স্বর্গাদপি গরীয়সী ১ – প্ৰথম পৰ্যায়

প্ৰথম পৰ্যায়

কি জানি কেন, কাজ করিতে করিতে হঠাৎ শৈলেন কেমন একটু অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছে।–

সব ব্যবধান-বৈষম্য মিটিয়া গিয়াছে,—স্থান, কাল, এমন কি পাত্রেরও। দেখিতেছে তাহার ললাট একটি শিশু-কন্যার চরণে লুণ্ঠিত—আলতা-পরা, পদ্মকোরকের মতো দু’খানি পেলব চরণ।

চারিপাশে আরও কত শত কি সব স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে : গোলপাতায় ছাওয়া চারখানি ঘর, মাঝখানে ভিজা-ভিজা কালচে মাটির একটা উঠান। একপাশে তুলসীমঞ্চ, তাহার উপরটা ঢাকিয়া একটা কৃষ্ণচূড়ার গাছ।…সদর দিকে সিঁড়ি দিয়া নামিয়াই একটা অপ্রশস্ত গ্রাম্য পথ, তার একদিকে ঝুরিনামা বটের নিচে ধর্মঠাকুরের মন্দির, একদিকে মোড় ঘুরিয়াই পাঁচুর মায়ের মুড়কির দোকান। পাঁচুর মাকেও দেখা যায়—নথে, অনন্তয় আর ঠ্যাকারে জ্বলজ্বলে মানুষটি।… খিড়কির দিকে উঠানটা আস্তে আস্তে ঢালু হইয়া গিয়া মন্থর-গতি কানা-নদীর মধ্যে মিলাইয়া গিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে কঞ্চির বেড়ার উপর ভর করিয়া সাথীর মতোই দুইপাশ দিয়া নামিয়া গিয়াছে পুষ্পিত লতার ঝাড় বন্য তেলাকুচাও আছে, যত্ন করিয়া আজ্জানো অপরাজিতাও আছে। একদিকে একটা শিউলি ফুলের গাছ, কতকটা অসময় হইলেও তলায় অল্প ফুল বিছানো। গন্ধ পাইতেছে শৈলেন, অস্পষ্ট, কিন্তু ভুল হইবার নয়, সমস্ত মনটাকে যেন ভরিয়া তুলিতেছে।…শুধু বর্ণ-গন্ধই নয়,—পাশেই কাদের বাড়িতে একটি ক্ষুধিত-গাভী হাম্বা রব করিয়া উঠিল, কে তাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল— “থাম্, এলাম হাতের পাটটুকু সেরে।…আর তর সয় না ওঁর!”

পরিষ্কার করিয়া নিকানো শিউলি গাছের তলায় খানিকটা জায়গা ইটের বেড়া দিয়ে ঘেরা। তাহার মধ্যে নানা আকারের খোলামকুচি, একটা ভাঙা কলসের কাণা, গোটাকতক ইতুর-ভাঁড়, একটা ভাঁড় হাতার টুকরা, একটা ছোট বঁটি—সব যত্ন করিয়া সাজানো। শিশুটি এই গৃহস্থালীর কর্ত্রী। একদিকে একখানি ইট পাতা, তাহার উপর একটি হাতভাঙা মাটির পুতুল শোয়ানো রহিয়াছে। ইটটি দোলনা, পালঙ্ক হইতেও বাধা নাই, পুতুলটি কর্ত্রীর শিশুপুত্র।

ছেলে যে ঘুমাইয়া আছে এমন নয়, অত্যন্ত বায়না ধরিয়াছে, মা বেশ বিব্রত।

ওপাশের একটি ঘরের দাওয়া থেকে ডাক পড়িল—“গিরি, খাবি আয়, রাখ তোর পুতুল খেলা এখন।”

মেয়েটি গৃহস্থালীর ব্যস্ততার মধ্যে ঘুরিয়া দাঁড়াইল। গৃহিণীপনার অভিনয়ে মুখখানি রাঙা হইয়া গেছে। সেই রাঙা মুখের উপর, টুকটুকে ঠোটের মাঝখানটিতে কম্পমান নোলকের উপর, ছোট্ট শাড়িখানির রাঙা পাড়ের উপর, গাছের ফাঁক দিয়া দীপ্ত রৌদ্রের আলোক আসিয়া পড়িয়াছে— পুণ্য শৈশবের উপর স্বর্গের পরশ;—গাছের তলাটি হঠাৎ যেন ঝলমল করিয়া উঠিল।

শৈলেন কালের ব্যবধান থেকে দেখিতেছে স্বর্গের ছবি, দাওয়া থেকে কিন্তু যিনি ডাক দিলেন তাঁহার মেজাজ ছবি দেখার অনুকূল নয়। বেশ ঝাঁজিয়াই বলিতেছেন– “বলি, খেতে হবে না? ঐ আদাড়ে খেলা নিয়ে থাকলেই চলবে? কী বাই বাপু!- পুতুল খেলা তো কেউ কখন করেনি! আয়, এলি, না, নামব?… দেখো মেয়ের চেহারা, দুপুর রোদ্দুরে মুখ একেবারে সিঁদুরবর্ণ হয়ে উঠেছে!”

মেয়েটি অগ্রসর হইতেছিল, আবার ব্যাকুলভাবে একবার ফিরিয়া পুতুলটির পানে চাহিল, তাহার পর আবার মায়ের পানে মিনতিনেত্রে চাহিয়া বলিল- ‘‘যাচ্ছি মাগো, একটুখানি রোস, কটুখানি।”

যাইতেছিল মায়ের আহ্বানে, মায়ের কথাতেই তাহার বাধা পড়িল, দুপুরের রোদে যদি তাহার নিজের মুখ সিঁদুরবর্ণ হইয়া থাকে তো তাহার ছেলেরও তো ঐ অবস্থাই হওয়ার কথা! পোড়ামাটির পুতুলে সিঁদুরবর্ণ কল্পনা করিতে অসুবিধাও হইল না, গিরিবালা গিয়া পুতুলটিকে বুকে চাপিয়া লইল। তাহার পর আরম্ভ হইল বিনাইয়া বিনাইয়া নানান্ রকম আলাপ-অনুযোগ—অবাধ্য ছেলে কথা শোনে না, শুধু দৌরাত্ম্য করিয়া বেড়ানো! রোদ নাই, বৃষ্টি নাই—মুখখানা যে একেবারে সিঁদুরবর্ণ হইয়া গেছে! হুঁশ আছে সেদিকে ছেলের? মা একলা মানুষ কতদিকে যে দেখবে।…

এমন সময় আসল মায়ের আর একটা উগ্রতর ধমক আসিল, নকল মাকে চলিয়া যাইতে হইল।

ছেলেটিকে অবশ্য কাঁখে করিয়া লইয়া আসিল।

প্রথম কারণ—কচি ছেলে, তায় ক্রন্দমান, বায়না ধরিয়াছে; তাহাকে একা ফেলিয়া আহার করিতে বসা চিরাচরিত মাতৃধর্মের বিরোধী। দ্বিতীয়ত, এক সে-ভিন্ন দুই বাড়ির শিশুমহলে কেহই স্থায়ীভাবে বিশ্বাস করে না যে ওটি একটি মানবশিশু। সুতরাং ওর প্রতি সবারই পুতুলের লোভ আছে, একটা গোটা ছেলের উপর যে দরদ থাকা দরকার তাহা নাই। ঐ হাত-ভাঙার ব্যাপারটাই ধরা যাক, মা অবশ্য ওটাকে ছেলের দস্যিপনার নিদর্শন করিয়া লইয়া তাহার মানবত্বের প্রমাণ পাকা করিয়া লইয়াছে, কিন্তু ভিতরের কথা এই যে, তাহার অলক্ষিতে কোন অদরদীর হাতে ওটি নিছক মাটির পুতুলের মতোই নাড়াচাড়া খাইয়াছিল বলিয়া ওর ঐ দুর্গতি। মতের মধ্যে যেখানে এতটা প্রভেদ সেখানে ছেলেকে টাঙাইয়া লইয়া যাওয়া ছাড়া উপায় কি? মুখে বিপর্যস্ত মায়ের বিরক্তি ও ব্যাকুলতার ভাবটুকু ফুটাইয়া গিরিবালা রান্নাঘরের দাওয়ায় আসিয়া উঠিল।

ছোট ভাই হরিচরণ নিতান্তই ছোট। খাইতেছিল, উৎসাহভরে প্রশ্ন করিল- “টোর ছেলেকে ভাট খাওয়াবি ডিডি?”

দিদি চক্ষু কপালে তুলিয়া বলিল—“চুপ কর হরু! ও কি ভাত খেতে পারে কখনও?”

হরিচরণের বিশ্বাসটা সত্য আর মিথ্যার মধ্যে দোলে। দিদিকে ছেলে কোলে আর সব মায়ের মতোই ভার-মন্থর গতিতে আসিতে দেখিয়া আশা করিয়াছিল পুতুলের মুখে সত্যকার অম্ল দেওয়ার মতো পরম বিস্ময়কর ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করিবে; দিদির কথায় নিরাশ এবং একটু লজ্জিত হইয়া প্ৰশ্ন করিল— “মুখ নেই, নারে?”

দিদি পিঁড়ায় বসিতে বসিতে বলিল— “না, মুখ নেই! তোর বুদ্ধিসুদ্ধি কবে হবে বল দিকিন হরু? মুখ নেই তো বেঁচে আছে কি করে?”

একে তর্কটা অকাট্য, তায় বুদ্ধি সম্বন্ধে খোঁচা আছে। হরু আর কোন উচ্চবাচ্য না করিয়া ঘাড় হেঁট করিয়া আহার করিতে লাগিল। গিরিবালা থেবড়ি খাইয়া বসিয়াছে, ছেলে কোলে করিয়া মায়েরা সাধারণত যেমন বসে; মুখে-গ্রাস তুলিয়া হাঁটু দুলাইয়া দুলাইয়া ছেলেকে শান্ত করিবার চেষ্টা করিতেছে। সমস্ত ব্যাপারটিতে সত্যের রূপ আবার এমন স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে যে, হরুর পক্ষে আগ্রহ চাপিয়া রাখা ক্রমেই কষ্টকর হইয়া উঠিল; দু’একবার কোলের পুতুলটার পানে আড়চোখে চাহিল, তাহার পর পূর্বের প্রসঙ্গ ধরিয়া প্রশ্ন করিয়া ফেলিল— “টবে কেন খেটে পারে না রে ডিডি?”

দিদি দুরন্ত ছেলের মাথায় বাঁ হাতে মৃদু আঘাত করিয়া বলিল— “ওর কি বয়েস হয়েছে এখনও ভাত খাবার? চোখ নেই? দেখতে পাচ্ছিস না?”

হরু পুতুলটার দিকে একদৃষ্টে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল; বয়সের কি লক্ষণ আবিষ্কার করিল সেই জানে, বলিল— “খোকার মোটন, না রে?”

দিদি হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হইয়া গিয়াছিল, ভাই-এর মন্তব্যের কোন উত্তর না দিয়া ঘাড়টা একটু তাহার দিকে বাড়াইয়া অপেক্ষাকৃত চাপা কণ্ঠে বলিল— “দু’টি ভাত তোর পাতে তুলে দিচ্ছি, মাকে বলে দিবি না তো? খোকার সমস্ত পাট আমার পড়ে রয়েছে ওদিকে।”

হরু অনেকক্ষণ পূর্বে খাইতে বসিয়াছিল, পেটে বিশেষ জায়গা ছিল এমন নয়, তা ভিন্ন শুধু ভাতের এমন কিছু একটা মোহও নাই; তবুও দিদির প্রয়োজনের গুরুত্বটা উপলব্ধি করিয়া রাজী হইল।

মা ভাত বাড়িয়া দিয়া কার্যান্তরে ওদিককার ঘরে গিয়াছেন, ভাইবোনের কথাবার্তা তাই এত মুক্ত এবং সাহস এত প্রবল।

“তাহলে আদ্দেকটা দিই?…তা হরু নেবে’খন, বড্ড লক্ষ্মী ছেলে।…তুইও শিগগির শিগগির আসবি চলে, খেলবি।”–স্তোকবাক্যে ভাইকে ভিজাইয়া ভাত তুলিয়া দিতে যাইতেছিল, ওদিককার ঘর হইতে বরদাসুন্দরীর গলা শোনা গেল— “হ্যাঁ, দে তুলে ভাত! আমি সব দেখতে পাচ্ছি গিরি;- যখনই কাঁখে ভাঙা পুতুলটা দেখেছি, বুঝেছি। খাওয়ার দফা নিকেশ। একটি ভাত যদি পাতে পড়ে থাকে, আমি জন্মের শোধ খেলা ঘুচুব। না খেয়ে খেয়ে মেয়ের চেহারা হচ্ছে দেখ না! বাপের আবার শখ ঐ মেয়ে গৌরীদান করবেন! মরি!”

বোধহয় নিজের দোষটুকু ঢাকিয়া লইবার জন্যই কন্যা বলিল— “তাহলে আর একটু ডাল দিয়ে যাও।”

“ডাল আর হবে না; ডাল আজ বাড়ন্ত ছিল ঘরে, আর একজন মানুষ এখনও খেতে। যে ক’টা ভাত বাকি থাকে অম্বল দে’ খেও, পাতলা করে অম্বল করছি—হয়ে এল।…হরু, তুইও বসবি একটু।”

দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হইয়া গেছে; খানিকক্ষণ নীরবে আহার করিল, তাহার পর পরস্পরের মুখের দিকে উভয়ে আড়চোখে চাহিল। বার দু’এক এরূপ চাওয়ার পর দু’টি মুখেই একটু করিয়া অর্থপূর্ণ হাসি ফুটিয়া মায়ের বকুনির গ্লানিটা ধুইয়া দিল; আবার উভয়ের মাঝে পুতুলটা আসিয়া পড়িল; ভাই বলিল— “টোর ছেলে চুপ করেছে বুঝি?”

দিদি পা-নাড়াটা বন্ধ করিয়াছিল, ভাই-এর কথায় আবার দোলানিটা শুরু করিয়া দিয়া বলিল— “চুপ করার পাত্তোর কিনা! দেখছিস না চোখে?”

চোখে দেখিয়া কিছু বুঝুক বা নাই বুঝুক, পাছে চোখের মতো কানেরও অপবাদ হয় সেই আশঙ্কায় হরু বলিল— “কান ঝালাপালা করে ডিয়েচে, না রে ডিডি?”

ভাই-এর শ্রবণেন্দ্রিয়ের একেবারে এতটা সূক্ষ্মতা দিদি আশা করে নাই, হাসিয়া উঠিয়া বলিল— “তুই হাসালি হরু, কান নাকি আবার ঝালাপালা করেছে!”

তখনই কিন্তু হাঁটুতে একটা দোল দিয়া পুতুলের মাথায় লঘু করাঘাত করিতে করিতে বলিল- “ঐ শোন, মামা কি বলছে!”

হরু পুতুলটাকে দিদির ছেলে বলিয়া মানিয়া লইয়াছে বটে, কিন্তু তাহাতে যে তাহারও পদবৃদ্ধি হইয়াছে অতটা খতাইয়া দেখে নাই। উল্লসিত হইয়া একটু লজ্জিত দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল— “আমি ওর মামা হই, নারে ডিডি?”

দিদি বলিল— “হোস না? আমার ছেলে তোর ভাগনে হয় না? তুই এত বোকা হরু!”

হরিচরণ উবু হইয়া আহার করিতেছিল, জায়গাটা বাঁ-হাতে ঝাড়িয়া লইয়া সভ্যভব্য একজন রীতিমত মামার মতো আসন-পিঁড়ি হইয়া বসিল, এবং তাহার পর বাঁ হাতটা পেটের মধ্যে গুটাইয়া লইয়া আহার করিতে প্রবৃত হইল। তবুও যেন নিজেকে হালকা বোধ হইতেছিল, মুখেও একটা কিছু না বলিলে যেন মান থাকে না। পাশের বড়ির মাখনদাদা সম্প্রতি তাঁহার ভগ্নী আসিলে বড় ভাগনেটির পিঠে হাত দিয়া একটা প্রশ্ন করিয়াছিল;—তাহা লইয়া আলোচনাটা যেমন গুরুগম্ভীর হইয়া উঠিয়াছিল তাহাতে হরিচরণের মনে হয় প্রশ্নটার দর আছে। সে বড়দের মতো আরও একটু ঝুঁকিয়া বসিয়া বলিল— “ছেলের পৈটে কবে ডিবি রে ডিডি?”

দিদিও সমালোচনার সময়টায় ছিল; কি একটা উত্তর দিবে এমন সময় মা আসিয়া উপস্থিত হইলেন, দাওয়ায় উঠিতে উঠিতে বলিলেন— “খেয়ে উঠে খোকাটাকে একটু দেখবি গিরি, দাঁত উঠবে না কি, কোনমতেই একটু থির হয়ে ঘুমোতে চাইছে না। বলছি কদিন থেকে একটা ওষুধ দাও, পরের ছেলেকেই ওষুধ বিলি ক’রে ফুরসৎ নেই তা….অম্বলটা বুঝি গেল ধরে, একটা মানুষ যে ক’দিক দেখে! দিদি আজও গেছেন কালও গেছেন…”

অভাবের সংসার—লোকের অভাব আর এদিকেও বেশ যে সচ্ছল এমন নয়, অথচ যাহার ভাবিবার কথা তাহার অন্যের কথা ভাবিয়া অবসর থাকে না। বরদাসুন্দরী একটু গর্ গর্ করেন বেশি, তবে কেমন হালকা রাশ, রাগ ধরিয়া রাখিতে পারেন না। তাই কথায় যেটুকু বলেন সেটুকু কাজে কখনও পরিণত করিতে পারিবেন না বলিয়া স্বামী এবং আর সবাই নিশ্চিন্ত থাকে—সংসারের তাগিদে নিজের নিজের পথ ছাড়িয়া একটু পাশ কাটাইয়া যাওয়ার প্রয়োজন দেখে না। শরতের আকাশের মতো মানুষটি, যত গর্জান তাহার চেয়ে ঢের বেশি হাসেন—আওয়াজে বুকটা বোধ হয় একটু দুরু দুরু করে, কিন্তু মুখে সবার পরিপূর্ণ প্রসন্নতাই থাকে ছাইয়া।

অম্বল লইয়া আসিয়া হাতা কাত করিয়া বলিলেন— “ওমা, আজ হরুঠাকুর বড় ভব্যিসব্যি হয়ে বসেছেন যে! ব্যাপারখানা কি?”

ভাইবোনে মুখ টিপিয়া হাসিতে হাসিতে একবার পরস্পরের পানে আড়চোখে চাহিল, হরিচরণ বেশ একটু লজ্জিত হইয়া পড়িয়াছে। দিদি প্রশ্ন করিল— “বলব হরু?”

হরিচরণ আরও লজ্জিতভাবে ঘাড়টা গুঁজিয়া দিয়া বলিল— “যাঃ।”

তাহার আপত্তি গ্রাহ্য না করিয়া গিরিবালা মায়ের দিকে চাহিয়া বলিল – “কি বোকা মা হরু?—খেলাঘরের মামা হলে নাকি আসনপিঁড়ি হয়ে বসতে হয়?”

মা রান্নাঘরে চলিয়া গিয়াছিলেন, কড়ায় খুন্তির দুইটা ঘা দিয়া ঘুরিয়া চাহিলেন, হাসিয়া বলিলেন— “খেলাঘরের মা যদি আহার নিদ্রে ভুলতে পারে তো মামা বেচারী শুধু আসনপিঁড়ি হয়ে বসে আর কি দোষটা করেছে?”

এমন সময় রসিকলালের ঘুড়িটা ‘চিঁ-হি-হি’ করিয়া ডাকিয়া উঠিল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজার কাছ থেকে আওয়াজ আসিল— “মা-রাণী কই গো?”

বরদাসুন্দরী রন্ধনের পাত্রগুলা গুছাইয়া রাখিতে রাখিতে বলিলেন— “ঐ নাও আসল ছেলেও এল।…খবরদার উঠবিনি গিরি; এক পলা দুধ দোব, আর দুটি ভাত খেয়ে উঠবি দুজনে।”

“আমরা বাবার সঙ্গে খাবখন”–বসিয়া গিরিবালা অম্বলের একটা মাছ মুখে ফেলিয়া এবং বাকিগুলা ভাইয়ের পাতে দিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল।

হরিচরণ বলিল— “ডিডি টোর ছেলে পড়ে রইল!”

মা আসিতে গিরিবালা পুতুলটাকে নামাইয়া পিঁড়ির পাশে রাখিয়া দিয়াছিল, দাওয়ার নীচে থেকে একবার দ্বিধাভরে ফিরিয়া চাহিল, তাহার পর পুকুরের দিকে যাইতে যাইতে বলিল— “তুই নিয়ে গিয়ে ওর দোলনায় শুইয়ে দিস ভাই হরু, লক্ষ্মীটি।”

গিরিবালার ধারাই ঐ। ওর আট বৎসরের স্বল্প শরীর-মনকে আশ্রয় করিয়া একটি পরিপূর্ণা জননী আছে; সে সর্বদাই আত্মপ্রকাশ খোঁজে এবং সাধারণত দুইটি আধারের মধ্য দিয়া নিজেকে চরিতার্থ করে; পুতুল এবং পিতা। পুতুলের ব্যাপারটা এমন কিছু অভিনবও নয়, আশ্চর্যও নয়; আশ্চর্যও নয়;–তাহাদের কথা নাই, গতি নাই, মন নাই, বলিয়া সব ছেলেমেয়েই তাহাদের মধ্যে নিজেদের সাধ-আহ্লাদ- আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিবিম্বিত বেশ নিরুপদ্রবে করিতে পারে। কিন্তু বত্রিশ বৎসরের একটা আস্ত মানুষ যখন আট বৎসরের একটা মেয়ের মনে মায়ের মায়া জাগায়—তখন আর ও-তত্ত্বটা লাগসই হয় না,—কারণটা একটু আলাদা করিয়া অনুসন্ধান করিতে হয়।

রসিকলালের বয়স হইয়াছে; শরীরও তাহার সঙ্গে পাল্লা দিয়াছে, কিন্তু মনটা পড়িয়া আছে অনেক পিছনে।…বিদ্যারম্ভের বয়স হইলে রসিকলাল হুড়হুড় করিয়া সাত-আট বৎসর বেশ পড়িয়া গেলেন। এই এক ঝোঁকে তিনি বয়সের যে স্থানটায় আসিয়া পড়িয়া পড়িলেন সেখানে মানুষের বিচারশক্তি আরম্ভ হয়, মনের দ্বিজত্ব-প্রাপ্তি ঘটে, অনুকরণের যুগ ছাড়াইয়া মানুষের বিচারের যুগ আসিয়া পড়ে; সে ভালোকে চিনিতে শিখে, মন্দকে চিনিতে শিখে, আর তাহাদের সংঘর্ষের মধ্য দিয়া নিজেও সংসারের জন্য ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতে থাকে। রসিকলালের মনটা কিন্তু এই চৌদ্দ-পনের বৎসরের রেখাটিতে আসিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। তাহার পর আবার আরম্ভ হইল গতি, কিন্তু সেটা পিছনের দিকে। ওঁর মধ্যে সুপ্ত এক কবি ছিল, সে যেন সংসারের তোরণে আসিয়াই থমকিয়া দাঁড়াইল; ওর সঙ্গী হইয়া পড়িল নদী, প্রান্তর, আগাছার জঙ্গল; যে-ছেলে বই থেকে চোখ ফিরাইত না তাহার ব্যসন হইল নিরুদ্দেশ ভ্রমণ—বনে, মাঠে, এ-গ্রাম থেকে সে-গ্রামে;—দিনরাতই ওঁকে যেন নিশিতে পাইয়া বসিল। ভালো ছেলে যখন ক্লাসে আটকাইয়া গেল তখন পিতার এদিকে ভালো করিয়া চোখ পড়িল; কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহাকে চক্ষু বুজিতে হইল।

এর পর অভিভাবক হইলেন দাদা। বছর চারেকের বড়, অভিভাবক হিসাবে নিতান্ত বেমানান নয়; কিন্তু হঠাৎ বিপদে সংসারের চাপে তাঁহার প্রায় ছয়-সাত বৎসর পর্যন্ত মাথা তুলিবার অবসর রহিল না। এই ছয়-সাত বৎসরের পূর্ণ স্বরাজে রসিকলাল কবে বইটইয়ের পাঠ একেবারে উঠাইয়া প্রকৃতির অবাধ মুক্তির মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইলেন, অর্থাৎ জীবনের এই গঠনের সময় উনি এমন সব সহচরদের মধ্যে কাটাইলেন যাহারা দুহাত তুলিয়া উহাকে শুধু দিলই,—দিল দ্বেষহীন প্রীতি আর অপরিমেয় আনন্দ।…শত্রুতা করিল আর কি, কেন না প্রীতি আর আনন্দের অতিরিক্ত যে আর কিছু আছে—প্রতিপদেই সংসারকে যাহা বিষাইয়া তোলে—সে-সবের আর সন্ধান পাইতে দিল না। মোটা ভাত আর মোটা কাপড়ের যখন পাকাপাকি একরকম একটা ব্যবস্থা হইল, জ্যেষ্ঠের হুঁশ হইল এদিকে একটা বিশেষ প্রয়োজনীয় কাজ বাকি রহিয়া গেছে। একদিন কনিষ্ঠকে ডাকিয়া কহিলেন— “এবার একটা বিয়ে-থা করে সংসারী হতে হবে তো?”

কনিষ্ঠ নতশিরে নীরব হইয়া রহিলেন।

“বই-পত্তর চুলোয় দিয়ে টো টো করে ঘুরে বেড়ালি। সংসার পাতলে তার একটা সংস্থান করতে হবে তো? শুনলাম নাকি পদ্য লিখিস?”

মস্ত বড় একটা সংস্থানের গোড়াপত্তন হইয়াছে ভাবিয়া ভাই মুখটা আরও নিচু করিয়া লইয়া একটু উৎসাহভরেই কহিলেন— “চেষ্টা করি মাঝে মাঝে।”

“ঐ হোল,–সেও কম দোষের কথা নয়, খুন-ডাকাতির চেষ্টা করলেও দ্বীপান্তর হয়।… খাতাটা তোর বৌদিকে দিয়ে দিস, খোকার দুধ জ্বাল দেবার জন্যে বিচুলিগুলো নষ্ট করে।”

মুখের দিকে চাহিয়া আকাশ পাতাল কি চিন্তা করিলেন খানিকক্ষণ। তাহার পর প্রস্তাবটা যেন ভাই-এর চেহারা, স্বভাব, বিদ্যাবুদ্ধি—সব জিনিসের সঙ্গে খাপে খাপে মিলিয়ে গিয়েছে এইভাবে বলিয়া উঠিলেন— “হয়েছে, হোমিওপ্যাথি পড়, পড়বি?”

ভাই মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইলেন।

জ্যেষ্ঠ নিজের ব্যবস্থায় হৃষ্টচিত্তে বলিলেন— “ঐ ভালো, তোর ধাতে সইবে। এদিকে যেমন চেরা-ফাড়া নেই, তেমনি আবার কবিরাজির পঞ্চতিক্ত-কটু কষায়, কি গোখরোর বিষ—এ সবেরও বালাই নেই। চিনিতে মোড়া নিরীহ জিনিস—লাগল, লাগল—না লাগল, সোবি আচ্ছা।… বেশ, তুই যা, করছি ব্যবস্থা।”

বছর দেড়েক কলিকাতায় থাকিয়া হোমিওপ্যাথি শিখিতে যে সময়টা গেল তাহারই মধ্যে দিন সাত-আটের মতো একবার আসিয়া রসিকলাল বরদাসুন্দরীকে বিবাহ করিয়া গেলেন।

বুদ্ধিমান ছেলে, তার কলিকাতায় গিয়া বুদ্ধিটা একটু মাজা-ঘষা খাইল, শিক্ষা লইয়া রসিকলাল গ্রামে আসিয়া বসিলেন। ক্রমে অল্প অল্প করিয়া ডাক হইতে লাগিল। নূতন কাজের উদ্দীপনার মধ্যে তিনি জীবনকে নূতন ভাবে পাইলেন, চিকিৎসায় সমস্ত প্রাণমন ঢালিয়া দিলেন। রোগ সারিতে লাগিল এবং সম্ভবত সস্তা ঔষধ বলিয়া যে-পসারটা নিম্নশ্রেণীর লোকেদের মধ্যে আরম্ভ হইয়াছিল, সেটা মধ্যবিত্তদের স্তর পর্যন্ত ঠেলিয়া উঠিল। দূর গ্রাম পর্যন্ত পাল্লা দিতে হয়—জ্যেষ্ঠ কি উপায় করিবেন ভাবিতেছেন, এমন সময় রসিকলালের চিকিৎসাধীনেই বুড়ো নবীন সা মারা গেল। নবীন একটা ফরে ঘুড়ির পিঠে এক হাটে মালপত্র কিনিয়া অন্য হাটে বেচিত। হিসাবী লোক, এই করিয়া নিঃসাড়ে বেশ দুপয়সা করিতেছিল, তবে অন্য দিকে যে হিসাবের ভুল হইয়া যাইতেছিল—ভদ্রোচিত বয়সের গণ্ডি পারাইয়া একমাত্র উত্তরাধিকারী নাতিটিকে যে চটাইয়া তুলিতেছে, সেদিকে খেয়াল করে নাই। নিবারণের ঘুড়ি লইয়া হাটে হাটে ঘোরার না ছিল উৎসাহ, না ছিল প্রয়োজন; নবীন যেদিন মারা গেল তাহার দুদিন পরে আসিয়া কৃতজ্ঞ চিত্তে মুখটা খুব বিষণ্ণ করিয়া রসিকলালকে বলিল— “দাদাঠাকুরের মেহনতের জন্যে আমি আর কি দেব? এই ঘুড়িটা রইল; ঠাকুরদা বড়ই ভালবাসতো—তবু মনে হবে বামুনের দানাপানি খাচ্ছে। সময় হলে বাচ্চাটা-আসটাও দেবে, ঠাকুরদাকে দিয়ে এসেছে বরাবর।”

গ্রামের লোক একটু আলগাভাবে ইংরাজী ও বাংলা অর্থ একত্র করিয়া ব্যাপারটার নামকরণ করিলেন নিবারণের ‘হর্ষোৎসর্গ’, …নিজের উপার্জিত ঘুড়ির পিঠে চড়িয়া রসিকলাল পসার জমাইয়া চলিলেন। সঙ্গে থাকে তারু নাপিতের ছেলে হারাণ। ছোঁড়াটা সেই স্কুলপালানোর যুগ থেকেই কি করিয়া রসিকলালের অনুগত হইয়া পড়িয়াছিল। ঘুড়ির পাশে পাশে ঔষধের বাক্সটা হাতে ঝুলাইয়া বা কাঁধে বসাইয়া লইয়া চলে; রসিক যখন ভিতরে রোগী দেখেন, সে বাহিরে পাঁচজন জুটাইয়া ঘুড়ির আর মনিবের বড়াই করিয়া আসর জমায়; বাড়িতে আসিয়া ঘুড়িটার ঘাস কাটে; পরিচয় দেয়- ডাক্তারঠাকুরের ‘কম্পুন্ডার’। যখন বড়াই করিবার লোক পায় না, মাথা দুলাইয়া দুলাইয়া ঔষধের বাক্স বা হাতের কাছে যাহা কিছুই পায় তাহার উপর তবলার বোল তোলে।

হাতযশে, ঘুড়িতে আর হারাণ নাপিতে পসার জমিয়া চলিল বটে, কিন্তু পয়সা জমিল না। পয়সা করিতে হইলে চিকিৎসকের মাঝখানটিতে একটি সর্তক হিসাব-নবিশ থাকা দরকার। রসিকলালের সেই আসন জুড়িয়া বসিয়া রহিল কবি; নবীনের অত বড় পয়মন্তর ঘুড়ি আসিয়াও কোন পরিবর্তন ঘটাইতে পারিল না।

পয়সাহীন পসারের একটা মোটা ইঙ্গিত দেওয়া রহিল, ব্যাপারটা পরে আরও পরিষ্কার হইবে।

.

রসিকলালের নিয়মই হইতেছে বাহিরে আসিয়া মেয়েকে ডাকিয়া একটা সাড়া দেন। ভিতরের ভাবগতিকটা আগে একবার বুঝিয়া লন, তাহার পর প্রবেশ করেন। সব সময় যে প্রবেশ করেনই এমনও নয়।

গিরিবালা তাড়াতাড়ি গোটাদুই কুলকুচা করিয়া লইল, হাতের এঁটো খানিকটা জলে ধুইয়া, খানিকটা কাপড়ে মুছিয়া বাহিরে ছুটিয়া গেল এবং বাপের হাঁটু দুইটা জড়াইয়া ধরিয়া মুখে চোখ তুলিয়া হাসিভরা আবদারের সুরে বলিল— “এনেছ বাবা?—দাও…”

রসিকলাল হাসি মুখে একটু ঝুঁকিয়া কন্যাকে আদর করিতে যাইতেছিলেন, হাতটা আলগা হইয়া গেল। নিষ্প্রভমুখে বললেন- ঐরে! আজও গেছি ভুলে; রমেশের দোকানের ওদিকেই যাওয়া হয়নি কিনা…”

কন্যা অভিমানে ঠোঁট দুইটি জোড় করিয়া মুখটা ঘুরাইয়া লইল, বলিল— “যাও, রোজই— ‘ঐরে, আজও ভুলে গেলাম!’…হারাণে, তোকেও তো বলে দিয়েছিলাম…”

হারাণ ঘুড়িটাকে বাঁধিয়া খাঁটি সহিসের পদ্ধতিতে—’হিস-হিস’ শব্দ করিয়া ডলাই-মলাই শুরু করিয়া দিয়াছিল, ঘাড়টা বাঁকাইয়া বলিল— “দাঁড়াও ঠাকুরুণ, এক যা ঘুড়ি নিয়ে পড়েছি, ফুরসৎ হলে তো তোমার পুতুলের কথা ভাববে হারাণে? তা ছাড়া, পুতুলের জন্যে তো কড়ি চাই? রমেশঠাকুর তো পুতুলের দানছত্র খুলে…”

রসিকলাল ধমক দিয়া উঠিতে মুখটা ঘুরাইয়া লইয়া আবার ‘হিস-হিস’ করিয়া আওয়াজ শুরু করিয়া দিল।

গিরিবালার মুখের ভাব বদলাইয়া গেল, চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া মাথাটা একটু নাড়িয়া চাপা কণ্ঠে প্রশ্ন করিল— “আজও কিছু পাওনি বাবা?”

রসিকলাল তাচ্ছিল্যের সহিত বলিলেন— “না, পাইনি! বেলা দুপুর পর্যন্ত অমনি অমনি ঘুরে বেড়াবার পাত্তোর কিনা আমি! আজ যার নাম তিন-তিনটে টাকার হিল্লে করে তবে রসিক বাঁড়ুজ্জ্যে বাড়ি ফিরছে…যা খরচ হয়ে গেছে তা আর ধরলামই না।”

মেয়ের চোখ দুটি আপনা-আপনি পকেটের উপর গিয়া পড়িতে বলিলেন— “কাছে নেই, কিন্তু সে কাছে থাকারই সামিল।”

পাছে সর্বক্ষণ হারাণ আবার ফোড়ন দেয় সেই ভয়ে বলিলেন— “চল্ না গিরি ভেতরে, সব বলছি কিনা।”

গিরিবালা আর অভিমানিনী কন্যা নাই, এক নিমেষেই অনুকম্পাময়ী মায়ের পদবীতে উঠিয়া গেছে, সেই মায়ের—যার অদৃষ্টলিপি এই যে দুর্বল সন্তানকে চারিদিকের লাঞ্ছনা থেকে ক্রমাগতই আগুলাইয়া ফিরিতে হইবে।…রসিকলাল অগ্রসর হইতেই একটু পথ-আটকানো গোছের করিয়া দাঁড়াইল, একবার হারাণের পানে চাহিয়া লইয়া বলিল— “বাবা শোন।”

পিতাপুত্রীর মধ্যে এ ধরনের আলাপ প্রায় প্রতিদিনের ব্যাপার, রসিকলাল বেশ একটু উৎসুকভাবেই মুখটা নামাইয়া লইলেন। গিরিবালা হারাণকে এড়াইয়া চাপা গলায় বলিল— “আজ কিচ্ছু পয়সা আননি বাবা?…ডাল বাড়ন্ত যে! সক্কাল বেলা থেকে মা গরগর করছেন…”

রসিকলাল ধীরে ধীরে সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া মাথা চুলকাইতে লাগিলেন। কন্যা আবার সেইরকম স্বরেই প্রশ্ন করিল— “তোমায় নাকি তিনদিন থেকে বলছেন, বাবা?”

রসিলালের যেন হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, ভিতরে শুনিলেও ক্ষতি নাই এই রকম সহজভাবে, বরং কতকটা গলা চড়াইয়াই বলিলেন— “ডাল আনতে হবে সে তো আজ তিনদিন থেকে ঐ বেটা নাপিতের পোকে বলছি, তা…”

হারাণ হাত এবং শিস-দেওয়া দুই-ই বন্ধ করিয়া ফিরিয়া তাকাইল, বলিল— “আম্মো তো তিনদিন থেকে কইছি—ডেলের পয়সা দেও, ও বেটা বেনেরকাল বিজিটের ট্যাকা থেকে দাম কাটাবেনি, বলে— “নগদ চাই, বিজিটের সঙ্গে ডেলের কড়ির কি সম্বন্ধ?…তবু তারই বাড়িতে আবার কলে যাবেন, ট্যাকা ফেলে রাখবেন।…এমন মনিষ্যির…”

এবার কন্যাই ধমক দিল— “আচ্ছা, হয়েছে, তুই চুপ কর; চেঁচাচ্ছে দেখ না শুনিয়ে শুনিয়ে! দূর করে দাও বাবা এমন চাকরকে, কাজ নেই…”

বরদাসুন্দরীর গলা শোনা গেল—প্রতি কথাতেই উচ্চ হইতে উচ্চতর হইয়া উঠিতেছে- “বাপে-মেয়েতে কি সব পরামর্শ হচ্ছে বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? ডালের ভাবনা ভাববার লোক আছে, আমার বলাই ঝকমারি হয়েছিল। দুপুর গড়িয়ে গেল, এখন নেয়ে খেয়ে উদ্‌গার করতে হবে, না, এইরকম ঠায় হাঁড়ি কোলে করে বসে থাকব?… একটা মনিষ্যি যে সকাল থেকে নাগাড়ে…”

গিরিবালা আর্তদৃষ্টিতে বাপের-উৎকণ্ঠিত মুখের পানে চাহিয়া হাঁটুর কাপড়টা ধরিয়া বলিল- “বলো বাবা শীগগির।”

বরদাসুন্দরী রান্নাঘরের দাওয়ায় আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। সুরটা আরও চড়াইতে যাইতেছিলেন কিন্তু শঙ্কিত মেয়ের আড়ালে ততোধিক শঙ্কিত বাপকে নতশিরে প্রবেশ করিতে দেখিয়া আর গাম্ভীর্য রক্ষা করিতে পারিলেন না। হাসিয়া ফেলিয়া বলিলেন— “মরিঃ, ঢুকলেন দেখ না মায়ে- পোয়ে—কচি ছেলেও অমন করে মায়ের আড়াল খোঁজে না।”

বরদাসুন্দরীর সংসারের ধারাই এই, এক কথাতেই থমথমে ভাবটা কাটিয়া গেল। রসিকলাল পাশ কাটাইয়া চলিয়া না গিয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন, হাসিয়া বলিলেন— “কচি ছেলেদের যে একটা মস্ত সুবিধে, বাপ-মায়ে চোখ রাঙাবার মানুষটিকে তখনও এনে হাজির করে না তো!”

“রঙ্গ রাখ, যেন চোখ রাঙিয়েই রয়েছি; তবে একথাও বলব—অষ্টপহর একজন চোখ রাঙাবার মানুষ কাছে থাকলেই তুমি থাকতে ভালো; তোমার দরকার ছিল সেটা।”—বলিয়া রান্নাঘরে চলিয়া গেলেন। সেখান থেকেই বলিলেন— “চট্ করে তেল মেখে নেয়ে নাও, ভাত বাড়ি। বকে মানুষ সাধ করে?…একবার আরশিটা সামনে ধর্ না গিরি, দেখুক কি চেহারা হয়েছে।”

ঘরে আসিয়াছে, মেয়ে বাপের পায়ের সামনে খড়ম জোড়াটা রাখিয়া জুতা খুলিতে খুলিতে একবার মুখের পানে চাহিল, ঠোট দুইটির উপর নোলক দুলাইয়া বলিল— “সত্যি বাবা, কি যে চেহারা হয়েছে তোমার; মুখের দিকে চাওয়া যায় না।”

রসিকলাল জামার বোতাম খুলিতে খুলিতে বলিলেন— “নাও, ওদিকে সামলালাম তো মায়ের মুখ ভার! ও তবু মুখের পানে চাইতে পেরেছিল,—হাজার হোক পরই তো? মা আর চাইতেই পারছে না…তাই তো বলি…”

মা আবার নিমেষেই মেয়ে হইয়া গেল। হাসিয়া, লজ্জিত চকিত দৃষ্টিতে বাপের মুখের পানে একবার চাহিয়া বলিল— “যাঃ।”

ঐটুকু শরীরের মধ্যে কেমন করিয়া যেন দুইটিতে মিশিয়া গিয়াছে,—যে-মেয়ে ভাবীকালে মা হইবে আর যে-মা অতীতকালে এক সময়ে মেয়ে ছিল। —নাকের নোলকটির মতোই যেন সোনায় মুক্তায় জড়িত হইয়া মনের কোথায় দোল খাইতেছে।

সেবা আরম্ভ হইল—কোট, গেঞ্জি, র‍্যাপার একবার তাড়াতাড়ি আলনায় রাখিয়া দিয়া তেল, গামছা আনিয়া দেওয়া। ওদিকে তেলমাখা চলিল, এদিকে ছাড়া কাপড়-চোপড় গোছানো চলিল, সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের গল্প, হুকুম, সলা-পরামর্শ— “ঐ যাঃ, ‘অশ্বত্থমায় নমো’ বলে মাটিতে তেল ছিটুলে না তো বাবা? তুমি কেমন রোজই ভুলে যাও, পুতুল আনতেও ভোল, তেল ছিটুতেও ভোল। যাকগে পুতুল,—ঘরে ডাল বাড়ন্ত!—কি বল বাবা? আমিই কি পুতুলের কথা মনে করে বসে আছি? বলে কাজ থেকেই ফুরসত নেই…আজ ও-বাড়ির চিলের ছাদ থেকে নন্তী ঠ্যাকার করে মোমের পুতুলটা দেখালে তাই মনে পড়ে গেল..নয়তো, বলে, কাজ থেকেই ফুরসত নেই—মা বেচারী একলা পড়ে গেছেন, খোকার দৌরাত্ম্যি…জেঠাইমা জেঠামশাই কবে আসবেন বাবা? পুতুরাণীর কথা আমি জিজ্ঞেসও করছি না, তিনি তো মামার বাড়ির মানুষই হয়ে গেছেন! আমরা গরিব, আমাদের এই বাড়িই ভালো, কি বল বাবা?”

পুতী জেঠতুত ভগ্নী, বয়সে ছোট, মামার বাড়িতে ছেলেপিলে নাই বলিয়া দিদিমা ধরিয়া রাখে, এক রকম সেইখানেই প্রতিপালিত হইতেছে। থাকিল খেলার ভালো সঙ্গিনী হইতে পারিত বলিয়া গিরিবালা সুবিধা পাইলেই একটু খোঁচা দেয়।

রসিকলাল একটু হাসিয়া বলিলেন— “তাকে না ছাড়লে সে কি করে আসবে বল?…দাদা বোধ হয় কালই চলে আসবেন। বৌদিদি দুটো দিন থাকুক না বাপের বাড়ি। তোকে যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠাবে গিরি, আমরা কি একদিনেই ছেড়ে দোব—বল না?…পুতুল তোর আনব বৈকি। রমেশের দোকানে একটা দেখে রেখেছি— সে পুতুলের সামনে নন্তীর পুতুল দাঁড়াতে পারবে?…কত দাম বলদিকিন পুতুলটায়?”

কন্যা উৎসুক স-প্রশ্ন নেত্রে চাহিতে মুঠার মধ্য হইতে দুইটা আঙুল আলাদা করিয়া ধরিয়া ঈষৎ হাস্যের সহিত চক্ষু দুইটা বিস্ফারিত করিয়া চাহিয়া রহিলেন। কন্যার মুখটি আনন্দে দীপ্ত হইয়া উঠিল, বাপের মতোই চোখ বড় বড় করিয়া বলিল— “দু টাকা”!

জিনিসটা যেন চোখের সামনেই রহিয়াছে বাপ এইভাবে মাথা নাড়িলেন, বলিলেন— “দু টাকা! …আনছিলামও কিনে—ভারী তো দুটো টাকা, তা ইয়ে হোল…”

মেয়ে কাপড় কোঁচাইয়া র‍্যাপার পাট করিয়া তামাক সাজিতেছিল, হুঁকাটা হাতে তুলিয়া দিল। রসিকলাল গলাটা খাটো করিয়া বলিলেন— “তোর মাকে বলবিনি তো?”

মেয়ে গম্ভীরভাবে বলিল— “মাকে কেন বলতে গেলাম? বোঝেন না সোঝেন না—সব কথাতেই গজর গজর…”

রসিকলালের বক্তব্যটাকে জোরাল করিবার জন্য একটা উপমা দিয়াই আরম্ভ করিলেন— “এই ধর, নন্তীর কথাই গিরি—ঠ্যাকার করে তোকে দামী মোমের পুতুল দেখালে,—দেখালে তো?— এখন যদি ওর পুতুলটি চুরি যায় কি ভেঙে যায়, আর তোকে বলে— “গিরি দিদি, তোর পুতুলটা একবার দে ভাই, খেলি’–তো ‘না’ বলতে পারবি? বল না?”…(হঠাৎ একটু উষ্ম হইয়া) – “ঐ গোকুল হারামজাদা—গাল না দিয়েও পারিনে—আমার কাছেই মেয়ের চিকিচ্ছে করাচ্ছিল, ছাড়িয়ে দিয়ে ডাকলে তো মতি চাটুজ্জেকে?…আজ আসছি, দেখি মুখটি চুন করে বাইরের দাওয়ায় বসে আছে। ‘কিগো গোকুলদা, মেয়েটা আছে কেমন’…’আর ভাই, তোর হাত থেকে নিয়ে মতিকাকার হাতে দিলাম, এখন অ্যালোপাথি চিকিচ্ছের হিড়িক সামলাতে বুঝি মেয়েটাকে হারাতে হয়। মতিকাকা ওষুধ-পথ্যিতে তিন টাকার ফর্দ করে দিলে; বললাম—হাতে কুল্যে ঐ ক’টি টাকা আছে, তোমার ভিজিটটা না হয় আর একদিন দিয়ে দোব মতিকাকা—পরের ডাকে একসঙ্গে চারটে টাকা,…কোনমতে শুনলে না! বলে—বড় খরচের টানাটানিতে আছি—আজকাল কও নেই তেমন, হেনতেন, সাত-সতেরো…তার হাতে দুটি টাকা তুলে দিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছি—কোথা থেকে ওষুধ আনাই, কি করেই বা দুটো বেদানা-কমলালেবু যোগাড় করি’…একটা মেয়ে ধুঁকছে গিরি, আর সে সব পুরনো কথা মনে রাখতে পারি? মেয়ে তো সবারই সমান—হ্যাঁগো গিরি, তুই-ই বল না? তার ওপর আবার আমার গাল শুনে গোকুলদার বৌ ঘোমটা টেনে দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল;- মায়ের প্রাণ!…পেয়েছিলাম গোটাকতক টাকা আজ—সামন্তর ওখানে আট আনা, ছ’কড়ের ওখানে আট আনা, এদিকে দাসু-খুড়োর ওখানে দু’টাকা, সেখেদের বাড়ি…”

বরদাসুন্দরী দুধটুকু জ্বাল দিয়া লইতেছিলেন, তাগাদা দিলেন— “তোমাদের হোল গো গল্প শেষ?”

রসিকলাল বলিলেন,–”তুমি বাড়ো না, একটা ডুব দেওয়া বৈ তো নয়। গিরি তামাকটা সেজে হাতের সামনে ধরলে নেহাৎ…”

গিরিবালা একটু অন্যমনস্ক হইয়া গিয়াছিল, সমস্ত বর্ণনাটির মধ্যে একটি চিত্র তাহার মনে যেন গাঁথিয়া বসিয়া গিয়াছিল—’গোকুলদার বৌ ঘোমটা টেনে দোরগোড়ায় এসে মুখটি নিচু করে দাঁড়াল, মায়ের প্রাণ…”

এই বাপেরই মেয়ে তো? তাহার উপর বিষাদে-আনন্দে, গৌরবে-অভিমানে বিশ্বের যত মা সবাই যেন ওর আট বছরের দেহটিতে ভিড় করিয়া জড়ো হইয়াছে। ব্যথিত কণ্ঠে বলিল – “আহা, ভালো হয়ে যাক, না বাবা পুতুল নাকি পালিয়ে যাচ্ছে?—কি বল বাবা?”

“আহা, তা আর নয়? আর ও-টাকা আমার যাবে ভেবেছিস নাকি? রাম!…এই দেখো, তোকে আসল কথাটাই বলতে ভুলে বসে আছি—আজ কোথায় গেছলাম বল দিকিন?”

বরদাসুন্দরীর তাগাদা আসিল— “কৈ, ভাত যে বেড়ে ফেললাম।”

কথাটা মিথ্যা জানিয়াও মিথ্যা বলিয়া গ্রহণ করিবার সাহস হইল না। রসিকলাল হুঁকা রাখিয়া গামছাটা কাঁধে ফেলিয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেলেন।

.

আহারে বসিলে বরদাসুন্দরী বলিলেন— “আজ বড্ড দেরি করে ফেলেছ, খুব দূরে গেছলে নিশ্চয়? পয়সার সঙ্গে সম্পর্ক নেই, শরীর কালি করে অত দূরে যাবার কি দরকার বাপু?”

কন্যা বলিল— “কোথায় যে গেছলে আজ বাবা, তখন বলতে বলতে নাইতে চলে গেলে?”

রসিকলালের হাতটা যেন থামিয়া যাইবার উপক্রম হইল। কন্যাকে বারণ করিয়া দেওয়া হয় নাই, সে যে পাড়িবেই কথাটা তিনি বরাবর আশঙ্কা করিতেছিলেন। আর উপায় নাই দেখিয়া বলিলেন— “হ্যাঁ, গেছলাম বৈকি।—মাঝের পাড়ায় হঠাৎ অখিলদার সঙ্গে দেখা। আমিও যাব না, সেও ছাড়বে না…”

স্ত্রী ও কন্যা প্রায় একসঙ্গেই বলিয়া উঠিল— “গেছলে নাকি সিমুরে?”…”গেছলে নাকি মামার বাড়ি বাবা?”

রসিকলাল একবার কাসিয়া একটু যেন স্খলিত কণ্ঠেই বলিলেন— “না গিয়ে উপায় ছিল? অখিলদা ছাড়বার পাত্তোর কিনা! গোটা দু’এক টাকা পেয়েছিলাম খরচ হয়ে গেল, কুটুমবাড়ি তো আর খালি হাতে যাওয়া যায় না।”

মেয়ে আবার যাহাতে কিছু না বলিয়া বসে সেজন্য একবার চকিতে তাহার পানে চাহিয়া লইলেন।

বরদাসুন্দরী প্রসন্নভাবেই, বরং একটু গর্বের সহিতই বলিলেন— “তা খরচ হয়েছে বেশ হয়েছে। জামাই ডাক্তারি করছে, দুটো টাকার মিষ্টি নিয়ে গেছ তো আর কি অন্যায় করেছ? তবে একটা টাকা হলেও নিন্দে হত না। তা যাক গে।…মা কেমন আছেন? পিসিমা, দাদা, বিকাশ, মেজদি, বৌদি, বড়দি?…বড়দি এদিকে আর এসেছিলেন?”

রসিকলাল বলিলেন— “আছে ভালোই সব। শাশুড়ীঠাকরুণ বাপের বাড়ি গেছেন, কালপরশু নাগাত ফিরবেন। না, বড়দি আর আসতে পারেন না, তাঁর নাকি আবার ঝঞ্ঝাট বেড়ে গেছে। এঁরা সব আমায় কোনমতেই ছাড়বেন না, বলেন— “চৌধুরীদের ওখানে রাস হচ্ছে— গোপাল উড়ের যাত্রা এসেছে, দেখে যাও; বললাম…”

বরদাসুন্দরী বলিলেন— “দেখে এলেই পারতে একটা রাত, অত করে বললে যখন—হারাণকে দিয়ে বলে পাঠাতে।”

রসিকলাল যেন ভয়ে ভয়ে পা টিপিয়া টিপিয়া অগ্রসর হইতেছেন। গিরিবালা শিশু হইলেও যেখানে বাপের চরিত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞতার কথা সেখানে পাকা গৃহিণী; বাকি টাকার কথা যে গোপন করিতে হইবে সেটা সে বুঝিয়া গিয়াছে, কিন্তু তাহার মনে হইতেছিল, ও-রহস্য ছাড়া আরও কিছু আছে যেন, সেটা প্রকাশ হইয়া যাহাতে না পড়ে বাবা যেন সেটুকু বাঁচাইয়া বাঁচাইয়া চলিতেছেন। নয় তো সবই তো ভালো কথা, মিষ্টি পর্যন্ত লইয়া গেছেন শ্বশুরবাড়ি, অথচ বাপের কথার যেন বাঁধুনি নাই, কেমন যেন একটা সন্ত্রস্ত ভাব ভিতরে ভিতরে।

গিরিবালা সতর্কভাবে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

বরদাসুন্দরীর কথায় রসিকলাল যেন একটু ওরই মধ্যে উৎসাহ পাইলেন, বলিলেন— “দাদা নেই, থাকব আর কি করে? তবে বলে এলাম—দাদা বৌদি এসে গেলেই গিরি আর সোতুকে নিয়ে যাব।…যাবি নাকি গিরি?”

গিরিবালা রহস্যের সমাধানে অন্যমনস্ক হইয়া আছে, ঘাড়টা ঈষৎ নাড়িয়ে সম্মতি জানাইল। বরদাসুন্দরী বলিলেন— “তা বেশ করেছ, যাবে ওরা; আহা এখানে দেখতে পায় না ওসব, যাবে না?”

তাহার পর তাঁহার স্বরটাও হঠাৎ যেন জড়িত হইয়া গেল, বলিলেন— “হ্যাঁগা, একটা কথা জিগ্যেস করব? আচ্ছা থাক্, আগে খেয়ে নাও।”

রসিকলালের মুখটা শুকাইয়া গেল, হাতটাও বন্ধ হইয়া গেল, যেন এতক্ষণ যাহা আশঙ্কা করিতেছিলেন, তাহাই আসিয়া পড়িল শেষ পর্যন্ত। একটা ঢোক গিলিয়া বলিলেন— “কি বলোই না।” সঙ্গে সঙ্গে যেন বিপদটার সম্মুখীন হইবার নেশা চাপিয়া গেল, হাত গুটাইয়া লইয়া একটু হাসিবার চেষ্টা করিয়া লইয়া বলিলেন— “না, বলো, নইলে আমি এই হাত গুটিয়ে বসলাম।”

বরদাসুন্দরী যেন আরও গুটাইয়া গেলেন—নিজের বাপের বাড়ির কথা, স্বামীকে মনে হয় সেখানে তাঁহার পক্ষেও কুটুম। দু-একবার চোখ তুলিবার চেষ্টা করিয়া মুখটা নিচু করিয়াই বলিলেন— “গেলে—নাওয়া-খাওয়ার সময়, তা তারা খেতে বললে না? পিসিমা রয়েছেন, মেজদি রয়েছে, বৌদি রয়েছে…মানে, এক সুয্যিতে বামনকে দু’বার খেতে নেই কিনা তাই জিগ্যেস করছি।” মন থেকে মস্ত বড় একটা বোঝা নামিয়া যাওয়ায় রসিকলাল হালকা ভাবে হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন— “এই কথা? আমি মনে করি—না জানি কত বড় একটা কথা বলবে।…তা, তারা জামাইকে ভাত দেবে? শুনে রাখ, গিরি, তোর গর্ভধারিণীর বুদ্ধির কথা, সেখানে গিয়ে বলবি।”

শ্বশুরবাড়ির কথাটা একেবারে গোপন করিবার অভিপ্রায়েই রসিকলাল ক্ষুধা না থাকিলেও আহারে বসিয়াছিলেন, অনেক লুচি খাওয়ার উপরই জোর দিয়া কথাটা সামলাইয়া লইলেন, বলিলেন— “তাড়াতাড়ি হলেও তারা লুচি আর আগড়ম-বাগড়ম কি সব করেছিল; দিনের বেলা দুটি ভাত না চাপা দিলে কি চলে? তাই মনে করলাম এক মুঠো ভাত খেয়ে নিই।”

এর পর কথা বেশ সহজভাবে চলিল অনেকক্ষণ, ফাঁড়াটা যেন কাটিয়া গেছে। তিনজনেই বেশ প্রাণ খুলিয়া যোগদান করিলেন। হরিচরণের ঝোঁকটা ঘুড়ির দিকে বেশি; এতক্ষণ বাহিরে ছিল, সেও আসিয়া নিজের টবর্গ-সঙ্কুল আলাপে আসরটাকে জমাইয়া তুলিল। তরকারির পর্ব শেষ হইলে রসিকলাল দুধের বাটিটা টানিয়াছেন, এমন সময় বরদাসুন্দরী কতকটা আপন মনেই বলিয়া উঠিলেন— “শুনেছিলাম বাড়িতে অখিল এবার খুব ভালো মুলো করেছে, আর পালং শাকের গোড়া; কলকাতা থেকে নাকি ফুলকপিরও বিচি আনিয়ে লাগিয়েছিল…কাটারিভোগ ধানের চিঁড়েও এবারে করলে কিনা কে জানে…”

রসিকলালের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে আগের চেয়েও শুকাইয়া গেল। দুধের বাটি থেকে হাতটা টানিয়া লইয়া প্রায় উঠিয়া পড়িয়াছেন, বরদাসুন্দরী শঙ্কিতভাবে প্রশ্ন করিলেন— “কি হল?”

এমন সময় হারাণ স্নান করিয়া আসিয়া উঠানে কলাপাতা বিছাইয়া বলিল— “দাও ছোট মাঠাক্রণ। ওখানেও হল একচোট, কিন্তু দীঘ্য পথ, ক্ষিধে নেগে গেছে। কোথায় ভেবেছিনু ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি,—আজ বাড়ি এসে কুটুম-বাড়ির মত্তমান কলা আর সীতাভোগ ধানের চিঁড়ে ফলার করব, তা যত সব হাভাতের দল রাস্তা এগলে বসে রয়েছে; বাবাঠাকুরও তো দাতাকন্ন হয়ে…”

রসিকলালকে সামনে দাওয়ার উপর দেখিয়া থামিয়া গেল। বরদাসুন্দরী কাঠ হইয়া বসিয়া রহিলেন, একটি কথা বলিলেন না।

ঘরে আসিয়া গিরিবালা চাপা ভীতকণ্ঠে প্রশ্ন করিল— “আবার সব বুঝি বিলিয়ে দিয়ে এসেছ বাবা—মামাবাড়িতে যা-সব দিয়েছিলেন?”

রসিকলালের অপরাধী-ভাবটা তখনও কাটে নাই; বলিলেন— “এক ছিলিম তামাক সাজ তো গিরি; শখ করে বিলোব আমায় কি তেমনি বোকা পেয়েছে, লোকে? বাগদিপাড়া হয়ে আসব, দেখি দুলো বউটাকে বেধড়ক মার দিচ্ছে ধরে…তুই নিজে পড়ে; রোজগারের দ্বিতীয় লোক নেই, একপাল কাচ্ছাবাচ্ছাও বৌমানুষ কদ্দূর কি করবে?…তুই-ই বল না গিরি, আনতে পারতিস চিঁড়েগুলো বয়ে তাদের মাঝখান থেকে?…তোর গর্ভধারিণীই পারত আনতে?—অত যে মুখ ভার, অত যে তম্বি?..

শৈলেনের এক-একবার এই রকম হয়—কয়েকটা তীব্র-অনুভূত মুহূর্তের সমষ্টি হঠাৎ কোথা হইতে আসিয়া পড়ে,—মনে হয় তাহার জাগ্রত দৃষ্টির উপর কে যেন স্বপ্নের প্রলেপ দিয়া গেল।—তাহাকে ঘিরিয়া আজিকার এই যে মহাকালের অংশটুকু—তাহার সমস্ত ইন্দ্রিয়ের তন্ত্রী ছুঁইয়া বর্তমান এই যে নানা সুরে মিশ্র সঙ্গীত তুলিতেছে—এ সবই যায় মিটিয়া, স্তব্ধ হইয়া, আর তাহাদের জায়গায় জাগিয়া উঠে অতীত। জানার সঙ্গে অজানা মেশে, শোনার সঙ্গে অশ্রুত। সত্যে-মিথ্যায়, হাসিতে-অশ্রুতে কি যে একটা মায়াপ্রবাহ চলে কিছুই বুঝিতে পারা যায় না। ইতিহাস-মাত্র নয় বলিয়া এ-অতীত প্রশ্নের উত্তর দেয় না, শুধু চলার মাতনে টানিয়া লইয়া চলে।—শৈলেন চেনে ঐ শিশু-জননীকে, তার ঐ বয়ঃপ্রাপ্ত শিশুটিকেও চেনে; গৃহের ঐ লক্ষ্মীকে চেনে; হরুও চেনা, তার ঐ টকারের টঙ্কায় না শোনা থাকিলেও। কিন্তু কে হারাণ, কে সামন্ত, দুলোই বা কে? —রু মেয়ের অশুভ আশঙ্কা লইয়া যাহার বধূ ঘোমটা টানিয়া নত নয়নে দোরগোড়াটিতে দাঁড়ায়…অতীত যেন যাদু জানে,—সত্য আর অলীক মিলাইয়া একটা চঞ্চল স্বপ্নস্রোতের রচনা করে, দুটাকে পৃথক করিয়া দেখিবার জো নাই, তাহা হইলে সমস্ত স্রোতই হইয়া যাইবে অবলুপ্ত!… শৈলেন তাই প্রশ্ন করে না, মুগ্ধনেত্রে দেখিয়াই চলে, মাত্র দেখার আনন্দেই নিজেকে হারাইয়া ফেলে।—

সেই মেয়েটি—শিউলি গাছের তলায় ভাঙা পুতুলের উপর জননীর করুণ দৃষ্টি মেলিয়া যে দাঁড়াইয়াছিল—মায়ের গঞ্জনার ভয়ে বাপকে যে ছেলের মতোই আড়াল করিয়া উঠানে আসিয়া দাঁড়াইল—শ্বশুরবাড়ির সওগাত বিলাইয়া বাপ যাহার অনুকম্পায়-ভরা চোখ দুটির উপর দৃষ্টি রাখিয়া প্রশ্ন করিল— “তুই-ই বল না গিরি, আনতে পারতিস্ চিঁড়েগুলো ব’য়ে তাদের মাঝখান দিয়ে?…”

গিরিবালার মুখটি ভালো করিয়া মুছানো, কপালে কাচপোকার টিপ, মাথায় বেড়া-বেণীর খোঁপা টান করিয়া সযত্নে বাঁধা। পরনে ডুরে শাড়ি, গায়ে একটি খাটো সাটিনের জামা— বোধ হয় বছর দু’এক আগের কেনা। কাঁধে পাট-করা একটি রাঙা গাঁতি।

পাশে বাপ।—গৌরকান্তি দীর্ঘ সুঠাম বত্রিশ বৎসরের যুবা পুরুষ। প্রসন্ন দৃষ্টি, সর্বব্যাপী কারুণ্য, আর, একটা আত্মভোলা ভাবের জন্য যৌবনের সঙ্গে যেন একদিক দিয়া শৈশব, আর একদিক দিয়া পবিত্র বার্ধক্য আসিয়া মিশিয়াছে। পোশাক একটু বেশি পরিচ্ছন্ন।

পিছনে হারাণ। মাথায় একটা বেতের ঝুড়ি, তাহার একদিকে দুইটা লাউ, গোটাকতক চালদা আর কিছু করমচা। অন্য পাশে একটা নেকড়ায়-বাঁধা কয়েকরকম বড়ি, কিছু পাঁপড় আর খানিকটা নূতন গুড়। অন্য একটি পুঁটুলিতে কিছু কদমা আর নূতন গুড়ের মুড়কি। হারাণের ভাবটা বেশ প্রসন্ন নয়। যেন কতকটা জাতিচ্যুত,—তাহার মাথায় বহিবার উপযুক্ত জিনিস ঔষধের বাক্সটা; সে তখন পা ফেলে কম্পাউন্ডারের দর্পে। অন্তত তাড়াতাড়ি গ্রামটা ছাড়াইয়া গেলে যেন এই লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পায়—ভাবটা কতক এইরকম।

.

কাল সন্ধ্যার সময় হঠাৎ দাদা-বৌদিদি আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দাদা চার দিন ছিলেন না, আজ ডাল বাড়ন্ত গেছে, কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আরও কত কি যে ‘বাড়ন্তের’ খবর পাওয়া যাইবে বলা যায় না। এই চারটে দিনের উপার্জনের হিসাব দাদাকে দিতে হইবে—আর বিপদ এই যে, বহুদিন পরে কপাল দোষে এই চারটা দিনেই বেশি উপার্জন হইয়াছে। কিন্তু একটি পয়সা বাড়িতে আসে নাই।

এ-অবস্থায় মানে মানে সরিয়া পড়াই ভালো। রসিকলাল কন্যাকে সামনে আগাইয়া দিলেন, বলিলেন— “গিরি, তোর জেঠামশায়কে বল সিমুরে যাওয়ার কথা, রাস ফুরিয়ে গেলে আর যাবি কবে? বলবি বড় দিদিমা মাথার দিব্যি দিয়ে বলে পাঠিয়েছে বাবাকে দিয়ে; আর সত্যি দিয়েছিল মাথার দিব্যি, কাজের চাপে ভুলে গিয়েছিলাম, এই এক্ষুনি আমার হঠাৎ মনে পড়ল। আমায় জিগ্যেস করলে আমিও বলব, যা, রাজী কর গিয়ে।’

রাত্রিটা খানিকটা চিনিবাস সেকরার দোকান, খানিকটা ভবনাথের বৈঠকখানা এই করিয়া কাটাইয়া দিলেন। তাই ক্লান্ত হইয়া আসিয়াছিলেন, সকাল সকাল আহার করিয়া শয্যা গ্রহণ করিলে রসিকলাল সন্তর্পণে আসিয়া নিজের ঘরে প্রবেশ করিলেন। গিরিবালা জাগিয়া ছিল, চুপিচুপি খবর দিল— “রাজী করেছি বাবা জেঠামশাইকে, কাল বিকেলে যাব আমরা। সাতু যেতে পারবে না বাবা, নতুন জুতোতে সমস্ত পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে, আহা!”

একটু থামিয়া অল্প একটু ঠোঁট উল্টাইয়া বলিল— “দেখলে তো বাবা? আমাদের পুতুরাণীর এবারও আসা হ’ল না! এলে তো যেতে পারতো?”

রসিকলালের আজ পুতির সম্বন্ধে মেয়ের চিরন্তন নালিশের দিকে মন ছিল না, প্রশ্ন করিলেন— “তোর জেঠাইমা কোথায়? দাদা ঘুমিয়েছেন?”

গিরিবালা বলিল— “জেঠামশাইকে তো আমিই মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে এলাম। জেঠাইমা খোকার কাঁথায় ফুল তুলছেন রান্নাঘরে বসে, মা রাঁধছেন।

“ডেকে আনতে পারিস্ তোর জেঠাইমাকে?”

গিরিবালা উঠিয়া দুয়ার পর্যন্ত যাইলে বলিলেন— “আর শোন গিরি, তুই তোর গর্ভধারিণীর কাছে একটু বসবি ততক্ষণ রান্নাঘরে,—ভয়-তরাসে মানুষ, তায় অন্ধকার রাত্তির…”

ভাজ বসন্তকুমারী আসিয়া কহিলেন— “কোথায় ছিলে গো ঠাকুর? উনি যে ক’বার খোঁজ করলেন…হ্যাঁগা ঠাকুরপো, দুটো দিন মানুষটা ছিল না, একেবারে শিবের সংসার ক’রে রেখেছ? কিছু পাও টাও নি এ ক’টা দিন?”

“না, তা কি আর পেয়েছি? একটু ফুরসত ক’রে যে একবার বাজারটা ক’রে আনব তার উপায় ছিল না, এমনি কলের হিড়িক; মাংনাতেই বুঝি ঘুরে বেড়িয়েছি। ছোটবৌ বুঝি পাঁচখানা ক’রে লাগিয়েছে তোমার কাছে? …হ্যাঁ, তোমায় কেন ডাকলাম, মনে পড়েছে—পাঁচটা টাকা হাওলাত দিতে পারো?”

বসন্তকুমারী ঠোঁটটা উল্টাইয়া বলিলেন— “কি যে বলে, তাই—খুব মহাজন ধরেছ। আর এত রাত্তিরে হঠাৎ টাকা?”

‘ঠাট্টা নয়, দরকার। মোটা সুদ পাবে, দাও দিয়ে আসি, ভবদাদার বৈঠকখানায় বসে আছে।”

“লোকটা কে?”

দেবর একটু রাগিয়াই বলিল— “ঐ তোমাদের মেয়েমানুষদের কেমন একটা রোগ। যদি নামই বলবে তো এক পহর রাত ক’রে গা ঢাকা দিয়ে আসবে কেন? দাও, তোমার টাকা মারা যাবে না, আমি জামিন রইলাম।”

অনেক করিয়া তিনটি টাকা পাওয়া গেল, আর ছিল না, পরের দিন রসিকলাল দাদা উঠিবার পূর্বেই “কল”-এ বাহির হইয়া গেলেন। সিমুরে যাওয়া ঠিক হইয়াছে, একটু সকাল সকালই ফিরিলেন। আরও তিনটি টাকার সংস্থান হইয়াছে,—দুইটি উপার্জন, একটি ক। রাত্রের টাকার সঙ্গে মিলাইয়া দাদার সহিত দেখা করিয়া বলিলেন— “গিরি বলছিল ওকে নিয়ে নাকি সিমুরে যেতে বলেছ তুমি?”

বড় ভাই অন্নদাচরণ একটু রুক্ষ প্রকৃতির লোক—অন্তত বাহিরে তো নিশ্চয়ই। তেল মাখিয়া তামাক খাইতেছিলেন, মাথায় একটু লঘু ঝাঁকুনি দিয়া বলিলেন— “হবে না যেতে? মাস-শাশুড়ি না মাথার দিব্যি দিয়ে দিয়েছে?”

রসিকলাল বলিলেন—’মাথার দিব্যি ওঁদের কথার মাত্রা একটা। কথা হচ্ছে, কতকগুলো কেস হাতে রয়েছে, এই সময় চলে যাওয়া…’

ভাইয়ের সাক্ষাৎ পান নাই বলিয়া কাল রাত্রি থেকে কথাগুলো জমিয়া আছে, অন্নদাচরণ রাগের চোটে ঘুরিয়া দাঁড়াইলেন— “তোকে যেতে হবে। তিনি যখন দেখতে চেয়েছেন গিরিকে, তখন যেতে হবে তোকে, এই আমার কথা। কেস!—এক ঢঙের কথা শিখেছিস—কি যে হচ্ছে কেসে তা তো দেখি না, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো! দুটো দিন ছিলাম না, ঘরে একেবারে…”

রসিকলাল রাগের ভান করিয়া বলিল— “বেশ, যাব, আমার আর কি? পাচ্ছিলাম এই সময়টা কিছু, ইনফ্লুয়েঞ্জাটা নেমেছে একটু, গুটি ছয়েক টাকা জমেছিল, রাত্তিরে এসে দেখি তুমি ঘুমুচ্ছ, দিতে পারিনি, এই গোটাচারেক নাও; দুটো আমি হাতে রাখলাম, যেতেই যখন হবে বলছ।”

.

যাত্রার গোছগাছের মধ্যে বসন্তকুমারী একটু চাপা গলায়ই অনুরোধ করিলেন— “টাকা তিনটে দিয়ে দাও ঠাকুরপো, লক্ষ্মীটি, এই যা হাতে ছিল–আসবার সময় মেজকাকা দিয়েছিলেন। আর ও- তিনটেও হাওলাত নাকি? নাঃ তোমার যে কি হবে ভেবেই পাই না।”

তিনজনে চলিয়াছে। বাড়ি থেকে প্রায় পো-তিনেকের মাথায় কানানদী, তাহাতে বড়-নদী অর্থাৎ দামোদরের জল নামিয়াছে, ওপারে গিয়া গরুর গাড়িতে উঠিতে হইবে। ক্রোশ তিনেক পথ বাহিয়া বড়-নদী, তাহার তীরে গাড়ি ছাড়িয়া দিয়া নৌকায় পার হওয়া। আবার প্রায় আধ ক্রোশ হাঁটা। তারপর সিমুর।

বেলা প্রায় দুপুর। কার্তিক মাস, নূতন শীতের হাওয়ার সঙ্গে রৌদ্রে মিশিয়া বেশ একটি মিঠা আমেজের সৃষ্টি করিয়াছে। বাপের দীর্ঘ মন্থর পদক্ষেপের সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া গিরিবালা খুর- খুর করিয়া দ্রুত চরণক্ষেপে চলিয়াছে, পথের মাটির গায়ে চঞ্চল আলতার রেখা চিকচিক করিতেছে। বাপে-মেয়েতে কি সব কথা হইতেছে, গিরিবালা এক একবার মুখ তুলিতেছে, নাকের নোলকটি গড়াইয়া পড়িতেছে, আবার মুখ নত করিতে দুলদুল করিতেছে।

একদিকে সিংহবাহিনীর মন্দির। দুইজনে সিংহবাহিনীকে প্রণাম করিলেন। প্রকাণ্ড অশ্বত্থ গাছের নিচে রথতলা। মেয়ে আবার বেশি ভক্তিমতী, রথে মাথাটা ঠেকাইয়া আসিতে গেল। রসিকলাল বলিয়া দিলেন— “শিগগির আসবি, ওদিকে আবার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

সমবয়সী ছেলেমেয়েরা জুটিয়াছে, প্রশ্ন করিল— “কোথায় যাচ্ছিস রে গিরি?”

গিরিবালার পায়া ভারি এখন, বিশেষ কাহারও দিকে না চাহিয়া চলিতে চলিতেই বলিল— “সিমুরে—মামারবাড়ি।”

“কবে ফিরবি?”

“দেরি হবে, দিদিমা ছাড়বে তবে তো! চৌধুরীবাড়ি রাস আছে, যাত্রা আছে।”

“হেঁটে যাবি?”

“হেঁটে নাকি মামারবাড়ি যাওয়া যায়? এপাড়া-ওপাড়া কিনা!”

মুখটা ভারিক্কে করিয়া আবার আসিয়া বাপের সঙ্গে চলিতে আরম্ভ করিল। সঙ্গীরা খানিকক্ষণ এই নবসৌভাগ্যশালিনীর পানে চাহিয়া রহিল, কি বলাবলিও হইল একটু। দু’একটি মেয়ে ঠোঁট দুইটি চাপিয়া একটু উল্টাইয়া লইল—সম্ভবত গিরিবালার দেমাক লইয়া মন্তব্য হিসাবে।

রথতলার পর রাস্তাটা আঁকিয়া বাঁকিয়া উত্তর হইয়া পশ্চিমদিকে চলিয়া গিয়াছে। দুইদিকে পানায়-ভরা ডোবা, বাগান, মাঝে মাঝে ছাড়া ছাড়া বাড়ি। পাড়াগাঁয়ে সাজিয়া-গুজিয়া পথ চলা যে নিত্যকার ব্যাপার এমন নয়, নানারকম প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে তিনজনে অগ্রসর হইতে লাগিল—

“বাঁড়ুজ্জ্যে মশাই, পেন্নাম হই। দূরের পাড়ি যেন?”

“কল্যাণ হোক। দূরেই যাব একটু সিমুরে।”

“ও, তাই বলছিলাম, বাঁড়ুজ্জ্যে মশাই যেন গাঁয়ের বাইরে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।”

.

“কম্পাউন্ডার সায়েবের মাথায় ঝুড়ি কেন? গিরিমায়ের সেজেগুজে বাপের সঙ্গে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?…কোথায় গো রসিক?”

“একটু সিমুর যাব ঠাকুরদা।”

“নাতবৌ কোথায়?”

“সে তো এখানেই।”

“তবে আর সিমুরে কি রইল?—আঁটিসার আমটা,—হাঃ—হা—হা।…তা যাও, মাঝে মাঝে একটু দর্শন ভালো। নতুন বৌ জিগ্যেস করছে—

বিরহ– সে কেমন, হ্যাঁ গা?
না, পিরিত-সোনার সেই সোহাগা।

ভাল কথা মনে পড়ে গেল। সিমুরের খাম্বিরে ডাকসাইটে, সেই কবে তোর বিয়ের সময় খেয়েছিলাম, এখনও মুখে তার লেগে আছে, আনবি খানিকটা। ভুললে অনর্থ করব।…গিরি মা, মনে করিয়ে দেবে, দেবে তো?…হ্যাঁ, ভোলো, আমার ক্ষতি নেই, মা’টি বেহাত হবে। আমার সেই—নাকের বদলে নরুণ পেলাম, ড্যাং—ড্যাঙা—ড্যাং—ড্যাং—হাঃহা হা।”

গিরিবালা কাপড় ধরিয়া প্রচ্ছন্নভাবে টান দিতেছে, হারাণের তো তাড়া আছেই, দুইবার গলা খাঁকারি দিল, তবুও একটু দেরি হইয়াই গেল।

হারাণের পাশে জুটিয়া গেল বাউরিদের রতন। গল্পের জন্য হারাণ উহারই মধ্যে গতি একটু মন্দীভূত করিয়া খানিকটা ব্যবধান সৃষ্টি করিয়া লইল।

রতন ছেলেটা বেশ একটু অনুগত, হারাণের বক্তব্যগুলো নির্বিচারে শুনিয়া যায় এবং পূর্ণ নিষ্ঠার সহিত বিশ্বাস করে। পেয়ারা খাইতেছিল, চলিতে চলিতে কোঁচড় থেকে গোটা তিন বাহির করিয়া সবচেয়ে ভালটা হারাণের হাতে দিয়া বলিল— “স্যানেদের গাছের। বামুন-ডাক্তার কোথায় যাচ্ছে গা হারাণদা? তোমার ওষুধের বাক্সটা দেখছি না যে?”

হারাণ পেয়ারায় একটা কামড় দিয়া বলিল— “মিষ্টি আছে, পিরানের পকেটে আর দুটো রেখে দে তো। বাক্স আছে—ঝুড়ির মধ্যে; তুই দেড় হাতের মানুষ দেখবি কথে?”

রতন খানিকটা চুপচাপ করিয়া চলিল, তাহার পর প্রশ্ন করিল— “বামুন ডাক্তার যাচ্ছে কনে তাই জিগুচ্ছি।”

“জনাই। বাবুদের বাড়ি থেকে ডাক এয়েচে।”

ও-অঞ্চলের ছেলেদের কল্পনায় কলিকাতার পরেই জনাই এবং লাট সাহবের পরেই জনাইয়ের বাবুরা। রতন চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া বলিল— “জনাইয়ের বাবুদের বাড়ি ডাক হয়েচে? উরে বাবা! বামুনডাক্তার কেও-কেটা নয় বলো হারাণদা!”

“কেউ-কেটা হলে হারাণ পরামানিক এমন কামড়ে পড়ে থাকত না। বাবুরা কলকাতার ডাক্তারও আন্নেছেলো; অসুখের বহর দেখে ন্যাজ মুখে করে পাইলেচে। তখন ডাক্ বেলে-তেজপুরের রসিক বাঁডুজ্জ্যেকে।”

“অসুখটা কি গা?”

হারাণ পেয়ারার একটা বড় গ্রাস কাটিয়া খানিকক্ষণ চিবাইতে চিবাইতে একটা লাটবেলাটের উপযোগী সম্ভ্রমযোগ্য রোগের নাম মনে করিবার চেষ্টা করিল, তাহার পর তাহার মনটা ঔষধের বাক্সের মধ্যে প্রবেশ করিল; হারাণ বলিল— “নক্সভোমিকা।”

কক্ষনও শোনে নাই এ নাম; রতন স্তম্ভিত হইয়া বলিল— “বারে! বাঁচবে?”

“বাঁচবে না তো যাচ্ছি কেন আমরা?”

রতন আবার খানিকক্ষণ চুপ করিয়া ভয়ঙ্কর এই অজানা রোগের স্বরূপটা উপলব্ধি করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল, একটু পরে জিজ্ঞাসা করিল— “কেবলই নাক দিয়ে বমি করচে বুঝি?”

হারাণ একটু রাগিল, বলিল— “যা জানিস না বুঝিস না তাতে দখল দিতে যাসনে রতনা। বমি করে মরবি তোরা—বাউরি, দুলে, তাঁতিরা। জনাইয়ের বাবুদের অমন হেঁজিপেঁজি রোগ হয় না। ডাক্তাররাও অমন হেঁজিপেঁজি রোগের জন্যে কাম্পুন্ডার সুদ্দু হাজরে দেয় না!”

এইবার বোধহয় প্রশ্ন হবে বামুনদিদি যায় কেন। হারাণ অবশ্য উত্তর দিবেই, তবে একটু ভাবিতে হইবে। তা ভিন্ন বাবাঠাকুর অনেকটা আগাইয়া গেছে। হারাণ বাঁ হাতে ঝুড়িটা ধরিয়া ডান হাতে একমুঠা বড়ি আর একগোছা পাঁপর বাহির করিয়া তাড়াতাড়ি রকমের কোঁচড়ে পুরিয়া দিয়া বলিল— “যা, ভেজে খাস, বুঝবি কি রকম পথ্যি যাচ্ছে জনাইয়ের বাবুর রোগের জন্যে। খেতে বড়ি আর পাঁপড়ের চেয়ে যদি একচুল এদিক-ওদিক হয় তো হারাণের নামে কুকুর পুষিস্ তখন। যা, পথি তৈরির কেরামতিটা দেখগে পরখ করে।”

ওদিকে মায়ে-পোয়ে জোর গল্প চলিয়াছে, মুক্ত আকাশের নীচে গতির আনন্দে কল্পনার কোন জড়তাই নাই। পাশে কাহাদের পুকুরে একরাশ রাঙা শালুক ফুটিয়াছে। একটু না দাঁড়াইয়া যেন পারিল না—বাপ মেয়ে উভয়েই। মেয়ে বলিল— “হারাণে পেছিয়ে গেছে বাবা, আসুক না।”

একটু আবদারের সুরে বলিল— “দুটো তুলে নিয়ে আসুক বাবা, হুঁ; নিয়ে যাব মামারবাড়ি।”

“তা নিয়ে আসুক দুটো। তুই বড় হলে আমি যে পদ্যগুলো লিখেছি তোকে শোনাব গিরি; আর দুটো বচ্ছর বাদেই তুই বুঝতে পারবি, তাতে এই রাঙা শালুকের কথা লিখেছি। তুই যে মেয়ে, নইলে তোকেও শেখাতুম পদ্য লিখতে। হরুটাকে শেখাব। আমার নিজের আর হল না…নাঃ, আর উপায় দেখি না হবার, যা সংসারের দুশ্চিন্তে!”

হারাণ ঝুড়ি রাখিয়া একটু জলে নামিয়া একটা আঁকশি করিয়া ফুল তুলিতেছে। রসিকলাল একটু আত্মস্থভাবেই বলিলেন— “মেয়েছেলেতেও শেখে পদ্য লেখা, না শেখে যে এমন নয়। এই তো মানকুমারী লিখেছে। তা তুই না লিখলি—তোর ছেলে নাতি-নাতকুড় কেউ না কেউ লিখবেই গিরি—বাপের গুণ কোথাও বর্তাবেই। হ্যাঁ, ভালো কথা মনে পড়ে গেল—রোজ শিবপুজো করিস তো, যেমন বলে দিয়েছিলাম?”

গিরিবালা একটু লজ্জিতভাবে রাগের সহিত বলিল,–”হ্যাঁ, রোজ সময় পাই কিনা…”

“সময় করে নিতে হবে, আমি গিরিবালা নাম দিয়েছি এমন নয়—আমার কথা ফলবে…করে নিতে হবে সময়।

“কিগো রসিক যে, কোথায়?”

রসিকলাল ফিরিয়াই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া বলিয়া উঠিলেন— “পণ্ডিতমশাই!”

সঙ্গে সঙ্গে সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া যেন একটা নির্মল আনন্দের জোয়ার খেলিয়া গেল। রসিকলাল অভিভূতভাবে নবাগতের মুখের পানে চাহিয়া একটু দাঁড়াইয়া রহিলেন, আর একবার বলিলেন,— “পণ্ডিতমশাই দেখি যে!”

তাহার পর যেন দেবতার চরণে নতি করিতেছেন এইভাবে মাথা প্রায় মাটি পর্যন্ত নামাইয়া পদধূলি গ্রহণ করিলেন।

খানিকক্ষণ পর্যন্ত আর কিছু জিজ্ঞাসা করিবার বা বলিবার অবসর পাওয়াই দুষ্কর হইয়া উঠিল রসিকলালের। পণ্ডিতমশাই বলিয়া চলিলেন—

“আমি ঠিক দূর থেকে আন্দাজ করেছি—ভুল হতেই পারে না।…থাক্ থাক্ হয়েছে, দীর্ঘজীবী হও…ভুল হতেই পারে না। বয়েস হয়েছে, খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু মানুষটা তো আর বদলাবে না?—সেই “শালপ্রাংশু মহাভুজ”—ইস্কুলে তোমায় দেখে বলতাম না? —মনে আছে?…শালগাছটা না হয় আর একটু বেড়েছে। বাঃ, বড় আনন্দ হল তোমায় দেখে রসিক। … দূর থেকেই চিনেছিলাম—তারপর আবার যখন দেখলাম লোকটা দাঁড়িয়ে কহ্লার ফুল তোলাচ্ছে তখন আমার সংশয়মাত্র রইল না। দুপুরের রোদে ডোবার ধারে দাঁড়িয়ে কহ্লার ফুল তোলাবে এমন লোক বেলে-তেজপুরে একটি মাত্রই আছে।

আরে চলো, দাঁড়িয়ে রইল যে? যাওয়া হচ্ছে কোথায়? তা যেখানেই যাও, পণ্ডিতমশাইদের বাড়িতে খানিকটা না বসে পাদমপি নড়া চলবে না; এতদিন পরে তোমায় পেয়েছি। অনেক কথা। আমার কথা জিগ্যেস করো না। সেই এখান থেকে বর্ধমান স্কুলে গেলাম…তোমরা ঘটা করে বিদায় দিলে। নাঃ দুটি বছরও টেকতে পারলাম না। বি-এ-তে সংস্কৃতে অনার্স ছিল, আর হেডমাস্টারের চেয়ারে বসেছে, তাই সে মহাপণ্ডিত? বন্‌ল না—অর্বাচীনের ঔদ্ধত্য সোমেশ পণ্ডিত কখনও সহ্য করতে পারেনি, পারবেও না।…তারপর নবদ্বীপ; মাইনে বেশি নয়, তবে পণ্ডিতের সাহচর্য ছিল। কিন্তু ঐ স্কুলের চাকরি—ঐ হয়েছে কাল জীবনে, টেঁকতে পারি না,—কী নীরস, রুক্ষ পঠন-পাঠনের ধারা—শুধু পাস করাও, নোট চাও, সংক্ষিপ্ত করো, খর্ব করো- -এ যে কী যন্ত্রণা! কি পাপ যে করেছিলাম এ লাইনে এসে!—তোমরা লাইনই বল না?—তা অবিকল লাইন; একটু এদিক ওদিক হবার যো নেই, তাহলেই সব ভূমিসাৎ! যাক, নবদ্বীপ ছেড়ে বছর খানেকের জন্যে এখানে এসে বসি। তুমি তখন ডাক্তারি পড়তে গেছ, দেখা হল না। ঠিক করলাম আর বেরুব না, যজন-যাজনের দ্বারা যা হয় করে চালাব, আর, একটা টোল খুলে প্রাণের আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে অধ্যাপনা করব শেষ জীবনটা। পারলাম না প্রতিজ্ঞা রাখতে, কেন, আন্দাজ করো তো?”

কাছেই বাড়ি, রাস্তার ধারে। গুরুশিষ্য আসিয়া বাহিরে দুইটি সিমেন্ট-বাঁধানো বেঞ্চে মুখোমুখি হইয়া অধিবেশন করিলেন। গিরিবালা পুষ্পসঞ্চয়ে পিছনেই রহিল।

পণ্ডিতমশাইয়ের মুখটি একটি অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে; বসিয়া, কি যেন একটা মস্তবড় সম্পদ লাভ হইয়াছে এই ভাবের তৃপ্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আর একবার প্রশ্ন করিলেন— “কেন রাখতে পারলাম না প্রতিজ্ঞা, আন্দাজ করো দিকিন …”

তাহার পর সেটা অসম্ভব জানিয়া নিজেই রহস্য উদ্ঘাটন করিয়া দিলেন। উজ্জ্বল মুখটা হঠাৎ যেন আরও চতুর্গুণ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, বলিলেন— “উজ্জয়িনী টানলে! মেঘদূতের সে অবন্তীপুর। মনে আছে তো?

প্রাপ্যাবস্তীনুদয়নকথাকোবিদ গ্রামবৃদ্ধান্
পূর্বোদ্দিষ্টামনুসর পুরীং শ্রীবিশালাং বিশালাং।।
স্বল্পীভূতে সুচরিতফলে স্বর্গিণাং পাং গতানাং
শেষৈঃ পুণ্যৈা তমিব দিবঃ কান্তিমং খণ্ডমেকং।।”

তাহার পরেই কিন্তু তাঁহার মুখটা একটু একটু করিয়া দ্রুত নিষ্প্রভ হইয়া গেল। বলিলেন— “কিন্তু না গেলেই ভাল ছিল রসিক! এক বছর ছিলাম, শুধু পেটের দায়ে! না হলে যেদিন স্বপ্ন ভাঙল সেই দিনই চলে আসতাম, অর্থাৎ যাকে বলে ধুলো পায়েই।”

পণ্ডিতমশাই একটু অন্যমনস্ক হইয়া রহিলেন, কল্পনায় উজ্জয়িনী থেকে তাঁহার দৃষ্টি রূঢ়, বাস্তব উজ্জয়িনীতে আসিয়া যেন নিবদ্ধ হইয়া গেছে।

একটু পরে সমস্ত ব্যাপারটা মন থেকে ঝাড়িয়া ফেলিয়া উঠিলেন— “এই দেখো, নিজের কথাই পাঁচ-কাহন করছি। তারপর, তোমার খবর কি? আমি মোটে এই কাল এসেচি—আরো কয়েক জায়গায় ঘুরে ঘুরে বাইরে বাইরেই জীবনের প্রায় সমস্তটা কাটিয়ে…হ্যাঁ, ভাল কথা, কাব্যচর্চাটা রেখে গেছ নিশ্চয় রসিক? মানে, পদ্য লেখার অভ্যাসটা ত্যাগ করনি তো?…বড় আনন্দ হ’ল যখন দেখলাম তুমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কহ্লার পুষ্প সংগ্রহ করছ …বই কিছু প্রকাশিত করলে?”

রসিকলাল বিষণ্ণ দৃষ্টিতে একবার পণ্ডিতমশায়ের পানে চাইলেন। এই একটি মাত্র মানুষের কাছে এক সময় উৎসাহ আর প্রেরণা পাইয়াছিলেন। নৈরাশ্যের কথাটা আর মুখ দিয়া বাহির করিতে পারিলেন না।

পণ্ডিতমশাই বুঝিলেন এবং আর একবার অন্যমনস্ক হইয়া পড়িলেন, মাঝে শুধু বলিলেন— “সংসার! সংসার!—তোমাকেও শেষ করলে?”

খানিকটা গেল। তারপর পণ্ডিতমশাই আবার সমস্তটা মন থেকে ঝাড়িয়া ফেলিলেন—এবার একেবারে নিঃশেষভাবে। বলিলেন— “না, শোক করো না রসিক, আমি এসেছি, তুমি আছ, আবার সব ঠিক ক’রে নিতে হবে। ভাবনা কিসের?…তোমার সঙ্গে একটি মেয়ে ছিল না? দেখো, মনেই ছিল না?”

বাড়ির সামনে লতাপাতায় ঢাকা একটা উঁচু বেড়া ছিল; সেইটার অন্তরাল হইতে গিরিবালা আর হারাণ সামনে আসিয়া উপস্থিত হইল, একরাশ ফুল, কতকগুলা গিরিবালার হাতে; কতকগুলা হারাণের ঝুড়িতে।

পণ্ডিতমশাই বলিলেন— “এই যে, বাঃ, দিব্যি মেয়েটি! কার মেয়ে। কার মেয়ে?… তোমার? বাঃ,…দিব্যি ফুটফুটে নাতনী পাওয়া গেছে তো? এসো তো দিদি।”

রসিকলাল কন্যাকে আদেশ করিলেন— “প্রণাম করো ঠাকুরদাদাকে।

গিরিবালা সঙ্কুচিতভাবে গিয়া পদধূলি লইয়া মাথায় দিল। পণ্ডিতমশাই কোলে টানিয়া লইয়া বলিলেন— “রাজরাজেশ্বরী হও। কি নাম দিয়েছে বাবা?”

গিরিবালা নাম বলিল।

“বাঃ, গিরিবালা দেবী! তবে আর তোমায় আশীর্বাদ করব কি? বাপ এক নামেই তো সব আশীর্বাদ জড়ো করে রেখেছে। বড় চমৎকার মেয়ে, বাঃ। তা হবে না? হবে বৈ কি। তোমার বাবার মতো একটা চেহারা দেখাক না গ্রামের মধ্যে কে পারে। আমার পোড়া কপাল দেখো না—গ্রামের মধ্যেই দেব-কন্যার মতো আমার এই সঙ্গিনী করে দিয়েছে রসিক আর আমি অঙ্গারসার উজ্জয়িনীর জন্য চোখের জল ফেলে বেড়াচ্ছি! কত বয়স হল নাতনীর রসিক?”

প্রাণতুল্যা কন্যার এত ঢালা প্রশংসা শুনিবার অদৃষ্ট হয় না বড় একটা, রসিকলালের মনের কবাট যেন ধীরে খুলিয়া যাইতেছিল, স্নেহের দুর্বলতায় যত সব অসম্ভব সংকল্প মনে জমা করিয়া রাখিয়াছিলেন, মর্মগ্রাহী গুরুর সামনে একে একে প্রকাশ করিতে লাগিলেন—

“বয়স..এই আটে পড়বে। মনে করছি পণ্ডিতমশাই, গৌরীদান করব, কিন্তু…”

পণ্ডিতমশাই একেবারে উল্লসিত হইয়া উঠিলেন, বলিলেন— “আবার ‘কিন্তু’ কি এর মধ্যে? গৌরীদানের মেয়েই তো…. দেখাশুনা লাগিয়েছ? আমিও ঘটকালিতে নামব এবার, দাড়ি-টাড়ি রেখে নারদের মত চেহারাও করে রেখেছি, দেখ না।”

দীর্ঘ শ্মশ্রুতে একবার হাত বুলাইয়া প্রাণ খুলিয়া হাসিয়া উঠিলেন।

গিরিবালা কোলের মধ্যে গুটাইয়া যাইতেছিল। রসিকলাল বলিলেন— “তাহলে আরও বলি পণ্ডিতমশাই। অন্য কাউকে বলিনি—বললে ভাববে পাগল; ওর নামটা আমি স্বপ্নে পেয়েছিলাম, আর ও জন্মেও ছিল বাবা তারকেশ্বরের দোর ধরে…মানে….”

উচ্চাশা যে কতদূর তাহা আর প্রকাশ করিয়া বলিতে পারিলেন না। পণ্ডিতমশাই বলিলেন— “বুঝেছি, দাও তো দিদি বাঁ হাতটা একবার…ও আমি মুখের লক্ষণ দেখেই ধরেছি, তবুও একবার দেখি রেখাগুলো মিলিয়ে…”

বাঁ হাতটা তুলিয়া লইয়া পণ্ডিতমশাই করাঙ্ক-বিচার করিতে লাগিলেন। ক্রমেই তাঁহার মুখে একটা বিস্ময় আর আনন্দের জ্যোতি ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। হাতটা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া অতৃপ্ত আগ্রহেই অনেকক্ষণ দেখিলেন, তাহার পর ধীরে ধীরে রাখিয়া দিয়া আবিষ্টভাবে স্মিতহাস্যের সহিত রসিকলালের মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন। রসিকলাল উদ্বেগটা চাপিয়া প্রশ্ন করিলেন— “কেমন দেখলেন পণ্ডিতমশাই?”

পণ্ডিতমশাই উত্তর না দিয়া ভিতরের পানে চাহিয়া ডাকিলেন—কৈ গো, কেমন নাতনী এসেছে, ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটু আলাপ-পরিচয় করো।…দেখেছেন নিশ্চয় আড়াল থেকে, নাতনীর রূপ দেখে হিংসেয় আর পা বাড়াতে পাচ্ছেন না বোধ হয়!…হাঃ—হা—হা…”

একজন নথ, শাঁখা আর চওড়া রাঙাপাড়ের শাড়ি-পরা বর্ষীয়সী বাহির হইয়া আসিলেন। পণ্ডিতমশাই গিরিবালার মাথায় হাতটা একবার বুলাইয়া প্রশ্ন করিলেন— “কার মেয়ে বলো দিকিন?”

রসিক অগ্রসর হইয়া পদধূলি লইয়া বলিলেন— “আমি রসিক, মা; চিনতে পারছেন না বোধ হয়।”

বর্ষীয়সী রসিকের চিবুক স্পর্শ করিয়া অঙ্গুলী চারিটি স্বীয় অধরে ঠেকাইলেন; বলিলেন— “ওমা, অমন কথা বলো না; চিনতে পারব না কি! ভীমরতি হয়েছে নাকি?…তোমার মেয়ে? চমৎকারটি হয়েছে তো!—বাপমুখী মেয়ে, পয় ভাল। এসো তো দিদি, ভেতরে চলো, রোদে তেতে মুখখানি রাঙা হয়ে উঠেছে!…আর কি ছেলেপুলে রসিকের? কাল মোটে এলাম, এখনও খোঁজখবর নেওয়া হয়নি কাউরি।”

রসিকলাল লজ্জিতভাবে বলিলেন— “ওর দুটি ভাই আছে, দুটিই ওর নিচে। একবার যাবেন মা আমাদের ওখানে।”

“মেয়েই তাহলে পেরথোম? – ভালো, পেরথোম মেয়ে আবার বাপের ভাগ্যি নিয়ে আসে, আশীর্বাদ করি, সব বেঁচে-বর্তে থাক।…ওমা, যাব বৈকি, যাব না? আগে যাব—গেরস্থালীটা একটু গুছিয়ে নিয়েই।…যেখানেই থাকুন, হেন দিন যায়নি যেদিন একবার না একবার রসিকের নাম না করেছেন। যাব বৈকি।”

স্ত্রী গিরিবালাকে লইয়া ভিতরে চলিয়া গেলে পণ্ডিতমশাই আবার স্নিগ্ধ প্রসন্ন দৃষ্টিতে রসিকলালের মুখের দিকে চাহিলেন, ধীরে ধীরে বলিলেন— “দিদিকে আমার সরিয়ে দিলাম রসিক, লজ্জিতা হয়ে পড়েছিল, তা ভিন্ন—তা ভিন্ন…”

দ্বিধাগ্রস্ত ভাবটা কাটাইয়া বললেন— “তা ভিন্ন, দেব-অংশে জন্ম এ-মেয়ের, নিজের কথা যত কম শোনে ততই ভালো, জাতিস্মর হয়ে উঠলে—মানে নিজেরে চিনে ফেললে আর এরা থাকতে চায় না সংসারে।…বড় সুলক্ষণ মেয়ে রসিক; পিতৃকুল, শ্বশুরকুল দুই কুলকেই ধন্য করবে এ মেয়ে।” পণ্ডিতমশাই তারপর ধীর-সঞ্চারে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়িয়া বলিলেন— “কিন্তু কাছে রাখতে পারেন না…না। এর বিবাহ বহুদূরে হিম চক্রের মধ্যে—হিম-চক্রটা হ’ল হিমালয়ের পঞ্চাশ ক্রোশ পর্যন্ত স্থানটা।…হুট্‌ করতেই যে ওপাড়ায় গিয়ে মেয়েকে দেখে আসবে সেটি হবার জো নেই। উঁহু…আর একটা কথা, তবে সেটা তেমন বিশেষ কিছু নয়….”

শেষের কথাটুকু পণ্ডিতমশাই যেন একটু চিন্তিত ভাবেই বলিলেন। রসিকলাল উৎসুককণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন— “কি পণ্ডিতমশাই?”

পণ্ডিতমশাই তাচ্ছিল্যের সহিত বলিলেন— “নাঃ, সে কিছু নয়, মানে বিয়েতে একটু সঙ্কট আছে, তা সে সঙ্গে সঙ্গে কেটে যাবে। মেয়ে থাকলেই পাঁচটা ভালমন্দ সম্বন্ধ আসে, সাবিত্রীরও পাঁচ জায়গায় সম্বন্ধ খুঁজতে হয়েছিল। যদি হয়ই একটু গোলমাল তার জন্যে ভাবনার কিছু নেই। বিবাহ আমার দিদির যথাস্থানেই ঠিক হয়ে আছে, খুঁজে নিয়ে যাবে।”

রসিকলালের স্বপ্ন যেন পূর্ণ হইতে চলিয়াছে। কী যে বলিবেন ভাবিয়া পাইতেছেন না। চোখ দুটি ভাবাবেগে ছলছল করিয়া উঠিয়াছে; মুখখানায় কিসের আলো আসিয়া পড়িয়াছে। একটু আবিষ্টভাবে থাকিয়া অবশেষে বলিলেন— “যেখানে থাকে ভালো থাক্ পণ্ডিতমশাই। ওর যার অংশে জন্ম সে বাপ-মাকে খুবই কাঁদিয়েছিল—শ্বশুরঘর যাওয়ার পর থেকে,—তার জন্যে আমাদের দুঃখ নেই কোন। আর কারুর কাছে বলি না ওর কথা, ভাববে পাগল। ওকে শুধু বলি নিত্য শিবপুজোটা করে যাস।—তারই কি সময় পায় ঠিক মতো? যা ঘরে এসে জন্ম নিয়েছে!”

বহুদিন—বহুদিন পরে একটি মনের পরশ পাইয়াছেন যে তাঁহাকে চেনে, বোঝে, তাঁহার গূঢ়তম বিশ্বাসকে বাতুলতা বলিয়া বিদ্রূপ করে না, এমন একটি মন যাহাতে নিজের স্বরূপটিকে প্রতিবিম্বিত করিয়া দেখা যায়…রসিকলালের অশ্রু উদ্‌গত হইয়া গড়াইয়া পড়িল, একটু লজ্জিতভাবেই কোঁচার খুঁটে মুছিয়া লইলেন।

বিষয়ান্তর আনিয়া ফেলিবার জন্যই পণ্ডিতমশাই বলিলেন— “তা আসল কথাই তো জিজ্ঞাসা করা হল না,—চলেছ কোথায়? সঙ্গে বোঁচকা-কুঁচকি নিয়ে লোকও চলেছে দেখছি…”

রসিকলাল বলিলেন— “যেতে হবে একবার সিমুরে।”

“অর্থাৎ?”

“ইয়ে—গিরির মামারবাড়ি।”

“ঠিকই তো, মনে ছিল না। সিমুরেই তো তোমার বিবাহ হয়। ফিরছ কবে?…অনেকদিন পরে দেশে ফিরলাম, অনেক কথা বাকি। শিগগির আসবে। শাশুড়ীর মোহে যেন আটকে যেও না বাপু!”

ঘরোয়া রসিকতাটুকু করিয়া পণ্ডিতমশাই হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন— “তা করব বৈকি ঠাট্টা, আমার তো আর পুত্রসন্তান নেই, পুত্র বলো, শিষ্য বলো—সব তোমরাই।”

রসিকলাল লজ্জিতভাবে মাথাটা নিচু করিয়া ছিলেন, তুলিয়া বলিলেন— “আজ্ঞে আপনাকে পেয়ে আমার তো মন সরছে না যেতে আর, নেহাৎ মেয়েটাকে দেখতে চেয়েছেন সবাই সেখানে…”

পণ্ডিতমশাই বলিলেন— “এ কথা আমি বিশ্বাস করি রসিক, আমি এসে পড়েছি, আর যে তুমি কোথাও যেতে চাইবে না—এ কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি—”  

একটু ব্যস্ত হইয়া বলিলেন— “তাহলে কিন্তু তোমায় উঠতে হয়। অনেকটা পথ তো? আমিও খানিকটা দেরি করিয়ে দিলাম।…ওগো, নিয়ে এসো নাতনীকে, তুমি যে ঘরের-লোক করিয়ে দিলে! ওকে অনেক দূর যেতে হবে।”

স্ত্রী গিরিবালাকে লইয়া বাহিরে আসিলেন, হাতে একটি রেকাবিতে গুটিকয়েক মুকুন্দমোয়া আর এক গ্লাস জল। বলিলেন— “তা সত্যি, ঘরের-লোক করে রাখতেই ইচ্ছা করে। কী চমৎকারটি বাপু! কী গিন্নিবান্নির মতো কথার ছাঁদ এটুকু মেয়ের, আর কী নরম স্বভাব!”

রসিকলাল বলিলেন— “এই মাত্র খেয়ে বেরিয়েছি মা, তা ভিন্ন অনেকটা পথ যেতে হবে, সময় অল্প…’

গুরুপত্নী অনুযোগের স্বরে বলিলেন— “ওমা, তা কি হয়! হোক্ অনেক দূর। বুঝলাম শ্বশুরবাড়ির আদর-যত্ন, আমার গরীবের এই দুটি মোয়ার ময্যেদা কিন্তু ঢের বেশি বাবা।…কি গো, তুমি কথা কইছ না কেন?”

শেষের কথাগুলি পণ্ডিতমশাইকে উদ্দেশ করিয়া। পণ্ডিতমশাই প্রসন্ন গাম্ভীর্যে দাড়ির উপর হাতের একটা দীর্ঘ টান দিয়া বলিলেন— “তা কি ও-ই অস্বীকার করতে পারে? পারে কি কখনও? নাও হে রসিক, চলবে না ওজর।”

গিরিবালাকে আবার কাছে ডাকিয়া লইলেন। বুকের কাছটিতে দাঁড় করাইয়া কী যেন এক পবিত্র অনুভূতিতে পূর্ণ হইয়া গেছেন। মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন— “শিব পুজো করিস তো নিত্য?…না, ছুতোনাতা শোনা হবে না। ইস্, বিনি তপস্যাতেই ইনি কেল্লাফতে করবেন ভেবেছেন! স্বয়ং উমাই বড় রেহাই পেয়েছিলেন! শোন্ তবে—

স্বয়ংবিশীর্ণক্রমপর্ণবৃত্তিতা
পরা হি কাষ্ঠা তপসস্তয়া-পুনঃ।
তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং
বদন্ত্যপর্ণেতি চা তাং পুরাবিদঃ।।

মানে শুনবি?—পর্ণ কিনা পাতা শুকিয়ে নিজে গাছ থেকে পড়বে, তাই খেয়ে থাকতে পারলে তবে সেই হ’ল তপস্যা; উমা তাও খাওয়া ছেড়ে দিয়ে অপর্ণা নাম নিলেন,—তবে গিয়ে মহাদেবকে…”

স্ত্রী ভিতর থেকে রসিকের জন্য পান সাজাইয়া আনিলেন, হাতে আরও দুইটি মোয়া; হারাণকে ডাকিয়া দিয়া স্বামীকে বলিলেন— “করুক তপিস্যে, মানা করিনে, কিন্তু যার জন্যে তপিস্যে তাকেও ওদিকে তপিস্যে করতে হবে না? ইস্, ওমনি!”

উঠিবার সময় রসিকলাল একগোছা শালুক পাশটিতে রাখিয়া দিয়া বলিলেন— “আমার প্রণামি, পণ্ডিতমশাই।”

প্রণাম করিয়া কন্যার হাত ধরিয়া অগ্রসর হইলেন। খানিকটা যখন গেছেন, পণ্ডিতমশাই রাস্তায় নামিয়া আসিয়া একটু হাঁকিয়া বলিলেন— “বাপ, মা, আর গুরুতে পেছনে ডাকলে দোষ হয় না।— বলছিলাম—শীগগির আসবে ফিরে রসিক, কালিদাসের গ্রন্থগুলো আবার ঝেড়েঝুড়ে একবার দুজনে ভালো করে পড়তে হবে।”

রসিকলাল একটু হাসিয়া কহিলেন— “বললাম তো পণ্ডিতমশাই, আমার পা উঠছে না যেতে।”

কি যে একটি আনন্দস্রোত বহিতেছে মনে, রসিকলালের আর সবই যেন লঘু, অকিঞ্চিৎকর মনে হইতেছে। নিজেকে, গিরিবালাকে যেন নূতন করিয়া পাওয়া গেল আজ, যেন গুরুগৃহে নূতন এক জীবনের অভিষেকের পর তীর্থযাত্রা আরম্ভ হইল। শ্বশুরবাড়ির কথা লুপ্ত হইয়া গেছে, শুধু চলার আনন্দে, পাওয়ার আনন্দে, দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মনটা পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। তৃপ্তি-অতৃপ্তিতে মেশানো কী একটা অনুভূতি—স্কুলের সেই হারানো দিনগুলির টুকরা-টাকরা কোথা হইতে যেন ভাসিয়া আসিয়াছে…গিরি—গিরি—আমার গিরি—নামটা মনে মনে উচ্চারণ করিয়া সমস্ত মনটিতে একটা অপূর্ব মধুর রসে যেন মাখাইয়া লইতেছেন। কবির মনই, কিন্তু আজ হঠাৎ আকাশ, বাতাস চারিদিকে গাছগাছড়া, পূর্বাপর সব কিছু কি করিয়া শতগুণ সুন্দর হইয়া গেছে।…মনে একটিমাত্র ধ্বনি উঠিতেছে—’আমার গিরি—আমার গিরি—গিরিবালা-পার্বতী—উমা”।

গিরিবালা বলিল— “শীগগির চলো বাবা, রাত করে ফেলবে। এঁরা কারা বাবা?”

“ঐ দেখলি তো গিরি? উনিও তোকে শিবপুজো করতে বললেন।…কি জিগ্যেস করছিলি? ও! উনি পণ্ডিতমশাই, আমাদের স্কুলের হেডপণ্ডিত ছিলেন। অমন মানুষ হয় না।…শিবপুজো করবি গিরি; বুঝলি?”

গিরিবালা গুরু-শিষ্যের কাছে এই আধঘণ্টার মধ্যে এই লইয়া এত তাগাদা খাইয়াছে যে আর ধৈর্য রাখিতে পারিল না, মুখঝামটায় নোলকটা একটু জোরে দুলাইয়া বলিল— “খালি শিবপুজো, খালি শিবপূজা!…বলছি তো করব। খোকাকে নিয়ে আর ছিষ্টির পাট করে সময় হলে তো?”

ভাবের ঘোরে ধমকটা খাইয়া রসিকলাল একটু অপ্রতিভ হইয়া গেলেন। ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন— “নারে পাগলি, বুঝিস না। দুটো ধুতরো আর বিল্বিপত্র দিয়ে ও-বুড়োর কাছে কী-ইবা আদায় না করা যায়?”

বাগদিপাড়া আসিয়া গেল। দুলাল বাগদি রোদে পিঠ দিয়া পিছন ফিরিয়া বসিয়াছিল, জুতার শব্দে ফিরিয়া চাহিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, বলিল, “পেন্নাম হই বাবাঠাকুর; কদ্দূর যাওয়া হচ্ছেন?”

একটু দাঁড়াইয়া পড়িতে হইল। কাল এই দুলালই স্ত্রীকে প্রহার দিতেছিল, রসিকলাল দুইটা চাপড় দিয়া নিরস্ত করিবার সময় টের পাইয়াছিলেন যে এর অসুখ। কহিলেন— “যাচ্ছি সিমুর; আছিস কেমন দুলু? কাল যেন বললি জ্বর আছে?”

“জ্বরের ওপর ঠেঙানি দিলে কি জ্বর ছেড়ে যায়? ভূত নয় তো বাবাঠাকুর।”—কথাটা বলিয়াই আবার হাসিয়া বলিল –”না, আজ আছি ভালোই। থাকব কিনা, পালা জ্বর, দু’দিন বাদ দিয়ে দিয়ে এসে।”

“পালা জ্বর? তা গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসিস’খন। সিমুর থেকে ফিরি। কি খাচ্ছিস?”

“ডোবার জল আর হাওয়া। একলার পেট চলে না বাবাঠাকুর, তার ওপর বিধেতাপুরুষ বছর বছর একটি করে ভাগিদার পাঠাচ্ছে। আজ দিন-দশ থেকে আমার এই দশা। ঘোষালদের ওপরে দুটো ঘর হচ্ছে—মাগী গতর খাটিয়ে গণ্ডা দু’এক করে পাচ্ছেল—মুড়িটা আসটা কিনে কোন গতিকে চলে যাচ্ছেল। পরশু থেকে কোলের মেয়েটার কি হয়েছে; ও-ও আর বেরুতে পারে না।…কাল তুমি বিধেতাপুরুষ হয়ে চিঁড়ে কাঁটা দিয়েছিলে—তাও ক’দণ্ড বাড়িতে রইল?—নক্ষ্মীর মা নারাণীর কাছে কর্জ নিয়েছেল, সে খবর পেয়ে আদ্দেকটা নিয়ে গেল। আজ আর…তোমার তো সেই বড়নদী পেইরে?—তা যাও, শুনে কি ফুরুতে পারবে?”

একটি আট-নয় বছরের চিরকুট-পরা মেয়ে ওদিক কোথায় থেকে আসিয়া একটু তফাতে দাঁড়াইল, সঙ্গে সঙ্গে ছুটিয়া ভিতরে গিয়া বলিল— “মা, বামুন-ডাক্তার এয়েচে—খুকিকে দেখাবি বললি না ত্যাখন?”

একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়েসের বৌ ছেঁড়া কাঁথায় আর ন্যাকড়ায় জড়ানো বছরখানেকের একটি শিশুকে বুকে করিয়া ঘরের দরজায় দাঁড়াইল, একটু যেন কি ভাবিল, তাহার পর হঠাৎ ফোপাইয়া কাঁদিয়া উঠিয়া দ্রুতপদেই নামিয়া আসিল, এবং রসিকলাল ব্যাপারটা ঠাহর করিবার পূর্বেই শিশুটিকেই একেবারে তাঁহার পায়ের কাছে নামাইয়া চাপা গলায় কাঁদিয়া উঠিল— “এই রইল ছিচরণে গো বাবাঠাকুর; ও বাঁচবে নি—আজ তিন দিন মুখে রা নেই—কেন যে এসে সব দন্ধাতে!…”

হঠাৎ যেন একটা কি হইয়া গেল। গিরিবালা একবার শিশুটির, একবার তাহার মায়ের, একবার রসিকলালের মুখের পানে চাহিয়া ভ্যাবাচাকা খাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। রসিকলালের অবস্থা ততোধিক খারাপ। একবার কি বলিবার চেষ্টা করিয়া নির্বাক হইয়া বিপর্যস্তভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। এমন সময় দুলাল হঠাৎ উঠিয়া মারমুখো হইয়া বধূর পানে আগাইয়া আসিল। শিশুটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল— “তোল্ শ্রীগির; তোল, নৈলে দোব তোর মেয়ের ওপর একটা লাথি বসিয়ে, একেবারে মরা মেয়ে তুলতে হবে।…পাড়া দিয়ে যাত্রা করে কারুর ভালো-মন্দ জায়গায় যাবার জো নেই, অমুঙ্গলের দল পথ এগলে দাঁড়াবে। শুনবি নি কথা হারামজাদি? তুলবি নি? …

ঘুষি তুলিয়া অগ্রসর হইতেই রসিকলালের যেন সম্বিৎ ফিরিয়া আসিল। চিৎকার করিয়া উঠিলেন— “থাম বলছি দুলো, নইলে কাল আর তোর কী হয়েছে?—আজ আস্ত রাখব না।”

দুলুর স্ত্রীকে বলিলেন— “তোল্ মেয়েটাকে।”

তুলিলে, একবার একটু কুণ্ঠার সহিত কন্যার পানে চাহিয়া শিশুটিকে ভালো করিয়া পরীক্ষা করিলেন, হোমিওপ্যাথি প্রথায় প্রসূতিকে একরাশ প্রশ্ন করিলেন— “একটু কাগজ আর দোয়াতকলম চাই তো?”

পাইবার কোনও আশা নাই জানিয়া নিজের পকেটগুলায় একবার হাত দিলেন, একটা ছোট পেন্সিল পাওয়া গেল। দুলালের মেয়েটি একটু তৎপর; দরজার কাছে তাহার আরও তিনটি ছেলেমেয়ে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাদের সরাইয়া ভিতর থেকে বোধ হয় সাগু কি ঐরকম একটা কিছুর মোড়ক খুলিয়া খানিকটা কাগজ সংগ্রহ করিল, হাতের তেলোয় তাহার কুঞ্চন যথাসাধ্য মিলাইয়া দিয়া রসিকলালের হাতে তুলিয়া দিল। রসিকলাল একটি ঔষধের নাম লিখিয়া দিয়া দুলালের পরিবারকে বলিলেন— “আমার বাড়ি থেকে ওষুধ নিয়ে আসবি…শোন, আর কারুর হাতে দিনি, বড়বৌয়ের হাতে দিবি। তুই নিজে যাস্। চল গিরি, গাড়োয়ানটা হা-পিত্তেশ করে দাঁড়িয়ে আছে।”

বেশ খানিকটা দূরে একটা অশ্বত্থ গাছের শানবাঁধান চাতালে হারাণ পেতে নামাইয়া বসিয়াছিল। অনেকগুলি ছেলেমেয়ে ঘিরিয়া বসিয়াছে, সে হাতমুখ নাড়িয়া কি সব মন্তব্য করিতেছে। রসিকলাল বলিলেন— “তুই খুব বসে বসে মাতব্বরি কর হারাণে, চার কোশ পথ ভেঙে যেতে হবে সেটা হুঁশ আছে?”

দুই পা অগ্রসর হইয়া ফিরিয়া দুলালের স্ত্রীকে বলিলেন— “একটু দুধ দিতে হবে মেয়েটাকে।”

দুলালের স্ত্রী একটু স্থির হইয়া রহিল।

“শুনলি? একটু দুধ চাই, ওষুধ তো আর খোরাকের কাজ করবে না? দুধ একটু দিতে হবে!”

দুলালের স্ত্রী এবার মাথা নাড়িল।

মেয়েটা দাঁড়াইয়া ছিল। রসিকলাল বলিলেন— “ডাক্ তো দোলুকে, সে হারামজাদা বুঝি ঘরে গিয়ে সেঁদুল?”

দুলাল আসিলে বলিলেন— “বউকে সামনে এগিয়ে দিয়ে তুই যে ঘরে গিয়ে বসলি? খালি বুঝি ঠেঙাবার গোঁসাই? ওকে তো দুধ এনে দিতে বললেও মাথা নাড়ছে, যদি বলি বেদানা আঙুর এনে দিতে হবে, তাতেও মাথা নাড়বে। পাবে কোথায় একবার ভেবে দেখেছিস?”

দুলাল বিরক্তভাবেই বলিল— “আমার কিছু ভেবে দেখবার খ্যামতা নেই বাবাঠাকুর, ওরা সব বাঁচবার জন্য এসে নি, মিচে বামুনের যাত্রা নষ্ট করে শাপমন্যি কুড়ুনো…দুধ এনে খাওয়াবে!”

রসিকলাল একটু দ্বিধাভরে কি ভাবিলেন, তাহার পর পকেট থেকে ব্যাগ বাহির করিয়া একটা আধুলি লইয়া দুলালের গায়ে ফেলিয়া দিলেন।—বলিলেন “অনেক ফি জমছে আমার, সঙ্গে এটাও দিয়ে দিবি, ফাঁকি দিসনি যেন, তোরা সব পারিস।”

যাইতে যাইতে গিরিবালা বলিল- -”বাবা যেন কী!”

যাত্রাপথে বাগ্‌দি ছোঁওয়ার জন্য আর আট-আনিটার জন্য রসিকলাল শঙ্কিতই ছিলেন মেয়ের কাছে, বলিলেন— “ওকে ছুঁলুম?—সে আমি ঠিক করে রেখেছি,—রাস্তায় নবীনের বাড়ি পড়বে, একটু গঙ্গাজল চেয়ে নিয়ে মাথায়…”

“সে নিও, সে কথা হচ্ছে না। ও গরীব, কোথা থেকে ফিরুবে আটআনিটা?—আবার ফি-ও দেবে!”

রসিকলাল হঠাৎ রাগিয়া উঠিলেন, যেন দুলাল সামনেই আছে এই ভাবেই বলিলেন— “দিতে হবে ওকে, ফি আমি এক পয়সাও ছাড়ব না, যেমন করে পারি আদায় করব। ফি হল ডাক্তারের লক্ষ্মী, বাঃ! গরীব তো নিজের ঘরেই গরীব আছে…বাঃ!”

চুপচাপ চলিয়াছেন দুইজনে। আর একটু গিয়া গিরিবালা বলিল— “বাবা!”

এবার স্বরটা একটু দ্রব। রসিকলাল প্রশ্ন করিলেন— “কি গা, কি বলবি?”

“কিছু নেই ওদের খাবার, আহা! বলছিলাম—মুড়কিগুলো দিয়ে আসুক না গিয়ে হারাণে। বাড়িতে না বললেই হবে।”

মেয়ের নিকট হইতে ভয় করিবার কিছু নাই তাহা হইলে; রসিকলালের বুক হইতে যেন একটা বোঝা নামিয়া গেল। তবু কতকটা অভিভাবকের কণ্ঠেই বলিলেন— “হ্যাঁ, ওদের খাঁই মেটানো চাড্ডিখানি কথা!…তবে তুই যখন বলছিস, দিয়ে আসুক না হয়। ভারী তো নতুন গুড়ের মুড়কি!..মস্তবড় বয়ে নিয়ে যাওয়ার জিনিস কুটুমবাড়ি!”

পরিপূর্ণ আনন্দে নির্বাক হইয়া চলিয়াছেন।…কৈলাস-দুহিতা উমাপার্বতী যে!—কেমন করিয়া সহ্য করিবে সে এই অসহ দুঃখ? পারে কখন?

আরও খানিকটা গিয়া গিরিবালা ডাকিল— “বাবা!”

স্বর আরও করুণ, তবে যেন একটু দ্বিধাজড়িত। রসিকলাল স্নিগ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন— “কি গো গিরি?”

“নাঃ, এমনি ডাকছিলাম।”

আর একটু পরে,—

“বাবা!—আচ্ছা বাবা, মায়ের বেশি কষ্ট না বাপের?”

অদ্ভুত প্রশ্ন মেয়ের। রসিকলাল হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন— “শোন গিরির কথা! তুই-ই বল না—তোর গর্ভধারিণী বেশি ভালোবাসে তোকে, না তোর বাবা? যে বেশি ভালোবাসে তারই তো লাগে বেশি।”

ওপারে গিয়া দেখা গেল গাড়ি নাই। গিরিশ হাজরার গাড়ি ঠিক হইয়াছিল, এত দেরি দেখিয়া সে ভাবিল—এরা আজ আসিল না। খুব চটিলে হারাণের আড় থাকে না, বলিল— “এ আমার জানাই ছেল; সেই তিন পহর রাত্তিরে সেখানে উঠতে গিয়ে চোর-তাড়ানি না খেতে হয় সবাইকে তো…ত্যাখন দুপুবাগ্দি ঠ্যাকাবে’খন—তার ঐ গোরা-পল্টন তুলে নিয়ে এসে!”

কার্তিকের দিন—বাড়ি পৌঁছাইতেই সন্ধ্যা হইয়া গেল। গিরিবালার মামী আঁচলের আড়াল দিয়া তুলসী-মঞ্চে প্রদীপ দিতে যাইতেছিলেন, একেবারে উঠানের মধ্যে নূতন লোক দেখিয়া একটু থমকিয়া দাঁড়াইলেন, সঙ্গে সঙ্গেই চিনিতে পারিয়া বলিয়া উঠিলেন— “ওমা, কী ভাগ্যি! ঠাকুরজামাই যে! সঙ্গে কে—গিরি না?…এসো ভাই, একটু রোস, তুলসীতলায় পিদ্দিমটা দিয়ে দিই। …ও মেজঠাকুরঝি! দেখ’সে কে এসেছে।”

প্রদীপটি মঞ্চে রাখিয়া তাড়াতাড়ি একটা প্রণাম করিয়া সামনে আসিলেন। গিরিবালাকে কোলে তুলিয়া লইয়া বক্ষে চাপিয়া ধরিলেন, তাহার মুখটি একটু সরাইয়া ধরিয়া বলিলেন— “ওমা, কী চমৎকারটি হয়েছে গো গিরিটা! কি লো, মামীকে পারিস্ চিনতে?”

“কে লা বৌ?”—বলিয়া রসিকলালের মেজ শ্যালী কাত্যায়নী ঘরের দাওয়ায় আসিয়া দাঁড়াইলেন। আবছা আলোয় রসিকলালকে চিনিয়া বলিলেন— “বাঁড়ুজ্জে!—তাই তো বলি, বৌ কাকে পেয়ে এমন হঠাৎ উৎলে উঠল!…তা উঠে এসো, উঠোনে দাঁড়িয়ে কেন?”

বলিতে বলিতেই নিজেও নামিয়া আসিয়াছেন। রসিক প্রণাম করিলেন, মেয়েকেও কহিলেন- “নেমে মেজমাসিমাকে আর মামীমাকে প্রণাম কর। মামীর কোল দখল করে রইল বোকা মেয়ে!”

গিরিবালা অস্বস্তি বোধ করিতেছিলই, লজ্জিতভাবে নামিবার জন্য অঙ্গ মোড়া দিল। মামী তাহাকে চুম্বন করিয়া ননদকে বলিল— “আমি যার জন্যে উৎলে উঠেছি তাকে এই দেখো। কী চমৎকার হয়ে উঠেছে দিদি, গিরি এই ক’টা দিনে!”

“ও তো হবেই সুন্দর, মায়ের চোখ মুখ, বাপের রং পেয়েছে, সুন্দর তো হবেই। আর এসেছিল সে কি ‘কটা’ দিন হোল?— নেত্যর সাধের সময়; সে প্রায় বছর ঘুরতে চলল। কতদিন বলেছি বাঁড়ুজ্জেকে নিয়ে এসো ওদের একবার; তা অ্যাদ্দিনে বার হোল। দেখতে সাধ হয় না? তা নিয়েও এলেন তো একটিকে বাদ দিয়ে এলেন।”

কোট আলোয়ান নামাইতে নামাইতে রসিকলাল বলিলেন— “তোমারই জিনিস, দিদি, নিয়ে আসব তাতে আর হয়েছে কি? সে কথা নয়—সেবার বাড়ি ফিরে গিয়ে গিরি পা ফুলে, জ্বর হয়ে তিন দিন বিছানায় পড়ে রইল। হরুটাকে ঐজন্যেই নিয়ে আসতে সাহস করলাম না।…বাপের রং পেয়েছে তো কি বাহাদুরি হয়েছে? চলাটা পাক দিকিন,—ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত হেঁটে পা ফোলানো কাকে বলে জানিনে…”

শ্যালিকা হাসিয়া বলিলেন— “তা কি হয়?—তুমি যদি এখন লঙ্কা ডিঙোও, ওদের তাই পারতে হবে?”

তিনজনেই একটু হাসিয়া উঠিলেন।

গিরিবালাকে কাছে টানিয়া লইয়া, দুই হাতের তেলোয় তাহার মুখটা তুলিয়া ধরিয়া কাত্যায়নী প্রশ্ন করিলেন— “মা, জেঠাইমা, জেঠামশাই, সাতু, হরু, পুতী, খোকা—সবাই কেমন আছে লো? বাপ কাল গুমোর করে গেল—বড় গিন্নী হয়েছিস—কৈ, চুপ করে রইলি যে?—বল সব খুঁটিয়ে, শুনি—তবে তো গিন্নী।…জেঠাইমা কি পাঠালে আমাদের জন্যে?”

গিরিবালা জড়িমার মধ্যে বলিয়া ফেলিল— “মুড়কি…”

তাহার পর মনে পড়িয়া যাওয়ায় একেবারে চুপ করিয়া গেল।

রসিকলালের জুতার ফিতায় একটা গ্রন্থি পড়িয়াছিল, অনেকটা ঠিক করিয়া আনিয়াছিলেন, হঠাৎ আরও জটিল হইয়া গেল।

বাহিরের দাওয়ায় একটা খুটখাট শব্দ হইতেছিল—হারাণের তবল—সেটাও হঠাৎ থামিয়া গেল।

কাত্যায়নী বলিলেন— “শুধু মুড়কি? কাল বাঁড়ুজ্জেকে যে চালতার কথা বলে দিয়েছিলাম।…তা কৈ, মুড়কিই দেখি।…বৌ নিশ্চয় বলছে—মেজদিদির নোলা দেখো!—তা, বরদার ঘরের জিনিসে আমার একটু লোভ আছে বাপু,—ওর মিষ্টি হাতটি যেন মাখানো থাকে। ..কৈরে?—তোমার সেই বাজনদার নফরটি বুঝি?”

হারাণ পেতেটা লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। রসিকলালের গ্রন্থি আরও উৎকট হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

“ওমা, করেছে কি কাণ্ড!—লাউ—আর এই যে আমার চালতা,—বাঁড়ুজ্জে কি এত নেমকহারামি করতে পারে?…করমচা—পাঁপর—কতরকম বড়ি!…নতুন পোয়াতি—এই সব করেছে রোদে পিঠ পুড়িয়ে?—মুকুন্দমোয়া—তা ভালো করেছে—অখিল বড্ড ভালোবাসে বেলেতেজপুরের মুকুন্দমোয়া।”

ঝুড়িটা সরাইয়া দিয়া কি বলতে যাইতেছিলেন, হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল— “বলি, হ্যাঁ—মুড়কি কোথায়? গিরি মুড়কির কথা বললি যেন—বাবা পথে খেতে খেতে এসেছে নাকি!”

রসিকলালের মুখের পানে চাহিলেন, দেখা গেল না, দৃষ্টি তখন গ্রন্থি-নিবদ্ধ। হারাণ নাপিতের সন্তান, ধূর্ত, পেতেটা রাখিয়াই বাহিরে চলিয়া গিয়াছিল। কাত্যায়নী হাসিয়া বলিলেন— “বলি, ও বাঁড়ুজ্জে, মেয়ে যে বললে…”

গিরিবালা হঠাৎ ঘুরিয়া দুইবার ফোঁপাইয়া কাত্যায়নীর কোলেই মুখ ঢাকিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। কাত্যায়নী আর তাহার ভাজ, দু’জনেই অপ্রতিভ হইয়া কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়াইয়া রহিলেন, বিশেষ করিয়া ক্যাতায়নী,—তিনি আত্মীয়তা আর আনন্দের আতিশয্যে কুণ্ঠার গণ্ডিটা পর্যন্ত ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন—বোনের ওখানে সওগাত সম্বন্ধে নারীসুলভ কৌতূহলটিকে ভগ্নীপতির সামনেই মুক্তি দিয়া।…একবার ভাজের মুখের পানে চাহিলেন—নিজের অপ্রতিভ মুখেরই যেন প্রতিবিম্ব, তাহার পর উবু হইয়া বসিয়া পড়িয়া গিরিবালাকে বুকে চাপিয়া ঠাণ্ডা করিবার চেষ্টায় লাগিয়া গেলেন—

“কি হোল রে? কাঁদিস কেন গিরি? চাকরটা ফেলেটেলে দিয়েছে?…বরুই দিতে ভুলে গেছে শেষ পর্যন্ত?—তাই হবে, এর জন্যে কান্না কেন? দেখো তো! তোর বাপ কি সত্যিই খেতে খেতে আসতে পারে?…ঠাট্টার সুবাদ, ঠাট্টা করব না? চুপ কর, চুপ কর গিরি, লক্ষ্মীটি…হ্যাঁ বাঁড়ুজ্জে, তুমিও যে কথা কও না!…দেখো তো!”

নিতান্ত একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার দাঁড়াইয়াছে। গিরিবালার কান্না কমিবে কি, আরও বাড়িয়াই যাইতেছে। ওদিকে রাজ্যের সমস্যা আসিয়া রসিকলালের ফিতায় জড়ো হইয়াছে। কাত্যায়নী বিপর্যস্ত হইয়া পড়িয়া কী যে করিবেন ভাবিয়া পাইতেছেন না। হঠাৎ অতটা উৎসাহের মাথায় ধাক্কাটা খাইয়া তাঁহারও কণ্ঠে যেন কি একটা ঠেলিয়া উঠিতেছে। অসহায়ভাবে একবার ভাজের পানে চাহিয়া বলিলেন— “এমন কিছু বলে ফেলেছি, বৌ?”

তিনি ভীতভাবে মগ্নকণ্ঠে বলিলেন— “কৈ, এমন তো কিছু…”

কাত্যায়নীর আর সহ্য হইতেছিল না অবস্থাটা,— “ভাই, যদি কিছু বলে থাকি ভুলে”—বলিয়া অভিমানভরে রসিকলালের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় হারাণের দুর্বুদ্ধিই হোক, কি সুবুদ্ধিই হোক—আসিয়া দরজার কাছে দাঁড়াইয়া আসল কথাটা ফাঁস করিয়া দিল—

“ঐ লাউ-চালতা কটা আর বড়িগুলা যে ফাঁড়া কাটিয়ে পৌঁছুতে পেরেছে ছিচরণে এইটেই পোড়াকপালের খুনসিব বলে ধরে নেবেন দিদিঠাকরুণ। পিরথিমিতে উপোস করবার লোকের অভাব রাখেন নি বিধেতাপুরুষ। তাদের কাটিয়ে এমনই গেরস্তমানুষের পথ চলা দায়, তার উপর যদি কেউ দাতাকন্ন হয়ে বাড়ি বয়ে তাদের খোরাক পৌঁছুবার দায় উঠোয় তো তুচ্ছ মুড়কি কেন, কুবেরের ভাঁড়ারও …”

গিরিবালা হঠাৎ চুপ করিয়া ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া গেছে। রসিকলাল অসহায়ভাবে শুনিয়া গেলেন খানিকটা, তাহার পর একটা নিচুভাবেই ঘুরাইয়া উগ্র দৃষ্টিতে হারাণের পানে চাহিলেন।

হারাণ আড়ালে সরিয়া গেল, সেইখান থেকেই বলিল— “আমার কি?—ঢাকি সুদ্দু বিসজ্জন দিতে বললে আরও ভালোই হোত, অমন লতুন গুড়ের মুড়কি বিলিয়ে কুটুম বাড়িতে শুধু লাউ- চালতা বইতে হোত না…বলতুম নি,–কি দরকার পড়েছে আমার?—খাই দাই গাজন গাই…তবে কইতে হোল কথা…নেহাত নাকি মুড়কির আপশোসে দিদিঠাকরুণের কোমল অন্তরীক্ষে…

কাত্যায়নী খিল-খিল করিয়া হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন— “তুই থাম, বুঝিছি। মুড়কির জন্যে আমার ‘কোমল অন্তরীক্ষে’ ব্যথা লাগে নি;—কি গেরোতেই পড়া গেল দেখো দিকিন! …বাঁড়ুজ্জের সেই খয়রা?—তা বেশ করেছে। গরীব মানুষকে দিয়েছে—এ আর কি অন্যায়টা করেছে? গিরি তুই এইজন্যে কেঁদে সারা হচ্ছিলি? আমি বলি, না জানি কি এমন বেফাস বলে ফেললাম—কুটুম বাড়িতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে…ভয়ে তো আমার পেটে হাত পা সেঁদিয়ে গিয়েছিল, – পিসিমা কি বলবেন, মা এসেই বা কি বলবেন?”

ভাজ বলিলেন— “আর ঠাকুরজামাইও যে ঘাড় হেঁট করে রইলেন, ভয় হল কী অপরাধ করে ফেলেছি আমরা…নাও, জল গামছা দি, হাত পা ধুয়ে নাও।—চল গিরি, রাঙাদিদিমার কাছে,- এখনও খবর দেওয়া হল না পিসিমাকে।”

একটা বাধা পাইয়া আদর যেন উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল, একটুর মধ্যে গিরিবালা সবার সঙ্গে বেশ মিশিয়া গেল, আদরের উত্তাপে তাহার মনের দলগুলো একটি একটি করিয়া যেন ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। আদর বাড়িতেও আছে, বাবার ও জেঠামশায়ের তো নয়নের পুতুলি বলিলেই চলে; মা জেঠাইমার কাছে মাঝে মাঝে ধমকটা আসটা খাইতে হয়, তবুও আতপ্ত বালির একটু নিচেই যে স্নিগ্ধ জলধারা বহিতেছে—এ সন্ধান ভালো রকমেই পাওয়া যায়। তবে এখনকার ভালোবাসাটা একটু অন্য ধরনের। ওখানে সংসার চলে অন্য কি সবকে কেন্দ্র করিয়া, কোন সবকিছুই যেন তাহাকে ঘিরিয়াই মুঞ্জরিত হইয়া উঠিতেছে—সবার সাধ, চিন্তা কল্পনা।—রাঙাদিদিমার সঙ্গে একচোট জলযোগ হইল। আহারের পর খানিকটা ক্ষীর সরাইয়া রাখিলেন— “এইটুকু তুলে রাখো বউমা, কাল সকালে গিরি খাবে।”— “তুমি খাও না পিসিমা, ওর জন্যে তো খাবার থাকবেই তোলা।”- “সে কি হয় বাছা? তোরা বুঝিস নে!—আয় লো গিরি, গল্প শুনবি তো আয়।—একটু হাত চালিয়ে নিস তোরা গো, কচি মেয়ে এতটা পথ এসেছে, হাক্লান্ত হয়ে আছে।”

ভাইঝি বলে— “গিরি শোবে কিন্তু আমার কাছে পিসিমা, এসেই আমার কোলে মুখ দিয়ে নাহক অতখানি কাঁদলে গা! কি পোড়াকপাল বলো দিকিন আমার! অন্য দিন যা হয় হবে, আজ আমার কাছে শুক্ বাপু, বুকটা যেন ভার হয়ে আছে—এখন তবু অন্যমনস্ক আছি, বিছানায় উঠলেই ঐ কথা মনে হবে, ঘুম হবে না। আমার কাছেই শুবি গিরি বুঝলি?”

“হ্যাঁ, শোব। রাঙাদিদিমার কাছে গল্পটা শুনে নি…”

মাসি ঈষৎ হাসিয়া বলেন— “আমার কাছেও গল্প আছে, পিসিমা একচেটে করে নেন নি।” পিসিমা লেপের মধ্যে প্রবেশ করিতে করিতে হাসিয়া বলেন— “গিরি বল– সে সব তো বাসি গল্প—যখন আমার মতনটিই ছিলে, রাঙাদিদিমার কাছেই শুনেছিলে।”

গিরিকে লইয়া যেন কাড়াকাড়ি পড়িয়া গেছে।

রাঁধিতে রাঁধিতে মামী উঠিয়া আসে। “সাধন বেশ মাছটি ধরেছে, ঝোল ভালোবাসিস না ডালনা রে গিরি? তোর বাপের তো মুখে স্বাদ নেই, যা ধরে দোব তাতেই খুশী।”

আশ্চর্য বোধ হইতেছে গিরিবালার—এত বড় প্রশ্ন তাহাকেও জিজ্ঞাসা করে মানুষে! দিদিমার গল্পের আঠার দাসীর সেবায় লালিত রাজকন্যার চেয়ে নিজেকে যেন এতটুকুও কম বলিয়া বোধ হয় না।

মামীর নিশ্চয় প্রশ্নের চেয়ে একবার দেখিয়া যাইবার, কথা কহিবার আকাঙ্ক্ষাটাই বেশি প্রবল বলেন— “দুই করব’খন, দুটো উনুনেই আঁচ দিয়েছি; তুই কিন্তু ঘুমুসনি মা গিরি, ঘুমের ঘোরে স্বাদ পাবিনি, মাঝখান থেকে আমার মনটায় একটা কষ্ট থেকে যাবে। সমস্ত রাত ছটফট করব।”

অখিলমামা রাত করিয়া ফিরিলেন। ভগিনীপতিকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া গেলেন, বলিলেন— “কৈ, কাল তো বললে না আজ আসবে, তা হলে কি এত রাত করি? গিরিকে এনেছ?… তোমার সুবুদ্ধি সম্বন্ধে নিরাশ হয়ে পড়েছিলাম, আবার আশা হ’ল। ঘুমিয়ে পড়ে নি তো? দাঁড়াও বেটিকে ধরে নিয়ে আসি। বহুদিন দেখি নি হে!”

বাড়ির চেয়ে আরও তফাৎ এইখানে যে আদরের পাশে পাশে আবার প্রশংসার স্রোত চলিয়াছে— “তুমি ভালো দেখতে পাচ্ছ না পিসিমা, সকালে দেখো কী চমৎকারটি হয়েছে গিরি।”

“আর, কী বাপ-অন্ত-প্রাণ মেয়ের—না মেঝঠাকুরঝি?—তখন বাপ অপরুদ্ধ হয়ে গেছে দেখে ভ্যাক করে কেঁদে ফেলল গো!— সে কি থামতে চায় পিসিমা?”

পিসি বলেন— “ভালোই, বলে মেয়ের বাপের দিকে টান হ’লে ছেলেপুলের ওপর বাচ্ছিল্যি হয় বেশি। মেয়েমানুষের পক্ষে বাপ আর ছেলে দুই একই জিনিস কিনা—শুধু বয়সের যা তফাৎ।” হাজার অভিজ্ঞ হইলেও এঁরা জানেন না নারীত্বের এই মূল তন্ত্রী গিরিবালার অন্তরে কত সুকুমার।—একটু স্পর্শেই রনরনিয়া উঠে। এত সুক্ষ্ম যে, হয়তো বাইরের বায়ুতে বীচিভঙ্গ করে না, তবে তাহার সমস্ত মনটা কান্নায় যেন ভরাট করিয়া তুলে।— লেপের মধ্যে মাথা গুঁজিয়া শুনিতেছিল, কেহ টের পায় নাই, আহারের জন্য যখন তাহাকে ডাকিয়া আনা গেল, মুখটি বিষণ্ণ। মামী প্রশ্ন করিল— “কি গো গিরি, মুখখানি ভার-ভার মনে হচ্ছে যেন?”

গিরির ঠোঁট দুইটি একবার কাঁপিয়া উঠিল।

মামী প্রশ্ন করিল— “বাড়ির জন্যে মন কেমন করছে নাকি?”

ঠোঁট দুইটি আবার কাঁপিয়া উঠিল, গিরি সামলাইয়া লইয়া মাথা নাড়িয়া জানাইল না, মন কেমন করে নাই।

বোনঝির মাথার উপর দিয়া কাত্যায়নী ভাজকে ইশারায় আর এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করিতে মানা করিয়া দিলেন। পিঁড়িটা পাতিয়া দিয়া বলিলেন— “বোস, দে ভাত বৌ,…বয়ে গেছে মন কেমন করতে ওর। কেন, আমরা কি পর?…মা জেঠাইয়ের তো ভারী আদরের ঘাট, তা আবার মন কেমন করতে হবে! গেছি আর কি। মেয়েকে পাঠিয়েছে, না চুল বাঁধবার ছিরি, না কাপড় পরাবার ছিরি!… ও আর যাবেই না সেখানে!..এইখানেই থাকব আমাদের কাছে, কি বলিস রে গিরি?”

গিরিবালা ঝোঁকটা সামলাইয়া লইয়াছে, বেশ কাত করিয়া ঘাড় নাড়িল,—মাসিমার এতগুলো কথার সঙ্গে যাহাতে মানায়। নাড়া পাইয়া দুই বিন্দু অশ্রু গাঁতির উপর ঝরিয়া পড়িল।

নূতন নূতন গল্প সংযোগে মাসিমা নিজের হাতে করিয়া খাওয়াইয়া দিলেন। কিন্তু যে মেঘখণ্ডটুকু জমিয়াছে তাহা যেন ঘুরিয়া আসিতেছে বলিয়া মনে হইতে লাগিল। ননদ-ভাজে কয়েকবার পরস্পরের মুখের পানে চাহিয়া মুখ টিপিয়া হাসিলেন—অর্থাৎ আর বুঝি রাখা যায় না। কোনমতে সামলাইয়া লইয়া মাসি বলিলেন— “চল্, তোকে আগে ঘুম পাড়িয়ে আসি গিরি। তারপর ওঁদের হবে’খন।…আমি এলে অখিল আর বাঁড়ুজ্জেকে খেতে দিবি বৌ; গল্পসল্প করব।”

লেপ ঢাকা দিয়া শুইয়া কাত্যায়নী যে জিনিসটাকে এতক্ষণ এড়াইয়া চলিতেছিলেন নিতান্ত অজান্তে একেবারে তাহারই কাছে আসিয়া পড়িলেন।— নিঃসন্তান বিধবা মানুষ অন্তরের সব দরদ ঢালিয়া বোনঝিকে নাড়া-চাড়া করিতে গিয়া মনের কোথায় কি উথলিয়া উঠিতেছিল কে জানে? লেপের মধ্যে ভালো করিয়া শুইয়া, গিরিবালার চারিদিকে ভালো করিয়া লেপ টানিয়া দিতে দিতে হঠাৎ বুকে চাপিয়া বলিয়া উঠিলেন— “হ্যালো গিরি, আমি মরে যদি তোর পেটে জন্মাই তো এমনি করে আমায় আদরযত্ন করবি তো? পিসিমার কাছ থেকে তোকে যেমন করে কেড়ে নিয়ে এলাম, এমনি করে সবার কাছ থেকে কেড়ে কুড়ে—নিজের বুকে চেপে রাখবি? নিজের হাতে খাওয়াবি গল্প বলতে বলতে? যখন খুব ছোট—কোলেরটি, তখন টিপ কাজল পরিয়ে দোলনায় শুইয়ে দোল দিবি? ধুলো লাগলে ঝেড়ে দিবি? রোদে তেতে যখন ঘেমে এসে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ব, আঁচলে ঘাম মুছিয়ে…”

টানিয়া টানিয়া, বিনাইয়া বিনাইয়া বলিয়া যাইতেছিলেন, হঠাৎ লেপটা যেন কাঁপিয়া উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গেই বোনজির কান্না যেন কুল ছাপাইয়া উথলাইয়া পড়িল। কাত্যায়নী মুখ থেকে লেপটা সরাইয়া সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিয়া উঠিলেন— “ও কি রে, তুই কাঁদছিস গিরি! কান্না কিসের? সত্যি আমি মরে তোর মেয়ে হচ্ছি নাকি? দেখো কাণ্ড বোকা মেয়ের। আর যদি মরিই তো তোর মেয়ে হতে সে-ই যার নাম বুড়ো হয়ে মরব। কি ক্ষতি? ভালোই তো। আচ্ছা বেশ, তাও মরব না, বরাবর আকন্দর ডাল মুড়ি দিয়ে বেঁচে থাকব; হ’ল তো? নে, চুপ কর… দেখো জ্বালা, তবু চুপ করে না!… না!…”

কোথা দিয়ে হঠাৎ কি হইল, কাত্যায়নী বোনঝিকে বুকে আরও নিবিড় ভাবে জড়াইয়া ধরিয়া নিজেও ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিলেন।

আর সান্ত্বনার কথা নাই। অসম মাতৃত্বের দুইটি ধারা নীরব অশ্রুর মধ্যে গলিয়া গলিয়া পড়িতে লাগিল।

একখানি হাত-ভাঙা মাটির পুতুল—ইট তাহার দোলনা—ইট তাহার শয্যা, আর সবার পুতুলশিশুরা জামায়-কাপড়ে জমজম করিতে থাকে—নন্তীর পুতুলের গায়ে পশমের জামা, মাথায় জরির টুপি, লোকে চাহিয়া লইয়া দেখে, প্রশংসা করে,—তাহাদের পাশে সেই অনাদৃত, লাঞ্ছিত, বিকলাঙ্গ শিশু—সবার অবহেলার দৃষ্টি বাঁচাইয়া মাকে বুকের কাছটিতে করিয়া বাহিয়া বেড়াইতে হয়।….মায়ের মনে পড়িল আজ সেও অবহেলার সহিত ফেলিয়া আসিয়াছে সেটিকে; হারু কি আর যত্ন করিয়া তুলিয়া রাখিবে? গিয়া দেখিবে হয়তো নাই—আবার গিয়া যখন শিউলিতলাটিতে খেলাঘর গুছাইবে—এই ভাঙা পুতুলটির স্থানটি হয়তো থাকিবে শূন্য…”

এই দূরত্ব হিমরাত্রির এই অন্ধকার—সব যেন এই বিচ্ছেদকে সত্য করিয়া তুলিতেছে…সঙ্গে আসিয়া পড়িতেছে মা, খোকা, হরু,—সবাই, বাবা পর্যন্ত।…ভুল, অনাদর, বিদ্রুপের মধ্যে দিয়া বাবা কেমন করিয়া যেন মাটিতে-গড়ানো, ভাঙা পুতুলটির পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে—ঐ রকমই অসহায়—কেন যে বাবা সব বিলাইয়া দেন এমন করিয়া।…মুখে পণ্ডিতমশাইয়ের ওখানে ছোট ছেলের মতো প্রাণখোলা হাসি, এখানে মুড়কির কথায় মাথা তুলতে না পারা, মায়ের বকুনির ভয়ে বাড়িতে গুটি-গুটি তাহার পাশে পাশে থাকিয়া প্রবেশ—সব মিলিয়া সত্যই বাবাও যেন একটা ছোট ছেলে—পাশটিতে না থাকিলে—এখন যেমন গিরিবালা নাই—মনটা যেন হাঁপাইয়া ওঠে…

এর পাশেই আর একটি ধারা—যে মা হইতে পারিল না, উৎস যাহার নিরুদ্ধই রহিয়া গেল, হঠাৎ কিসের আবেগে তাহার সেই নিরুদ্ধ উৎসের মুখ খুলিয়া যাওয়া। —কাত্যায়নী নিজের বুকের যে অমৃত দিতে পারিলেন না, পরের বুকে সেই অমৃতের স্বাদ পাইতে চান—দেওয়ার আর স্বাদ পাওয়ার কি বেশি তফাৎ?…বুকের ধনের রৌদ্র-তপ্ত রাঙা মুখ মুছাইয়া দেওয়ার সঙ্গে— “গিরি তুই আঁচলে আমার মুখ মুছিয়ে দিস”–এই সে সাধ, এর কতটুকুই বা প্রভেদ? এক দিক দিয়া বিস্তর হইলেও এক দিক দিয়া যে নিতান্তই অগণ্য—প্রভেদ নাই বলিলেই চলে। এ যে আরশিতে নিজের প্রতিবিম্ব ফেলা,—কতটুকু থাকে তফাৎ?

.

ঘুম পাড়াইয়া আসিলে ভাজ বলিলেন— “ওমা, তুমিও বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছিলে ঠাকুরঝি? চোখ দু’টো ফুলো-ফুলো দেখছি যে?”

“হ্যাঁ, একটু চোখ বুজে এসেছিল, কাল সমস্ত রাত যাত্রা দেখেছি”…

“গলার আওয়াজটাও ভারী-ভারী ঠেকছে। রাত্রে ঠাণ্ডা লেগে যায় নি তো?”

সকালে বিছানা থেকে নামিয়াই গিরিবালা যেন নূতন জগতে প্রবেশ করিল। কাল সেই আসার কথা ওঠা থেকে নিদ্রাগমের পূর্ব পর্যন্ত মনটা খুব নাড়া খাইয়াছিল, যাত্রার ঔৎসুক্য, পথের সেই বিচিত্র ঘটনার বিস্ময়, মামার বাড়ির আদর, তাহার পাশেই অশ্রু—সব মিলিয়া তাহার সত্তাটিকে যেন নূতন ভাবে একবার জাগাইয়া দিল।…প্রভাতটি বড় চমৎকার লাগিল। বাবার পূর্ণ মনের সচেতন কবিত্ব কোথায় পাইবে?—তবে নূতন লাগিল এবং মিষ্ট লাগিল। নিজেকে যেন বেশ একটু বড় বলিয়া বোধ হইল। রাত্রে সেই পুতুলের জন্য কান্নার কথা ভাবিয়া একটু যেন নিজের কাছেই লজ্জা-লজ্জা বোধ হইতে লাগিল—কতকটা যেন নিজেকে চেনার মতো। অবশ্য আবছায়া ভাবে চেনা, তবে অনুভব করা যে কাল-পরশুকার গিরিবালাটি যেন একটু ছোট—তাহার কথা ভাবিতে আজকের গিরিবালার মনে লজ্জার সঙ্গে একটি করুণার ভাব আসিয়া পড়ে।

আরও নাড়া খাইল মনটা। মাসি সকালে হাল্কা ভাবে সাজাইয়া-গুছাইয়া পাড়ায় লইয়া গেল, এ-বাড়ি, সে-বাড়ি—কোন একটা ছুতা করিয়া—যেন বোনঝি দেখাইতে নয়, পাশে যে একটা নূতন মেয়ে আছে সেদিকে যেন চৈতন্যই নাই।

“কৈ গো খান্ত—রাঙাখুড়ি কোথায়? চানে গেছেন নাকি?”

“এত সকালে চানে গিয়ে মরব? এমনই শীতে হি-হিয়ে দিয়েছে। রাঙাখুড়ি গেলে বাঁচিস, না?—বুড়ি হয়ে গেছি তো? সঙ্গে ওটি কে?”

“দুটো পাঁপর নিয়ে এলাম, কাল বেলে-তেজপুর থেকে এয়েছে, মনে করলাম সকাল সকাল দিয়ে আসিগে যাই, অভয়দার আবার আফিস, বেরিয়ে যাবে। ধর খান্ত, ভেজে দিস্।…ইটি?—ওমা, চিনতে পারলে না? বড়দার মেয়ে গো,—গিরি।… যা, দিদিমাকে পেন্নাম করগে।”

“থাক্, থাক্, হয়েছে। দেখি, ওমা তাই তো!…আর মা, আমার কি চোখের দৃষ্টি আছে? দিব্যি মেয়েটি তো হয়েছে বরুর আমাদের—যেন নক্ষী-পিতিমেটি! বরুও ঐ রকমটি ছিল, মনে আছে কিনা! তবে মেয়ের রং যেন আরও মাজা। বেঁচে থাক্, পাকা চুলে সিঁদুর পরুক, আর কি আশীর্বাদ করব?”

“মেয়ের আর এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আছেই বা কি রাঙাখুড়ি?”

.

“সঙ্গের উটি কে গো কাতু দিদি? যেন নতুন নতুন ঠেকছে?”

“বরুর মেয়ে। কাল বাপ নিয়ে এসেছে। এসেই বেড়াবার শখ হয়েছে মেয়ের; পাড়াবেড়ানি কারুর বৌ হবেন বোধহয়। দেখো না, সক্কালবেলা টেনে নিয়ে এসেছে আমায়, মাসির যেন কত ফুরসোৎ!”

“বল্—’বেশ করেছি—মাসি হওয়া ওমনি নাকি’…নামটি কি তোমার মা?”

“গিরিবালা।”

“বেশ মিষ্টি নামটি; দুগ্‌গার নাম।…আর আমাদের বাড়িতে এক নাম রাখার ঢো হয়েছে!— দাদার অমন চমৎকার মেয়েটির নাম হল তনিমা। ওর মাকে জিগ্যেস করি—হ্যাঁগা, তনিমা আবার কি জিনিস?— বেদে-পুরাণে কেউ কখনও শোনেনি!…কে তক্ক করে বলো ইস্কুলে পড়া মেয়ের সাথে? বাবাও ঐ দিকে; বলি—চুপ করে থাকাই ভালো।”

“গিরিবালা নাম রেখেই খালাস হয় তবে তো? বাপ বলে মেয়ে আমার পার্বতী উমা—গৌরী, দান করব। ও আজকালকার সব বাপ-মাই সমান ভাই, কি যে এক নতুন হাওয়াই উঠেছে!”

.

“কে গো, শ্রীমতী কাত্যায়নী না? হঠাৎ আজ এ আকাশে যে! পথ ভুলে?”

“ভাবলাম—দেখে আসি ঘোষাল-ঠাকুরদাদার আকাশে কোন নতুন তারা উঠল কিনা।”

“ভালো, আড়ি পেতেও যদি এক-একবার উদয় হও তো ঠাকুরদাদার খালি আকাশটা মাঝে মাঝে আলো হয়। সঙ্গে কে ও?”

“আপনার ছোট নাতনীর মেয়ে।”

“বরুর মেয়ে? বেশ, বেশ, এস তো মা। বাঃ, দিব্যি মেয়ে, খাসা মা হবে আমার। নামটি কি?”

“গিরিবালা।”

“গিরিবালা দেবী।—তা মা আমার বোধ হয় বলবে ‘দেবী’– সে তো আমার চেহারা দেখেই বুঝবে লোকে, নিজের মুখে আর বলতে যাব কেন? তাই নাকি গো?…হাসিটিও বড় মিষ্টি মায়ের। থাকবে এখন কিছু দিন?”

“থামুন, থাকার কথা আর তুলে কাজ নেই। দেখতে ভালো-মন্দ যাই হোক, অতশত বুঝি না, তবে আদ্ধেকটি সংসার এই এক ফোঁটা মেয়ের ঘাড়ে। মা নতুন পোয়াতি, এক হাঁড়িটা শুধু জেঠাইমার হাতে, বাকি যত কন্না ঐ মেয়ের ওপর; থাকলে চলবে ওর?…কি লো, থাকবি? বেশ তো এমন কোলের ছেলে পেলি!…আসি ঠাকুরদা এখন। এইদিকে একবার এসেছিলাম, মনে করলাম ঠাকুরদার খবরটা একবার নিয়ে যাই। ঠানদি কোথায়?…ভেতরে? যাই, একবার নতুন শাশুড়ীকে দেখিয়ে আনিগে, নইলে আবার মুখনাড়া খেতে হবে কোন দিন…

সম্পত্তি দেখাইয়া যেন আশ মেটে না আর মাসিমার। অনেকখানি ঘোরা হইল সকাল থেকে, কিন্তু প্রতি পদেই নিজেকে নূতনভাবে অনুভব করার জন্য ঘোরাটা গিরিবালার যেন গায়েই লাগিল না। যেটুকুই বা ক্লান্তি আসিয়াছিল, বাড়িতে আসিয়া তাহাও কোথায় যেন উবিয়া গেল। দিদিমা আসিয়াছেন, আর সঙ্গে আসিয়াছে অখিলমামার ছেলে বিকাশ। বিকাশ একটু বেশি চেনা, অখিলের সঙ্গে প্রায় তেজপুরের বাটীতে যায়। আদরের মধ্যে সখ্যের যে অভাব ছিল, বিকাশ সেটা পূরণ করিয়া দিল। দিদিমা থেকে ভাই পর্যন্ত সবার স্নেহ যেন একটি নিটোল আঙুরের মতো টলমল করিতে লাগিল।

বিকাশের মনোরঞ্জন করিবার পদ্ধতিটা একটু অন্য ধরনের। স্থানীয় স্কুলে থার্ড ক্লাসে পড়ে; নিজের বিদ্যাবুদ্ধি সম্বন্ধে একটু বেশি সজাগ। বোনকে প্রশ্ন করিল— “কি পড়ছিরে তুই গিরি আজকাল?”

গিরিবালা একটু লজ্জিতভাবে বলিল— “দ্বিতীয় ভাগ।”

“মোটে দ্বিতীয় ভাগ!” ঠোট দুইটা গোল করিয়া ‘উস্’ করিয়া এমন খানিকটা বিস্ময়ের হাওয়া পেটে টানিয়া লইল যে যেন গিরিবালার বয়স কুড়ি কি তিরিশ গোছের কিছু একটা। বলিল— “চল্ আমার বই দেখবি, তুই তো অজ্ঞানই হয়ে যাবি তা হলে।”

একটা দেবদারু কাঠের টেবিলে অবিন্যস্ত একরাশ বই-খাতা। গিরিবালার বিদ্যার দৌড় ততদূর হইলে বুঝিত তাহাতে কাশীরাম দাসও আছে, অন্নদামঙ্গলও আছে, নূতন পুরাতন পঞ্জিকাও আছে। সে একটু বিস্মিতভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। শুধু সংখ্যাতেই ভগ্নীর মনের অবস্থা কি দাঁড়াইয়াছে একবার দেখিয়া লইয়া বিকাশ গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার মতো একখানা ঘাড়ে গর্দানে বই তুলিয়া লইল। জিজ্ঞাসা করিল— “কি বলে বল্‌ দিকিন এটাকে?”

আকারটা চেনা, গিরিবালা বলিল— “পাঁজি।”

বিকাশ বলিল— “শুধু এক পাঁজিই চিনেছিস কিনা! ডিকশনারি—বল দিকিন মুখে।”

গিরিবালা বলিল— “ডিশনারি।”

বিকাশ একটু মৃদু হাসিল, বলিল— “ডিকশনারি—সি আর এস একসঙ্গে—ভারি তো বুঝলি তুই!—ক আর স একসঙ্গে, মাঝখানে কোন ভাউয়েল নেই—মানে স্বরবর্ণ নেই। এইবার বল দিকিন।”

গিরিবালা টীকার চোটে আরও ধাঁধা খাইয়া গেল, এবারে চেষ্টাও করিতে সাহস করিল না।

“এইখানে এসে আমার কাছে তোকে থাকতে হবে, নইলে বেলে-তেজপুরে থাকলে তুই মুখ্যু হয়ে যাবি গিরি। পিসিমশাইকে বলব।”

তাহার পর ডিকশনারিটা তুলিয়া ধরিয়া হাতটাকে একটু ঘুরাইয়া বলিল – “পৃথিবীর মধ্যে যত্তো কথা আছে তুমি এর মধ্যে পাবে। নাম করো—যে কোন কথা।”

গিরিবালা একটু ভাবিল; সকালে মাসিকে ঘোষালঠাকুরদার ডাকটি বড় মিষ্টি এবং অভিনব লাগিয়াছিল,—যেন কোন যাদুকরকে ঝুলির ভিতর হইতে অসম্ভব কোন দ্রব্য বাহির করিতে ফরমাইশ করিতেছে, এইভাবে বলিল— “আচ্ছা দেখাও—সীমতী কাত্যায়িনী।”

বিকাশ নিরাশভাবে বইটা রাখিয়া দিল, বলিল— “খালি—পাঁজি, সীমতী কাত্যায়িনী—এই শিখেছিস কিনা…” আরও সব বিষয় আছে—এজেব্রা, জিওমেট্রি…অঙ্কের শিক্ষক থার্ডমাস্টার জগদীশবাবু—বাবাকে পড়াইয়াছেন, দাদাকে পড়াইয়াছেন, হেডমাস্টারকে পড়াইয়াছেন। হেডমাস্টারের কানের পিছনে এখন পর্যন্ত একটা কাটা দাগ আছে—গর্বের সহিত দেখাইয়া বলেন— “এই আশীর্বাদের জোরে আজ এখানে হেডমাস্টারের চেয়ার দখল করে আছি।” আসিয়াই প্রথমে থার্ডমাস্টারের পদধুলি লন, তাহার পর কাজ আরম্ভ করেন—অত বড় অঙ্ক জানা লোক এ তল্লাটে নাই।…এলজেব্রা, জিওমেট্রির পর রয়েল রীডারের ছবি সব—নেপোলিয়ান আল্পস্ অতিক্রম করিতেছেন—তুষার-ঢাকা অলঙ্ঘ্য গিরিবর্ত—নেপোলিয়ান বলিলেন— “দেয়ার শ্যাল বি নো আল্পস্! আল্পস্ আমার গতিরোধ করে দাঁড়াবে? —বটে—আল্পস্কেই ধরাপৃষ্ঠ হতে বিলুপ্ত হতে হবে—তার মানে, মানুষের পরাক্রমের সামনে আন্নকে মাথা নত করতে হবে—তার মানে নেপোলিয়ান নিশ্চয়ই আল্পস্ পাহাড় ডিঙোবেন—বরফে ঢাকা আল্পস্ পাহাড়—এ পর্যন্ত যা কেউ পেরুতে পারেনি।”

বিকাশ উপযুক্ত শ্রোত্রী পাইয়া নিজের ইস্কুলের ধার-করা লেকচার শুনাইয়া যাইতেছে। গিরিবালা অকৃত্রিম বিস্ময়ে চাহিয়া আছে। কে জগদীশমাস্টার জানে না, কে নেপোলিয়ান, কোথায়ই বা বরফে ঢাকা আল্পস্ পাহাড়?—যে পাহাড় ডিঙাইল সে বড়, না, যে হেডমাস্টারের কানের পিছনে চিরদিনের জন্য বেতের দাগ রাখিয়া দিতে পারে সেই বড়, কিছুই নির্ণয় করিতে পারে না, শুধু একদল বিচিত্র-কর্মাদের আশ্চর্য জগতের সামনে মুগ্ধ নেত্রে দাঁড়াইয়া থাকে।

.

তাহার পর বাংলা রীডারের ছবি সহ—মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।—ছবি মাত্র, তবু চোখ দেখিলে চোখ ফিরাইতে পারা যায় না যেন, এমনিই দীর্ঘায়ত আর ভাস্কর:…বিদ্যাসাগর। … বিকাশ বলে “মাথায় চুল অমন করে কাটা বলে একটা হেঁজিপেঁজি মানুষ মনে করিসনি গিরি—মস্ত বড় লোক। আর জানিস?—মা যদি বললে— ‘ঈশ্বর’—নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—মা যদি একবার বললে—ঈশ্বর তোকে অমুক কাজটা করতে হবে’—ব্যাস আর নড়চড় হবার যো নেই, তা ব্ৰহ্মা- বিষ্ণু-মহেশ্বরই আসুন না কেন। খুব বড় চাকরি করতেন, বাড়িতে একটা বিয়ে ছিল, মা আসতে বলে দিয়েছিলেন। ছুটি চাইতে সাহেব বললে, ‘না পণ্ডিত এখন ছুটি অসম্ভব।’ বাইরে গিয়ে একটু ভাবলেন, তক্ষুনি ফিরে এসে বললেন— ‘তাহলে রইল সাহেব তোমার চাকরি, মা ডেকেছেন আমাকে যেতেই হবে।’…চটি-পরা বামুনের তেজ দেখে সাহেব ছুটি দিতে পথ পায় না। বাড়ি আসতে রাস্তায় দামোদর—এই যে দামোদর তুই পেরিয়ে এলি—একূল-ওকূল দেখা যায় না—তার ওপর বর্ষাকাল, ভেবেই দেখ নিজের মনে! বিদ্যাসাগর যখন ধারে এসে পৌঁছুলেন তখন রাত্তির হয়ে গেছে…”

বিকাশ বর্ণনাটাকে আরও জোরাল করিবার জন্য নিজের কল্পনা শক্তির সাহায্য লইল, বলিল— “রাত্তির বারোটা হয়ে গেছে! অন্ধকার ঘুটঘুট করছে, আকাশে সে কী ভীষণ দুর্যোগ! মাঝি বললে—’না ঠাকুর, যতই কেন বেশি দাও খেয়ার কড়ি, এমন রেতে নৌকো খুলব না; প্রাণ আগে তবে তো কড়ি!’…কিন্তু, এদিকে যে মায়ের ডাক, বিদ্যাসাগরের নিজের প্রাণ তো তার আগে নয়?…যখন কোন মতেই মাঝিকে রাজী করা গেল না, তখন কি করলেন বল দিকিন গিরি?”

মহিমময় কাহিনীটি বলিতে বলিতে বিকাশের কিশোর বদনে একটা জ্যোতি ফুটিয়া উঠিল, উত্তরের জন্য একটা শান্ত স্মিত হাস্যের সহিত ভগ্নীর মুখের পানে চাহিয়া রহিল। গিরিবালার বোধ হয় এই অবাধ্যতার অন্যায়টুকুর দিকেই মনটা আকৃষ্ট ছিল বেশি, বলিল— “মেরে ফেললেন?”

বিকাশ উত্তরটা শুনিয়া মুহূর্তমাত্র চোখ তুলিয়া যেন একটা কি ভাবিল, বোধ হয় মনে করিল ভগ্নী খুব বেশি ভুল বলে নাই—মারিয়া ফেলিলেও বিশেষ অন্যায় হইত না। মুখে বলিল – “দুৎ, তুই আমি হলে বোধ হয় ফেলতাম মেরে, কিন্তু বিদ্যাসাগরের যে দয়াও ছিল তেমনি ভয়ঙ্কর।…বিদ্যাসাগর বললেন—’দেয়ার শ্যাল বি নো দামোদর।”

প্রভাবটা কি রকম হইতেছে দেখিবার জন্য ভগ্নীর বিমুগ্ধ দৃষ্টির উপর চক্ষু রাখিয়া একটু দাঁড়াইয়া রহিল। গিরিবালা প্রশ্ন করিল— “সেই পাহাড় ডিঙোনর লোকটা যা বলেছিল?”

বিকাশের দৃষ্টি প্রশংসায় আয়ত হইয়া উঠিল, বলিল— “তুই শুনছিস মন দিয়ে তাহলে, আছে মনে। হ্যাঁ, বিদ্যাসাগর অবশ্য ওকথা চেঁচিয়ে বলেননি, মনে মনেই বলছিলেন।—আমাদের হেডমাস্টার মহাশয় আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন—গ্রেট মেন থিঙ্ক এলাইক… মানে কি বল দিকিন?”

ভাবের ঘোরে অসম্ভব প্রশ্নটা করিয়া তখনই বলিল— “মানে—সব বড় লোকদের চিন্তার ধারা একইরকম।…এই না মনে করে ঝপ্পাং করে সেই রাক্ষুসীর মতো দামোদর নদীতে দিলেন ঝাঁপ!”

গিরিবালা হঠাৎ যেন ভয়ে সিঁটকাইয়া উঠিল, বলিল,—“আহা গো।”

বিকাশের মুখটি শান্ত হইয়া আসিল, ঈষৎ হাসিয়া বলিল— “তুই ভাবলি বুঝি মরে গেলেন?…মায়ের আশীর্বাদ, মারে কার সাধ্যি রে? বিয়ের আগেই মায়ের কাছে গিয়ে হাজির।”

বিকাশ এখানে আর একবার থামিল, তাহার ব্যাখ্যানটার এমন অপ্রত্যাশিত প্রভাব হইতেছে দেখিয়া বোধ হয় একটু লোভ বাড়িল। বলিল— “তারপর মায়ে-ছেলেয় গলা জড়াজড়ি করে সে কী কান্না!”

যে রেটরিক অর্থাৎ অলঙ্কারের জোরে সে এতটা ফল পাইল, তাহাতেই যে কী গুরুতর ভ্রম করিয়া বসিল, বিকাশের তাহা বুঝিবার যেমন বিদ্যাও ছিল না, তেমনি অবসরও ছিল না। ঝোঁকের মাথায় বলিয়াই চলিল, “গলা জড়াজড়ি করে সে কী কান্না!—সে কী কান্না! কার সাধ্যি থামায় দুজনকে…ও কি রে গিরি, তুইও যে কেঁদে ফেললি! দেখো মেয়ের কাণ্ড! চুপ কর!”

ভগ্নীকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া প্রবোধ দিতে লাগিল— “চুপ কর গিরি… দেখো তো! ওরে কাঁদেনি, ওটুকু আমি বাড়িয়ে বলেছি—অমন তেজী ছেলে কখনও কাঁদে?…চুপ কর গিরি, লক্ষ্মীটি, কী ফ্যাসাদে যে ফেললি। পিসিমা ভাববে তোকে বুঝি মেরেছি আমি….”

অনেকক্ষণ পরে ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া গিরিবালা থামিল, বলিল— “মেয়েছেলে, এক জাতই তোরা আলাদা, ছোটই হোস আর বড়ই হোস; কার ছেলে কবে কষ্ট করে মায়ের কাছে এসে গলা জড়িয়ে ধরেছিল তা কানে শুনেও তোর কান্না!”

বিকাশের আরও বলিবার ছিল—একটা ভাবের বান ডাকিয়া গেছে মনে; ভগ্নীর অদ্ভুত আচরণে একটু বাধা পাইয়া খানিকটা চুপ করিয়া এ-বই সে-বই একটু নাড়াচাড়া করিল। তাহার পর সূত্রটা আবার তুলিবার আগে একটু উপক্রমণিকা হিসাবে বলিল— “যা ছিঁচকাঁদুনে তুই, তোকে বলতেই ইচ্ছে করে না; আবার কাঁদবি তো?”

গিরিবালা মাথা নাড়িয়া জানাইল—না, কাঁদিবে না।

বিকাশ আবেগটা সঞ্চিত করিয়া লইবার জন্য আরও একটু থামিল, তাহার পর বলিল— “নেপোলিয়ানও ঠিক ঐ রকম ছিলেন, মা যদি কোন কথা বললেন তো ঠিক বিদ্যাসাগরের মতন— ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এলেও টলাতে পারবে না—অবশ্য ওঁরা ক্রীশ্চান, ওঁদের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর নেই, শুধু যীশু আছে—কিন্তু প্রতিজ্ঞা টলাতে পারবে না…তুমি যীশু আছ তো নিজের ঘরে থাকো, মায়ের কথার সামনে তোমার হুকুম চলবে না।… আরও যত সব বড় বড় লোক হয়ে গেছেন, সব মায়ের ভক্ত,—ওয়াশিংটন বল্‌, আলেকজেন্ডার বল, আমাদের পঞ্চপাণ্ডব বল, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বল্‌–কত নাম করব?…তোকে একটা কথা বলছি গিরি, বলিসনি কাউকে।”

গিরিবালা কুতুহলী হইয়া মুখের পানে চাহিতে বলিল— “আমিও মাকে খুব ভক্তি করতে আরম্ভ করেছি গিরি; মিলিয়ে দেখবি সব কাজ ছেড়ে আগে মায়ের হুকুম তালিম করি। এবারে ক্লাসে ফাস্ট হলাম কি করে? মিলিয়ে দেখিস—এক সময় খুব বড় হব; মা মস্ত বড় জিনিস রে!”

গিরিবালার মনটা আবার উথলিয়া উঠিল, প্রতিজ্ঞার কথাটা স্মরণ করিয়া নিজেকে সংবৃত করিয়া লইল, তবু একটু ধরা গলায়ই বলিল— “আমিও গিয়ে এবার থেকে সব কথা শুনব মায়ের, বিকাশ দাদা।”

বিকাশ আবার একটু কি ভাবিল, তাহার পর বলিল— “তোর অতটা না করলেও চলে, মেয়ে কিনা;—তুই বরং বাপের দিকটা দেখিস—পিসেমশাইয়ের দিকটা আর কি।”

আর একটু থামিয়া কতকটা উপদেশ হিসাবে কতকটা উচ্ছ্বাসের বশে বলিল— “তোকে বরং ভাল মা হতে হবে গিরি—যে দেশে যত ভাল মা, সে দেশে তত উন্নতি। ঐ যে সব দেখছিস নেপোলিয়ান, বিদ্যাসাগর, মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত—ওঁরা কি অমনি কত বড় হয়েছেন?—ওঁদের মায়েরাও তেমনি ছিলেন। তুই এখন থেকেই ভগবানের কাছে রোজ প্রার্থনা করবি…’হে ঠাকুর আমি যেন বড় হয়ে ভাল মা হতে পারি—আমি যেন বড় হয়ে ভাল মা হতে পারি।’…পুজো করিস রোজ তো?”

গিরিবালার মুখে এমন যোগাযোগে আর সত্যটা বাহির হইল না, ঘাড় নাড়িয়া জানাইল—হ্যাঁ করে।

বিকাশ বলিল— “পুজোর সময় বলবি শিবঠাকুরকে; তা ভিন্ন তোকে আমি একটা সুন্দর প্রার্থনাও শিখিয়ে দোব, আমাদের বাংলার পণ্ডিত মশাইয়ের রচনা, রোজ ঘুম ভাঙলেই আগে বলে তবে বিছানা ছাড়বি

রাত্রি হোল অপগত
নব সুর্যোদয়ে,
খুলিনু নয়ন প্ৰভু,
তবাশিস্ লয়ে;
আমি না প্রার্থনা করি
বিত্ত অগণন,
পুণ্য কর চিত্ত মোর
এই নিবেদন;
জ্ঞান দাও, শক্তি দাও,
দাও ভক্তি চিতে…

আরও আছে, আমি দু-এক জায়গায় বদলে ছেলের কথাটা বসিয়ে দোব’খন। পদ্যও লিখছি কিনা একটু একটু আজকাল…”

গিরিবালা এবার বেশ কয়েক দিন রহিয়া গেল মামারবাড়ি—একেবারে পূর্ণিমা পর্যন্ত। রসিকলাল ইতিমধ্যে দুই-তিনবার বাড়ি শ্বশুরবাড়ি যাওয়া-আসা করিলেন। টানা এতদিন শ্বশুরবাড়ি পড়িয়া থাকা যায় না, তাহা ভিন্ন হাতের কেসগুলা আছে। বেলে-তেজপুরে আর একটা নূতন আকর্ষণ হইয়াছে, পণ্ডিতমশাই। অলস রসালোচনা আর যতরকম অসম্ভব কল্পনার সঙ্গী পাইয়া রসিকলালের মধ্যেকার কর্মপলাতক কবিটি আবার মাথা ঝাড়িয়া উঠিতেছে। বেলে-তেজপুরে গেলে এখন ওঁর ওখানেই কাটে বেশিটা সময়।

এই গতায়াতের মধ্যে একবার ভাইপো সাতকড়িকে রাখিয়া যান সিমুরে, তাহার পায়ের ঘাগুলা সারিলে। বিকাশ দুইটি শিষ্য বা ছাত্রছাত্রী পাইয়া পুরাদস্তুর শিক্ষকতা আরম্ভ করিয়া দিল— বাড়িতে এবং বাহিরেও।—স্কুল থেকে প্রত্যহ বড় বড় যাহা কিছু শিখিয়া আসে—আজকাল ঝোঁক করিয়া শেখেও অনেক—সমস্ত দুইটি শিশুর সামনে উজাড় করিয়া দিয়া তাহাদের বিস্ময়ের পরিধি বাড়াইয়া তোলে। সাতকড়ি ছেলেটি বড় ভালোমানুষ আর দিদির নিতান্ত অনুগত। শুনিবার সময় মাঝে মাঝে দিদির দিকে চাহিয়া দেখে। দিদি যেমন মুখের ভাবটি করে, সেও করিবার চেষ্টা করে, দিদি “আহা” বলিলে “আহা” বলে, “ওরে বাব্বা!” বলিলে হয়তো আর একটি শব্দ বাড়াইয়া বলে— “ওরে ব্বাবা! উস্!”

বাহিরেও শিক্ষকতা হয়, ছোট গ্রামটির যত রকম দ্রষ্টব্য যা কিছু সেগুলির সঙ্গে বিকাশ ভাই আর বোনটির পরিচয় করাইয়া বেড়ায় বিকালে স্কুল থেকে আসিয়া। একটা মজা ডোবার, কি একটা পোড়া বাড়ির, কি একটা ঢিবির মধ্যে অবশ্য দ্রষ্টব্য কিছু থাকে না, তবে বিকাশের কল্পনাপ্রবণ মস্তিষ্ক করিয়া তোলে সেগুলিকে দ্রষ্টব্য—তাহাদের সঙ্গে রোমান্স বা রহস্যের যোগাযোগ ঘটাইয়া। যে ঢিবিটা দেখছিস্ সাতকড়ি, ওর মধ্যে কিছু নয় তো লাখখানেক সোনার মোহর পোঁতা আছে— পেতলের ঘড়ায় করে।”

সাতকড়ি দিদির দিকে চায়; দিদি বিকাশকে প্রশ্ন করে— “সত্যি! কেউ নেয় না কেন বিকাশ দাদা?”

সাতকড়ি বলে— “সত্যি! কেউ যে নেয় না?”

বিকাশের ততক্ষণে উত্তর আরম্ভ হইয়া যায়। বলে— “চেষ্টা কর না তোরাই গিয়ে, এখন তো রাত্রিরও হয় নি।…সব ঘড়ার ঠিক মাঝখানটিতে এক যক্ষী বসে আছে।…চেষ্টা কেউ কেউ যে না করেছে এমন নয়, লোভ বড় পাপ কি না, কিন্তু …”

এফেক্টের জ্ঞান ভাল, আর বলে না।

এ-ভিন্ন স্কুল আছে, চৌধুরীদের বাড়ি আছে, পঞ্চাননতলা আছে, কতদিনের কত ইতিহাস বিজড়িত। এমন কি একদিন জগদীশ মাস্টারকে পর্যন্ত দেখাইয়া ছিল—সব বিস্ময়ের সেরা বিস্ময়—হেডমাস্টারের কানের পিছনে যে একটি চিরন্তন দাগ রাখিয়া দিয়াছে সেও কিনা খালি গায়ে হুঁকা হাতে নিজের বাড়ির বারান্দাটিতে সাধারণ মানুষের মত ঘুরিয়া বেড়ায়! এর পরে আরও কী না দেখিতে হইবে!

রাত্রিগুলো কাটে মেজমাসিমা, মামী আর দিদিমাদের কাছে। মাসিমার কাছেই বেশি, কেননা তিনি যেন বেশি করিয়া খোঁজেন, আরও ঠিক ভাবে বলিতে গেলে অন্য সবার কাছ থেকে কাড়িয়া কাড়িয়া বেড়ান। মামীমার হাতটা একটু আজাড় থাকিলে মামীমা রান্নাঘরে ডাকিয়া লন, পাইলে দুজনকেই নয় তো শুধু গিরিবালাকে। অনেক রকম গল্প হয়—বেলে-তেজপুরের, এখানে আজ নূতন কি সব দেখিল, বিকাশ কি কি সব বলিল—সেই সব। মামী তরকারি নাড়িতে নাড়িতে খন্তিটা তুলিয়া নিজের হাঁটুর উপর চিবুকটা রাখিয়া ঈষৎ হাসি মুখে শুনিতে থাকেন—কী মধু পান তিনিই জানেন—এক একবার একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ে। একদিন গিরিকে একলা পাইয়া এমনি করিয়া গল্প শুনিতে শুনিতে হঠাৎ বলিয়া বসিলেন— “বিকাশের যদ্দিন না একটি বোন হবে তুই যেতে পাবি না গিরি! থাকবি তো মামীর কাছে?”

একটু পরে উঠিয়া গেলেন। বলিয়া গেলেন— “যানি গিরি যেন, এলাম বলে আমি।”

ফিরিয়া আসিয়া গিরির হাতে একটা ডবল পয়সা দিয়া বলিলেন,–-“কাল রাসের মেলায় কিছু কিনে খাবি গিরি।”

একটু পরেই বলিলেন—“হ্যাঁ, ভাল কথা, তোকে যা বললাম কাউকে যেন বলিস নি, ভাববে মামী আটকে রাখতে চায়।”

আরও একটু পরে একটি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলিলেন—“মায়ের জিনিস মায়ের কাছে যাবি, আটকাতে গেলাম কেন, কি বলবে?”

কয়েক দিন যাত্রা দেখাও হইয়াছে। রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সারিয়া যায়। যায় প্রায় সকলেই, অখিল এবং দিদিমাদের মধ্যে কেহ একজন বাড়িতে থাকেন। পূর্ণিমার দিন হইল অভিমন্যু বধ। শেষ দিন, আসরটা সাজানো হইয়াছে খুব ঘটা করিয়া, লোকও হইয়াছে খুব বেশি। অভিমন্যু বধের পালাটাও গোপাল উড়ের নামজাদা পালার মধ্যে। কয়েক দিন থেকে নাগাড়ে যাত্রা হইয়া চলিয়াছে, এদিকে শ্রোতাদের অবসাদের জন্য আসরটা খালি-খালি হইয়া আসিতেছিল, সাজানোর মধ্যে একটা গতানুগতিক ভাব আসিয়া পড়িয়াছিল, আজ যেন আবার গমগম করিয়া উঠিয়াছে। পূর্ণিমার এই শেষ রাত্রিটিকে বিশিষ্ট করিবার জন্য বরাবরই দু-একটা জিনিস আলাদা করিয়া রাখা হয়—এই রাত্রেই বাহির করা হয়। আজ মাঝখানটিতে একটি বেশ বড় টকটকে রাঙা বেলোয়ারি ঝাড় দেওয়া হইয়াছে, চারি কোণে চারিটা ভাল ভাল কাচের হাঁড়ি-লালটেম টাঙান হইয়াছে, চারি কোণের চারিটা থামেও সবুজ রঙের ব্র্যাকেট-ঝাড় বসানো হইয়াছে। যে মোমবাতিগুলি ছোট হইয়া গিয়াছিল সেগুলি বদলাইয়া দেওয়া হইয়াছে; কাগজের শিকল, কাগজের পতাকা যেখানে যেখানে নষ্ট হইয়া গিয়াছিল পূরণ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। মোটের উপর নিবিবার পূর্বে আসরটা যেন পূর্ণতর ঔজ্জ্বল্যে একবার দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে।

এদিকে রাসের মঞ্চেও এই ব্যাপার—আলোয়, সজ্জায় যেন ঝলমল করিতেছে। সাতকড়ির তো কথাই নাই, গিরিবালা, যে কতকটা অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল এধরনের জাঁকজমকে, শেষ পর্যন্ত আজ যেন নূতন করিয়া অভিভূত হইয়া পড়িয়াছে। মনটা কিরকম পূর্ণতার যেন কানায় কানায় ঠেলিয়া উঠিতেছে।

তাহার উপর আজ যাত্রাও হইতেছে সেই রকম। অভিমন্যু যে সাজিয়াছে সে দলের একেবারে নামকরা ছেলে, মাৎ করিয়া দিতেছে। গিরিবালা অবশ্য অত বুঝিতেছে না, তবে প্রায় মেয়ের মতোই সুকুমার ছেলেটির উপর উহার বড় মায়া বসিয়া গিয়াছে। এই মায়াটুকু তাহার বুকে সংক্রামিত হইয়াছে সুভদ্রার পার্ট হইতে। অমন সদাব্যাকুল, পুত্রগতপ্রাণ মা আর হয় না,—অভিমন্যু না হইলে তাহার যেন কিছুতে স্বস্তি নাই। আজ যেন আরও অধীর, – থাকিয়া থাকিয়া স্বীয় সখীকে জিজ্ঞাসা করিতেছে, “সখি, আজ আমার ডান চোখ নাচে কেন? আমার অভিমন্যু কোথায়? সখীরে, আজ যেন আমার মনে কি হচ্ছে, কেন এমন হচ্ছে বল না আমায়, গোপন করিস না…আমার নয়নের মণি অভিমন্যু এখনও আসে না কেন?”

এমন সময়ে ধনুর্বাণ, বর্ম, আর সাজগোজ হাতে করিয়া একটা গান গাহিতে গাহিতে অভিমন্যু প্রবেশ করিল—

ওমা ও জননী, পূর্ণচন্দ্রাননী,
এই যে অভি তোমার, নাও মা তুলে কোলে,
নাশি অরিকুলে, তোমার আশিস বলে,
‘মা, মা’, আবার আসব চলে।

গিরিবালা একবার হঠাৎ কাত্যায়নীকে প্রশ্ন করিল— “কেন মেজমাসিমা, ডান চোখ নাচলে কি হয়?”

কাত্যায়নী গিরিবালাকে বুকে একটু চাপিয়া বলিলেন— “অমঙ্গল। অভিমন্যু বাঁচবে না কিনা, তাই ডান চোখ নাচছে মায়ের।”

শুনিয়া অবধি মনটা বিষণ্ণ হইয়া আছে। চারিদিকের জাঁকজমক যেন একটু বিস্বাদ ঠেকিতেছে; অথচ বিপদটার জন্য একটা শিশুসুলভ ঔৎসুক্যও লাগিয়া আছে।…সুভদ্রা প্রথমে গানের মধ্য দিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া কাঁদিয়া পরে আবার যথার্থ ক্ষত্রিয়ললনার মতোই পুত্রকে যথাবিধি সাজাইয়া দিল, তাহার পর কারুণ্য, আশীর্বাদ ও বীরত্বের সমাবেশে খানিকটা বক্তৃতা করিয়া পুত্রকে বিদায় দিল। আসর ছাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে জুড়ি উঠিয়া তান ধরিল—

ও যে পণ করেছে মনে
যাবে রণাঙ্গনে,
কেমনে রুধিবি
ক্ষত্রিয়ে ললনে?
ওরে কোল থেকে নামায়ে
বাঁধ মা আপন হিয়ে,
ওর সব বাঁধন ঘুচিয়ে
নিয়তি যে টানে।

অর্থ বিশেষ না বুঝিলেও গিরিবালার মনটা সুরের কাতরানিতে যেন টনটন করিতে লাগিল। কিন্তু পরে অভিমন্যু যেভাবে সগর্ব হুঙ্কারের সহিত শত্রুসৈন্য বিনাশ করিতে লাগিল, গিরিবালার অনেকটা আশা হইল যে ব্যাপারটা সামলাইয়া যাইবে। একবার বলিল— “সবাইকে বেশ মেরে ফেলছে না মেজমাসিমা?”

মাসিমা বলিলেন— “ফেলবে না মেরে? কত বড় বীর ছেলে! চুপ করে দেখ না।”

একে একে সপ্তরথী আসতে লাগিল, একক সকলেই পরাজিত হইয়া পৃষ্ঠভঙ্গ দিল। গিরিবালার মুখটা উজ্জ্বল হইয়া উঠিতে লাগিল। মনের আনন্দটা চাপিতে না পারিয়া সাতকড়িকে বলিল— “দেখছিস সাতু কি বীর, উস্!”

সাতকড়ি ঢুলিতেছিল, তন্দ্রাচ্ছন্ন চক্ষু দুইটিতে চাড়া দিয়া বলিল— “হুঁ, উরে ব্বাস্ রে!”

তাহার পর একজোটে সপ্তরথীতে বালক অভিমন্যুকে ঘিরিয়া ফেলিল। আরও ঘোরতর যুদ্ধ, সপ্তরথীদের সকলেই বিপর্যস্ত হইয়া পড়িতেছে। তাহার পর অস্ত্রাঘাতে অস্ত্রাঘাতে অবসন্ন হইয়া অভিমন্যু ধরাশায়ী হইল।

গিরিবালার মুখে আশা-নিরাশার একটা আলো-ছায়া খেলিতেছিল এতক্ষণ, সব দীপ্তি যেন নিবিয়া গেল। একবার মাসিমাকে প্রশ্ন করিল— “ও-ই মরে গেল, না?”

“মরবে না?—একটা শিশুকে সাতজন মিলে চারিদিক থেকে ঘিরে মারলে!”

তিনি চোখে আঁচলের খুঁট দিতেছেন দেখিয়া আর অন্য প্রশ্ন করিল না।

আহার পর আসিল কাঁদার পালা —সুভদ্রা যখন আসিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া কান্নার সঙ্গে গান ধরিল-

“বাপরে অভিমন্যু, রিদয় করিয়া শূন্য
কোন্ পুণ্যধামে গেলিরে তুই চলে?
যদি, নিতান্তই কৃতান্ত করবে সর্বস্বান্ত,
কেন আশা দিলি পুনঃ আসিব বলে?”

গভীর করুণাত্মক পালাটির আলোচনা করিতে করিতে বর্ষীয়সীরা গৃহে ফিরিল। গিরিবালার মনটাও খুব আলোড়িত, সমস্ত রাস্তাটায় আর বিশেষ কিছু কথা কহিল না। বিশেষ বুঝিতেছে না, তবে এই অস্পষ্ট শোক যেন একটা অবলম্বন চায়; আসিয়া লেপে প্রবেশ করিল, মাসিমা তখনও আসেন নাই, মুখ হাত পা ধুইতে গেছেন—গিরিবালা সাতুকে বলিল— “বড় কষ্ট, নয় রে সাতু?— সবাই মিলে মারলে বেচারীকে। আহা!”

সাতকড়ি বলিল— “হ।”

একটু পরে গিরিবালা বলিল— “হ্যাঁরে সাতু, আমার একটা পুতুল রেখে এসেছিলাম হরুর কাছে,—কিছু বলেনি তোকে?”

সাতকড়ি বলিল— “না তো।”

মাসিমা আসিয়া পড়ায় গিরিবালা আর কিছু বলিল না।

.

তাহার পরদিন সকালে রসিকলাল আসিলেন এবং বৈকালে ইহাদের লইয়া চলিয়া গেলেন।

ননদভাজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়া ভাইবোনকে সাজাইয়া দিলেন—দুধের সর দিয়া হাত মুখ মাজিয়া নির্মল করিয়া। মামার বাড়িতে পাওয়া নূতন কাপড়চোপড় পরিয়াছে, তাহার উপর বাড়িমুখো—গিরিবালা ও সাতকড়ি দুইজনেই প্রফুল্ল। তবুও কিন্তু সেই প্রফুল্লতার মধ্যে কয়েকটি বিষণ্নতার রেখা প্রস্ফুট, বিশেষ করিয়া গিরিবালার। মাসিমা আর মামীমা ঘন ঘন চোখ মুছিতেছেন—গিরিবালা সাহস করিয়া তাহাদের মুখের পানে চাহিতে পারিতেছে না।

সবাই দাওয়ায় একত্র হইয়াছেন। গিরিবালার হাতে একটি পুঁটুলি—এতদিনে যাহা কিছু সঞ্চিত হইয়াছে সব জড়ো করা তাহার মধ্যে।—মামীমার কাছ থেকে পাওয়া একটি পমেটমের পাত্ৰ – অল্প একটু পমেটমসুদ্ধ, একটি গোলাপি রং-এর নূতন সাবান, একটা এসেন্সের খালি শিশি, খানিকটা মাথার ফিতা; মাসিমার কাছ থেকে একটি কালোপাথরের নাড়ুগোপাল, একটা রাধাকৃষ্ণ নামের পিতলের ছাপ; বিকাশের কাছে একটা পেন্সিল, একটা হাড়ের কলম। এছাড়া কিছু কাচের পুতুল এবং সাতকড়ির কয়েকটা মার্বেলগুলি এবং একটা এবং ব্যাটবল উহারই মধ্যে আছে। বিকাশ নিজের একখানি ছবিওয়ালা প্রাইজের বইও বোনকে উপহার দিয়াছে, সেটি রহিয়াছে গিরিবালার হাতে।

শাশুড়ি আসিয়া ঘোমটা টানিয়া দরজার কাছটিতে দাঁড়াইলেন, অস্পষ্টস্বরে জামাইকে উদ্দেশ করিয়া অখিলকে কহিলেন— “ওঁকে বল্ অখিল, নিয়ে আসতে মাঝে মাঝে—কোন্ এমন নশোপঞ্চাশ কোশ দূর?… মেয়েটা বড় হয়েছে, এখন দেখতে মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়। আর কতদিনই বা দেখব? ও-ই বা আর কতদিন বাপের বাড়িতে আছে?”

কাত্যায়নী চোখ মুছিয়া হাসিয়া আরম্ভ করিলেন— “ওমা, তোমাদের আবদারও তো কম নয়! বাঁড়ুজ্জের পায়া ভারি এখন, সম্পত্তির মালিক হয়েছে—নিজের সম্পত্তি দেখাতে কি কেউ চট করে…”

শেষ করিতে না পারিয়া মুখে আঁচল গুঁজিয়া হু-হু করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। ভাজও আর নিজেকে সামলাইতে না পারিয়া, হঠাৎ অগ্রসর হইয়া গিরিবালাকে বুকে চাপিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন; চাপা ভাঙা ভাঙা গলায় বলিলেন— “জোর করে আসবি গিরি—আমরাও এমন কিছু পর নয়…”

গিরিবালা তাঁর বহুবিস্তৃত জীবনে ভালোমন্দ অনেক কিছুই দেখিয়াছিলেন, কিন্তু ছেলেবেলার ঐ কটা দিনের অভিজ্ঞতার উল্লেখ যেন আর সবের চেয়ে বেশি করিয়া করিতেন—এই এবারের মামার বাড়ির যাওয়ার ব্যাপারটা। মামার বাড়িও যে এই প্রথম যাওয়া এমন নয়, পূর্বেও গেছেন অনেকবার, পরেও গেছেন, কিন্তু এইবারের উল্লেখ যত করিতেন, আর যত দরদ দিয়া, অন্য কোনও বারেরই ততটা বা তেমনভাবে করিতেন না। শৈলেনের বড় কৌতুক বোধ হইত, তাহার পর ভাবিয়া একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে।

এই কয়টা দিনের খুব তাড়াতাড়ি ঘটিয়া যাওয়া বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া গিরিবালা এক নবতর জগতের সন্ধান পান, উত্তরকালে তাঁহার জীবন যখন ধীরে ধীরে পূর্ণতা লাভ করে—আত্মীয়- পরিজন, মান, ঐশ্বর্য, সব দিক দিয়াই, তখন যাত্রা আর প্রবাসের অভিজ্ঞতা লইয়া সিমুরের ঐ কটা দিন মনে পড়িয়া যাইত। পৃথিবী যে বেলে-তেজপুরের চেয়ে বড়, এবং তিনিও যে শ্রী আর স্বভাবে সে-পৃথিবীর কিছু পাইবার অধিকারী, শতমুখের আশীর্বাদ আর প্রশংসার মধ্য দিয়া এ-চেতনার উন্মেষ হইয়াছিল সিমুরের ঐ দিনগুলিতে। সেখানে যাহাদের মনের উত্তাপে প্রথম আশা ফুটিয়াছিল, প্রথম আকাঙ্ক্ষা জাগিয়াছিল—আশা আকাঙ্ক্ষার পরিণতির দিনে সে জায়গার আর সে-সব মানুষের কথা যে না মনে পড়িয়াই পারে না।

.

সেই সঙ্গে বোধ হয় একটু নিরহঙ্কার অনুকম্পাও ছিল মিশানো।

যখন পড়ার বই-এ বাড়ি ঠাসা, পুত্রেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ সম্মান অর্জন করিয়াছে, নাতি- নাতনীরা স্কুলের বই-এর ভারে বিপর্যস্ত,—তিনি নিজে এক বৃহৎ নগরীতে অধিষ্ঠিতা,– যেখানে এক গ্রাম্য জমিদারের আড়ম্বর নিতান্তই নিষ্প্রভ,—এমন দিনের স্মিত মুহূর্তগুলিতে সিমুরের কথা মনে পড়িবে বৈকি, একটু বেশি করিয়াই মনে পড়িবে। বিকাশ দাদার কৈশোর-সুলভ দত্ত একটি হাস্যমণ্ডিত প্রীতির স্মৃতিতে ভাসিয়া উঠিবে বৈকি।