নাম হাসান, হাসানুজ্জামান
আপনার নাম?
জ্বি আমার নাম হাসান। হাসানুজ্জামান।
আপনি কী করেন?
কিছু করি না–বেকার বলতে পারেন। সম্প্রতি অবশ্য একটা চাকরি পেয়েছি।
কী চাকরি?
স্কুল টিচারের চাকুরি। ঢাকার বাইরে।
আপনি ধূমপান করেন?
জ্বি।
নিন। একটা সিগারেট খান।
ওসি সাহেব সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলেন। হাসান সিগারেট নিল। তার অস্বস্তি বাড়ছে। তাকে থানায় ডেকে আনার কারণ স্পষ্ট হচ্ছে না। তারাও ভেঙে কিছু বলছেন না। ওসি সাহেবকে বেশ ভদ্র মনে হচ্ছে। পুলিশের চাকরি না করে এই ভদ্রলোক কোনো কলেজের শিক্ষকতাও করতে পারতেন। খাকি পোশাকে তাকে মানাচ্ছে না।
চা খাবেন?
জ্বি না। আমাকে কেন ডেকেছেন দয়া করে বলবেন?
আপনার ছোট ভাই আছে না–রকিব?
জ্বি।
তার সঙ্গে কি আপনার যোগাযোগ নেই?
যোগাযোগ থাকবে না কেন? আছে তো। মাঝখানে বেশ কিছুদিনের জন্যে ইন্ডিয়া গিয়েছিল।
শেষ কবে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
শেষ কবে দেখা হয়েছে। হাসান মনে করতে পারল না। লায়লার বিয়েতে আসে নি। এটা মনে আছে। তাকে খবর দেয়া হয়েছিল, সে নিজেই খবর দিয়ে এসেছে।
দিন তারিখ বলতে হবে না। মোটামুটি একটা সময় বললেই হবে।
শেষবার সে এসেছিল খুব সম্ভব দিন পনের আগে। কেন বলুন তো?
এর মধ্যে সে কি কোনো খবর পাঠিয়েছে?
জ্বি না। পাঠালেও আমি জানি না।
সে কি বাসায় আপনাদের কারো কাছে টাকা-পয়সা রাখতে দিয়েছে?
জ্বি না।
এমনকি হতে পারে যে কারো কাছে রাখতে দিয়েছে আপনি তা জানেন না? ব্যাপারটা গোপনে ঘটেছে।
আমি আসলে কিছু বুঝতে পারছি না। এই প্রশ্নগুলো আপনি কেন করছেন জানতে পারলে আমার উত্তর দিতে সুবিধা হতো।
চা দিতে বলি–এক কাপ চা খান। চা খেতে খেতে কথা বলি। দিতে বললো?
বলুন।
ওসি সাহেব চা দিতে বললেন। হাসান খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। রকিব কি কোনো ঝামেলায় পড়েছে? ঝামেলাটা কোন ধরনের? বড় ধরনের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার কোনো কারণ নই। রকিব রগচটা কিন্তু ভালো ছেলে।
চা নিন হাসান সাহেব।
হাসান চা নিল। ওসি সাহেব বললেন, আমি বেশি কিছুদিন আগে একজন এস.আইকে পাঠিয়েছিলাম। ও আপনার বাবার সঙ্গে রকিব সম্পর্কে কথা বলেছিল। এক ধরনের সাবধানবাণী বলতে পারেন। উনি কি ব্যাপারটা নিয়ে আপনাদের সঙ্গে ডিসকাস করেন নি?
আমাকে কিছু বলেন নি। মনে হয় অন্য কারো সঙ্গে বলেন নি। বাবা কথাবার্তা বিশেষ বলেন না। সমস্যার কথা একেবারেই বলেন না।
আপনার ছোট ভাই রকিব বাজে ধরনের সমস্যায় জড়িত ছিল। তার মধ্যে একটা হচ্ছে মানি এক্সটিরশন?
কী বললেন?
বিত্তবান লোকজন আটকে রেখে টাকা চেয়ে পাঠানো।
কী বলছেন এসব?
তার বিরুদ্ধে একটা হত্যা মামলাও আছে।
আপনাদের নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।
জ্বি না ভুল হচ্ছে না।
আমার মনে হয় শক্রিতাবশত তার সম্পর্কে এই জাতীয় কথা বলা হচ্ছে। সে ছাত্র রাজনীতি করে—তাকে বিপদে ফেলার জন্য এইসব হয়তো ছড়াচ্ছে। সে খুবই ভালো ছেলে। পড়াশোনায় ভালো। চিকেন পক্স নিয়ে এস.এস.সি. পরীক্ষা দিয়েছিল–তারপরেও চারটা লেটার নিয়ে এস.এস.সি. পাস করেছিল।
বুঝলেন হাসান সাহেব–দেশের পরিবেশ এখন এমন রাতারাতি একজন ভালো মানুষ নষ্টমানুষ হয়ে যায়।
নষ্ট হবার একটা সীমা থাকে। সীমার নিচে নষ্টও হওয়া সম্ভব না। আপনি কী করে বললেন রকিব হত্যা মামলার আসামি?
আপনার চা কি শেষ হয়েছে?
জ্বি।
চলুন আমার সঙ্গে।
কোথায় যাব?
আপনি একটা ডেডবডি আইডেনটিফাই করবেন।
হাসান হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকাল। খাকি পোশাক পরা এই মানুষটা এইসব কী বলছে। সে ডেডবিডি আইডেনটিফাই করবে। কেন? কার ডেডবডি?
হাসান সাহেব!
জ্বি।
বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেয়া ডেডবডি। চেনার অবস্থা না পচেগলে গিয়েছে। নিকট আত্মীয়স্বজনরা মাথর চুল দেখে জামাকাপড় দেখে হয়তো আইডেনটিফাই করতে পারবেন। এই জন্যই আপনাকে আনা।
আপনার কী করে ধারণা হলো এটা আমার ভাইয়ের ডেডবডি?
আপনার ভাইয়ের একজন সহযোগীকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তার স্বীকারোক্তি থেকে জেনেছি। সে বলছে রকিবকে ছুরি দিয়ে জবাই করা হয়–তারপর ডেডবিডি ইটসহ বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
হাসানের মনে হলো–খাকি পোশাক পরা এই মানুষটা আসলে মানুষ না, পিশাচ। এর হৃদয় বলে কিছু নেই। সে নির্বিকারভাবে কথাগুলো বলছে। তার মন বলে কিছু নেই? তার কি বাসায় ভাইবোন নেই? ছেলেমেয়ে নেই? সে কি স্ত্রীর সঙ্গে বসে টিভিতে নাটক দেখে না? ঘন বর্ষায় কি তার বাড়িতে খিচুড়ি ইলিশ মাছ রান্না হয় না?
হাসান সাহেব!
জ্বি।
নিন আরেকটা সিগারেট নিন।
জ্বি না সিগারেট নেব না।
তাহলে চলুন।
কোথায় যাব?
মেডিকেল কলেজে। ডেডবডি মেডিকেল কলেজের মৰ্গে রাখা হয়েছে। আপনি আইডেনটিফাই করার পর সুরতহাল হবে। যদিও সুরতহাল অর্থহীন। তবুও নিয়ম রক্ষার জন্যে করতে হবে।
আপনি যে ডেডবিডি আমাকে দেখাতে যাচ্ছেন সেটা আমার ভাইয়ের ডেডবডি না। আপনারা মস্তবড় ভুল করছেন।
ভুল হতেও পারে। ভুল হচ্ছে কি না তা জানার জন্যই আপনাকে নিয়ে যাওয়া।
লাশের পাশে একজন ডোম দাঁড়িয়ে। তার নাক গামছা দিয়ে বাঁধা। তার হাতে একটা লাঠি। সে লাঠি দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখাচ্ছে।
ওসি সাহেব বললেন, দেখলেন!
হাসান জবাব দিল না।
দাঁতগুলো দেখুন। ওপরের প্রথম দাঁতটা ভাঙা। হাতের রিস্টওয়াচটা দেখুন।
হাসান বলল, এটা আমার ভাইয়ের ডেডবডি না।
ও আচ্ছা ঠিক আছে–চলুন যাই।
ঘর থেকে বের হয়েই হাসান বলল, আমার মাথা ঘুরছে শরীর কেমন যেন করছে। আমি বমি করব।
বারান্দায় গিয়ে বমি করুন। কোনো অসুবিধা নেই। আমি পানি এনে দিচ্ছি।
হাসান মুখ ভর্তি করে বমি করল। তার মনে হচ্ছে শরীরের ভেতরটা পুরোপুরি মুখ দিয়ে বের হয়ে যাবে। সে হয়ে যাবে উল্টো মানুষ। শরীরের বাইরের অংশ চলে যাবে ভেতরে। ভেতরের অংশ চলে আসবে বাইরে।
হাসান সাহেব।
জ্বি।
এখন কি একটু ভালো বোধ করছেন?
জ্বি।
নিন পানি দিয়ে মুখ ধোন। একটা পান খান।
আমি কি চলে যেতে পারি?
জ্বি পারেন। চলুন আমি আপনাকে একটা রিকশা করে দি। পুলিশের গাড়ি করে পাঠাতে পারতাম সেটা ঠিক হবে না। প্রতিবেশীরা নানান কথা বলতে পারে।
আপনাকে রিকশা করে দিতে হবে না। ধন্যবাদ।
ওসি সাহেব বললেন, কুৎসিত একটা দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি— সামান্য ভদ্রতা আমাকে করতে দিন।
ওসি সাহেব!
জ্বি।
ডেডবডিটা আমার ছোট ভাইয়ের।
আমি জানি।
আমি কাউকে বলতে চাচ্ছি না। কাউকে না। বাবা-মা কাউকে না। তাতে কোনো অসুবিধা আছে?
অসুবিধা নেই।
সবাই জানবে একটা ছেলে ছিল, হারিয়ে গেছে। কত মানুষ তো হারিয়ে যায়।
তা যায়।
আমার ভাইয়ের কি জানাজা হবে? কবর হবে?
হ্যাঁ হবে। আপনি কাঁদবেন না।
ওসি সাহেব আপনার নামটা কি জানতে পারি?
কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে আমার নামও রকিব। হাসান সাহেব কাঁদবেন না প্লিজ। আর ভাই শুনুন–আই অ্যাম সরি।
জ্বরে হাসানের গা পুড়ে যাচ্ছে।
বাড়িতে কেউ নেই। তারেক গিয়েছে চিটাগাং। রীনা এসে টগর-পলাশকে নিয়ে গেছে। লায়লা তার শ্বশুরবাড়িতে। হাসানের মা তার বড় মেয়ের বাড়িতে। শুধু হাসানের বাবা আশরাফুজ্জামান সাহেব আছেন। তবে এই মুহুর্তে তিনি বাড়িতে নেই। চায়ের স্টলে বসে আছেন। গরম গরম জিলাপি ভাজা হচ্ছে। তিনি জিলাপি খাচ্ছেন। রসে তার মুখ মাখামাখি। এত ভালো জিলাপি তিনি অনেক দিন পর খাচ্ছেন। মাখনের মতো মোলায়েম হয়েছে। মুখে দেয়ামাত্র গলে যাচ্ছে।
কমলার মা গোঙানির শব্দ শুনে হাসানের দরজার সামানে এসে দাঁড়িয়েছে। সে ভীত গলায় ডাকল, ভাইজান?
হাসান চোখ মেলল। তার চোখ টকটকে লাল। হাসান ভারি গলায় বলল, কে?
কমলার মা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ভাইজান আমি।
হাসান আবারো বলল, কে?
ভাইজান আমি কমলার মা। আপনের কী হইছে ভাইজান?
মাথায় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে কমলার মা।
খুব বেশি?
হ্যাঁ খুব বেশি।
হাসান চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে জেগে আছে অথচ সেই বিশ্ৰী স্বপ্নটা আবার শুরু হয়েছে। একদল হাঁস যাচ্ছে। সে হাঁটছে। হাঁসের সঙ্গে। হাঁসিরা শামুক গুগলি জাতীয় খাবার খাচ্ছে। ঝিনুকের খোল খুলতে তার কষ্ট হচ্ছে। একটা হাঁস তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। হাঁসটার চোখ মানুষের চোখের মতো বড় বড়।
জেগে থেকেই সে এই স্বপ্নটা দেখছে কেন? তার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? এই দুঃস্বপ্নের কথা সে তিতলী ছাড়া আর কাউকে বলে নি।
স্বপ্নের কথা শুনে তিতলী বলেছিল। খিচুড়ি দিয়ে ভূনা হাঁসের মাংস খেলে তোমার হাঁসের স্বপ্ন দেখার এই রোগ সেরে যাবে। শীতকাল আসুক আমি নিজে তোমাকে ভুনা হাঁসের মাংস খাওয়াব। তুমি কি জান আমি খুব ভালো রাধুনি?
না জানি না।
আমার অনেক কিছুই তুমি জান না। একেক করে জানবে। আর মুগ্ধ হবে। এই পৃথিবীতে মটরশুঁটি দিয়ে কই মাছের ঝোল আমার চেয়ে ভালো কেউ রাঁধতে পারে না। শীতকাল আসুক তোমাকে মটরশুঁটি আর কই মাছের ঝোল খাওয়াব।
আচ্ছা।
মাছের ঝোল রান্নার গোপন কৌশল কি তুমি জান?
জানি না।
জানতে চাও?
না।
জানতে না চাইলেও বলব। মাছের ঝোল রান্নার আসল কৌশল হলো–অনেকক্ষণ নাড়াতে নাড়তে হাত ব্যথা হয়ে যাবে। তবু চামচ নাড়ানো বন্ধ করবে না। বুঝেছ?
হুঁ।
শীতকাল আসতে কত দেরি? এখন কোন কাল? বর্ষা শেষ হয়ে গেছে না?
হাসান চোখ মেলল।
কমলার মা বলল, ভাইজান মাথাত পানি ঢালমু?
হাসান বলল, না।
যন্ত্রণা কি আরো বাড়ছে ভাইজান?
হুঁ।
মাথা বিষের বড়ি খাইবেন?
না। তুমি এখন যাও।
হাসান চোখ বন্ধ করছে না। চোখ বন্ধ করলেই হাঁসের পাল চলে আসবে। চুড়ির শব্দ হচ্ছে। কে এসেছে চুড়ি পরে? তিতলী না তো? হাসান জানে কেউ নেই তারপরেও বলল, কে তিতলী! আশ্চর্য ব্যাপার। মাথার ভেতরে তিতলী কথা বলে উঠল।
হুঁ।
কেমন আছ?
ভালো।
তোমাকে অনেক দিন থেকে মনে মনে খুঁজছি।
কেন?
ওই যে একটা গান করেছিলে বুড়িগঙ্গায় ওই গানের লাইনগুলো কী?
আমি তো গান করি নি।
তিতলী শোন!
শুনছি।
আমি খুব একটা অন্যায় করেছি। তোমাকে বলা হয় নি।
বল।
নাদিয়া এত ভালো রেজাল্ট করেছে, ওকে কনগ্রাচুলেশনস জানানো হয় নি। আমি ওর জন্যে একটা গিফট কিনে রেখেছিলাম। সেই গিফটটাও তাকে দেয়া হয় নি।
একদিন বাসায় গিয়ে ওকে দিয়ে এসো।
তুমি রাগ করবে না তো?
আমি রাগ করব কেন?
তিতলী!
বল শুনছি।
হাঁসের স্বপ্নটা আমি এখনো দেখি।
ও আচ্ছা।
স্বপ্নটা দেখার সময় মাথায় খুব যন্ত্রণা হয়।
ও আচ্ছা।
তিতলী আমার মনটা সারাক্ষণ খুব খারাপ থাকে।
ও আচ্ছা।
তুমি কি জান আমি এখানে, মাঝে মাঝে তোমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি?
ও আচ্ছা।
কয়েকদিন আগে তোমাদের কলেজে গিয়েছিলাম। মনের ভুলে চলে গিয়েছি।
ও আচ্ছা।
এখন আমার মাথায় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।
ও আচ্ছা।
আশরাফুজ্জামান বাড়িতে ফিরলেন রাত ন’টায়। তিনি ছেলেকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। কী হয়েছে হাসানের? তিনি ভীত গলায় বললেন, তোর কী হয়েছে রে? তোর চোখ এত লাল কেন?
হাসান লাল চোখে তাকিয়ে রইল। জবাব দিল না।