2 of 2

৬৮. সার্কুলার রোডের বাড়িটি

সার্কুলার রোডের বাড়িটির একতলায় দুটি দোকানঘর। একটি দশকর্ম ভাণ্ডার, অন্যটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের, সারাদিন খরিদ্দারদের ভিড় লেগে থাকে। দুটি দোকানের মাঝখান দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি, অন্ধকার মতন, রেলিং ভাঙা। বেশ পুরাতন আমলের বাড়ি, গৃহস্বামী এক সময় দোতলায় থাকতেন, এখন আর একটি গৃহ নির্মাণ করে বউবাজারের সম্রান্ত অঞ্চলে উঠে গেছেন, আপাতত কয়েক মাস যাবৎ সমগ্র দোতলাটি তালাবন্ধ অবস্থাতেই রয়েছে। তিনতলায়, আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ, নিরীহ ব্রাহ্মণ পরিবারের বাস। স্বামী, স্ত্রী ও ভগিনীকে নিয়ে ছোট সংসার, আর রয়েছে সর্বক্ষণের ফরমাশ-খাটা এক বালক ভৃত্য। ঘর রয়েছে চারখানা, সামনে ও পেছনে দুটি বারান্দা, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর, স্নানের ঘর, ভাড়া বারো টাকা। কেউ জানে না, এটাই গুপ্ত সমিতির কেন্দ্র। সমিতির সদস্যরা নিজেরা নাম দিয়েছে, আখড়া।।

দিনের বেলা পারতপক্ষে কেউ আসে না। আনাগোনা শুরু হয় সন্ধ্যার কিছুটা পরে। যখন দোকান-ঘরগুলি বন্ধ হয়ে যায়। দিনের বেলা যদি কারুকে আসতে হয়, তবে আসে ফুলবাবুটি সেজে, গিলে করা পাতলা কামিজ পরে ও ধুতির কোঁচাটি হাতে ধরে, যেন তিনতলার যতীনবাবুর আত্মীয়।

যতীনবাবুর লম্বা-চওড়া বলশালী দেহ হলেও গলায় পৈতে ও রুদ্রাক্ষের মালা ঝোলে, কপালে চন্দনের তিলক, মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সংস্কৃত শ্লোক আওড়ান, এই পল্লীর মানুষ তাকে সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ বলেই জানে। ভরত প্রথম যেদিন এসেছিল, সেদিন যতীন একটা ফাঁকা ঘরে, মালকোচা মেরে ধুতি পরে, খালি গায়ে একটা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। যেন রামায়ণ-মহাভারতের কোনও চরিত্র।

ভরত এখানে হেমচন্দ্রের সঙ্গে প্রায়ই আসে। অন্যদের মধ্যে আসে বারী, তার মামা সত্যেন্দ্র, দেবব্রত বসু নামে একজন বেশ শিক্ষিত যুবক, ভূপেন্দ্র দত্ত, রাখহরি সরকার, অমিতবিক্ৰম গোস্বামী ও আরও কয়েকজন। এই আখড়ায় অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে আছে দু’খানি তলোয়ার, গোটা দশেক লাঠি ও একটি পিস্তল। এই সব অস্ত্র চালনায় প্রাক্তন সৈনিক যতীনই সবচেয়ে দক্ষ। মাঝে মাঝে সে একটা তলোয়ার হাতে নিয়ে অন্য সদস্যদের বলে, কে কতখানি শিখলে, তার পরীক্ষা দাও। আমার সঙ্গে লড়ো! ভরতকেও লড়তে হয়েছে কয়েকবার, বলাই বাহুল্য, একটু পরেই সে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। অন্য কেউ যতীনের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না। জয়ী হয়ে যতীন সগর্বে উরু চাপড়ায়। ভরতের মনে হয়, অন্যদের অস্ত্র প্রয়োগ শিক্ষা দেবার বদলে যতীন যেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবার জন্যই বেশি ব্যস্ত।

আজ সারাদিন বৃষ্টি, সন্ধ্যার পর পথ একেবারে জনমানব শূন্য। বাতাসে বেশ শীত শীত ভাব। হেম উঠেছে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে, কাছাকাছি একটি মেস বাড়িতে জায়গা করে নিয়েছে ভরত। এই মেসের লোকেরা অফিস-কাছারি থেকে ফিরে আসার পর কেউ লুঙ্গি, কেউ ঠেঙো-ধুতি পরে নেয়, তারপর সময় কাটাবার জন্য বদ রসিকতায় মেতে ওঠে। কেউ কেউ কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে নাচে। মেসবাসীদের নারীবর্জিত জীবন, তাই তাদের অধিকাংশ কথাবার্তাই নারীঘটিত, আদিরসাত্মক। ভরতের এসব খুবই অরুচিকর লাগে, বিকেলের পর তার আর এখানে মন টেকে না। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এল হেমচন্দ্রের বাড়িতে, সেখানে কোনও বসার জায়গা নেই, তাই দু’জনে আবার বেরিয়ে পড়ল আখড়ার উদ্দেশে।

এমন দুর্যোগের দিনেও সেখানে কয়েকজন উপস্থিত হয়েছে আগেই। অমিতবিক্রম প্রায় রোজই আসে। এই ছেলেটির বাড়ি শ্রীরামপুর, বিত্তশালী পরিবারের সন্তান, মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে, জীবিকার সন্ধানেও মন নেই। দেশোদ্ধার ব্রত যেন তার কাছে কোনও রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার, প্রায়ই অস্থির হয়ে বলে, কই কিছু শুরু হচ্ছে না কেন, চলো একবার বেরিয়ে পড়ি, অন্তত একটা সাহেব মেরে আসি। হাসিখুশি স্বভাবের যুবাটিকে সকলেরই ভাল লাগে।

দেবব্রত একখানি বই এনেছে, তার থেকে অংশবিশেষ পড়ে শোনাচ্ছে। রমেশ দত্তের লেখা ইকনমিক হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া। শাসনের নামে ইংরেজরা এ দেশকে কত রকমভাবে শোষণ করেছে, তার মর্মন্তুদ বিবরণ। বঙ্কিমবাবুর গানে যে দেশকে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বলা হয়েছে, সে দেশ ঘন ঘন দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে এখন মলিন, নিষ্প্রাণ। ইংরেজ রাজপুরুষরা গর্ব করে বলে, মুঘল আমলের তুলনায় বর্তমান সুশাসনে ভারতে চুরি-ডাকাতি, খুন সন্ত্রাস কত কমে গেছে। রমেশ দত্ত দেখিয়েছেন, তার বদলে মানুষের দারিদ্র্য কত বেড়েছে, অর্ধাহারে মানুষগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। এই শান্তি যেন শ্মশানের শান্তি!

পড়তে পড়তে দেবব্রত বলল, ভাই, একজন সমালোচক বলেছেন, কংগ্রেসের এক গরুর গাড়ি ভর্তি বক্তৃতার চেয়ে রমেশ দত্তর অর্থনৈতিক লেখা অনেক বেশি মূল্যবান।

হেমচন্দ্র বলল, এই বক্তব্যের অনেক কিছুই আমরা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও জানি, গ্রামেগঞ্জে ঘুরে দেখেছি। কিন্তু এর প্রতিকারের উপায় কী? রমেশবাবুও তো ইংরেজদের তাড়াবার কথা বলেন না।

বারীন বলল, বিপিন পালও কী গরম গরম লিখছেন দেখেছ? ওঁকে বোধ হয় আমাদের দলে পাওয়া যাবে।

অমিতবিক্রম একটা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেছিল, তড়াক করে উঠে পড়ে বলল, এসব বিষয়ে আমারও অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু তার আগে এমন বর্ষার দিনে এক পাত্তর চা হলে হয় না?

যতীন মুখ গোঁজ করে বলল, একবার তো চা খেয়েছ!

অমিতবিক্ৰম বলল, ভরতদা, হেমারা পরে এল, ওদের জন্য বলছি। সেই সঙ্গে যদি আমারও এক ভাঁড় জুটে যায়।

বারীন বলল, লোহালের পাশের দোকানটায় খুব ভাল তেলেভাজা পাওয়া যায়। যতীনদা, তুমি ভেতরে চায়ের কথা বলে দাও, কিছু মুড়ি-তেলেভাজা আনানো যাক। সবাই দু পয়সা করে চাঁদা দাও।

যতীন বলল, আর চায়ের খরচটা কে দেবে?

সবাই হঠাৎ চুপ করে গেল। কোনও গৃহস্থ বাড়িতে এসে পয়সা দিয়ে চা খাওয়া সম্ভব নাকি? কাছাকাছি কোনও চায়ের দোকানও নেই।

বারীন বলল, চায়ের জন্য আর কতটুকু খরচ, ওটা তুমিই দাও যতীনদা। ঠিক আছে, তোমাকে মুড়ির জন্য চাঁদা দিতে হবে না।

বালক ভৃত্যটির নাম খেলারাম। সে দৌড়ে চলে গেল মুড়ি-টুড়ি আনতে। একটু পরেই ভেতর থেকে একটা বড় থালায় কাপ সাজিয়ে চা নিয়ে এল কুহেলিকা। যতীনের স্ত্রী একেবারে পদানশীনা, ভেতরের কোন ঘরে বসে থাকে কে জানে, এখানকার আড্ডাধারীরা তাকে একবারও চক্ষে দেখেনি। কুহেলিকা সবার সামনে আসে, সে যতীনের বোন। আপন বোন, না দূর সম্পর্কের তা অবশ্য জানা যায় না। বয়েস কুড়িবাইশের বেশি হবে না, শরীরটি গড়াপেটা, মুখে জলুস আছে, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে মিটিমিটি হাসি। আগে ধারণা হয়েছিল সে বয়স্থা কুমারী, এখন শোনা গেছে যে, সে বালবিধবা।

কুহেলিকা সকলকে চা দেবার পর দাঁড়িয়ে রইল। অমিতবিক্ৰম বলল, আপনিও আমাদের সঙ্গে বসুন না!

যতীন কঠোরভাবে বলল, না, ও এখানে বসবে না। তুই ভেতরে যা!

অমিতবিক্ৰম বলল, অন্তত দু গাল মুড়ি খেয়ে যাক।

যতীন বলল, মুড়ি ভেতরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

আবার আলোচনা শুরু হয়ে গেল। ভরত নিজের চায়ের কাপটি নিয়ে উঠে গেল জানলার ধারে।

এ বাড়ির পাশেই একটা বস্তি। জানলা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। একটি বড় বাড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ভরত। আগে ওই অঞ্চলে ওরকম বাড়ি একটিই ছিল, এখন কাছাকাছি আরও দুটি বাড়ি উঠেছে, তবু এ বিশেষ বাড়িটি চিনতে ভরতের ভুল হয় না। এই প্রাসাদে এক সময় থাকতেন মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য। যদিও পরিচয় দিতে পারে না, তবু তিনিই তো ভরতের পিতা। এখনও ওই বাড়ি ত্রিপুরার রাজ সরকারেরই ভাড়া নেওয়া আছে, ভরত একদিন কাছাকাছি ঘুরে দেখে এসেছে, ওখানে বর্তমানে বিশেষ কেউ নেই।

ভরতকে ওই বাড়ি এখনও টানে, বাবার জন্য নয়, ওখানে এক সময় থাকত ভূমিসূতা। ভেতরে ভরতের প্রবেশ অধিকার ছিল না, তবু এক এক রাত্তিরে চোরের মতন সে এসে পাচিলের চার পাশে ঘুরেছে। এতদিন পর আবার কেন দেখা হল ভূমিসূতার সঙ্গে? এই রমণীর সঙ্গে সারাটা জীবন তার শুধু দুঃখের সম্পর্কই থেকে যাবে? কটকে থাকার সময় সে যখন মহিলামণিকে বিবাহ করতে সম্মত হয়েছিল, তখনই ভরত ঠিক করেছিল, ভূমিসূতা তার জীবন থেকে নিঃসৃত হয়ে যাবে। সে চিরতরে হারিয়েই গেছে। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর সে যখন যাযাবরের মতন ভ্রাম্যমাণ ছিল, তখনও ভূমিসূতাকে ফিরে পাওয়ার আশা করেনি। তার সারা জীবনটাই উদ্দেশ্যহীন, তবু অরবিন্দ ঘোষ, বারীন, হেমচন্দ্রের সংস্পর্শে এসে সে একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিল, দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ। এর মধ্যে ভরত বিভিন্ন দেশের বিপ্লব ও স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি বই পড়ে ফেলেছে। ভগিনী নিবেদিতা সংগ্রহ করে দিয়েছেন এরকম অনেক গ্রন্থ। সে সব পড়ে ভরত বুঝতে পেরেছে, বিপ্লবের প্রাথমিক পর্বে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীদের প্রাণ দিতেই হয়। ফরাসি বিপ্লবেই তার উদাহরণ প্রকট। রেভেলিউশান ডিভাউরস ইটস ওউন চিলড্রেন। ভরতও প্রাণ দেবার জন্য তৈরি হয়ে অনেকটা স্বস্তি বোধ করেছিল। আর তাকে অন্য কোনও পথ খুঁজে বিড়ম্বিত হতে হবে না।

তবু কেন এর মধ্যে কেন এসে পড়ল ভূমিসূতা? ভরত কি ভূমিসূতাকে ভালবাসে? সে নিজেই বুঝতে পারে না। অনেক দিন পর্যন্ত একটা অপরাধবোধই তাকে পীড়া দিয়েছে, সে এক সংকটের মুহূর্তে ভূমিসূতার সঙ্গে পুরুষোচিত ব্যবহার করেনি, বরং ভূমিসূতার আত্মনিবেদনকে সে অপমান করেছে। সে সব তো কতকাল আগেকার কথা! জীবনের নানান সংঘাতে ওসব তুচ্ছ হয়ে যায়। ভূমিসূতা এখন কত উচ্চে উঠে গেছে, সে শুধু খ্যাতনামী নটী নয়, ঠাকুর পরিবারের পুরুষেরা তার প্রণয়প্রার্থী, ভরতকে সে মনে রাখবে কেন? মনে যে রাখেনি, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণও পাওয়া গেল। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সে মুখ ফিরিয়ে থেকেছে, একবারও ভরতের দিকে সরাসরি দৃষ্টিপাত করেনি।

যাকে পাওয়া যাবে না, তার জন্যও বুকের মধ্যে মৃদু ব্যথা সব সময় ছড়িয়ে থাকে কেন? এ যেন এক রহস্য। ভরত কি ইচ্ছে করলে আবার বিবাহ করতে পারত না! এখনও পারে। এ দেশে কোনও পুরুষের জন্যই কখনও পাত্রীর অভাব হয় না। কিন্তু অপর কোনও নারীর জন্য সামান্য টানও অনুভব করে না ভরত। ভূমিসূতার সঙ্গে আর কখনও দেখা করবে না, থিয়েটার দেখতে যাবে না, সরলা ঘোষালের বাড়িতে যাবে না, এমন একটা শপথ সে নিয়েছে মনে মনে। তবু কেন মন থেকে মুছে দিতে পারছে না ওই মুখ? ছাত্র বয়েসে ভরত যে ইংরেজি রোমান্টিক কবিতা পড়েছিল, এখনও কি রয়ে গেছে সেই প্রভাব? সংস্কৃত সাহিত্যে প্রেম মানে শারীরিক সান্নিধ্য উপভোগ, আর ইউরোপীয় রোমান্টিক কাব্যে দূরত্বের হা-হুঁতাশ।

ভরতের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, মন, আমাকে ভূমিসূতার চিন্তা থেকে মুক্তি দাও। আমি দেশমাতৃকাকেই ধ্যানজ্ঞান করতে চাই!

দূরের ওই বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভরতের আর একটা কথাও মনে আসে। সে কি আর কখনও ত্রিপুরায় ফিরতে পারবে না? ভূমিসূতার মতন তার জন্মভূমিও তার কাছে চিরকাল অলভ্য থেকে যাবে? এত দিন হয়ে গেল, তবু সে ভুলতে পারে না, তার শরীরে আছে ত্রিপুরার রাজরক্ত, সেই রাজ্যটির প্রতি টান এখনও রয়ে গেছে। এখনকার রাজা রাধাকিশোরকে সে অল্পই দেখেছে, তখন সে নরম প্রকৃতির ছিল, এখন সিংহাসনে বসার পর সে কেমন মানুষ হয়েছে কে জানে! অমৃতবাজার পত্রিকায় পড়েছে, আগরতলায় নির্মিত হয়েছে নতুন রাজধানী। গড়া হয়েছে। নতুন রাজপ্রাসাদ। ভরতের একবার দেখে আসতে ইচ্ছে করে। সে ত্রিপুরায় গেলে কেউ কি তাকে চিনতে পারবে?

এ দিকে তর্ক জমে উঠেছে। মহারাষ্ট্রে তিলক প্রবর্তিত শিবাজী উৎসব বাংলাতেও অনুষ্ঠিত হবে ধুমধামের সঙ্গে। সখারাম গণেশ দেউস্কর নামে এক বাংলা জানা মারাঠি এর প্রধান উদ্যোক্তা, অনেক গণ্যমান্য লোক তাতে খুব উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন জানিয়েছেন। আবার সরলা ঘোষাল প্রতাপাদিত্য-উদয়াদিত্য উৎসবও পালন করতে চান। এই দলের মধ্যে কেউ কেউ শিবাজীর বদলে প্রতাপাদিত্য উৎসবেরই বেশি সমর্থক। বাঙালিরা কি মারাঠা শিবাজীকে আদর্শ বীর বলে মেনে নেবে? বর্গির আক্রমণ ও লুঠতরাজের স্মৃতি এখনও বাঙালিদের মধ্যে রয়ে গেছে। কেন, বাংলায় কি বীর নেই? প্রতাপাদিত্য যখন মুঘলদের সঙ্গে লড়াই করার সাহস দেখিয়েছিলেন, তখন মুঘল সাম্রাজ্য প্রবল শক্তিমান। আর শিবাজী যখন যুদ্ধ করেছিলেন, তখন মুঘল সাম্রাজ্য ক্রমশ হীনবল। হয়ে যাবার মুখে। প্রতাপাদিত্যকে যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুনি বলে থাকেন, তা হলে শিবাজীর ছুরিতে আফজল খান হত্যাও কম কলঙ্কজনক নয়! বাংলা মঞ্চে এখন প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে নাটক চলছে, দর্শকরা মুহুর্মুহু করতালিতে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

জানলা থেকে ফিরে এসে ভরত জোর দিয়ে বলে উঠল, না, সরলা ঘোষালের উৎসবে আমাদের যোগ দেওয়া উচিত নয়!

সত্যেন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?

ভরত ঠিক যুক্তি দিতে পারল না, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সেদিন ভূমিসূতাকে ও বাড়িতে দেখার পর থেকেই সে ঠিক করেছে, সরলা ঘোষালের দলের সঙ্গেই সে আর কোনও সংস্পর্শ রাখবে না। কিন্তু সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

সে আবার বলল, শিবাজী উৎসবে যোগ দেওয়াও আমাদের পক্ষে অর্থহীন।

দেবব্রত জিজ্ঞেস করল, আমরা এই সব উৎসব থেকে দূরে সরে থাকব?

ভরত বলল, অবশ্যই। উৎসব মানে তো লাঠি নিয়ে ধেই ধেই নাচ আর মরচে পড়া তলোয়ার ঘোরানো। আর গানের পর গান। এই নিয়ে আমরা কতকাল কাটাব? কাজের কাজ কিছুই শুরু করছি না।

দেবব্রত বলল, জনগণকে সচেতন করার জন্য এই ধরনের উৎসবের সার্থকতা অবশ্যই আছে। অধিকাংশ মানুষই তো এখনও জানে না, কাকে বলে দেশ।

হেমচন্দ্র বলল, ভরত ঠিকই বলেছে। নিজেদের জীবনযাত্রার সব দিক ঠিকঠাক রেখে যাঁরা ওইভাবে জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা তাই নিয়ে থাকুন। কিন্তু আমরা বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছি, ঘর ছেড়ে চলে এসেছি, আমরাও নাচ-গান করে দিন কাটাব? এই করতে করতে যে বুড়ো হয়ে যাব।

অমিতবিক্ৰম বলল, একখানা পিস্তল আর দুখানা ভোঁতা তলোয়ার আমাদের সম্বল। এই নিয়ে বিপ্লব হবে? জাপানি সাহেবটি যে বলে গেলেন বিদেশ থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র আসবে, সে সব কোথায় কে বাবা?

সবাই মিলে একসঙ্গে কথা বলা শুরু করলে যতীন হাত তুলে বলল, চুপ, চুপ! আমার কথা শোনো। টাকা পেলে অনেক অস্ত্র জোগাড় করা যাবে। পগেয়াপট্টির একটা চিনেম্যানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, টাকা দিলে সে হংকং থেকে অনেক পিস্তল আর টোটা এনে দিতে পারে। কিন্তু টাকা কোথায়? বারীন, তোমাকে যে আমি মল্লিক বাড়িতে যেতে বলেছিলাম কিছু চাঁদা আদায়ের জন্য, তুমি গিয়েছিলে?

বারীন বলল, আমি যাব কেন? আমার ওপর দায়িত্ব দলের জন্য বিশ্বস্ত সদস্য জোগাড় করা। টাকার ব্যবস্থা করবে তুমি!

যতীন বলল, আমি আর কত করব? কোনওরকমে তো চালাচ্ছি। বড়লোকেরা আমাদের কিছু কাজ না দেখলে আর সাহায্য করতে চাইছে না।

হেমচন্দ্র বলল, আমরা কীভাবে কাজে নামব আগে সেই পরিকল্পনা করো। টাকার চিন্তা পরে হবে।

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে এলোমেলো বাতাস। নতুন করে অ বজ্রগর্জন শুরু হল।

অমিতবিক্রম অনেকটা আপন মনে বলল, আজ বাড়ি ফিরব কী করে কে জানে! আহা এমন রাতে যদি খিচুড়ি আর ডিম ভাজা খাওয়া যেত!

সত্যেন বলল, যতীন, আজ তোমার বাড়িতেই খিচুড়ি লাগাও না, সবাই মিলে আনন্দ করে খাই! তোমার বোন বুঝি রান্না করে, একদিন খেয়েছিলাম, ওর রান্নার হাতটি বড় সরেস!

সবাই মিলে একসঙ্গে খিচুড়ি খিচুড়ি বলে চেঁচিয়ে উঠল।

যতীন আবার হাত তুলে সকলকে থামিয়ে বলল, বেশ, খিচুড়ি হতে পারে। প্রত্যেকে একটা করে টাকা দাও!

অমিতবিক্ৰম বলল, সে কী যতীনদা, একদিন তোমার বাড়িতে খিচুড়ি খাব, তাও কিনে খেতে হবে? তা হলে সে খিচুড়ির স্বাদ থাকবে না।

যতীন রেগে উঠে বলল, আমি কি দানছত্তর খুলেছি নাকি। আমি পাব কোথায়? বরোদা থেকে  অরবিন্দবাবু মাসে তিরিশটি টাকা পাঠান, তাও গত মাসে আসেনি। এই টাকায় বাড়ি ভাড়া, সংসার খরচ, সমিতির খরচ–এত কিছু চলে?

হেমচন্দ্র বলল, যতীনদা, একজন মানুষ তার মাইনের টাকা থেকে কিছু সাহায্য পাঠাবে,। বিপ্লব হয় না! অনেক টাকা সংগ্রহ করে একটা ফান্ড করা দরকার। সেই টাকা সংগ্রহের। উপায় তো আমি বলেছিলাম।

যতীন বলল, তাতে তো আমি রাজি আছিই। তুমি অন্যদের মত নাও। আমি অরবিন্দবাবুকেও চিঠি লিখেছি।

দরজার বাইরে অলঙ্কারের রিনিঝিনি শব্দ শোনা গেল।

অমিতবিক্ৰম উৎসুকভাবে সেদিকে তাকিয়ে বলল, খিচুড়ি খাওয়ার জন্য চাঁদা তোলার দরকার নেই। আমি দশটা টাকা দিচ্ছি, ব্যবস্থা করে ফেল!

সত্যেন বলল, দশ টাকা! তা হলে শুধু ডিম ভাজা কেন, তপসে মাছও হয়ে যাক।

যতীন বলল, এত রাতে তোমার জন্য তপসে মাছ যেন কেউ সাজিয়ে বসে আছে। গ্রাম থেকে আজ পাঁচ গণ্ডা হাঁসের ডিম দিয়ে গেছে, সেই ডিমই খাও!

না ডাকতেই কুহেলিকা মুখ বাড়িয়ে বলল, আমাকে কিছু বলছ?

অমিতবিক্রম বলল, যতীনদা, আজ শ্রীরামপুর ফেরা আমার পক্ষে অসম্ভব। রাত্তিরটা তোমার এখানেই থেকে যাব?

যতীন কঠোরভাবে বলল, না, ওসব চলবে না। তোমরা এখানে রাত্রে থাকা শুরু করলে পাড়ার লোকে সন্দেহ করবে। শ্রীরামপুরে ফিরতে না পারো, ভরতের মেসে গিয়ে শুয়ে পড়ো।

এরপর আরও দিন দশেক আলাপ-আলোচনার পর প্রথম কর্ম পরিকল্পনা গৃহীত হল।

চাঁদপাল ঘাট থেকে ভাড়া করা হল একটা নৌকো। চাঁদনি রাতে অনেকেই গঙ্গায় প্রমোদভ্রমণে যায়, এই দলটি ঠিক সেরকম নয়। নৌকোটি নেওয়া হয়েছে সাত দিনের কড়ারে এবং দাঁড়ি-মাঝিদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। যতীনের অনেক গুণ, সে নৌকো চালাতেও জানে। হেমচন্দ্রও পারে বৈঠা বাইতে। সাতজন যুবককে নিয়ে নৌকোটি ভেসে চলল গঙ্গার মোহনার দিকে।

আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছে যে কোনও বিশাল ধনীর বাড়িতে হানা দেওয়া হবে না। কারণ, সেসব বাড়িতে অনেক লোক-লস্কর-দ্বারবান থাকে। প্রথমেই কোনও সংঘর্ষের পথে যাওয়া ঠিক নয়। টাকাকড়ি কম পাওয়া গেলেও কোনও মধ্যবিত্ত, ছোট পরিবারকে লক্ষ করাই সুবিধাজনক। বারীন ও হেম এর আগেই ডায়মন্ড হারবার অঞ্চল ঘুরে দেখে এসেছে। একটি গ্রামের এক ব্যবসায়ীর বাড়ি নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেই গ্রাম থেকে থানা অন্তত এগারো মাইল দূরে।

ট্রেনযোগে একসঙ্গে সাতজন যুবকের যাওয়া ও আসা সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে। সেই জন্যই নৌকোর ব্যবস্থা। যতীন এর মধ্যেই মাঝি সেজে ফেলেছে, তার পরনে চেক লুঙ্গি। ভাটার টানে নৌকো এগিয়ে চলল বেশ তরতর গতিতে।

হীরক বন্দর ও কাক দ্বীপের মাঝামাঝি এক জায়গায় নোঙ্গর করা হল নৌকো। দিনের বেলায় শুধু রান্না, খাওয়াদাওয়া ও ঘুম। পূর্ণিমা চলছে, বড় বেশি জ্যোৎস্না বলে প্রথম রাতটায় অভিযান বাতিল করা হল। পরদিন বিকেল থেকে মেঘলা। চাঁদের দেখা নেই, এই রাতটিই ঠিক উপযুক্ত।

অমাবস্যার সময় এলেই ভাল হত। কিন্তু সে হিসেবে ভুল হয়ে গেছে।

প্রথম থেকেই যারা উৎসাহে টগবগ করছিল, সন্ধের পর দেখা গেল তারা যেন কেমন ম্লান হয়ে পড়েছে। নৌকোর ছইয়ের মধ্যে দেবব্রত পূজোয় বসে গেছে। যে-কোনও কাজ শুরু করার আগে সে তার আরাধ্য দেবতার নির্দেশ পেতে চায়। আরও দুজন ঈশ্বরের নাম জপ করছে। ভরত লক্ষ করল, একমাত্র হেমচন্দ্ৰই কোনওরকম প্রার্থনার ধার ধারে না।

বারীন এক সময় শরীর মুচড়ে বলল, আমি বলছিলাম কী উপেনদা, সবাই মিলে কি যাবার দরকার আছে? দু’একজন কি নৌকোয় থাকলে হয় না? ধরো যদি এদিক থেকে কোনও পুলিশের নৌকো আসে, আমি দৌড়ে গিয়ে তোমাদের সাবধান করে দিতে পারব।

হেমচন্দ্র বলল, ওসব চলবে না। আমরা সাতজন এসেছি, একসঙ্গে সব দায়িত্ব নিতে হবে। এতে যদি কোনও পাপ থাকে, তাও যেন সকলকেই অর্শায়।

বারীন বলল, আহা সে কথা বলছি না। দায়িত্বও তো ভাগ করে নিতে হয়। ধরো, আমি যদি নৌকোয় থেকে সব দিক সামলাই, সেনাপতি তো নিজে যুদ্ধের মধ্যে যায় না, দূরেই থাকে।

যতীন শ্লেষের সঙ্গে বলল, তোমাকে আবার সেনাপতি বানাল কে? সব ব্যবস্থা তো আমিই করেছি!

হেমচন্দ্র বলল, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, বৃষ্টি আসার আগে বেরিয়ে পড়াই ভাল।

অমিতবিক্রম নৌকোর গলুইতে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি উদাস। সে অন্য কারুর কথাও শুনছে না।

যতীন তাকে তাড়া দিয়ে বলল, কী রে বিক্রম, তুই তৈরি হবি না?

আস্তে আস্তে উঠে বসল অমিতবিক্রম। কঁপা কাঁপা গলায় বলল, যতীনদা, ভদ্রলোকের ছেলে হয়ে শেষ পর্যন্ত চুরি-ডাকাতিতে নামতে হবে? বংশের নাম ডোবাব?

এটা অনেকেরই মনের কথা। অর্থ সংগ্রহের অন্য কোনও পথ দেখা যাচ্ছে না। বিপ্লবের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনে হাতে রক্ত মাখতে হবে, এটাও ঠিক, তবু মন থেকে দ্বিধা যায় না। সবাই চুপ করে রইল।

অমিতবিক্ৰম আবার বলল, আমি নিজের জীবন নিয়ে যা খুশি করতে পারি, কিন্তু আমার বাপ-ঠাকুরদা তো কোনও দোষ করেনি, আমি যদি ধরা পড়ি, জানাজানি হবেই, আমার বাড়ির মানুষ লজ্জায় সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। মানী বংশে কলঙ্ক লেপন হবে!

হেমচন্দ্র বলল, সাধারণ চোর ডাকাতদের মতন আমরা তো নিজেদের স্বার্থে কিছু করছি না। টাকা-পয়সা যা পাওয়া যাবে, তার থেকে এক কানাকড়িও নিজেদের জন্য ব্যয় করব না, সবই লাগবে দেশের মঙ্গলের জন্য! এতে তো কোনও কলঙ্ক নেই।

যতীন বলল, কাজে নামতে যদি কেউ ভয় পায়, তা হলে এখনও ফিরে যেতে পারে।

হেমচন্দ্র বলল, উহুঃ, ফিরে যাবার আর প্রশ্ন নেই। দীক্ষা নেবার সময় আমরা প্রত্যেকেই শপথ। করেছি, দলের নির্দেশ কেউ অমান্য করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

যতীন বলল, তবু, বিক্রম যখন ভয় পাচ্ছে, ওকে আমি ছেড়ে দিতে রাজি আছি।

অমিতবিক্রম এবার লাফিয়ে উঠে হুংকার দিয়ে বলল, ভয়? একটা ছুরি দাও, এক্ষুনি আমার বুক চিরে হৃৎপিণ্ডটা তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারি কি না দেখ!

এবার হেমচন্দ্র হেসে উঠল। অমিতবিক্রমের কাঁধে চাপড় মেরে বলল, তোমার হৃৎপিণ্ডটা আমাদের কোনও কাজে লাগবে না। বরং জামাটা খুলে ফেল, তোমাকে আমি এমনভাবে সাজিয়ে দেব, কেউ আর ভদ্দরলোক বলে চিনতে পারবে না। ছোটবেলায় একবার আমাদের পাড়ায় এক স্বর্ণকারের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল, চেঁচামেচি শুনে আমরা ঘুম ভেঙে বাইরে এসেছিলাম। ভাকাতরা যখন ছুটে পালায়, তখন একজনকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেইজন্যই আমি জানি, ডাকাতদের কেমন দেখতে হয়।

হেমচন্দ্রের নির্দেশে সবাই জামা খুলে ফেলে ধুতিতে মালকোঁচা আঁটল। সর্বাঙ্গে ছপছপে করে মাখা হল সরষের তেল, কেউ জাপটে ধরতে গেলেও পিছলে যাবে। ভাত রান্নার মাটির হাঁড়ির গা থেকে ভুযো কালি নিয়ে মাখা হল মুখে। মাথায় বাঁধা হল গামছা। এরপর হাতে লাঠি নেবার পর শ্রীরামপুরের গোঁসাই বাড়ির অমিতবিক্রমের এ রূপ দেখে তার মা-বাবাও বোধ করি চিনতে পারবেন না।

যতীনের কাছে পিস্তল, দুটি তলোয়ারের একটি হেমচন্দ্রের হাতে, অন্যটি নিল ভরত। নৌকো থেকে নেমে কিছুটা অগ্রসর হবার পর যতীন বলল, একটা কথা শুনে রাখো, প্রথমেই বেগতিক দেখলে সরে পড়তে হবে, বেশি বেশি সাহস দেখাবার দরকার নেই। খুন জখমের মধ্যে যাওয়া ঠিক হবে না। দৈবাৎ কেউ ধরা পড়লেও কিছুতেই দলের অন্যদের নাম বলবে না।

হেমচন্দ্র বলল, প্রথমে বাড়ির মধ্যে ঢুকব আমি, তোমরা পেছনে থাকবে। অনেক বাড়িতে রামদা কিংবা বর্শা থাকে, যদি তা নিয়ে আক্রমণ করে, প্রথমটা আমার ওপর দিয়ে যাবে।

ভরত বলল, না হেম, ও দায়িত্বটা আমি নিতে চাই। আমার চালচুলো নেই, তুমি সংসারী মানুষ।

হেমচন্দ্র বলল, বিয়ে করলেও সব মানুষ সংসারী হয় না। সন্তানের জন্ম দিলেও সবাই পিতা হয় না। আমি যা বলছি, তাই শোনো।

বারীন বলল, হ্যাঁ, হেমই প্রথমে যাবে।

যতীন বলল, না, না, আমার কাছে আসল অস্তর, আগে যাব আমি! হেম আমার পাশে থাকবে। ও সাধারণত ডাকাতরা আসে মশাল নিয়ে, হা-রে-রে-রে আওয়াজ তুলে! আগে থেকেই ভয় জাগিয়ে দেওয়াই থাকে উদ্দেশ্য। এরা এল অন্ধকারের মধ্যে নিঃশব্দে। বাড়িটাকে ঘিরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। খুব কাছাকাছি আর কোনও বাড়ি নেই। এ বাড়ির অধিবাসীরাও ঘুমন্ত মনে হল। আগেই খবর নেওয়া হয়েছে, দুজন প্রৌঢ় ও একজন ভৃত্য ছাড়া এ বাড়িতে কোনও জোয়ান পুরুষ নেই। দুই ছেলে শহরে চাকরি করতে গেছে।

উঠোনটা দেওয়াল ঘেরা নয়, চাঁচার বেড়া দেওয়া। সেই বেড়া টপকে প্রথমে ঢুকে পড়ল চার জন। অমনি একটা কুকুর তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। কিন্তু দেশি সারমেয় দূর থেকেই চেঁচায়, কাছে আসে না। তার দিকে লাঠি বাগিয়ে রইল অমিতবিক্রম।

লম্বা একটা মাটির দাওয়ার ওপাশে পর পর কয়েকটা ঘর। সেই দাওয়াতে শুয়ে আছে এ বাড়ির ভৃত্য। যতীন বলল, ভরত, তুমি এর বুকে পা দিয়ে চেপে রাখো।

আচমকা জেগে উঠে ভৃত্যটি তলোয়ারধারী এক মূর্তি দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যতীন আর হেমচন্দ্র দম দম করে লাথি মারল একটা বন্ধ দরজায়। যতীন কঠোর স্বরে বলল, কে আছ, দরজা খোলো শিগগির, নইলে আগুন লাগিয়ে দেব।

দরজা খুলে দিল এক বুড়ি। সম্ভবত বিধবা পিসিমা-টিসিমা হবে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে না পেরে সে ধমকে উঠল, এত রাতে, হারামজাদা, মুখপোড়া, তোরা কারা?

অন্য একটি ঘরের দরজা খুলে গেল। ছোট একটি লাঠি নিয়ে এক খর্বকায় প্রৌঢ় বেরিয়ে আসতে চাইলেও পেছন থেকে তার স্ত্রী কাছা টেনে ধরে বলতে লাগল, ওগো, যেয়ো না, যেয়ো না, ডাকাত! মেরে ফেলবে! হে ভগবান, হে ভগবান…।

যতীন পিস্তল তুলে বলল, চেঁচিয়ো না কেউ। প্রাণে মারব না। টাকাকড়ি, গয়নাগাঁটি যা আছে বার করে দাও! দেরি করলে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেব। ধনে প্রাণে পুড়ে মরবে।

বেশ সহজভাবেই, তৎপরতার সঙ্গে কাজ হয়ে গেল। প্রতিরোধের কোনও প্রশ্নই নেই। অন্যদের হাতে লুণ্ঠিত সামগ্রী দিয়ে চলে যেতে বলে অসমসাহসী যতীন একা সেখানে দাঁড়িয়ে রইল আরও কিছুক্ষণ। যাতে ওরা আতাঁরব তুলে পাড়া-পড়শিদের জোটাতে না পারে। যতীনের হাতের পিস্তল দেখে বাড়ির সবাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। তারপর তাদের সারা রাত মুখ না, খোলার নির্দেশ দিয়ে যতীন এক লাফে পাঁচিল ডিঙিয়ে দৌড় লাগাল, বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করছিল ভরত, দুজনেই নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেল নৌকোয়। অবিলম্বে নৌকো ভেসে গেল মাঝ নদীতে।

বারীন, সত্যেন, দেবব্রতরা টাকা পয়সা গুনে দেখছে। মোট ছ’শো বাহাত্তর টাকা। আর চুড়ি দুল আংটি মিলিয়ে যা স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে, তার দাম হবে বড় জোর হাজার খানেক টাকা। ও বাড়িতে আরও কিছু হয়তো ছিল, কিন্তু সে জন্য জোর করা হয়নি, যা পাওয়া গেছে, তাইই যথেষ্ট।

ডাকাতি করা এত সোজা, একটা লাঠির বাড়িও মারতে হল না কারুকে!

অমিতবিক্ৰম আবার শুয়ে পড়েছে। একসময় সে আপন মনে হা হা করে হেসে উঠল। অন্যরা নিজেদের কথায় মত্ত, প্রথমে কেউ গ্রাহ্য করল না। কিন্তু অমিতবিক্ৰম হেসেই চলেছে দেখে যতীন জিজ্ঞেস করল, কী রে, তুই একা একা হাসছিস কেন? পাগল হয়ে গেলি নাকি!

অমিতবিক্ৰম বলল, আমি… একটা কুকুর–

যতীন বলল, আরে, এ ছেলেটা বলে কী?

 অমিতবিক্ৰম হাসতে হাসতেই বলল, আমার কাজ হল শুধু একটা কুকুরকে … ভবিষ্যতে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি দেশের জন্য কী করেছ? আমাকে বলতেই হবে, আমি শুধু একটা খেকি কুকুর সামলেছি।

এবার সকলেই একসঙ্গে হেসে উঠল।

কলকাতায় ফিরে কয়েকদিন চুপচাপ রইল ওরা। এই ঘটনার কোনও প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল না। সংবাদপত্রেও দূর মফস্বলের এত ছোটখাটো ডাকাতির খবর স্থান পায় না। দিন সাতেক পরে সমিতির সদস্যরা আবার জমায়েত হল আখড়ায়। প্রাথমিক দ্বিধা ও গ্লানি কেটে গেছে, আবার একটি এরকম কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সকলেই উৎসাহী।

শুরু হয়ে গেল পরবর্তী অভিযানের শলাপরামর্শ। কুহেলিকাকে ডেকে ঘন ঘন চায়ের জন্য অনুরোধ করে অমিতবিক্রম। দ্বিতীয় কাপ চায়ের কথা উঠতেই যতীন বলল, কে খরচ দেবে? সেদিন আমরা যা পেয়েছি, সব জমা থাকবে, তার থেকে এক কানাকড়িও নিজেদের জন্য খরচ হবে না, মনে নেই? আমি কি গাঁটের পয়সায় তোমাদের এতবার চা খাওয়াব?

অমিতবিক্ৰম বলল, না, না, ও পয়সায় খাব না। তোমাকে দিতে হবে না। চাঁদার পয়সায় চা, তোমার বাড়ির চায়ের স্বাদই আলাদা।

বর্ষা শুরু হয়ে গেছে, একদিন অমিতবিক্রম বাগবাজার ঘাট থেকে টাটকা জোড়া ইলিশ নিয়ে এল হাতে ঝুলিয়ে। সকলে মিলে খাওয়া হবে। সেদিন কুহেলিকার রান্না খেয়ে ধন্য ধন্য করতে লাগল সবাই।

কুহেলিকা চা এনে দেয়, খাদ্য পরিবেশন করে, অন্য সময়েও সে ঘোরাঘুরি করে এই কক্ষের আশেপাশে। সে এদের আলোলাচনায় যোগ দিতে চায়, কিন্তু তাতে যতীনের ঘোর আপত্তি। প্রায়ই কুহেলিকাকে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দেয় ভেতরে। অমিতবিক্রম বা সত্যেন কুহেলিকার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করলেও সে চোখ গরম করে।

পরবর্তী অভিযান হল তারকেশ্বরে। এবারেও নৌকোয় যাওয়া হল, হানা দেওয়া হল সুদের কারবারি এক মহাজনের বাড়িতে। এবারে টাকা পয়সা পাওয়া গেল অনেক বেশি, বিয়ও হয়েছিল যথেষ্ট। ইংরেজ সরকারের আদেশে কোনও পরিবারই বাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে পারবে না, এ ব্যাপারে ওরা নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু মহাজনের বাড়িতে একজন ভোজপুরি দরোয়ান ও সড়কিবল্লম, লাঠিসোঁটা ছিল যথেষ্ট, সেই দিনই মহাজনের দুই ঘণ্ডামার্কা শ্যালকও বাড়িতে অতিথি হয়েছিল। তাদের প্রতিরোধ অবশ্য বেশিক্ষণ টেকেনি, যতীন পিস্তলের গুলি শূন্যে চালিয়েছিল দুবার, তাতেই তারা হাতিয়ার ফেলে দেয়। শেষের দিকে দুজন তাড়া করে এসেছিল, ভরত আর হেমচন্দ্র তলোয়ার হাতে নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করে। লড়াই হয়েছিল সংক্ষিপ্ত।

গুপ্ত সমিতির কেউ ধরা পড়েনি, আহতও হয়নি। নৌকোয় উঠে ভরত চুপি চুপি হেমচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করেছিল, শেষকালে যে লোকটার ঘাড়ে আমরা তলোয়ারের কোপ দিলাম ও লোকটা কি শেষ পর্যন্ত মরেই যাবে, না বাঁচার আশা আছে?

হেমচন্দ্র উত্তর দিয়েছিল, জানি না, জানতেও চাই না। না মারলে ওরা আমাদের মারত। ও চিন্তা মন থেকে একেবারে মুছে ফেল!

এবারেও কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। পুলিশ এসব ঘটনাকে সাধারণ ডাকাতি বলেই ধরে নিয়েছে,। কোনও বিপ্লবী দলের অস্তিত্বের কথা সরকারি মহলের কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি। সকলেরই ধারণা, শিক্ষিত বাঙালি মানেই বাক্যবাগীশ, কোনওরকম বিপদের ঝুঁকি নেবার কথা তারা কল্পনাও করে না।

পুলিশ বা সরকারি মহল টের না পেলেও বাংলার রাজনৈতিক মহলে এই সব অভিযানের কথা জানাজানি হয়ে গেল। কেউই সমর্থন করলেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্যে নরমপন্থী নেতা। তিনি ব্রিটিশ রাজের কাছে আবেদন-নিবেদন চালিয়ে কিছু কিছু অধিকার আদায় করতে চান, গুপ্ত সমিতি, বিপ্লব এসবে বিশ্বাস করেন না। চুরি-ডাকাতি-নরহত্যা তো অতি ঘৃণ্য কাজ। বিপিনচন্দ্র পাল পত্র-পত্রিকায় উগ্র মতামত প্রচার করছেন বটে, তবু তিনিও এর বিরোধী। তার আপত্তি অবশ্য নৈতিক নয়, তিনি মনে করেন, এ সবের এখনও সময় আসেনি। পুলিশ একবার জানতে পারলে এমন ধর-পাকড় অত্যাচার শুরু করবে যে, দু দিনেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। তার চেয়ে দেশের মানুষকে সজাগ করার কাজই এখন চালিয়ে যেতে হবে বেশ কিছুদিন।  

সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ল সরলা ঘোষাল। সে সম্রান্ত ঘরের বিদুষী মহিলা, দেশের যুবকদের বীরত্বের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার ব্রত নিয়েছে, তার জন্য সে নিজস্ব উদ্যম ও অর্থব্যয় করছে অকাতরে। কিন্তু বাংলার যুবকরা চুরি-ডাকাতির মতন নীচ কাজে মেতে উঠছে! এত হীন পন্থায় কোনও মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে? সরলা ঘোষাল যতীন ও বারীনের দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি, কিন্তু তার নিজের দলের কিছু কিছু ছেলে সরে পড়ছে দেখে সে প্রথমে বিচলিত হয়ে পড়ে। অন্যদের কাছে খোঁজখবর নিয়ে জানল, তার দলের কিছু কিছু ছেলে যতীনের আখড়ায় যাতায়াত করে, তাদের কাছেই শোনা গেছে ডাকাতির খবর।

যে-কোনও উপায়ে এসব বন্ধ করতেই হবে। বাঙালি জাতির সম্মান এরা ধূলিসাৎ করতে চলেছে।

সরলার কী করে যেন ধারণা হল, যতীন বাঁড়জ্যের এই গুপ্ত সমিতির নির্দেশ আসছে বাংলার বাইরের কোনও নেতার কাছ থেকে। বাংলায় এদের কাজের সমর্থক কেউ নেই। বাইরের কে হতে পারে, বারীনের দাদা অরবিন্দ ঘোষকে কেউ নেতা বলে মানে না। বরোদা কলেজের এই ইংরেজির অধ্যাপকটির নামই অনেকে শোনেনি। বাংলার বাইরে সর্বজনমান্য নেতা আছে মহারাষ্ট্রে। গোখলে এবং তিলক।

গোখলের সঙ্গে সরলার বিশেষ হৃদ্যতা আছে। উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিমান, ধীর স্থির, সংস্কারমুক্ত এই মানুষটি অবশ্যই নেতৃত্বের যোগ্য। বাঙালিদের প্রতি গোভলের বিশেষ মুগ্ধতা আছে। বিপত্নীক এই মানুষটির বাঙালি রমণীদের প্রতি মুগ্ধতা আরও বেশি। অন্দরমহল ছেড়ে যেসব যুবতী বৈঠকখানায় এসে বসে, অনাত্মীয় পরপুরুষদের সঙ্গে চা পান করে, গান শোনায়, হাস্য-পরিহাসে অংশগ্রহণ করে, তেমন যুবতীদের তো কলকাতা শহরেই দেখা যায়। গোখলে এজন্য ঘন ঘন কলকাতায় আসেন, এলেই ঘোষাল বাড়িতে কয়েক সন্ধে কাটিয়ে যান। কেউ কেউ আড়ালে কানাকানি করে, সরলা ঘোষাল রাজি হলে গোখলে তাকে বিবাহ করেও ধন্য হতে পারেন। সরলা ঘোষালের অবশ্য সেদিকে মন নেই।

রাজনীতিতে গোখলেও অতি নরমপন্থী, তার সঙ্গে গুপ্ত বিপ্লবী দলের সংস্রব থাকার কোনও প্রশ্নই নেই। বরং তিলকের সঙ্গেই থাকা সম্ভব। তিলক চাপের ভাইদের ইংরেজ-হত্যায় প্রচ্ছন্ন সমর্থক ছিলেন। চিঠি লেখারও ধৈর্য রইল না, সরলা তিলকের সঙ্গে দেখা করার জন্য সোজা চলে গেল পুণায়।

তিলক যেমন গোঁড়া, একরোখা, তেমনি কূটবুদ্ধিতেও তার তুলনা নেই। সব শুনে তিনি সহাস্যে বললেন, না, বেটি তুমি যা ভেবেছ, তা ভুল। বাংলায় গুপ্ত সমিতি আমি চালাই না, আমি তাদের কোনও নির্দেশও পাঠাই না।

সরলা বলল, আপনি এই চুরি-ডাকাতি, এই ডাকাতির নামে নিরীহ মানুষ হত্যা, এসব সমর্থন করেন?

তিলক দুদিকে মাথা নেড়ে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, না, আমি এসব সমর্থন করি না।

সরলা খুশি হয়ে বলল, আপনার কথা শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। এই শোনার জন্যই তো এতদূর ছুটে আসা! এই বিপথগামী যুবকদের নিবৃত্ত করতেই হবে। এই কাজ আমাদের দেশের ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব কিছুর বিরোধী। আপনি প্রতিবাদ করুন, আপনি জানিয়ে দিন যে এটা ভ্রান্ত পথ। আপনার নির্দেশ সবাই শুনবে। আপনি লিখে দিন, আমার পত্রিকায় ছাপ।

তিলক এবার বললেন, না। আমি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাব না। পুলিশ এখনও কিছু জানে না। আমি কিছু লিখলে পুলিশ সজাগ হয়ে যাবে। তারপর এদের ঠিক ধরে ফেলবে। তা আমি চাই না।

সরলা বলল, তা হলে কি এরকম চলতেই থাকবে? আপনাকে কারুর নাম করতে হবে না, আপনি যুবকদের সামনে অন্য আদর্শের কথা তুলে ধরুন।

তিলক বললেন, কেউ কেউ যদি মনে করে, এটাই ঠিক পথ, এতেই দেশের কাজ হবে, আমি তাদের বাধা দিতে চাই না। আমি তাদের সমর্থনও করব না, প্রতিবাদও করব না।

নিরাশ হয়ে শূন্য হাতে সরলাকে ফিরে আসতে হল।

কিন্তু সার্কুলার রোডের আখড়ায় ভাঙন এল অন্য দিক দিয়ে।

কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল বারীন ও যতীনের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত। যতীনের হাবভাব দেখে মনে হয়, সে-ই এ দলের নেতা। বারীন তা মানতে রাজি নয়। মাঝে মাঝেই ওদের দু তিক্ত তর্ক শুরু হয়, তখন অন্যরা নির্বাক থাকে।

একদিন বারীন বলল, যতীনদা, টাকা পয়সাগুলো সব তোমার কাছে থাকবে? তুমি খরচ চালাবার জন্য কিছু রেখে বাকি সব টাকা আমাকে দিয়ে দাও।

যতীন বলল, কেন, আমার কাছে থাকলে অসুবিধা কী?

বারীন বলল, নিয়ম মতে আমাদের প্রধান নেতার কাছেই সব গচ্ছিত রাখা উচিত। তিনি এখানে নেই, এ দায়িত্ব নিতেও চান না। তার প্রতিনিধি হিসেবে আমার কাছেই রাখা সঙ্গত নয়?

যতীন বলল, তুমি কী করে প্রধান নেতার প্রতিনিধি হলে? তাঁর ভাই বলে? এখানে আমরা সবাই সমান, সবাই ভাই-ভাই নয়? আমি পাই পয়সা পর্যন্ত হিসেব রাখব, সেজন্য কারুকে চিন্তা করতে হবে না।

তর্কে ও যুক্তিতে হেরে গিয়ে বারীন অন্য পথ দিল। একদিন পটলডাঙার এক চায়ের দোকানে কয়েকজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে সে বলল, ওই আখড়ায় আমার আর যেতে ইচ্ছে করে না। ওই যতীন বাঁড়জ্যেটা কী দুশ্চরিত্র, তোমরা দেখতে পাওনা? ওই যে কুহেলিকা বলে মেয়েটা, ও কি ওর সত্যিকারের বোন, না রক্ষিতা? মেয়েটার ভাবভঙ্গি দেখেছ? অন্য কেউ ওই মেয়েটার সঙ্গে কথা বললেই যতীন বাঁড়জ্যে কী রকম খেঁকিয়ে ওঠে।

ভরত বলল, কিন্তু…তুমি যা বলছ, ওখানে তো যতীনদার স্ত্রীও রয়েছেন!

বারীন বলল, লোকে দুটো বউ নিয়ে থাকে না। বউটা নিশ্চয় গোবেচারা ভালমানুষ, তাকে ও দাবিয়ে রেখেছে। মেয়েটা আমাদের অন্য বন্ধুদেরও মাথা খাচ্ছে।

হেমচন্দ্র বলল, অমিতবিক্রমের ওই মেয়েটিকে খুব পছন্দ। আমার মনে হয়, সে বিধবা বিবাহ করতেও অরাজি হবে না।

বারীন বলল, একবার বলে দেখো না, যতীন বাঁড়জ্যে তাতেও রাজি হবে না। নিজের ও জিনিস কে ছাড়ে! কুহেলিকা! কুহেলিকা কোনও মেয়ের নাম হয়? ভেবেছিল সবটাই কু করে রাখবে? আমি সব জানি! তোমাদের কী বলব, আমার মামা সত্যেন, সেও প্রায়ই দিনের একা একা ও বাড়িতে যায়, শুয়ে থাকে। আমাদের সবাইকে ও নষ্ট করবে। সত্যি কথা বল মেয়েটার শরীরের দোলানি দেখো, আমারও মাঝে মাঝে মাথা ঘুরে যায়। নেহাত দেশের। জন্য আমি আর নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হব না ঠিক করেছি…

বারীন লম্বা অভিযোগপত্র পাঠাল তার দাদার কাছে। তদন্ত করার জন্য অরবিন্দ চলে এল কলকাতায়। বারীন ততদিনে গ্রে স্ট্রিটে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আলাদা আখড়া খুলে ফেলেছে। অরবিন্দ বারীনের মুখে সব শুনে সঙ্গে সঙ্গে রায় দিয়ে দিল। যতীনের সঙ্গে আর সমিতির কোনও সম্পর্ক রাখা হবে না। নতুন আখড়া হবে এই গ্রে স্ট্রিটে। সত্যেনও দলচ্যুত হল।

বিচার হল একেবারেই একতরফা। যতীনের কোনও কথাই শোনা হল না। কুহেলিকা নামের মেয়েটিরও যে কিছু বলার থাকতে পারে, সে চিন্তাও করল না অরবিন্দ।

প্রধান নেতার এই নির্দেশ শুনে রেগে আগুন হয়ে গেল যতীন। কয়েকজনকে ডেকে এনে তাদের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিল টাকার থলি। কুহেলিকার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে এনে ওদের সামনে বসিয়ে দিল জোর করে। পায়ের ওপর থেকে খানিকটা শাড়ি তুলে যতীন বলল, দেখা, সবাইকে দেখা।

যতীন নিজেরও পা রাখল পাশে। দুজনেরই পায়ের গড়নে খানিকটা বৈশিষ্ট্য আছে। দুজনেরই এক রকম, বুড়ো আঙুলে দুটো স্পষ্ট ভাঁজ। যতীন বলল, মায়ের পেটের ভাই বোন ছাড়া এ রকম হতে পারে? বিধবা বোনটাকে নিজের কাছে না রেখে জলে ভাসিয়ে দেব?

অরবিন্দর নিজের ভাইয়ের প্রতি এরকম পক্ষপাতিত্ব অনেকেরই পছন্দ হল না। সত্যেন মিত্র স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করলেন, তিনি এ দলটির আগাগোড়া সমর্থক ছিলেন, এখন বারীনকে ত্যাগ করলেন।

বারীনের সুত্রেই এই দলটির সঙ্গে ভরতের পরিচয়, তাই ভরত বারীনকে ছাড়তে পারেনি। যদিও এই দল ভাঙাভাঙি তার ভাল লাগেনি একেবারেই। গ্রে স্ট্রিটের আখড়ায় প্রায় কেউই আসে না। একদিন সে সার্কুলার রোডে যতীনের আখড়ায় গেল। সেখানে তালা বন্ধ। সে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে যতীন কোথায় চলে গেছে, কেউ জানে না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *