নিশানাথ বাবু খুব সকালে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন।
উদ্দেশ্য আশেপাশের গ্যারাজ-সেলগুলি খুঁজে দেখা। প্রি-উইন্টার গ্যারাজসেল শুরু হয়েছে। বুড়ো-বুড়ির দল অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গাড়ির গ্যারাজে সাজিয়ে বসে আছে। মূল্য নামমাত্র। নিশানাথ বাবু সকাল থেকেই এ সব দেখে বেড়াচ্ছেন। গ্যারাজ-সেলে ঘুরে বেড়ান। তাঁর বাতিকের মতো। যে—সব জিনিস তিনি গত চৌদ্দ বছরে কিনেছেন, তার মধ্যে একটি প্রকাণ্ড পিয়ানো পর্যন্ত আছে। এম স্ট্রীটের দুতলা বাড়ি গ্যারাজ-সেলে কেনা জঞ্জাল দিয়ে তিনি ভর্তি করে ফেলেছেন। নতুন কিছু কিনে রাখবার জায়গা নেই, তবু কিনছেন।
আজ তাঁর একটি ফুলদানি পছন্দ হল। জার্মান সিলভারের ফুলদানি। খুব সুন্দর কাজ। দাম লেখা আছে। এক ডলার।
এরচে কমে দিতে পার? এক ডলার বড্ড বেশি মনে হচ্ছে।
যে—বুড়ো জিনিসপত্র সাজিয়ে বসে আছে, সে অবাক হয়ে বলল, এক ডলার কি যথেষ্ট কম নয়। ড. নিশানাথ?
নিশানাথ বাবু দেখলেন বুড়ো হচ্ছে স্টাটিসটিকসের স্ট্যানলি। মাংকি ক্যাপে সমস্ত মুখ ঢেকে রেখেছে বলে চেনা যাচ্ছে না।
গুড মনিং স্ট্যানলি।
গুড মনিং। কফি খাবে? গ্যারাজ-সেল উপলক্ষে কফি পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চাশ সেন্ট চার্জ, ফ্ৰী রিফিল।
নিশানাথ বাবু পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে এক পেয়ালা কফি নিলেন। বিক্রিটিক্রি কেমন?
মন্দ নয়, সাড়ে ন ডলার বিক্রি করেছি। বস তুমি, ঐ চেয়ারটাতে বস।
নিশানাথ বাবু অবাক হয়ে স্ট্যানলির দিকে তাকালেন। এই লোকটি মাসে চার হাজার ডলারের মতো পায়। দুপুরের একটা সাদাসিধা লাঞ্চের জন্যেই খরচ করে ত্রিশ-চল্লিশ ডলার। অথচ সে বাড়ির যত সব জঞ্জাল সাজিয়ে সাড়ে ন ডলার বিক্রি করে কী খুশি!
স্ট্যানলি ভারি স্বরে বলল, ওলড হোমে যাবার প্রস্তুতি, বুঝলে। জিনিসপত্র সব বিক্রিটিক্রি করে হাত খালি করছি।
প্রস্তুতি কি একটু সকাল-সকাল নিয়ে ফেলছি না?
উঁহু, রিটায়ার করবার টাইম হয়ে আসছে। বছর দুই আছে মাত্র।
নিশানাথ বাবু জার্মান সিলভারের ফুলদানি ছাড়াও একটা বড়ো আয়না কিনে ফেললেন। আয়নাটির দাম পড়ল তিন ডলার। স্ট্যানলি বারবার বলল, আয়নাটায় খুব জিতে গেলে। আমার স্ত্রী ইটালি থেকে ছ শ লীরা দিয়ে কিনেছিল।
তিনি বাড়ি ফিরলেন এগারটার দিকে। কী আশ্চর্য, রুনকি বসে আছে বারান্দার ইজিচেয়ারে! রুনকি হাসিমুখে বলল, গ্যারাজ-সেলে গিয়েছিলেন চাচা?
হুঁ।
ইশ, কী যে এক রোগ বাধিয়েছেন!
ভেতরে আয়, রুনকি।
আজ কী কিনলেন?
জার্মান সিলভারের একটা ফুলদানি, আর একটা আয়না। তুই নিবি?
না।
আয়নাটা নিয়ে যা! ভালো জিনিস, ছ শ লীরা দাম পড়েছে ইটালিতে।
পড়ুক। চাচা, আপনার কাছে বিদায় নিতে এলাম।
নিশানাথ বাবু কিছু বললেন না। চায়ের পানি চড়ালেন। রুনকি সোফায় বসতেবসতে বলল, আমরা মন্টানায় চলে যাচ্ছি।
মন্টানা খুব সুন্দর জায়গা।
আপনার সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না।
নিশানাথ বাবু দীর্ঘ সময় চুপ থেকে বললেন, অল্পবয়েসী মেয়ে নিরাশ ভঙ্গিতে কথা বললে ভালো লাগে না। তাদের বলা উচিত, আবার হয়তো দেখা হবে। অর্থ একই–আনসার্টিনিটি। কিন্তু বলার ভঙ্গিটা অপটিমিস্টিক। চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবি?
না চাচা। আপনাকে একটা খবর দিই, আমরা বিয়ে করছি।
জানি। শফিক বলেছে। বাঙালী কায়দায় নাকি বিয়ে হবে?
না, সে-রকম কিছু না।
নিশানাথবাবু চা বানিয়ে এনে দেখেন রুনকি কাঁদছে। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, কাঁদছিস কেন মা?
চাচা, আমি কি ভুল করছ?
কোনটা ভুল আর কোনটা নয়, তা বোঝা মানুষের সাধ্যের বাইরে। ও নিয়ে চিন্তা করিস না। চা খা।
রুনকি চায়ে চুমুক দিল। নিশানাথ বাবু গাঢ় স্বরে বললেন, খিদিরপুরের এক কলেজে অঙ্ক পড়াতাম, বুঝলি রুনকি। কী নিদারুণ অভাব গেছে আমার! আর এখন পাসবই দেখলে তুই চমকে উঠবি। আমি যদি খিদিরপুরে পড়ে থাকতাম, সেটা ভুল হত। আবার আমেরিকা আসাটাও ভুল হয়েছে। তাহলে ঠিক কোনটা?
রুনকি চুপ করে রইল। নিশানাথ বাবু বললেন, বেঁচে থাকার আনন্দটাই একমাত্র সত্যি। ঐটি থাকলেই হল। আয়নাটা একটা কাগজ দিয়ে বেঁধে দিই মা?
দিন।
নিশানাথ বাবু আয়নাটি গিফট র্যাপ করবার জন্যে পাশের ঘরে চলে গেলেন। রুনকি একটু হাসল। সে জানে, নিশানাথ বাবু শুধু আয়না কাগজ দিয়ে বাঁধবেন না। সেইসঙ্গে একটা খামের মধ্যে মোটা অঙ্কের একটা চেক থাকবে। এটি নিশানাথ বাবুর একটি পুরনো অভ্যাস। রুনকির সব জন্মদিনে তিনি রুনকিকে গল্পের বই দেন। সেই বইয়ের ভেতর একটা খাম থাকবেই; যা দেওয়ার তা সরাসরি দিয়ে দিলেই হয়, কিন্তু তা তিনি দেবেন না। কত রকম অদ্ভুত মানুষ দুনিয়াতে আছে!