ছয়
সন্ধেবেলায় ডকের পাশে এক পিকনিক টেবিলে বসল ছেলে- মেয়েরা। ক্যাম্প এখন শান্ত-নিরিবিলি। ক্যাম্পারদের অনেকে কেবিনে শুয়ে-বসে আর বই পড়ে সময় কাটাচ্ছে। অন্যরা ক্র্যাফট প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত-ছবি আঁকা, ম্যাক্রামি, মাটির কাজ।
মুসা ওদেরকে জানাল ক্যাথি অ্যালেন, জো ইলিয়ট আর নিল স্যাণ্ডার্সের প্রতি ওর সন্দেহের কথা। সব শুনে একটুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল।
‘কেউ কিছু ধারণা করতে পারছ?’ জিজ্ঞেস করল ও, পানির ওপর এক চ্যাপ্টা পাথর ছুঁড়তে দেখল ডনকে।
কিশোরকে চিন্তামগ্ন দেখাল।
‘এগুলোর পেছনে হয়তো কোন যুক্তি আছে।’
‘জো ইলিয়টকে আমি শার্টের ভেতর মাছ ঢোকাতে দেখেছি, সেটা মনে রেখো,’ বলল ডন।
হেসে উঠল রবিন।
‘ওটা মাছ না-ও হতে পারে, ডন,’ বলল। ‘নমুনা সংগ্রহের দিন লোকটা কিছু একটা লুকিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
‘হ্যাঁ,’ সায় জানাল সু কি। ‘কিন্তু ক্যাথি অ্যালেনের ব্যাপারটা কী? জয়েস ওর পায়ে খামচি দিয়েছে আমার বিশ্বাস হয় না।’
‘হুম, ব্যাপারটা আজব,’ বলল নথি। ‘কিন্তু মহিলা মিথ্যে বলবে কেন?’ হঠাৎই ওর মনে পড়ল এমার দ্বীপে প্রথমবার বেড়াতে যাওয়ার কথা। কোমরে তোয়ালে জড়িয়েছিল ওরা ঘন ঝোপ-ঝাড়ের খোঁচা থেকে বাঁচতে। ‘ম্যানগ্রোভ গাছপালা!’ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল ও।
‘ক্যাথি অ্যালেন যদি এমার দ্বীপ থেকে প্রবাল চুরি করতে গিয়ে পায়ে খোঁচা খায়, তবে কথাটা চেপে যাবে। আঁচড়ের দাগের কোন একটা ব্যাখ্যা দিতে হবে, তাই দায় চাপিয়েছে জয়েসের ওপর।
‘কিন্তু মহিলা দ্বীপে গেল কীভাবে?’ কিশোরের প্রশ্ন। ‘শুধুমাত্র কাউন্সেলরদেরই নৌকা ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।’
‘রাতের বেলা সবাই যখন ঘুমোচ্ছে তখন হয়তো চুপিচুপি গেছে,’ সু কি বাতলে দিল।
‘আমি পানিতে এক রাতে আলো দেখেছি!’ বলল ডন, দলটার দিকে ফিরে চাইল। ‘ওটাকে কি কোন সূত্র বলা যায়?’
মুচকি হাসল রবিন।
‘রাতে সাগরে অনেক নৌকাই বেরোতে পারে, ডন এবং সবারই আলো থাকে।’ ডনের মুখে হতাশার ছাপ দেখে আরও বলল, ‘তবে এটা জরুরী কোন সূত্রও হতে পারে, ডন। আমরা এটার কথা মনে রাখব।’
এক পাম গাছে হেলান দিয়ে সাঁঝের কালচে আকাশের দিকে দৃষ্টি মেলে দিল কিশোর।
‘আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ল এইমাত্র। প্রথম দিন দ্বীপে আমি একটা বাটালি খুঁজে পেয়েছিলাম না? চোর হয়তো ফেলে গেছে ওটা।’
‘তাই তো,’ বলে উঠল নথি। ‘কোস্ট গার্ডের মিস্টার সোবার্সকে কথাটা জানাতে হবে তো। তিনি নিশ্চয়ই কাল আবার আসবেন-’
হঠাৎই আবছায়া থেকে বেরিয়ে এল এক লিকলিকে অবয়ব।
‘সন্ধেটা চমৎকার, তাই না?’ রিনা ইলিয়ট ডনের উদ্দেশে মৃদু হেসে পানিতে একটা পাথর ছুঁড়ল। ব্যাঙবাজির মত লাফাতে- লাফাতে গেল ছুটন্ত পাথরটা, ঠিক একটু আগে ডনেরটা যেমন গিয়েছিল। ‘ছোটবেলায় এটা করে খুব মজা পেতাম,’ বন্ধুসুলভ কণ্ঠে বলল।
মহিলা কি সারাক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল? ভাবল মুসা। ওদের সব কথা কি আড়ি পেতে শুনেছে?
কিশোরও চমকে গেছে। মহিলা এত আন্তরিকতা দেখাচ্ছে কেন? ডিনারে ওদের সঙ্গে কথাই বলেনি সে এবং ক্যাম্পে আসার পর থেকে তার সঙ্গে খুব অল্প কথাই হয়েছে ছেলে-মেয়েদের।
সু কির দিকে মনোযোগ ফেরাল রিনা।
‘বাহ, কী সুন্দর,’ বলে, পাটের উজ্জ্বল, সোনালী তন্তুটুকু স্পর্শ করল। ‘এটা ম্যাক্রামি, তাই না? শিখলে কীভাবে?’
‘আমি ক্র্যাফট ক্লাস করছি,’ জানাল সু কি। ‘কাজটা সহজ,’ বলে, চকচকে হলদে ব্যাণ্ডটা তুলে ধরল। ‘সহজ একটা নকশা বেছে নিয়েছি। এতে মাত্র দুটো আলাদা নট রয়েছে।’
‘দুটো আলাদা নট?’ রিনাকে মুগ্ধ দেখাল। ‘আমাকে দিয়ে কখনও ওকাজ হবে না। আমি পারব না।’
‘না, কঠিন না তো। পারবেন,’ সাহস জোগাল সু কি। মহিলার হাতে ম্যাক্রামির স্ট্রিপটা ধরিয়ে দিল। ‘আপনার শুধু স্কয়্যার নট আর হাফ-হিচ জানলেই চলবে।’ খুব সাবধানে নতুন শেখা শব্দগুলো আওড়াল ও।
‘এগুলো আগে কখনও শুনিনি,’ রিনা হেসে উঠে বলল। ‘আচ্ছা, তবে তোমার কথাই সই।’
সু কিকে অবাক দেখাল।
‘কিন্তু আমার টিচার যে বললেন নাবিকরা এ নটগুলোই ব্যবহার করে,’ বলল ও। ‘আপনাদের বোটে করেন না?’
‘হ্যাঁ, মানে…’ অপ্রস্তুত রিনার গালজোড়া লাল হয়ে গেল। ‘ওসব আমার স্বামীই দেখে আরকী।’ ঝটপট সু কির হাতে ম্যাক্রামিটা গুঁজে দিল। ‘আকাশটা কেমন আঁধার হয়ে গেছে না? আমি কেবিনে যাচ্ছি। কাল দেখা হবে!’ কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উল্টো ঘুরে যেন পালিয়ে বাঁচল মহিলা।
‘খাইছে, কেমন পালাই পালাই একটা ভাব মহিলার মধ্যে, লক্ষ করেছ?’ বলল মুসা।
‘মহিলা আমাদের বুঝতে দিতে চায়নি সে যে আসলে গিঁটগুলো চেনে না,’ বলল রবিন।
‘তারমানে এখন চারজন সন্দেহভাজন,’ বলল সু কি।
‘চারজন?’ ডনের প্রশ্ন। ‘আমি তো ভেবেছিলাম তিনজন-জো আর রিনা ইলিয়ট আর ক্যাথি অ্যালেন।’
‘নিল স্যাণ্ডার্সের কথাও মনে রেখো,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল কিশোর। ‘কেউ মাছ নিয়ে কোন প্রশ্ন করলেই ভদ্রলোক ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খান।’
‘অথচ তিনি নাকি মেরিন বায়োলজিস্ট!’ বলে উঠল রবিন।
‘এবং আরেকটা ব্যাপারও রহস্যজনক,’ বলল কিশোর। ‘কি ওয়েস্টে জেলে বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় তাঁকে কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছিল, যখন আরকী বোঝেন আমরা দেখে ফেলেছি।’
‘ওই লোকটা হয়তো আদৌ জেলে নয়।’ সটান সিধে হয়ে দাঁড়াল রবিন। ‘কেমন ফ্যাকাসে গায়ের চামড়া!’
মাথা ঝাঁকাল কিশোর।
‘বন্ধুর সম্পর্কে উনি সত্যি কথা বলছেন না, তবে মিথ্যে বলবেন কেন তাও জানি না।’
ডনের হাই উঠল, এবং ওর হাত ধরল নথি।
‘রাতে সবার ভাল ঘুম হলে কাল হয়তো আমরা অনেক প্রশ্নেরই জবাব পাব।’
ডন উঠতে যাবে, হঠাৎই পিকনিক টেবিলের কাঠের ফাঁকে গোঁজা পুরানো কয়েনটা চোখে পড়ল ওর।
‘দেখো!’ বলে উঠল ও, মুদ্রাটা দেখাল কিশোর আর রবিনকে। ‘আমি এটা জমাব!’ কয়েনটা তুবড়ে গেছে এবং কিনারাগুলো ওটার কেমন অমসৃণ, তবে ডন ওসব পরোয়া করল না। মুদ্রা জমাতে পছন্দ করে ও এবং পকেটে গুঁজল জিনিসটা।
পরদিন সকালে, জানালার ধারে এক লম্বা টেবিলে নাস্তা করতে বসল ছেলে-মেয়েরা, আলোচনা করছে রহস্যটা নিয়ে। জো আর রিনা ওদের সঙ্গে যোগ দিতেই আচমকা মুখ বন্ধ হয়ে গেল সবার।
‘গুড মর্নিং!’ রিনা খোশমেজাজের সঙ্গে বলল ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশে।
সবাই ওকে নম্রস্বরে স্বাগত জানাল, তবে কিশোর আরও বেশি সন্দিহান হয়ে উঠল। মহিলার এত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের পেছনে কারণটা কী?
‘আজ তোমাদের প্ল্যান কী?’ জো জিজ্ঞেস করল।
‘গ্লাস-বটম বোট রাইডে প্রবাল প্রাচীর দেখতে যাচ্ছি,’ রবিন বলল ওকে। ‘তারপর বিকেলে কি ওয়েস্টে যাব ট্রেজার মিউজিয়াম দেখতে।’
‘ট্রেজার মিউজিয়াম! বাহ, দারুণ জায়গা মনে হচ্ছে,’ বলে উঠল রিনা। ‘সাগরতলের গুপ্তধন খুঁজে পেলে কী ভালই না হত!’
‘মেল ফিশার ওটাই খুঁজে পান,’ কিশোর বলল ওকে। ‘তিনি এবং তাঁর স্ত্রী অ্যাটোচা নামে এক বিখ্যাত জাহাজ আবিষ্কার করেন। ফ্লোরিডার উপকূল থেকে দূরে, ১৬০০ সালের দিকে হারিকেনের কবলে পড়ে তলিয়ে যায় স্প্যানিশ জাহাজটা।’
‘আমি পড়েছি ওটার কথা,’ জানাল রবিন। ‘সাগরতলে পড়ে ছিল গুপ্তধন বোঝাই হয়ে-সোনার বার, স্বর্ণমুদ্রা, অলঙ্কার কী ছিল না ওটায়! লোকে বহু বছর ধরে খোঁজাখুঁজি করেছে জাহাজটাকে কিন্তু শেষমেশ মেল ফিশার ওটাকে খুঁজে পান।
‘উনি কি জাহাজটা তুলে এনেছিলেন?’ ডনের উৎসাহ ধরে না। ‘ওটা দেখা যাবে?’
‘অ্যাটোচা এখনও মহাসাগরের তলে, তবে তিনি সমস্ত গুপ্তধন তুলে এনেছেন। ওর অনেক কিছুই জাদুঘরে ডিসপ্লে দেয়া আছে,’ কিশোর বলল ডনকে।
‘আমরা আজকে ওখানেই যাচ্ছি!’ বলে উঠল ডন। ‘ইয়াপ্পি!’
‘গুপ্তধনের ব্যাপারে তোমার খুব আগ্রহ দেখছি,’ বলল জো।
‘হ্যাঁ! আমি কয়েন জমাই,’ সগর্বে বলল ডন। ‘কাল রাতে একটা পেয়েছি।’
‘তাই? কয়েনটা কেমন?’ খাওয়া থামিয়ে বলল জো।
‘অনেক পুরনো, লেখাগুলো মুছে গেছে।’ ওদের কৌতূহল দেখে অবাক হয়ে গেছে ও।
‘সাথে আছে?’ তীক্ষ্ণকণ্ঠে প্রশ্ন করল রিনা।
‘না, আমার ঘরে।’ ডনকে খানিকটা অনিশ্চিত দেখাল। রিনা সহসাই কেমন জানি বিরক্ত হয়ে উঠেছে ওর ওপর।
‘কয়েনটার আর কী-কী দেখলে?’ ওর স্বামী নাছোড়বান্দা।
শ্রাগ করল ডন।
‘কিনারাগুলো অসমান।’ হাসল দাঁত বের করে। ‘সেজন্যেই আরও ভাল লেগেছে। জিনিসটার কদর বেড়েছে।’
‘কোন চিহ্ন আছে ওটায়?’ ডনের দিকে ঝুঁকল রিনা, চোখজোড়া যেন ফুঁড়ে ফেলবে ওকে। ‘মনে করে দেখো তো।’
চিন্তার ভাঁজ পড়ল ডনের কপালে।
‘ওটায় কোট অভ আর্মস আছে, তাই না?’ মুসা বলল।
‘কোট অভ আর্মস!’ রিনা এতটাই উত্তেজিত, ওর কফি চলকে পড়ল কাপ থেকে পিরিচে। সে ওটা ঠেলে সরিয়ে স্বামীর দিকে চাইল।
‘আমার খিদে নেই। চলো, কেবিনে যাই।’
‘চলো।’ চেয়ারটা পেছনে ঠেলল জো। ‘পরে দেখা হবে,’ ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশে সংক্ষেপে বলল।
‘স্বামী-স্ত্রীর হাব-ভাব ভাল ঠেকছে না,’ রবিন শান্তকণ্ঠে অন্যদের বলল। ‘ওদের ওপর নজর রাখতে হবে।’
মুসা মাথা ঝাঁকিয়ে কাঁটাচামচ থেকে প্যানকেক চালান করল মুখে। ‘ঠিক। এমুহূর্তে সন্দেহভাজন চারজন, এবং ইলিয়ট দম্পতি তালিকায় সবার ওপরে।’