উপন্যাস
বড় গল্প
সংকলন
রচনা

ভারতের দ্বিতীয় প্রভাত – ১

প্রথম পরিচ্ছেদ

আঁধার আঁধার! অসীম আঁধার!
আঁখি হয়ে যায় অন্ধ!
জাগো শিশু-রবি, আনো আলো-সোনা
আনো প্রভাতের ছন্দ!

.

হ্যাঁ, ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের কথা বলব। প্রাগৈতিহাসিক কালে আর্যাবর্তে বিচরণ করতেন রঘু, কুরু, পাণ্ডব, যদু ও ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি বংশের মহা মহা বীররা। তাঁদের কেউ কেউ অবতার রূপে আজও পূজিত হন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের জগতে ভারতে প্রথম প্রভাত এনেছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতবিজয়ী আলেকজান্ডার এবং গ্রিকবিজয়ী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত।

রাম-রাবণ ও কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধকাহিনির মধ্যে অল্পবিস্তর ঐতিহাসিক সত্য থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সে সম্বন্ধে তর্ক না তুলে আপাতত এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, পুরাণ-বিখ্যাত সেই সব যুদ্ধের পরেও ভারতে এসেছিল দীর্ঘকালব্যাপী এক তমিস্রযুগ। তারই মধ্যে কেবল সত্যের সন্ধান দেয় নিষ্কম্প দীপশিখার মতো বুদ্ধদেবের বিস্ময়কর অপূর্ব মূর্তি। আজ ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি, তখনও তার অস্তিত্ব ছিল না বটে, কিন্তু কি এদেশি, কি বিদেশি কোনও ঐতিহাসিকেরই এমন সাহস হয়নি যে বুদ্ধদেবকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দেন। সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস বলতে বুঝি, বুদ্ধদেবের জীবনচরিত।

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং শিলালিপি প্রভৃতির দৌলতে বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পরবর্তী যুগের ভারতের কতকগুলি প্রামাণিক ছবি আমরা পেয়েছি। যদিও সে যুগের বৌদ্ধ চিত্রশালা সম্পূর্ণ নয়, তবু আলো-আঁধারের ভিতর থেকে ভারতের যে মূর্তিখানি আমরা দেখতে পাই, বিচিত্র তা—মোহনীয়!

তারপরই সেই ছায়ামায়াময় প্রাচীন আর্যাবর্তে সমুজ্জ্বল মশাল হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার। যে শ্রেণির কাহিনিকে আজ আমরা ইতিহাস বলে গ্রাহ্য করি, তার জন্ম হয়েছিল সর্বপ্রথমে সেকালকার গ্রিক দেশেই। কাজেই আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান স্থানলাভ করল গ্রিক ইতিহাসেও এবং আলেকজান্ডারের পরেও প্রাচীন ভারতের সঙ্গে গ্রিসের আদান-প্রদানের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়নি। তাই সে যুগের ভারতবর্ষের অনেক কথাই আমরা জানতে পেরেছি গ্রিক লেখকদের প্রসাদে। সেলিউকস প্রেরিত গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস লিপিবদ্ধ করে না রাখলে আমরা মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের যুগে মগধ সাম্রাজ্য তথা ভারতবর্ষের রাজপ্রাসাদ, রাজসভা, রাজধানী, সমাজনীতি, শাসননীতি, আচার-ব্যবহার প্রভৃতির অনেক কথাই জানতে পারতুম না। এজন্যে গ্রিসের কাছে ভারতবর্ষ হয়ে থাকবে চিরকৃতজ্ঞ।

প্রাকৃতিক জগতে যেমন কখনও মেঘ কখনও রোদের খেলা, কখনও আলো কখনও ছায়ার মেলা, প্রত্যেক দেশের সভ্যতার ইতিহাসেও তেমনই পরিবর্তনের লীলা দেখা যায়। মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের বা ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ কি আরও দুই-এক বছর আগে। তার কিছু কম দেড় শতাব্দী পরে মৌর্য সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়। তারপর ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখি সুঙ্গ, কান্ব ও অন্ধ্র প্রভৃতি বংশের কমবেশি প্রভুত্ব। ইতিমধ্যে গ্রিকরাও বারকয়েক ভারতের মাটিতে আসন পাতবার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

কেবল গ্রিকরা নয়, মধ্য এশিয়ার ভবঘুরে মোগলজাতি তখন থেকেই ভারতবর্ষে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোগল বলতে তখন মুসলমান বোঝাত না (নিজ মঙ্গোলিয়ায় আজও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মোগলরা আছে) এবং মোগল বলতে আসলে কী বোঝায় সে সম্বন্ধেও সকলের খুব পরিষ্কার ধারণা নেই। যুগে যুগে নানা জাতি মোগলদের নানা নামে ডেকেছে। এদের বাহন ছিল ঘোড়া, খাদ্য ছিল মাংস, পানীয় ছিল দুগ্ধ। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোদোতাস এদের ডেকেছেন ‘সিথিয়ান’ বলে, পরবর্তী যুগের রোমানরা এদের ‘হুন’ নামে ডাকতেন, প্রাচীন ভারতে এদের নাম ছিল ‘শক’, এবং চিনারা এদের নাম দিয়েছিল Hiungnu। আসলে মোগল, শক, হুন, তাতার ও তুর্কিরা একরকম এক জাতেরই লোক, কারণ তাদের সকলেরই উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায় বা মঙ্গোলিয়ায়। এই আশ্চর্য জাতি ধরতে গেলে এক সময়ে প্রাচীন পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশকেই দখল করেছিল এবং ভারতবর্ষ তাদের অধিকারে এসেছিল দুইবার। প্রথমবারে তাদের বংশ কুষাণ বংশ বলে পরিচিত হয়। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বিখ্যাত সম্রাট কনিষ্ক এই বংশেরই ছেলে। দ্বিতীয়বারে তারা মোগল রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করে।

মোগল বা শকরা ভারতে এসে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাবে নিজেদের সমস্ত বিশেষত্ব—এমনকী ধর্ম পর্যন্ত হারিয়ে একেবারে এদেশের মানুষ হয়ে পড়েছিল। কনিষ্ক ছিলেন বৌদ্ধ, তবু তাঁর নামে বিদেশি গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু কুষাণ বংশের শেষ সম্রাট বাসুদেবের নামই কেবল ভারতীয় নয়, ধর্মেও তিনি ছিলেন শৈব মতাবলম্বী হিন্দু। কারণ তাঁর নামাঙ্কিত প্রায় প্রত্যেক মুদ্রায় দেখা যায় শিব এবং শিবের ষাঁড়ের প্রতিমূর্তি।

আনুমানিক ২২০ খ্রিস্টাব্দে বাসুদেবের মৃত্যু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে হয় কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন। যদিও তারপরেও কিছুকাল পর্যন্ত ভারতের এখানে-ওখানে কুষাণদের খণ্ড খণ্ড রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু কুষাণদের কেউ আর সম্রাট নামে পরিচিত হতে পারেননি।

মোগল বা শকদের রাজত্বের সময়েই ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গোধূলির ম্লান আলো। প্রাচীনতর হলেও মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ যেন স্পষ্ট রূপে ও রেখায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শক ভারতবর্ষে তেমনভাবে নজর চলে না—সেটা ছিল যেন আলো-মাখানো ছায়ার যুগ, তার খানিকটা স্পষ্ট আর খানিকটা অস্পষ্ট।

কিন্তু কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে এল সত্যিকার তমিস্রযুগ। যেন এক অমাবস্যার মহানিশা এসে সমগ্র আর্যাবর্তকে তার বিপুল আঁধার আঁচলে ঢেকে দিলে। অবশ্য, এ সময়কার হিন্দুস্থানে কোনও সাম্রাজ্য ও সম্রাট না থাকলেও ছোট ছোট রাজ্যের খুদে খুদে রাজার যে অভাব ছিল না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। নানা পুরাণে এ সময়কার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তাও ভাসা ভাসা, রহস্যময়। ওই খুদে রাজাদের কারুর ভিতরে এমন শক্তি ও প্রতিভা ছিল না যে সমগ্র ভারতের উপরে বিপুল একচ্ছত্র তুলে ধরেন। এক-এক দেশের সিংহাসন পেয়ে এবং বড়জোর প্রতিবেশি ছোট ছোট রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ বা ঝগড়া করেই তাঁরা তুষ্ট ছিলেন। এই গভীর অন্ধকার জগতে মাঝে মাঝে যেন, বিদ্যুৎ-চমকের মধ্যে দেখা যায় আভিরাস, যবন, শক, বল্হীক ও গর্দব্বিলাস প্রভৃতি অদ্ভুত বা বিদেশি বংশকে!

বৃহৎ ভারতের আত্মা যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনুমানে বোঝা যায়, তখন ক্রমেই বৌদ্ধধর্মের অধঃপতন হচ্ছিল এবং হিন্দুধর্মের হচ্ছিল ক্রমোন্নতি। কিন্তু তখনকার দেশাচার, কলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইতিহাস জানবার কোনও উপায়ই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র মৌর্য বংশ লোপ পাওয়ার পরেও এবং সেই অন্ধকার যুগেও যে একটি প্রসিদ্ধ নগর বলে গণ্য হত, এ কথা জানা যায়। কিন্তু পাটলিপুত্রের রাজার নাম পাওয়া যায় না। পাঞ্জাবে ও কাবুলে ছিলেন শকবংশীয় কোনও কোনও রাজা। এ কথাও জানা গিয়েছে যে, কাবুলের ভারতীয় শক রাজারা ছিলেন বিলক্ষণ ক্ষমতাবান (৩৬০ খ্রিস্টাব্দেও কাবুলের শক রাজার দ্বারা প্রেরিত ভারতীয় যুদ্ধহস্তী ও সৈন্যের সাহায্যে পারস্যের অধিপতি দ্বিতীয় সাপর প্রাচ্য রোম-সৈন্যদের পরাজিত করেন)।

প্রায় এক শতাব্দী এই অন্ধকার রহস্যের মধ্য দিয়ে অতীত হয়ে যায়। এই হারানো ভারতকে আর অতীতের গর্ভ থেকে উদ্ধার করা যাবে না, বহুযুগের ওপার থেকে ভেসে আসে কেবল অন্ধকারের আর্তনাদ!

ইউরোপের অবস্থাও তখন ভালো নয়। গ্রিস তখন গৌরবহীন এবং পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য হয়েছে বর্বর, অন্ধকার যুগের মধ্যে প্রবেশ করতে উদ্যত। চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কনস্তানতাইন দি গ্রেটের মৃত্যুর পর ইউরোপীয় রোম-সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল নামে মাত্র।

কিন্তু ইউরোপীয় সভ্যতা যখন মৃত্যুন্মুখ, মহাভারতে জাগল তখন নবজীবনের কলধ্বনি।

প্রায় শতাব্দীকাল পরে ঐতিহাসিক ভারতে এল আবার দ্বিতীয় প্রভাত! আমরা আজ সেই নবপ্রভাতের জয়গান গাইবার জন্যেই আয়োজন করছি।

দীর্ঘরাত্রি শেষে প্রাতঃসন্ধ্যা এসে অন্ধকারের যবনিকা যখন সরিয়ে দিলে, তখন দেখলুম পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বিরাজ করছেন যে রাজা, ইতিহাসে তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত নামে বিখ্যাত (আনুমানিক ৩১৮ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর বাপের নাম ঘটোৎকচ এবং ঠাকুরদাদা ছিলেন শুধু গুপ্ত নামেই পরিচিত।

গুপ্তবংশের উৎপত্তি নিয়ে গোলমাল আছে। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন নীচ জাতের লোক। কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন অহিন্দু।

লিচ্ছবি জাতি বুদ্ধদেবের সময়েই বিখ্যাত হয়েছিল। বৌদ্ধগ্রন্থে প্রসিদ্ধ বৈশালী নগরে ছিল লিচ্ছবিদের রাজ্য। লিচ্ছবিরা আর্য না হলেও সম্ভ্রান্ত ছিল অত্যন্ত এবং তাদের শক্তিও ছিল যথেষ্ট।

এই বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিয়ে করে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মানমর্যাদা এত বেড়ে গেল যে, তুচ্ছ ‘রাজা’ উপাধি আর তাঁর ভালো লাগল না। তিনি গ্রহণ করলেন ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি এবং স্বাধীন নরপতির মতো নিজের ও রানি কুমারদেবীর নামাঙ্কিত মুদ্রারও প্রচলন করলেন।

সঙ্গে সঙ্গে চলল রাজ্য বাড়াবার চেষ্টা। এ চেষ্টাও বিফল হল না। দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই তিরহুত ও অযোধ্যা প্রভৃতি দেশ হস্তগত করে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত প্রমাণ করলেন যে সত্যসত্যই তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভের যোগ্য। ওদিকে তাঁর রাজ্যসীমা গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল (আজ যেখানে এলাহাবাদের অবস্থান) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজ্যাভিষেকের পরে নিজের নামে তিনি এক নতুন অব্দও চালালেন—তা গুপ্তাব্দ বলে পরিচিত।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বেশিদিন রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারেননি। কিন্তু ছোট্ট একটি খণ্ড রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি যখন মাত্র দশ-পনেরো বছরের ভিতরেই নিজের রাজ্যকে প্রায় সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তখন তাঁর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ বীরত্ব ও যথেষ্ট যুদ্ধকৌশলের অভাব ছিল না, এ সত্য বোঝা যায় সহজেই। ম্যাসিদনের অধিপতি ফিলিপ তাঁর সমধিক বিখ্যাত পুত্র আলেকজান্ডারের জন্যে এমন দৃঢ় ভিত্তির উপরে সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন যে বিশেষজ্ঞদের মতে ফিলিপের মতো রাজনীতিজ্ঞ ও যুদ্ধকৌশলী পিতা না পেলে আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ী হতে পারতেন কিনা সন্দেহ! গুপ্তবংশীয় চন্দ্রগুপ্তও আর এক অতি বিখ্যাত পুত্রের পিতা। অতি অল্পদিনে খণ্ড-বিখণ্ড ভারতবর্ষে তিনি এমন এক অখণ্ড ও বিপুল রাজ্য স্থাপন করে গেলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই আকারে ও বলবিক্রমে তা প্রায় সুপ্রসিদ্ধ মৌর্য সাম্রাজ্যের সমান হয়ে উঠেছিল এবং তার স্থায়িত্ব হয়েছিল কিছু কম দুইশত বৎসর! ব্যাপকভাবে ধরলে বলতে হয়, ভারতবর্ষের উপরে গুপ্তযুগের অস্তিত্ব ছিল তিনশত পঞ্চাশ বৎসর!

বলেছি, গুপ্তবংশীয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আবির্ভাব নিশান্তকালে প্রাতঃসন্ধ্যায়। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতের গৌরবময় অপূর্ব সূর্যোদয় তখনও হয়নি। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত তরুণ সূর্যের জন্যে অরুণ আসর সাজিয়ে রাখলেন। তারপরই হল গৌরবময় সূর্যোদয়। আর্যাবর্ত তারপরে আর কখনও দেখেনি তেমন আশ্চর্য সূর্যকে। তারই বিচিত্র কিরণে সৃষ্ট হয়েছিল ভারতের যেসব নিজস্বতা বা বিশেষত্ব, আজও বিশ্বসভায় তাই নিয়ে আমরা গর্ব করে থাকি। ভারতের অমর কালিদাস গুপ্তযুগেরই মানুষ। কেবল কি কালিদাসের কাব্য? ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘মুদ্রারাক্ষস’ প্রভৃতি অতুলনীয় সাহিত্যরত্নের সৃষ্টি গুপ্তযুগেই। প্রাচীনতম পুরাণ ‘বায়ুপুরাণ’ এবং ‘মনুসংহিতা’ও তাই। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতিষজ্ঞ হিসাবে গুপ্তযুগের বরাহমিহির ও আর্যভট্টের নাম বিশ্ববিখ্যাত। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় গুপ্তযুগের প্রতিভাকে প্রমাণিত করবার জন্য আজও বিদ্যমান আছে অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, ভরহুত, অমরাবতী ও শিগিরি প্রভৃতি। দিল্লির বিস্ময়কর লৌহস্তম্ভের জন্ম গুপ্তযুগেই। সংগীতকলাও হয়ে উঠেছিল সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ। কত আর নাম করব?

এতক্ষণ গেল ইতিহাসের কথা। পরের পরিচ্ছেদেই আমাদের গল্প শুরু হবে এবং দেখা দেবেন আমাদের কাহিনির নায়ক।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

মন ছুটেছে সুদূর, সুদূর, সুদূর পারে—
সূর্যালোকে, চন্দ্রকরে, অন্ধকারে।
ইচ্ছা যে তার বিশ্ববাটে ঝোড়ো-হাওয়ার সঙ্গে হাঁটে
বন্দি দেহ উঠছে কেঁদে বন্ধ-দ্বারে!

.

পাটলিপুত্র? সমগ্র ভারতবর্ষে এ নামের তুলনা নেই এবং গৌরবে এই নগর দিল্লির চেয়েও বড়!

ঐতিহাসিক যুগে দিল্লির মর্যাদা বেড়েছে মুসলমান সম্রাটদের দৌলতেই। কিন্তু পাটলিপুত্রের কীর্তিস্তম্ভ রচনা করেছেন ভারতের হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্রাটরাই।

গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে যখন পাটলিপুত্রকে দেখেন, তখন তার মতো বৃহৎ নগর আর্যাবর্তে আর দ্বিতীয় ছিল না।

গ্রিক বর্ণনা থেকে পাটলিপুত্র সম্বন্ধে আরও অনেক কথা জানা যায়। গঙ্গানদী যেখানে শোন নদের সঙ্গে এসে মিলেছে, পাটলিপুত্রের অবস্থান সেইখানেই। আজ পাটলিপুত্রের ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে আছে পাটনা শহর।

সেকালে যেসব নগর থাকত সমুদ্র বা নদীর তীরে, সাধারণত তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করবার সময়ে ইটের বদলে কাঠের ব্যবহারই হত বেশি। কাঠ দীর্ঘকাল স্থায়ী নয়, তাই তখনকার স্থাপত্য শিল্পের কোনও নিদর্শন আজ আর দেখবার উপায় নেই।

প্রকাণ্ড পাটলিপুত্র নগর, তার ভিতরে বাস করে লক্ষ লক্ষ মানুষ। খ্রিস্ট জন্মাবার পাঁচশত বৎসর আগে তার প্রতিষ্ঠা হয়। দৈর্ঘ্যে সে ছিল নয় মাইল এবং প্রস্থে দেড় মাইল। চার চারদিক উঁচু ও পুরু কাঠের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বহিঃশত্রুকে বাধা দেওয়ার জন্যে প্রাচীরগাত্রের সর্বত্রই ছিদ্র ছিল, ভিতর থেকে তিরনিক্ষেপের সুবিধা হবে বলে। প্রাচীরের মাঝে মাঝে ছিল বুরুজ, তাদের সংখ্যা ৬৭০। প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্যে নগরদ্বার ছিল ৬৪টি। প্রাচীরের পরেই যে পরিখাটি নগরকে বেষ্টন করে থাকত সেটি চওড়ায় ছয়শো ফুট এবং গভীরতায় তিরিশ হাত।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাটলিপুত্র তার কোলের উপরে দেখেছিল রাজবংশের পর রাজবংশের উত্থান ও পতন।

গুপ্তবংশের প্রতিষ্ঠার আগে ভারতবর্ষে এসেছিল যখন অন্ধকারযুগ, তখনও পাটলিপুত্র ছিল একটি বিখ্যাত ও বৃহৎ নগর এবং তখনও যিনি পালিপুত্রের সিংহাসন অধিকার করতে পারতেন, লোকচক্ষে তিনি হতেন পৃথিবীরই অধিকারী!

গুপ্তযুগে চিন পরিব্রাজক ফা হিয়েন স্বচক্ষে পাটলিপুত্রকে দেখে যে উজ্জ্বল বর্ণনা করে গেছেন তা পড়লেই বোঝা যায়, মৌর্যবংশের পতনের পরেও সে ছিল গৌরবের উচ্চচূড়ায়।

চতুর্থ খ্রিস্টাব্দেও রাজধানী পাটলিপুত্রের বুকে দাঁড়িয়ে মৌর্য সম্রাট অশোকের প্রস্তরনির্মিত অপূর্ব প্রাসাদ করত পথিকের বিস্মিত দৃষ্টিতে আকর্ষণ! সাধারণের বিশ্বাস ছিল, এ প্রাসাদ মানুষের গড়া নয়!

কেবল কাঠের বাড়ি নয়, পাটলিপুত্র তখন বহু ইটপাথরের বাড়ির জন্যেও গর্ব করতে পারত, কারণ ভারতের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্প তখন যথেষ্ট উন্নতির পথে অগ্রসর হয়েছে।

পথে পথে ছুটছে আরোহীদের নিয়ে উট, অশ্ব, ও রথ! মাঝে মাঝে দেখা যায় রাজহস্তীর শ্রেণি!

রাজপথের এক জায়গায় রয়েছে প্রকাণ্ড একটি হাসপাতাল! তার দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে একজন ঘোষণা করছে :

‘গরিব, অসহায়, পঙ্গু রোগীরা এখানে আগমন করুক। এখানে তাদের যত্ন ও পরিচর্যা করা, চিকিৎসককে দেখানো আর ঔষধ-পথ্য দেওয়া হবে। তারা সম্পূর্ণ আরামে বাস করতে পারবে, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত!’

বলা বাহুল্য, সারা পৃথিবীর কোনও দেশেই তখন এমন হাসপাতাল ছিল না।

পৃথিবীতে প্রথম সরকারি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন বৌদ্ধ সম্রাট অশোক। পাটলিপুত্রের রাজা এখন হিন্দু হলে কি হয়, অশোকের মানবতার প্রভাব তাঁকেও অভিভূত করে। কেবল হাসপাতাল নয়, নগরের নানাস্থানে আরও অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান আছে এবং রাজধানীতে যে বৌদ্ধ প্রভাবও সামান্য নয়, এর প্রমাণ পাওয়া যায় বড় বড় বৌদ্ধ মঠগুলিকে দেখলে। কোনও মঠে থাকেন মহাযান এবং কোনও মঠে হীনযান সম্প্রদায়ভুক্ত বৌদ্ধসন্ন্যাসীরা। সেইসব মঠে বাস করে শত শত শিক্ষার্থীও। সন্ন্যাসীদের পাণ্ডিত্য ছিল এমন অসাধারণ যে ভারতের দূর-দূরান্ত থেকে—এমনকী ভারতের বাহির থেকেও ছাত্ররা আসত বিদ্যালাভ করতে। পাটলিপুত্রের এমনই একটি মঠে থেকে চিনা পরিব্রাজক ফা হিয়েন সংস্কৃত শেখবার জন্যে পুরো তিনটি বৎসর কাটিয়ে দিয়েছিলেন।

পাটলিপুত্রের প্রজারা পরম সুখে কালযাপন করত। ফা হিয়েনের বিবরণ পড়লে মনে হয়, পুরাকালের কল্পিত রামরাজত্বেও প্রজারা এর চেয়ে সুখে বাস করত না। গৃহস্থরা রাত্রে বাড়ির সদর দরজা খোলা রেখেও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পারত—সভ্যতা-গর্বিত ইংরেজ রাজত্বেও আজ যা অসম্ভব। গুরুতর অপরাধের সংখ্যা ছিল এত কম যে প্রাণদণ্ডের কথা লোকে জানতই না। বারংবার ডাকাতি করলে বড় জোর অপরাধীর ডান হাত কেটে নেওয়া হত। কিন্তু এই চরম দণ্ড দেওয়ার দরকার হত না প্রায়ই। অধিকাংশ অপরাধেরই শাস্তি ছিল জরিমানা মাত্র!

নগরের মাঝখানে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ। এটিও পাথরের তৈরি। তার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের চরম উন্নতির যুগে ভারতের যে নিজস্ব শিল্পরীতি অপূর্বতা সৃষ্টি করেছিল পূর্ণ মহিমায়, মহারাজাধিরাজ প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন লাভের আগেই তার প্রথম প্রকাশ দেখা গিয়েছিল। এইটেই স্বাভাবিক। ফুল আগে কুঁড়ির আকারে দেখা না দিয়ে একেবারে ফোটে না। মৌর্য সম্রাট অশোকের যুগেও ভারত-শিল্পের নিজস্ব রীতি আত্মপ্রকাশ করেনি এবং মৌর্য রাজপ্রাসাদ ও ভাস্কর্যের উপরে পারসি প্রভাব ছিল অল্পবিস্তর। তারপর উত্তর ভারতের শিল্পের উপরে পড়ে গ্রিক প্রভাব,—তার প্রমাণ গান্ধার-ভাস্কর্য। কিন্তু তারপর থেকেই ভারত-শিল্পীর দৃষ্টি ফিরে আসতে শুরু করে ঘরের দিকে। সেই দৃষ্টি পরিবর্তনের সুফল দেখি অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, ভরহুত, অমরাবতী ও শিগির প্রভৃতি স্থানে।

রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে একটি তপোবনের মতো মনোরম জায়গা। সেখানে নানা জাতের শত শত তরুলতা করেছে স্নিগ্ধ শ্যামলতা সৃষ্টি, সেখানে ঘাসের নরম গালিচার উপরে খেলা করছে আলো আর ছায়া, সেখানে উপরে বসে গান গায় স্বাধীন বনের পাখি, নীচে নেচে নেচে বেড়িয়ে বেড়ায় ময়ূর ও হরিণের দল, সরোবরে জললীলায় মাতে মরাল-মরালীরা। সরোবরের ধারে একখানি কাঠের বাড়ি, তার সর্বত্র শিল্পীর হাতের কারুকার্য। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন, সেসব কারুকার্য দেখতে কেমন? তাহলে তাঁকে বলব, আজও ভারতে যেসব প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন বিদ্যমান আছে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করতে। কারণ সেসব স্থাপত্য পাথরে গড়া হলেও তাদের শিল্পীরা অনুকরণ করেছে পূর্ববর্তী যুগের কাঠের শিল্পকেই।

সরোবরের জলে মিষ্টি হাওয়ায় আবেশে কেঁপে কেঁপে উঠেছে ফোটা-অফোটা কমলেরা এবং তাদের উপরে ঝরে পড়ছে নরম রোদের সোনালি স্নেহ। ঘাটের সিঁড়ির উপরে বসে একটি তরুণী আনমনে দেখছিল, পদ্মফোটার খবর পেয়ে কোথা থেকে উড়ে আসছে মধুলোভী ভ্রমররা।

এমন সময়ে বাড়ির ভিতরে কার হাতে জেগে উঠল এক মধুর বীণা!

তরুণী হাসিমুখে কান পেতে শুনলে যে এই সুন্দর প্রভাতে আনন্দময়ী ভৈরবী রাগিণীর মধ্যেও যেন কেঁদে কেঁদে উঠছে বীণকারের মন। হাসতে হাসতে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর বাড়ির ভিতরে গেল।

বাগানের ধারে একখানি ঘরে উচ্চ কাষ্ঠাসনে বসে একটি যুবক আপনমনে বীণার তারে তারে করে যাচ্ছে অঙ্গুলিচালনা।

যুবকের বর্ণ শ্যাম, মাথায় কুঞ্চিত কেশদাম, উন্নত কপাল, ডাগর চোখ, টিকেলো নাক, ওষ্ঠাধরের উপরে নতুন গোঁফের রেখা। তার কানে দুলছে হীরকখচিত সুবর্ণকুণ্ডল, গলায় দুলছে রত্নহার, পরনে দামি রেশমি সাজ। তার সুদীর্ঘ দেহের ভিতর থেকে বলিষ্ঠ যৌবনের উদ্দাম শক্তি যেন মাংসপেশীগুলোকে ঠেলে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার দিকে তাকালেই বুঝতে বিলম্ব হয় না যে সে হচ্ছে অসাধারণ যুবক, তার সঙ্গে তুলনা করা চলে এমন মানুষ দুর্লভ।

যুবক দুই চোখ মুদে এমন একমনে বীণা বাজাচ্ছিল যে জানতেও পারলে না, তরুণী ঘরে ঢুকে একেবারে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

তরুণী হাসিমুখে ডাকলে, ‘চন্দ্রপ্রকাশ!’

যুবক চমকে উঠে চোখ খুলে তরুণীর দিকে তাকালে,—কিন্তু সে দৃষ্টি দেখলে মনে হয়, তার স্বপ্নমাখা চোখ যেন তরুণীকে ছাড়িয়ে, ঘরের দেওয়াল ভেদ করে চলে গিয়েছে দূরে, বহুদূরে!

‘চন্দ্রপ্রকাশ!’

‘পদ্মাবতী!’ একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে যুবক বীণার তার থেকে হাত তুললে।

‘চন্দ্রপ্রকাশ, তুমি আমার বাবার যোগ্য ছাত্রই বটে! ভোরবেলার শাস্ত্র অধ্যয়নের সময়ে বীণা বাজিয়ে কান্না শুরু করেছ!’

‘তাহলে আমার কান্না তুমি শুনতে পেয়েছ?’

‘কান্না তো তোমার নিত্যই শুনি, দিনে দিনে তুমি যেন হাসিকে ভুলে যেতে বসেছ!’

‘না পদ্মা, এ আমার মনের কান্না নয়, এ হচ্ছে আমার দেহের কান্না!’

‘দেহের কান্না?’

‘হ্যাঁ, বন্দি দেহের কান্না। আমার যৌবনের কান্না!’

‘যৌবন তো হাসে চন্দ্রপ্রকাশ, যৌবন তো কাঁদে না?’

‘হাসতে পারে কেবল স্বাধীন যৌবন। দেহের সঙ্গে আমার যৌবনও অলস হয়ে গণ্ডির ভিতরে বন্দি হয়ে আছে। এ গণ্ডি আমি ভাঙতে চাই, কিন্তু পারছি না।’

‘তাই এমন সুন্দর প্রভাতটিতে তোমার কান্নার সুরে ভরিয়ে তুলতে চাও?’

‘তাছাড়া আর কী করতে পারি পদ্মা? মহারাজ চান, আমি তোমার পিতার শিষ্য হই। তোমার পিতা চান শাস্ত্রালোচনা করে আমি ধার্মিক হই। কিন্তু আমি চাই বিশ্বের রাজপথে মহাপ্রস্থান করতে।’

‘মহাপ্রস্থান করতে? তুমি আর ফিরতে চাও না?’

‘ঠিক তা নয় পদ্মা ফিরতে পারি, সফল যদি হই—স্বপ্ন যদি সত্য হয়।’

‘যুবরাজ—’

‘আবার তুমি আমার নাম না ধরে আমাকে যুবরাজ বলে ডাকছ? কে যুবরাজ? জানো আমার বৈমাত্রেয় ভাই কচ আছেন?’

‘কিন্তু প্রজারা তাঁকে চায় না।’

‘থাক, ওসব কথা নিয়ে আলোচনার দরকার নেই। তার চেয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপটি করে ওইখানে গিয়ে বসো। আমার স্বপ্নকাহিনি শোনো। বিচিত্র এই স্বপ্ন—এর মধ্যে আছে মহাভারতের কণ্ঠস্বর!’

এই চন্দ্রপ্রকাশ কে? মগধের রাজপুত্র। পাটলিপুত্র এঁকে আরও দুই নামে জানে—বালাদিত্য, পরাদিত্য।

পদ্মাবতী হচ্ছেন বৌদ্ধ শাস্ত্রকার ও চন্দ্রপ্রকাশের শিক্ষাগুরু বসুবন্ধুর পালিতা কন্যা, রাজপুত্রের বান্ধবী।

তৃতীয় অধ্যায়

জীর্ণ-জরার নাট্যশালায় জাগ্রত হও রুদ্র!
ভারত ভরে অগ্নি কর বৃষ্টি!
“উড়ুক হাতে মৃত্যু-নিশান, মরুক যত ক্ষুদ্র,—
তবেই হবে নতুন প্রাণের সৃষ্টি।

পদ্মাবতী একখানি আসন গ্রহণ করে বললে, ‘চন্দ্রপ্রকাশ, প্রভাত হচ্ছে জাগরণের কাল। স্বপ্নের কথা এখন ভুলে যাও।’

চন্দ্রপ্রকাশ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না পদ্মা, এখন প্রভাত এলেও বিশাল ভারত আর জাগে না। এমন গভীর তার ঘুম যে স্বপ্ন দেখবার শক্তিও তার নেই। এই ঘুমন্ত আর্যাবর্তে আজ স্বপ্ন দেখছে কেবল দুজন লোক।’

পদ্মাবতী হেসে বললে, ‘বুঝতে পারছি, দুজনের একজন হচ্ছ তুমি। আর একজন কে?’

‘আমাদের পিতৃদেব, মহারাজাধিরাজ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।’

‘তিনিও স্বপ্ন দেখেন নাকি?’

চন্দ্রপ্রকাশ পরিপূর্ণ স্বরে বললেন, ‘নিশ্চয়! নইলে মগধ সাম্রাজ্য আজ গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারত না। এই সাম্রাজ্য বিস্তার সম্ভব হয়েছে স্বপ্নাদেশের ফলেই।’

পদ্মাবতী কৌতূহলী স্বরে বললে, ‘চন্দ্রপ্রকাশ, তোমাদের স্বপ্নের কথা শোনবার জন্যে আমার আগ্রহ হচ্ছে। কী স্বপ্ন তুমি দেখ?’

‘আমি সেই স্বপ্ন দেখি পদ্মা, মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত যা দেখেছিলেন।’

‘আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো।’

‘কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের পরে ভারতের ক্ষাত্রধর্ম বহু যুগ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর সেই দুর্বলতার সুযোগে পঙ্গপালের মতো যবন সৈন্যের পর যবন সৈন্য এসে ছেয়ে ফেলেছিল আর্যাবর্তের বুক। চারিদিকে তুচ্ছ যত খণ্ডরাজ্য—তারা কেউ কারুকে মানে না, তাদের কেউ জানে না একতার মাহাত্ম্য! পরস্পরের কাছ থেকে দু-চারটে গ্রাম বা নগর কেড়ে নিয়েই তারা আত্মপ্রসাদ লাভ করত। মাথার উপরে ঝুলত যখন যবন-দিগবিজয়ীর তরবারি, তখনও হত না তাদের চেতনা! নির্লজ্জের মতো যবনের আনুগত্য স্বীকার করে রাজারা যদি নিজেদের মুকুট বাঁচাতে পারতেন, তাহলেই হতেন পরম পরিতৃপ্ত। সাড়ে ছয়শো বৎসর আগে এই অধমদের মধ্যেই আবির্ভূত হয়েছিলেন মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত—চক্ষে ছিল তাঁর অখণ্ড মহাভারতের স্বপ্ন। নিজের জীবনেই তিনি সফল করেছিলেন তাঁর সেই অপূর্ব স্বপ্নকে! আমি তাঁকে ভীমার্জুনের চেয়ে মহাবীর বলে মনে করি।’

পদ্মাবতী বিস্মিত স্বরে বললে, ‘চন্দ্রপ্রকাশ, তুমিও কি আবার সেই অসম্ভব স্বপ্ন দেখতে চাও?’

‘যা একবার সম্ভবপর হয়েছে, তাকে অসম্ভব বলছ কেন পদ্মা? মৌর্য চন্দ্রগুপ্তও এই মগধের সন্তান। আর সেই স্বপ্নকে আবার সত্যে পরিণত করতে চান বলেই হয়তো আমার পিতৃদেবও চন্দ্রগুপ্ত নাম ধারণ করেছেন।’

পদ্মাবতী বললে, ‘কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য কি আর পূর্ণ হবে? মহারাজা একে বৃদ্ধ হয়েছেন, তার উপরে কঠিন ব্যাধির আক্রমণে শয্যাগত। ভগবান বুদ্ধদেবের কৃপায় তিনি রোগমুক্ত হলেও এই বয়সে আর কি সারা ভারতের উপরে এক ছত্র তুলে ধরতে পারবেন?’

চন্দ্রপ্রকাশ দৃপ্তস্বরে বললেন, ‘পিতার পুনর্জন্ম হয় পুত্রের মধ্যেই। মহারাজ যে ব্রত গ্রহণ করেছেন, তা উদ্যাপন করব আমিই। ভারতের দিকে দিকে আজ দুর্বল হস্তে রাজদণ্ড ধারণ করে আছে শত শত নগণ্য রাজা। তাদের মন সংকীর্ণ, চোখ অন্ধ, চরণ গণ্ডির ভিতরে বন্দি। তাদের কেউ হচ্ছে শক, কেউ হচ্ছে যবন, কেউ হচ্ছে দ্রাবিড়ী। তাদের অবহেলায় ভারতের ক্ষত্রিয় ধর্ম, প্রাচীন সভ্যতা, সাহিত্য, শিল্প, দর্শন, বিজ্ঞান একেবারে অধঃপাতে যেতে বসেছে। সম্রাট অশোকের যুগে আর্যাবর্তের নামে সারা পৃথিবীর মাথা শ্রদ্ধায় নত হয়ে পড়ত, কিন্তু আজ ভারতকে কেউ চেনে না। আর্যাবর্তেই আর্য-আদর্শ নেই। দীর্ঘকাল অনার্য, শকদের কবলে পড়ে ভারতের অমর আত্মাও আজ মর মর, অচেতন। ভারতব্যাপী এই ক্ষুদ্রতার উপর দিয়ে আমি জ্বলন্ত উল্কার মতো ছুটে যেতে চাই, চারিদিকে আগুন ছড়াতে ছড়াতে! আমি নিষ্ঠুর হব, ভয়ানক হব, আগে করব ধ্বংস—কেবল ধ্বংস আর ধ্বংস আর ধ্বংস! তারপর সেই সমস্ত জড়তা, দীনতা, হীনতা আর ক্ষুদ্রতার রক্তাক্ত ধ্বংস্তূপের মধ্যে বসে আবার আমি গড়ে তুলব আমার স্বপ্নে দেখা সত্যিকার ভারতকে!’

হঠাৎ চলন্ত কাষ্ঠপাদুকার শব্দ উঠল। চন্দ্রপ্রকাশ ভাবের আবেগে প্রায় বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে নিজের মনের কথা বলে যাচ্ছিলেন, সে শব্দ তিনি শুনতে পেলেন না। কিন্তু পদ্মাবতী খড়মের আওয়াজ পেয়েই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘চুপ করো চন্দ্রপ্রকাশ, চুপ করো! বাবা আসছেন!’

পীতবস্ত্র ও উত্তরীয়ধারী বৌদ্ধশাস্ত্রজ্ঞ এবং বিখ্যাত গ্রন্থকার বসুবন্ধু ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর মাথার চুল ও দাড়ি-গোঁফ কামানো, বয়স ষাটের কম নয়। মুখখানি প্রশান্ত—যদিও সেখানে এখন ফুটে উঠেছে বেদনার আভাস!

ঘরে ঢুকে বসুবন্ধু একবার চন্দ্রপ্রকাশের উত্তেজিত মুখের দিকে তাকালেন। তারপর একটু নীরব থেকে বললেন, ‘বৎস, আসতে আসতে আমি তোমার কথা শুনতে পেয়েছি। আমার এই আশ্রমে বসে তুমি ধ্বংসের মন্ত্র উচ্চারণ করছ!’

চন্দ্রপ্রকাশ মুখ নামিয়ে বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ গুরুদেব! আমি ধ্বংস করতে চাই ভারতব্যাপী দীনতা আর জড়তাকে!’

মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বসুবন্ধু বললেন, ‘আমারও সেই কর্তব্য। জ্ঞানের আলো দেখিয়ে আমি হীনকে করে তুলতে চাই মহৎ। কিন্তু তুমি কীসের সাহায্যে দীনতা আর জড়তাকে ধ্বংস করবে?’

‘গুরুদেব, আমি রাজপুত্র। আমার অবলম্বন তরবারি।’

দুঃখিত স্বরে বসুবন্ধু বললেন, ‘আমি তোমাকে শাস্ত্রশিক্ষা দিয়েছি বৎস, অস্ত্রশিক্ষা দিইনি। আমার শাস্ত্র রচনা করেছেন ভগবান বুদ্ধদেব, সর্বজীবে অহিংসাই ছিল যার বাণী।’

‘আবার বলি গুরুদেব, আমি রাজপুত্র। রাজধর্ম হচ্ছে রাজ্যবিস্তার করা। তরবারি কোশবদ্ধ থাকলে রাজধর্ম পালন করা হয় না।’

‘বৎস, তুমি ভুল বলছ। সম্রাট অশোক কি রাজধর্ম পালন করেননি? তাঁর অধীনে কি বিরাট ভারত-সম্রাজ্য পৃথিবীতে অতুলনীয় হয়ে ওঠেনি? তিনি কি অস্ত্র ত্যাগ করে অহিংসার আশ্রয় নেননি?’

চন্দ্রপ্রকাশ বললেন, ‘কলিঙ্গ যুদ্ধের পর সম্রাট অশোককে আর রাজ্যবিস্তার করতে হয়নি, সে কর্তব্য প্রায় শেষ করে গিয়েছিলেন তাঁর পিতামহ চন্দ্রগুপ্তই। কিন্তু সম্রাট অশোক তরবারি ত্যাগ করেছিলেন বলেই তাঁর মৃত্যুর পরেই হয়েছিল মৌর্যসাম্রাজ্যের পতন।’

বসুবন্ধু বললেন, ‘আমার কাছে সাম্রাজ্যের পতন খুব বড় কথা নয় রাজকুমার! আমি চাই কেবল আত্মাকে পতন থেকে রক্ষা করতে। রক্তসাগরে সাঁতার দেয় পশুর আত্মাই, সেখানে ঠাঁই নেই মনুষ্যত্বের! বৎস, তোমাকে এই শিক্ষাই আমি বার বার দিয়েছি, আমার শিক্ষা কি তবে ব্যর্থ হবে?’

চন্দ্রপ্রকাশ কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘গুরুদেব, সিংহের শিশু কি নিরামিষের ভক্ত হতে পারে? অস্ত্রহীন ক্ষত্রিয় সন্তান, একথা কি কোনওদিন কল্পনাতেও আসে? প্রেমের মন্ত্রে বিশ্বের হৃদয় জয় করা যায়, ভগবান বুদ্ধদেব যা করে গেছেন। কিন্তু ভারতব্যাপী হিংস্র পশুত্বকে দমন করতে পারে কেবল শক্তির মন্ত্র। কুরুক্ষেত্রে অর্জুন যদি অস্ত্রত্যাগ করতেন, তাহলে কে করত এখানে ধর্মরাজ্য স্থাপন? চন্দ্রগুপ্তের তরবারি যদি হিন্দুস্থানের সমস্ত দীনতাকে হত্যা না করত, তবে কী করে প্রতিষ্ঠিত হত অশোকের প্রেমধর্ম? গুরুদেব, গুরুদেব, আগে আমাকে আগাছা কেটে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে দিন, তারপর সেখানে ছড়াবেন আপনার প্রেমের বীজ।’

ঘরের বাইরে হঠাৎ দ্রুত পদশব্দ উঠল। তারপরেই দরজার কাছে এসে অভিবাদন করলে এক রাজভৃত্য। তার মুখেচোখে দারুণ দুর্ভাবনার চিহ্ন।

চন্দ্রপ্রকাশ উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে? তুমি এখানে কেন?’

‘মহারাজের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, তাঁর অন্তিমকাল উপস্থিত। মহারাজা আপনাকে স্মরণ করেছেন!’

চন্দ্রপ্রকাশ তাড়াতাড়ি বসুবন্ধুর চরণে প্রণাম করে বললেন, ‘গুরুদেব, গুরুদেব। আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার! মগধের মঙ্গলের জন্যে ভগবান বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করুন!’ তারপরে উঠেই ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গেলেন।

বসুবন্ধু চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললেন, ‘পদ্মা, সত্যই আজ মগধের অতি দুর্দিন! মহারাজের যদি মৃত্যু হয়, তবে সিংহাসনে বসবে কে? চন্দ্রপ্রকাশ, না তার বৈমাত্রেয় ভাই কচ?’

পদ্মাবতী বললেন, ‘প্রজারা চন্দ্রপ্রকাশকেই যুবরাজ বলে জানে, আর মহারাজের উপরে চন্দ্রপ্রকাশের মা কুমারদেবীর প্রভাব কত বেশি, সে কথা তো আপনিও জানেন বাবা!’

বসুবন্ধু বললেন, ‘কিন্তু রাজকুমার কচ তো শান্ত মানুষ নন, নিজের দাবি তিনি ছাড়বেন বলে মনে হয় না! পদ্মা, মগধ রাজ্যে শীঘ্রই মহা অশান্তির সম্ভাবনা—ভ্রাতৃবিরোধ, ঘরোয়া যুদ্ধ, রক্তপাত!’

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

ক্ষুদ্র কাজে মরতে যে চায়
হয় সে পশু, নয় সে দানব।
বৃহৎ ব্রত-উদযাপনে
মরতে পারে কেবল মানব!

.

পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদ ঘিরে রয়েছে আজ বিরাট জনতা। উৎসব করে জনতা সৃষ্টি, কিন্তু এ উৎসবের জনতা নয়। কারণ জনতার প্রত্যেকেরই মুখে-চোখে রয়েছে আসন্ন বিপদের আভাস।

রাজবাড়ির সিংহদ্বারের পিছনে ও প্রাঙ্গণের উপরে দেখা যাচ্ছে সজ্জিত ও সশস্ত্র সৈন্যের জনতা, সেখানে অসংখ্য শূল ও নগ্ন তরবারির উপরে প্রভাত-সূর্য জ্বেলে দিয়েছে যেন অসংখ্য বিদ্যুৎ-দীপের চঞ্চল শিখা!

রাজবাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার নাগরিক এবং দেখলেই বোঝা যায় শোক ও দুশ্চিন্তায় তারা অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছে।

কাতর হওয়ারই কথা। কেবল মহারাজাধিরাজ চন্দ্রগুপ্তের অন্তিমকাল উপস্থিত হয়েছে বলেই প্রজারা ভবিষ্যতের দুর্ভাবনায় এমন ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এই প্রজাবৎসল মহারাজাকে তারা সবাই ভালোবাসত বটে, কিন্তু একথাও সকলে জানত যে কাল পূর্ণ হলে পৃথিবীতে কেউ বর্তমান থাকতে পারে না। তাদের দুর্ভাবনার অন্য কারণ আছে।

আমরা যে যুগের কথা বলতে বসেছি তখন পৃথিবীর সব দেশেই রাজার মৃত্যু হলে প্রজার আতঙ্কের সীমা থাকত না। কারণ প্রায়ই মৃত রাজার সিংহাসন লাভের জন্য রাজপুত্রদের ও রাজবংশীয় অন্যান্য লোকদের মধ্যে ঘরোয়া যুদ্ধের অবতারণা হত এবং সেই যুদ্ধ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ত সমস্ত রাজ্যের মধ্যে। নতুন রাজাকে সিংহাসনে বসতে হত মানুষের রক্ত-সমুদ্রে সর্বাঙ্গ ডুবিয়ে।

তাই এই সংকট-মুহূর্তে সমগ্র পাটলিপুত্রের প্রজারা আজ রাজবাড়ির কাছে ছুটে এসেছে এবং উত্তেজিতভাবে অদূর-ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে করছে নানান রকম জল্পনা-কল্পনা।

এমন সময়ে অদূরে দেখা গেল, বিবর্ণ মুখে দ্রুতপদে এগিয়ে আসছেন রাজকুমার চন্দ্রপ্রকাশ।

সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দিয়ে জনতা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দূরে সরে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক থেকে চিৎকার উঠল—’জয়, যুবরাজের জয়!’

চন্দ্রপ্রকাশ সিংহদ্বারের সামনে গিয়ে বিস্মিত নেত্রে দেখলেন, তাঁর পথ জুড়ে অটল প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে একদল সশস্ত্র প্রহরী।

তিনি অধীর স্বরে বললেন, ‘তোমরা মূর্খের মতো পথ বন্ধ করে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’

প্রহরীদের দলপতি এক পা না সরেই বললে, ‘রাজবাড়ির ভিতরে এখন আর কারুর ঢুকবার আদেশ নেই।’

ক্রুদ্ধস্বরে চন্দ্রপ্রকাশ বললেন, ‘আদেশ নেই! কে দিলে এই আদেশ?’

‘মগধ রাজ্যের যুবরাজ।’

জনতার ভিতর থেকে চিৎকার করে কে বললে, ‘মূর্খ দৌবারিক! পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াও। মগধের যুবরাজকে সামনে দেখেও চিনতে পারছ না?’

প্রহরী নির্ভীক কণ্ঠে বললে, ‘মগধের যুবরাজ হচ্ছেন কচগুপ্ত। আমরা তাঁরই আদেশ মানব।’

চন্দ্রপ্রকাশ বললেন, ‘মহারাজা আমাকে আহ্বান করেছেন। তোমরা যদি পথ না ছাড়, আমি কোশ থেকে তরবারি খুলতে বাধ্য হব।’

প্রহরী দৃঢ়স্বরে বললে, ‘আমরাও তা হলে রাজকুমারকে বাধা দিতে বাধ্য হব।’

চন্দ্রপ্রকাশ কিছু বলার আগেই জনতার ভিতর থেকে জেগে উঠল বহু কণ্ঠে ক্রুদ্ধ গর্জনধ্বনি। তুচ্ছ এক প্রহরী মগধের রাজকুমারের মুখের উপরে স্পর্ধার কথা বলতে সাহসী হয়েছে দেখে অনেকে তাকে আক্রমণ করবার জন্যে ছুটে এল। প্রহরীরাও আত্মরক্ষা করবার জন্যে প্রস্তুত হল।

তখন কী রক্তাক্ত দৃশ্যের সূচনা হত বলা যায় না, কিন্তু সেই মুহূর্তেই রাজবাড়ির ভিতর থেকে ছুটে এলেন এক প্রাচীন পুরুষ—তাঁর মাথায় শুভ্র কেশ, মুখে শুভ্র শ্মশ্রু, পরনে বহুমূল্য শুভ্র পোশাক। সকলেই চিনলে, তিনি হচ্ছেন মগধের প্রধানমন্ত্রী।

প্রহরীরা সসম্মানে তাঁকে অভিবাদন করলে।

মন্ত্রী বললেন, ‘এ কী বীভৎস ব্যাপার! উপরে মুমূর্ষু মহারাজ, আর এখানে এই অশান্তি!’

দৌবারিকদের নেতা বললে, ‘আমরা কী করব প্রভু? যুবরাজের আদেশেই আমরা দ্বার রোধ করে দাঁড়িয়ে আছি!’

মন্ত্রী মহাশয় দুই ভুরু সঙ্কুচিত করে বললেন, ‘মহারাজা জীবিত থাকতে এ রাজ্যে তাঁর উপরে আর কারুর কথা বলবার অধিকার নেই। মহারাজ স্বয়ং রাজকুমার চন্দ্রপ্রকাশকে স্মরণ করেছেন। যদি মঙ্গল চাও, তাহলে এখনই তোমরা রাজকুমারের পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াও!’

প্রহরীরা একবার পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে। তারপর পথ ছেড়ে দিলে বিনা বাক্যব্যয়ে।

চন্দ্রপ্রকাশ কোনওদিকে না তাকিয়েই ছুটে চললেন রাজবাড়ির দিকে এবং যেতে যেতে ভাবতে লাগলেন, মহারাজা এখনও পৃথিবীতে বর্তমান, কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কত বড় একটা ষড়যন্ত্রের আয়োজন হয়েছে!

মহারাজের শয়ন-আগারে উপস্থিত হয়ে দেখলেন সুবর্ণখচিত ও হস্তীদন্তে অলঙ্কৃত প্রশস্ত পালঙ্কের উপরে দুই চোখ মুদে শুয়ে আছেন মহারাজাধিরাজ চন্দ্রগুপ্ত—তাঁর মুখে আসন্ন মৃত্যুর ছায়া। মহারাজের শিয়রের কাছে পাখা হাতে করে সাশ্রুনেত্রে বসে আছেন পাটরানি ও চন্দ্রপ্রকাশের মা কুমারদেবী এবং তাঁর পাশে অন্যান্য রানি ও পুরমহিলারা। পালঙ্কের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন রাজপুত্র কচ এবং ঘরের ভিতরেই খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন অমাত্য ও বড় বড় রাজকর্মচারী।

চন্দ্রপ্রকাশ ছুটে গিয়ে একবারে খাটের পাশে নতজানু হয়ে বসে পড়ে অশ্রুজলে গাঢ়স্বরে ডাকলেন, ‘মহারাজ, মহারাজ!’

চন্দ্রগুপ্ত সচমকে চোখ খুললেন, তাঁর মৃত্যুকাতর মুখও হাস্যে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠল। ক্ষীণ স্বরে তিনি বললেন, ‘চন্দ্রপ্রকাশ, এতক্ষণ আমি তোমারই অপেক্ষায় ছিলুম!’

‘মহারাজ!’

‘পৃথিবীর রাজ্য আমি পৃথিবীতেই রেখে যাচ্ছি বৎস, এখন আমাকে আর মহারাজ বলে ডেকো না। বলো, বাবা!’

‘বাবা, বাবা!’

‘হ্যাঁ, ওই নামই বড় মিষ্টি।…মন্ত্রীমশাই, আমার হাতে আর বেশি সময় নেই, যা বলি মন দিয়ে শুনুন। আপনারা সবাই এখানে জানতে এসেছেন, আমার অবর্তমানে মগধের সিংহাসনের অধিকারী হবেন কে? তাহলে চেয়ে দেখুন এই চন্দ্রপ্রকাশের—এই মহৎ যুবকের দিকে। বিদ্যা, বুদ্ধিতে অদ্বিতীয়, বীরত্বে আর চরিত্রবলে অসাধারণ চন্দ্রপ্রকাশকে আপনারা সকলেই জানেন। এখন বলুন, চন্দ্রপ্রকাশ কি অযোগ্য ব্যক্তি?’

মন্ত্রীগণ ও অন্যান্য সভাসদদের ভিতর থেকে নানা কণ্ঠে শোনা গেল, ‘নিশ্চয়ই নয়, নিশ্চয়ই নয়!’—’মহারাজের জয় হোক!’—’আমরা ওঁকেই চাই!’ প্রভৃতি।

চন্দ্রগুপ্ত বললেন, ‘এটাও কারুর অবিদিত নেই যে পবিত্র আর মহা সম্ভ্রান্ত লিচ্ছবি বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করেই আজ আমার এত মানমর্যাদা। মগধের রাজধানী এই পাটলিপুত্রও আমি যৌতুকরূপে পেয়েছি সেই বিবাহের ফলে। সুতরাং কুমারদেবীর পুত্রেরও পাটলিপুত্রের সিংহাসনের উপরে একটা যুক্তিসঙ্গত দাবি আছে। নয় কি মন্ত্রীমশাই?’

প্রধানমন্ত্রী উৎসাহিত স্বরে বললেন, ‘মহারাজ, আপনার আদেশ এ রাজ্যের সবাই সানন্দে মাথা পেতে গ্রহণ করবে। সমস্ত মগধরাজ্যে রাজকুমার চন্দ্রপ্রকাশের চেয়ে যোগ্য লোক আর দ্বিতীয় নেই।’

চন্দ্রগুপ্ত সস্নেহে চন্দ্রপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাছা, শেষ নিশ্বাস ফেলবার আগে আমি তোমাকে একবার আলিঙ্গন করতে চাই।’

চন্দ্রপ্রকাশ কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়িয়ে পিতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চন্দ্রগুপ্তের চোখও অশ্রুসজল।

এইভাবে কিছুক্ষণ থেকে চন্দ্রগুপ্ত হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘চন্দ্রপ্রকাশ, উঠে দাঁড়াও!’

পিতার কণ্ঠস্বর পরিবর্তনে বিস্মিত হয়ে চন্দ্রপ্রকাশ শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘পিতা?’

‘প্রতিজ্ঞা করো!’

‘কী প্রতিজ্ঞা, পিতা?’

চন্দ্রগুপ্ত নিজের সব শক্তি একত্র করে পরিপূর্ণ স্বরে বললেন, ‘কঠোর প্রতিজ্ঞা! জানো চন্দ্রপ্রকাশ, আমার জীবনের একমাত্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, বিপুল আর্যাবর্ত জুড়ে করব একচ্ছত্র সাম্রাজ্য বিস্তার, কাপুরুষ সংহার, যবন দমন। মহাভারতে আবার ফিরিয়ে আনব সেই কতকাল আগে হারানো ক্ষাত্র যুগকে! কিন্তু কী সংক্ষিপ্ত এই মানুষজীবন! যে ব্রত গ্রহণ করেছিলুম তা সাঙ্গ করে যাওয়ার সময় পেলুম না, তাই আমি তোমাকে এই পৃথিবীতে রেখে যেতে চাই আমারই প্রতিনিধি রূপে। পাটলিপুত্রের সিংহাসন পেয়ে তোমার প্রথম কর্তব্য হবে, দিগবিজয়ীর ধর্ম পালন করা, স্বাধীন ভারতে আবার আর্য আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা। পারবে?’

চন্দ্রগুপ্তের দুই চরণ স্পর্শ করে চন্দ্রপ্রকাশ সতেজে বললেন, ‘পারব পিতা, পারব! আপনার আশীর্বাদে ক্ষুদ্র ভারতকে আবার আমি মহাভারত করে তুলতে পারব! যতদিন না আর্যাবর্ত জুড়ে স্বাধীন ভারত-সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারি, ততদিন পাটলিপুত্রে আর ফিরে আসব না—এই আমি প্রতিজ্ঞা করছি!’

আনন্দে বিগলিত স্বরে চন্দ্রগুপ্ত বললেন, ‘আশীর্বাদ করি পুত্র, তুমি সক্ষম হও—ভারত আবার ভারত হোক!’—বলতে বলতে তাঁর দুই চোখ মুদে এল, উপাধানের একপাশে তাঁর মাথাটি নেতিয়ে পড়ল। গুপ্ত রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত ইহলোক থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন।

ঘরের ভিতরে পুরললনা ও রানিদের কণ্ঠে জাগল উচ্চ হাহাকার! কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই সেই শোকার্তনাদকে ডুবিয়ে বাইর থেকে ছুটে এল বিপুল জনকোলাহল এবং সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রঝঞ্ঝনা। প্রধানমন্ত্রী দৌড়ে গবাক্ষের ধারে গিয়ে দেখে বললেন, ‘এ কি প্রজাবিদ্রোহ?’

অতি দ্রুতপদে বাইর থেকে একজন প্রাসাদ-প্রহরী ভয়বিহ্বল মুখে এসে খবর দিলে, ‘শত শত সৈন্য নিয়ে রাজপুত্র কচ প্রাসাদের ভিতরে ছুটে আসছেন।’

চন্দ্রপ্রকাশ সচকিত নেত্রে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝলেন, ইতিমধ্যে সকলের অগোচরে কচ কখন ঘরের ভিতর থেকে অদৃশ্য হয়েছেন।

পালঙ্কের উপর থেকে নেমে এসে কুমারদেবী বললেন, ‘চন্দ্রপ্রকাশ, কচ আসছে তোমাকেই বন্দি বা বধ করতে। কিন্তু কচকে আমি চিনি, এর জন্যেও আমি প্রস্তুত ছিলুম। শীঘ্র তুমি রাজবাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও। সেখানে আমার পিত্রালয়ের লিচ্ছবি সৈন্যরা তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে গঙ্গা পার হয়ে ভবিষ্যতের জন্যে প্রস্তুত হও।’

চন্দ্রপ্রকাশ বললেন, ‘তা হয় না মা। আমি কাপুরুষ নই, সিংহাসন পেয়ে প্রথমেই পলায়ন করা আমার শোভা পায় না।’

কুমারদেবী বিরক্ত স্বরে বললেন, ‘আমি তোমার মা, আমার আদেশ পালন করো। মহারাজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগে, তাঁর মৃতদেহের পাশে ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি আমি সহ্য করব না। তার উপরে এইমাত্র মহারাজের পা ছুঁয়ে তুমি কী প্রতিজ্ঞা করেছ মনে রেখো। নির্বোধের মতো তুচ্ছ ঘরোয়া যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া আর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা হবে তোমার পক্ষে একই কথা। নিজের প্রাণকে রক্ষা করো উচ্চতর কর্তব্যপালনের জন্যে। যাও, যাও চন্দ্রপ্রকাশ। ওরা যে এসে পড়ল!’