হিমাচলের হেঁয়ালি

হিমাচলের হেঁয়ালি

এক

একটু আগেই বুধোদা একটা এসএমএস পাঠিয়েছিল—’যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়’।

তাড়াতাড়ি চলে আসতে আমার কোনও অসুবিধে ছিল না। স্কুলে সামার ভেকেসন চলছে, তাই বাড়িতেই ছিলাম। দুপুরবেলায় ঘরে বসে ফাদার ব্রাউনের ডিটেকটিভ গল্প পড়ছিলাম। বুধোদার মেসেজ পেয়ে জাস্ট জিনসের ওপর টি-শার্টটা গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

আগেই বলেছি, বুধোদাদের একশো আঠেরো বছরের পুরোনো বাড়ি হেমকুঞ্জ আর আমাদের বাড়ি রাস্তার এপাড়-ওপাড়। জি. টি. রোড পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম হেমকুঞ্জে।

বুধোদার ঘরে ঢুকে দেখলাম, বুধোদা দু-হাতে দুটো গরাদ চেপে ধরে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই ঘুরে দাঁড়াল। তারপর একদম বিনা ভূমিকায় বলল, ‘এক জায়গায় বেড়াতে যাবি? একদম কমপ্টি প্যাকেজ।’

হয়তো আমার মুখের ভাব দেখে বুধোদা বুঝতে পেরেছিল, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। আরও একটু ডিটেলে বলতে হবে। তাই জানলার ধার থেকে ফিরে গেল কম্পিউটার টেবিলে। নিজে বসল, আমাকেও পাশের একটা চেয়ারে বসতে ইশারা করল। তারপর বলল, ‘এদিকে দ্যাখ’।

আমি মনিটরের দিকে মুখ বাড়ালাম। মাউসের ওপর বুধোদার আঙুলের চটপট কয়েকটা ক্লিক, তারপরেই স্ক্রিন জুড়ে ফুটে উঠল একটা ছবি। কোনও এক পাহাড়চূড়ার একটু নীচে দাঁড়িয়ে আছে আশ্চর্য সুন্দর এক মন্দির। মন্দিরকে ঘিরে ধাপে-ধাপে নেমে গেছে গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ফসল খেত। চারিপাশে আরও অনেক নীল পাহাড়ের ঢেউ।

বুধোদা বলল, ‘উইকিতে এই একটা ছবিই পেলাম। এটা হল নাগোয়ার দেবতার মন্দির। নীচে ওই যে গ্রামটা দেখছিস ওর নামও নাগোয়ার। জায়গাটা হিমাচল প্রদেশে। কুলু থেকে মনিকরণ যেতে গেলে রাস্তায় ভুন্টার বলে একটা শহর পড়ে। সেখান থেকে নাগোয়ারের রাস্তা ভাগ হয়ে গেছে। বুঝতেই পারছিস, দেবতার নামেই ওই গ্রামের নাম। নাগোয়ার আসলে নাগদেবতা। সর্পদেবতাও বলতে পারিস। জায়গাটা সুন্দর না?’

আমি ঘাড় হেলালাম।

বুধোদা বলে চলল, ‘নাগদেবতার ওই মূর্তির মতন দামি মূর্তি ইন্ডিয়াতে কম আছে। বাদশা ঔরঙ্গজেবের ছেলে বাহাদুর শাহ না কি ওই মূর্তি আর মন্দির তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। আড়াই ফুট উঁচু সলিড সোনার একটা মূর্তি। তার কীরকম দাম হতে পারে বুঝতেই পারছিস।

‘তার ওপরে সর্পদেবতার আটটা ফণার প্রত্যেকটার ওপরে না কি একটা করে রত্ন বসানো আছে। কোনওটায় রুবি, কোনওটায় স্যাফায়ার, কোনওটায় অ্যামেথিস্ট। ডায়মন্ড তো আছেই। মূর্তিটা যে কয়েকশো বছরের পুরোনো সেটাও হিসেবের মধ্যে ধরতে হবে। আজকের দিনে খরচাপাতি করে এরকম একটা কিছু বানালেও সেটার দাম এটার সমান হবে না। এটা অ্যান্টিক।’

জিগ্যেস করলাম, ‘তুমি কি নাগোয়ার যাবার কথা বলছিলে।’

‘ইয়েস।’

‘তুমি নাগোয়ার সম্বন্ধে এত কথা জানলে কেমন করে বলো তো? আমি তো জীবনে এমন কোনও জায়গার নামই শুনিনি।’

বুধোদা বলল, ‘সে তো নাগোয়ারের লোকেরাও উত্তরপাড়ার নাম শোনেনি। তাতে কি প্রমাণিত হয় উত্তরপাড়া খুব সাধারণ জায়গা? ও হ্যাঁ, কোথায় শুনেছি জিগ্যেস করছিলিস? শুনেছি বিরাজ সিং-এর কাছ থেকে।’

‘বিরাজ সিং আবার কে?’

বুধোদা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চাইল। বলল, ‘সে কি রে! তোকে বিরাজ সিং-এর কথা বলিনি! হি ইজ আ জিনিয়াস।’

আমি জানি, কাজের খাতিরে টই টই করে ঘুরে বেড়ানোর সময় বুধোদার ডায়েরিতে অনেক জিনিয়াসের নাম-ঠিকানা জমা হয়। বাইরে থেকে দেখলে তারা খুব সাধারণ লোক। কেউ হয়তো ট্রেনের কামরায় গান গায়, কেউ ফুটপাথে রঙিন চকখড়ি দিয়ে ছবি আঁকে, কেউ মেলার ভিড়ে ম্যাজিক দেখায়। বুধোদা তাদের সঙ্গে আলাপ করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। তারা কলকাতায় এলে নি:সঙ্কোচে হেমকুঞ্জে দুয়েকটা দিন কাটিয়ে যায়। বুধোদা নিজের মুখে কখনও না বললেও আমি জানি, ও নিয়মিত তাদের টাকাপয়সাও পাঠায়। বুঝলাম, বিরাজ সিং-ও সেরকমই কেউ হবে। বুধোদা আর কী বলে শোনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।

বুধোদা বলে চলল, ‘বিরাজ সিং ওই নাগোয়ার গ্রামেরই ছেলে। বয়স, এই ধর পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর হবে। কিন্তু ওর হাতের কাজ দেখলে তোর মাথা ঘুরে যাবে। ও কাজ করে মেটাল নিয়ে—তামা, পেতল, রুপো, নানান মেটালে ফুল ফোটাতে পারে ছেলেটা। কী সূক্ষ্ম সেসব কারুকাজ!

‘কিন্তু শুনলে অবাক হবি, বেচারা এখনও ট্যুরিস্টদের জন্যে সস্তার চাবির রিং, ওয়াল-হ্যাঙ্গিং, মোমদানি এইসব বানিয়ে পেট চালায়?

‘গত ডিসেম্বরে হিমাচল প্রদেশের পুলিশ একটা অ্যান্টিক পাচার-চক্রকে ধরার ব্যাপারে আমার পরামর্শ চেয়েছিল, মনে আছে তোর? তখন দিন সাতেক সিমলায় থাকতে হয়েছিল। ওখানেই বিরাজের সঙ্গে আলাপ। রাস্তার ধারে একটা মেলায় নিজের হাতের কাজ সাজিয়ে বসেছিল। এমনিতে ও খুব লাজুক ছেলে। তবে আমার সঙ্গে বেশ জমে গিয়েছিল।

তখনই বিরাজ ওদের গ্রাম আর সেখানকার নাগদেবতার অনেক গল্প বলেছিল। ও আমাকে নানারকম লোভ দেখিয়ে নাগোয়ারে নিয়ে যেতে চাইছিল। শুধু মন্দির নয়, ও বলেছিল ওদের গ্রামের সিনিক বিউটিও না কি অসাধারণ।

‘তবে তখন গেলে নাগদেবতার মূর্তিটা দেখতে পেতাম না।’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কেন?’

বুধোদা বলল, ‘অত দামি মূর্তি বলেই বছরের মধ্যে তিনশো ষাট দিন মন্দিরের বেদির ওপরে বসানো থাকে নাগোয়ারের শিলাপট, মানে পাথরের প্রতীক আর কি। আর আসল সোনার মূর্তি রাখা থাকে ব্যাঙ্কের ভল্টে। একমাত্র স্নানযাত্রা আর তার আগের চারদিন ভক্তরা সেই মূর্তি দেখতে পায়।

‘বিরাজকে কথা দিয়ে এসেছিলাম, স্নানযাত্রার সময়ই নাগোয়ার যাব। সেই দিন এসে গেল। কাল শনিবার তো? পরের শনিবার হচ্ছে জৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা। ওই দিনেই নাগোয়ারের মূর্তি নিয়ে শোভাযাত্রা বার হবে। কিন্তু একটা মুশকিল কী হল বল তো। গত কয়েকদিন ধরে বিরাজের ফোন দেখছি সুইচড অফ। অফ তো অফ। একবারের জন্যেও খুলছে না।’

একটু চুপ করে থেকে বুধোদা বলল, ‘সে যাই হোক, বিরাজের সঙ্গে না হয় ওখানে গিয়েই দেখা করে নেব। আগে যাই তো। কিন্তু তুই কী করবি? তোকে তো যাওয়ার ব্যাপারে জোর করতে পারি না। তাই বলছি, নিজেই ভেবে দেখ।’

আনন্দ আর উত্তেজনা লুকিয়ে রেখে, যথাসম্ভব নিস্পৃহ মুখে বুধোদাকে বললাম, ‘দিন সাতেক ঘুরে আসতে অসুবিধে নেই। আর তোমার সঙ্গে গেলে বাবা-মা’ও কিছু বলবে না।’

আমার কথা শেষ হতে না হতেই বুধোদা মুচকি হেসে মনিটরের প্রিন্ট-অপশনে গিয়ে মাউস ক্লিক করল। প্রিন্টারের স্লট থেকে বেরিয়ে এল দুটো ই-টিকিটের কপি যার একটা বুধোদা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আগামীকাল। কালকা মেল। ওখান থেকে বাই রোড নাগোয়ার।’

বুঝলাম আমার সঙ্গে কোনও কথা বলার আগেই ও আমাদের দুজনের নামে টিকিট বুক করে বসে আছে। অথচ একটু আগেই কেমন বলল, ‘তোকে তো যাওয়ার ব্যাপারে জোর করতে পারি না।’

আসলে বুধোদা জানে, যেখানে সুন্দরের হাতছানি আছে, যেখানে অ্যাডভেঞ্চারের ইশারা আছে সেখানে মাল্যবান মিত্রকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জোর খাটাবার প্রয়োজনই পড়ে না।

 দুই

কাল আমাদের নাগোয়ারে পৌঁছোতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। কালকা স্টেশন থেকে গাড়িতে এখানে আসতে যে অত সময় লাগবে ভাবতে পারিনি। ভুন্টারের পর থেকে রাস্তার হাল দেখলাম একেবারে জঘন্য। প্রায় আট ঘণ্টা সময় লেগে গিয়েছিল নাগোয়ার পৌঁছোতে। তার ওপরে আমাদের এই থাকার জায়গাটা প্রপার নাগোয়ার ভিলেজ থেকে আরও তিন কিলোমিটার দূরে। রাতে তাই চারিদিকের কিছুই দেখতে পাইনি।

আজ ভোরে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম আমরা রয়েছি একেবারে নদীর ধারেই। আমাদের হোটেলের নাম ল্যাভেন্ডার লজ। নাগোয়ারে আপাতত ট্যুরিস্টদের জন্যে এই একটাই থাকার জায়গা। অন-লাইনে বুধোদাই এটা আমাদের জন্যে বুক করে রেখেছিল। পাশাপাশি ছ’টা পাইনকাঠের কটেজ। কটেজগুলোর পেছনদিকে, মানে যেদিকে পিচরাস্তা সেইদিকে স্টাফেদের থাকার ঘর, অফিসঘর আর কিচেন। সামনে বেড়া দিয়ে ঘেরা বাগান। বেড়ার ওপাশেই পাথুরে জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে নদীর দিকে। গভীর সেই খাতের নীচ দিয়ে ভয়ংকর বেগে বয়ে ছুটে চলেছে পার্বতী নদী। অজস্র বোল্ডারে ধাক্কা খেতে খেতে চলেছে বলে এই জায়গাটায় নদীর স্রোত দুধের মতন সাদা।

বুধোদা মনে হয় আরও অনেক আগে উঠে চারপাশটা দেখে নিয়েছে। কারণ, আমি যখন বেরোলাম তখন ও বাগানের একদিকে দাঁড়িয়ে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ সারছিল। আমাকে বেরোতে দেখে বলল, ‘তোকে ডাকতে যাচ্ছিলাম। চল, চট করে একটু ঘুরে আসি। সাড়ে ছ’টা বাজে তো, ন’টার মধ্যে ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট খাব।’

একটা কাঠের বেঞ্চির ওপরে ওর ক্যামেরার ব্যাগ, বাইনোকুলার সব রাখা ছিল। সেগুলোকে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে কটেজের দরজায় তালা লাগিয়ে ও ফিরে এসে বলল, ‘চল।’।

বুধোদার সঙ্গে যখনই এরকম কোনও নির্জন জায়গায় ঘুরতে গেছি, দেখেছি ও এই সকাল আর বিকেলে পায়ে হেঁটে বেড়ানোর সুযোগটা ছাড়তে চায় না। আসলে অ্যান্টিক হান্টিং ছাড়া বুধোদার অন্য যে হবিটা আছে সেটার পক্ষে দিনের শুরু আর শেষটাই সবচেয়ে ভালো সময়। সেটা হল বার্ড-ওয়াচিং।

আমরা কটেজের সামনের গেট দিয়ে বেরিয়ে দেখলাম একটা পায়ে হাঁটা রাস্তা নদীর ধার দিয়ে দিয়ে উত্তরদিকে চলে গেছে। বড়জোর পঞ্চাশ পা গিয়েই রাস্তাটা ঢুকে গেছে ঘন পাইন-বনের মধ্যে। বুধোদা চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘এটা নাগোয়ার যাবার শর্ট-কাট রাস্তা, বুঝলি রুবিক? ওই দ্যাখ, নাগোয়ার গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। চল ওদিকেই যাব।’

বুধোদা যেদিকে আঙুল দেখাল, তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই সেদিকে পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট ঘরবাড়ির একটা জটলা। সব বাড়ির মাথা ছাড়িয়ে জেগে রয়েছে একটা মন্দিরের চুড়ো। ঠিক যেমনটা সেদিন বুধোদার কম্পিউটারে দেখেছিলাম। সকালের সোনালি আলো সবে সেই চুড়োটার মাথায় লেগেছে; বাকি গ্রামটা এখনও কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। দু-একবার মোরগের ডাক ভেসে এল, তা ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।

নীল পাহাড়গুলোর কোল বেয়ে গাবলু-গুবলু বাচ্চাদের মতন হামাগুড়ি দিয়ে মেঘ উঠে আসছে; পাইনবনের মাটিতে রোদ ছায়ার জেব্রা-লাইন; পার্বতী নদীর ঝরঝর কলকল শব্দ। সব মিলিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে আমরা দুজনেই কেমন যেন হিপনোটাইজড হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বুধোদাই সেই ঘোর কাটিয়ে হাঁটতে শুরু করল। পেছন পেছন আমি।

গাছের ডালপালায় আমাদের মাথার ওপরের আকাশটা আড়াল হয়ে ছিল। ভোরের তাজা হাওয়ায় মিশে যাচ্ছিল পাইনের আঠার ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ। হঠাৎই আমাদের দু-পাশে সেই পাইন গাছের বন অনেকটা সরে গেল। দেখলাম বেশ কিছুটা দূরে নদী আর নদীর পাশের রাস্তা দুটোই একসঙ্গে ইউ-এর মতন বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকের মুখেই দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের প্রথম বাড়িটা। তারপর আরও বাড়ি, দোকানপাট। ইউয়ের অন্য মাথায় নাগোয়ার দেবতার মন্দির। আমরা দাঁড়িয়ে আছি মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকের পাহাড়টার গায়ে।

বুধোদার দেখলাম সিন-সিনারির দিকে মন নেই। ও তাকিয়ে আছে আমাদের বাঁ-দিকের আকাশে। ও কী দেখছে দেখতে গিয়ে বুঝলাম, ও আসলে একটা পাখি দেখতে পেয়েছে। আকাশের ওই কোণা থেকে চিলের মতন পাখি-টা আমাদের দিকেই গ্লাইড করে উড়ে আসছে। বুধোদা তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে টেলি-লেন্সটা বার করে ক্যামেরায় লাগাতে-লাগাতে বলল, ‘রুবিক, মনে হচ্ছে হিমালয়ান গ্রিফন। এত সুন্দর আলো। শট-টা যদি ঠিকঠাক নিতে পারি…।’

বুধোদার লেন্স পালটানো হয়ে গিয়েছিল। এবার ও ক্যামেরাটা চোখে লাগিয়ে উড়ন্ত পাখিটাকে ফলো করতে শুরু করল।

পাখিটা এগিয়ে আসছে। এখন আমিও খালি চোখেই বুঝতে পারছি ওটা সাধারণ চিল বা শকুন নয়। তারা এত বড় হয় না। এই পাখিটার পালকগুলোও মনে হয় সাদা কিংবা ঘিয়ে রঙের, না হলে ভোরের আলোয় অমন সোনালি দেখাত না।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাখিটা আমাদের একেবারে সামনে চলে এল। আমরা যে হাইটে দাঁড়িয়ে আছি, প্রায় সেই হাইটেই উড়ছে পাখিটা। এখন এক সরলরেখায় ওই পাখি এবং বুধোদা।

বুধোদা শেষ মুহূর্তে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলটা একটু অ্যাডজাস্ট করল, তারপরেই পরপর কয়েকবার শাটারের ক্লিক ক্লিক শব্দ। ওর ওই ডিজিটাল এস. এল. আর. ক্যামেরাটায় এক সেকেন্ডের মধ্যে যে কোনও চলন্ত জিনিসের পরপর আটটা ছবি তোলা যায়। মানে, এক সেকেন্ডের মধ্যে ওই পাখিটার ডানার যতরকমের মুভমেন্ট হয়েছে সবক’টাই বুধোদার ক্যামেরায় ধরা রইল।

একবার ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ বুলিয়ে বুধোদার মুখটা খুশিতে ভরে উঠল। বলল, ‘ও:, লাকিলি দারুণ কয়েকটা শট পেয়ে গেলাম। চল রুবিক, এগোনো যাক।’

জিগ্যেস করলাম, ‘কোথায় যাবে বুধোদা? বিরাজ সিং-এর বাড়ি?’

‘ঠিক ধরেছিস।’ বুধোদা বলল। ‘ওকে কথা দিয়েছিলাম বলেই তো এখানে এলাম। তাই ওর সঙ্গে দেখা না হওয়া অবধি শান্তি পাচ্ছি না।’

পাইনবন পেরিয়ে আরও মিনিট কুড়ি হাঁটার পরেই পৌঁছে গেলাম একটা বাজারের মতন জায়গায়।

বিরাজ আগেই বুধোদাকে বলেছিল, ও যে বস্তিটায় থাকে তার নাম টিনামহল্লা। একটা পানের দোকানের সামনে গিয়ে বুধোদা ‘টিনামহল্লার রাস্তাটা কোনদিকে ভাই?’ জিগ্যেস করতেই লোকটা হাত তুলে একটা রাস্তার দিক দেখিয়ে দিল।

মাইল খানেক হাঁটার পর আমরা গিয়ে পড়লাম একটা বস্তির মতন জায়গায়। পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে তিরিশ চল্লিশখানা বাড়ি। সবক’টা বাড়িতেই গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো দেয়াল, স্লেট-পাথরের টালি দিয়ে ছাওয়া ছাদ।

এটাই যে টিনামহল্লার সেই শিল্পীদের গ্রাম সেটা কাউকে বলে দিতে হয় না। অনেক বাড়িরই ছাদ ফুঁড়ে লম্বা চিমনি বেরিয়ে এসেছে। ধাতু গলানোর উনুনের সঙ্গে সেগুলোর যোগ। এখানে ওখানে বাড়ির রোয়াকে ডাঁই করে রাখা আছে অর্ধেক তৈরি হওয়া অ্যাশ-ট্রে, ফুলদানি, ওয়াল-হ্যাঙ্গিং এইসব।

এত সকাল বলেই বোধহয় রাস্তায় লোকজন ছিল না। একজন বয়স্ক মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখে জিগ্যেস করলাম, ‘বিরাজ সিং-এর বাড়ি কোনটা বলতে পারেন?’

তিনি আঙুল তুলে একটা বাড়ির দিকে দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। কোনও কথা বললেন না।

আমরা তার দেখিয়ে দেওয়া বাড়িটার দরজায় কড়া নাড়লাম। বুধোদা দুবার বিরাজ, বিরাজ বলে ডাক দিল। পাশের একটা জানলা অল্প ফাঁক হল। বুঝলাম আড়াল থেকে কেউ আমাদের দেখে নিচ্ছে। তারপরে সামনের দরজাটা খুলে গেল।

যিনি খুললেন তিনি বিরাজ সিং হতে পারেন না, কারণ এনার বয়স পঁচিশ নয়। পঁচাত্তর হতে পারে, পঁচাশি হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বুড়ো মানুষটি আমাদের ভেতরে ডাকলেন—’আসুন মজুমদার সাব! ভেতরে আসুন। আমি বিরাজের দাদু, সুরথ সিং।’

মনে পড়ল, ট্রেনে আসতে আসতেই বুধোদার মুখে এই দাদুর কথা শুনেছিলাম। বিরাজ সিং-এর বাবা-মা দুজনেই বহুদিন আগে স্মল-পক্সে মারা গেছেন। বিরাজের বয়স তখন সাত আট বছর হবে। তারপর থেকে ও দাদু-ঠাকুমার কাছেই মানুষ হয়েছে। সেই ঠাকুমাও মারা গেছেন গত বছরে, তবে তার আগে বিরাজের বিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। তাই এখন সংসারে শুধু বিরাজের দাদু, বিরাজের বউ আর বিরাজ।

এই দাদুর সম্বন্ধে আরও একটা কথা বলেছিল বিরাজ। ওনার মতন বড় শিল্পী না কি এখনও টিনামহল্লায় জন্মায়নি। বিরাজ বুধোদাকে বলেছিল, ‘মজুমদারসাব, আমরা তো সারাদিন বসে বসে অন্যের তৈরি করা ছাঁচে একই জিনিসের একটার পর একটা কপি বার করি। দাদুর হাতের কাজ ছিল অন্যরকম। দাদু নিজেই যেমন ইচ্ছে ছাঁচ বানিয়ে নিতে পারতেন। ওনার প্রতিভার একশোভাগের একভাগও আমি পাইনি।’

বুধোদা আমাকে বলেছিল, ‘তাহলেই ভেবে দ্যাখ, বিরাজের নিজের হাতের কাজই এত সুন্দর। ওর দাদুর কাজ তাহলে কেমন ছিল!’

সেই থেকেই সুরথ সিং-কে দেখার আগ্রহ ছিল আমাদের। তবে এখন ওনাকে দেখে বেশ অসুস্থ মনে হল। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখের তলায় কালি। কথা বলতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল।

বুধোদা জিগ্যেস করল, ‘আমাকে চিনলেন কেমন করে?’

‘আপনার ফোটো দেখেছি না? মার্চ মাসে বিরাজ যেবার প্রাইজ নিতে কলকাতা গেল, সেই অকেশনে আপনি তো সারাক্ষণ ওর পাশে পাশে ছিলেন। ওই আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিল, এই হল বোধিস্যার। আপনি ওনার জন্যে অনেক করেছেন।’

বুধোদা অপ্রস্তুত মুখে বলল, ‘ছাড়ুন ওসব কথা। বিরাজ কোথায়? ওকে ডাকুন না একবার।’

‘বিরাজ তো নেই। ও সিমলার একটা মেলায় মাল বিক্রি করতে গেছে।’

‘সে কি! নিজের গ্রাম নাগোয়ারে এত বড় মেলা বসেছে, আর সেই মেলা ছেড়ে ও চলে গেল সিমলা!’

সুরথ সিং কোনও উত্তর দিলেন না।

বুধোদা কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘শুনুন নানাজি, বিরাজের ফোন কয়েকদিন ধরে বন্ধ। কী হয়েছে ঠিক করে বলুন তো।’

‘আরে ওসব মেলার ভিড়ে ফোন কাজ করে না কি?’ মাছি তাড়ানোর মতন করে হাত নাড়লেন সুরথ সিং। ‘আমাদেরও তো কতদিন ফোন করে না।’

বুধোদা অসন্তুষ্ট মুখে ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘ফোনের টাওয়ার না থাকলে ”নট রিচেবল” বলবে। ”সুইচড অফ” বলবে কেন? যাই হোক, বিরাজ কবে ফিরবে কিছু বলেছে?’

সুরথ সিং বললেন, ‘কবে আসবে কেমন করে বলব? বিক্রিবাটা শেষ হলেই ফিরে আসবে। এলেই আপনার কথা বলব। আপ বেফিক্কর রহিয়ে মজুমদার সাব।’

কথা বলতে বলতেই দেখলাম, ভেতরে যাওয়ার দরজার কাছে একটি শাড়ি পরা কমবয়সি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পুরো মুখটাই লম্বা ঘোমটায় ঢাকা। হাতে কাঁসার থালার ওপর তিনটে চায়ের গ্লাস আর একটা প্লেটে সেঁউ ভাজা। সুরথ সিং তাকে ভেতরে ডাকলেন। ‘এসো দিদি, ভেতরে এসো। এই হচ্ছেন বোধিসত্ব স্যার আর এই ওনার ভাই। এনাদের কথা তো তুমি বিরাজের মুখে অনেক শুনেছ। বাবুজি, এই হল বিরাজের বহু, ঊর্মিলা।’

ঊর্মিলা থালাটা আমাদের সামনে নামিয়ে রেখে হাতজোড় করে নমস্কার করল। তখনও মাটির দিক থেকে মুখ তুলল না। তারপর কোনও কথা না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বেরিয়ে যাবার সময় ওর গলা থেকে এমন একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল, যেটাকে কান্না চাপার চেষ্টা বলেই মনে হল। আওয়াজটা আমরা তিনজনেই শুনেছিলাম। ও বেরিয়ে যাবার পরে সুরথ সিং গম্ভীরমুখে বললেন, ‘বরকে যদি পেটের ধান্দায় বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতে হয় তাহলে কোন মেয়ের মন ভালো থাকে? নিন স্যার, চা নিন।’ সুরথ সিং আমাদের হাতে চায়ের গ্লাস তুলে দিলেন।

বুধোদা চা-এর গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বিরাজের মুখেই শুনেছি, আপনিও খুব বড় আর্টিস্ট। এখন কাজ করেন না?’

সুরথ সিং বলল, ‘কী যে বলেন সাব! আমার আটাত্তর বছর বয়েস হল। চোখে ভালো দেখি না। সারাক্ষণ হাত কাঁপে। আমি করব কাজ? ছ’বছর হল কারখানা ঘরের চৌকাঠ পেরোইনি। নাতির হাতে ও ঘরের চাবি তুলে দিয়ে আমি সেই যে বেরিয়ে এসেছি আর ঢুকিনি। কারখানা ঘর এখন বন্ধ।’

চা শেষ করে আমরা উঠে পড়লাম। বেরোবার আগে বুধোদা বলল, ‘আপনি দয়া করে বিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ হলে একবার আমার কাছে ওকে আসতে বলবেন। আমরা আরও কয়েকদিন এখানে আছি। আর আমরা উঠেছি ল্যাভেন্ডার লজে। চেনেন তো জায়গাটা?’

সুরথ সিং ঘাড় হেলিয়ে জানালেন যে, তিনি চেনেন।

বিরাজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা হাঁটার পরেই বুধোদা বলল, ‘রুবিক, ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না, একদমই ভালো লাগছে না। সুরথ সিং এতগুলো মিথ্যে কথা বললেন কেন?’

আমি অবাক হয়ে বুধোদার মুখের দিকে তাকালাম।

বুধোদা বলল, ‘বিরাজ যেখানেই গিয়ে থাকুক স্বেচ্ছায় যায়নি। প্রথম কথা নাগোয়ারের মেলা ফেলে ও এইসময়ে বাইরে যেতে যাবে কোন দু:খে? দ্বিতীয়ত, যদি তাই যায়, তার জন্যে ঊর্মিলা কাঁদবে কেন? বিরাজ তো প্রায় সারাবছরই মেলায় মেলায় ঘুরে ওর হাতের কাজ বিক্রি করে। এই টিনামহল্লার সব মানুষই তাই করে। ঊর্মিলার তো অভ্যেস হয়ে যাওয়ার কথা।

‘তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, সুরথ সিং কেন আবার কামারশালায় ফিরে গেছেন? কেন ছ’বছর বাদে আবার ফার্নেসের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করেছেন?’

আমি বললাম, ‘সে কি! কেমন করে বুঝলে উনি ফার্নেসের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন?’

বুধোদা বলল, ‘ওনার হাতদুটো একটু খেয়াল করে দেখলে তুইও বুঝতে পারতিস। হাতের সমস্ত লোম আগুনের আঁচে পুড়ে কুঁকড়ে গেছে। তাছাড়া বেরোবার সময় দেখলাম ওনার বাড়ির চিমনি থেকেও খুব সরু একটা ধোঁয়ার রেখা বেরিয়ে আসছে।

‘রুবিক, বিরাজ কোথায় গেছে, এটা যেমন একটা প্রশ্ন, তেমনি সুরথ সিং কী করছেন সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। মনে রাখবি, দু-ধরনের লোক মিথ্যে কথা বলে। বদমাশ লোক আর ভীতু লোক। সুরথ সিং কোন দলে?’

এরপর অনেকক্ষণ আমরা দুজনে আর কোনও কথা বলিনি। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে নাগোয়ার বাজারে পৌঁছে গিয়েছিলাম, তা-ও খেয়াল নেই। ওখানে পৌঁছিয়ে বুধোদার প্রথম মৌনব্রত ভাঙল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সবে সাড়ে আটটা বাজে। আমি বলি কি, ল্যাভেন্ডার লজে না ফিরে এখানেই মোমো টোমো কিছু খেয়ে নিই। তারপর একটা জরুরি কাজ সেরে একেবারে হোটেলে ফিরব। কী বলিস?’

আমি বললাম, ‘কোনও আপত্তি নই। কিন্তু জরুরি কাজটা কী?’

বুধোদা বলল, ‘একবার লোকাল পুলিশ স্টেশনে যাব।’

তিন

ও.সি.-র ঘরের দরজায় সবুজ রঙের ভারী পরদা ঝুলছিল। বাইরে নেমপ্লেটে দেবনাগরী অক্ষরে লেখা ‘মনীশ শ্রীবাস্তব, অফিসার-ইন-চার্জ’। পরদাটা অল্প সরিয়ে বুধোদা জিগ্যেস করল, ‘মে উই কাম ইন স্যার?’

ভারী গলায় জবাব এল, প্লিজ কাম ইন।’

আমরা দুজন ভেতরে ঢুকলাম। শ্রীবাস্তব সাহেব কম্পিউটারে বোধহয় মেল চেক করছিলেন। আমরা ঘরে ঢুকতেই মুখ ফিরিয়ে অল্প হেসে সামনের চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

দেখলাম, ওনার বয়স হয়েছে। পঞ্চাশের বেশ কিছুটা ওপরেই হবে। ছোট করে ছাঁটা চুল পুরোটাই প্রায় সাদা। কিন্তু চেহারা দেখলে মনে হয় এখনও যথেষ্ট অ্যাকটিভ। চোখদুটোও খুব ইনটেলিজেন্ট। বুধোদার কাঁধের ক্যামেরা-ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ট্যুরিস্ট? কোনও প্রবলেমে পড়েছেন?’

বুধোদা ঘাড় নেড়ে পার্স থেকে নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড বার করে শ্রীবাস্তব সাহেবের হাতে দিল। আমি জানি, কার্ডটার ওপরে বেশ কায়দা করে ইংরিজিতে মহারাজা কালেকশনসের নাম আর লোগো ছাপা আছে। নীচে লেখা আছে ‘প্রোপ্রাইটর বোধিসত্ব মজুমদার’। তার নীচে শো-রুমের ঠিকানা আর বুধোদার ফোন নাম্বার।

উনি কার্ডটার দিক থেকে চোখ না তুলেই বললেন, ‘বোধিসত্ব মজুমদার! গত ডিসেম্বরে সিমলা মিউজিয়াম থেকে যে রেয়ার ম্যানাস্ক্রিপ্ট চুরি গেছিল, আপনার টিপস নিয়েই পুলিশ ওগুলোকে রিকভার করেছিল না?’

বুধোদা বিনয়ী ভঙ্গিতে ঘাড় হেলাল।

শ্রীবাস্তব সাহেব বেল বাজিয়ে পিয়নকে আমাদের জন্যে চা আনতে বললেন, তারপর বললেন, ‘বলুন মিস্টার মজুমদার, আপনি নাগোয়ারে কেন? কোনও ক্রাইমের গন্ধ পেলেন না কি?’

বুধোদা বলল, ‘আগে পাইনি। শুধু বেড়াতেই এসেছিলাম। তবে এখন পাচ্ছি। আমার এক বন্ধু, লোকাল ছেলে, টিনামহল্লায় বাড়ি। একটু আগে ওর বাড়ি গিয়ে শুনলাম ও বাড়ি নেই। ওর ফোনও আজ ছ’দিন হল সুইচড অফ। একটু খোঁজ করতে পারেন?’

ও. সি. মনীশ শ্রীবাস্তব বললেন, ‘বাড়ির লোক কী বলছে? অস্বাভাবিক কিছু সন্দেহ করছে কী?’

বুধোদা বলল, ‘বাড়ির লোক, মানে ছেলেটির দাদু, ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করছেন…বলছেন ও নাকি বিজনেসের ব্যাপারে বাইরে বাইরে ঘুরছে।’

মনীশ শ্রীবাস্তব বুধোদাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, উই আর স্যরি। এখন ফেস্টিভাল নিয়ে আমরা সবাই প্রচণ্ড ব্যস্ত আছি। এসব পেটি-কেসের পেছনে যে একজন লোক দেব, সেরকম বাড়তি ম্যানপাওয়ারও এখন আমার হাতে নেই। আপনি বরং শনিবারের পরে আসুন। তখন অবধি যদি ছেলেটিকে কনট্যাক্ট করতে না পারেন, তখন আমরা দেখব।’

বুধোদা বলল, ‘দেখুন, আমি বলতে চাইছিলাম, নাগোয়ারের মূর্তির সেফটির সঙ্গে এর কোনও সম্বন্ধ নেই তো? বিরাজ, মানে আমাদের বন্ধু, ঠিক এই সময়েই বেপাত্তা হয়ে গেল কেন?’

মনীশ শ্রীবাস্তব বুধোদার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ওনার চোখের দৃষ্টি দেখলাম বুধোদার এই কথায় বেশ কঠিন হয়ে উঠল। উনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার। আপনার বোধহয় সবকিছুর মধ্যে ক্রাইম খুঁজে বেড়ানোর অভ্যেস হয়ে গেছে। না হলে কোথায় কোন এক মিস্ত্রি বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, আর তার সঙ্গে আপনি নাগোয়ারের সেফটিকে জড়িয়ে দিলেন? প্লিজ, এসব রিউমার ছড়াবেন না। যদি কেউ মূর্তি লুঠের চেষ্টা করে, তাকে করতে দিন। লেট হিম মেক অ্যান অ্যাটেমপ্ট। উই হ্যাভ নো প্রবলেম।’

বুধোদা একটা ভুরু ওপরে তুলে অবাক হবার ভাব দেখাল। বলল, ‘নো প্রবলেম?’

‘অ্যাবসল্যুটলি নট। ফেস্টিভালের এই ছ’দিন নাগোয়ারের সিকিউরিটি থাকে মিলিটারির হাতে। আমিই অবশ্য পুরো ব্যাপারটার চার্জে থাকি। আপনারা বেড়াতে এসেছেন, নিশ্চিন্তে বেড়ান। মন্দির দেখুন, ঝরনা-পাহাড় দেখুন, কেনাকাটা করুন। নাগোয়ারের সেফটির ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।’

বুধোদা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘তাহলে তো কোনও কথাই নেই। আচ্ছা ঠিক আছে মিস্টার শ্রীবাস্তব, আমরা তাহলে চলি। যদি প্রয়োজন হয় শনিবারের পর আসব।’

আমরা ঘর থেকে যখন বেরোচ্ছি, ঠিক তখনই শ্রীবাস্তব সাহেবের টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল। মনীশ শ্রীবাস্তব ফোনটা কানে লাগিয়ে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, আমাদের দিকে ফিরেও তাকালেন না। ও.সি.-র ব্যবহারে মনটা বেশ তেঁতো হয়ে গিয়েছিল। সেই তেঁতো মন নিয়েই থানার কম্পাউন্ড পেরিয়ে রাস্তার দিকে যাচ্ছিলাম।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা ডাক ভেসে এল,—’মিস্টার মজুমদার!’

আমি আর বুধোদা একসঙ্গেই ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম, নিজের চেম্বারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মনীশ শ্রীবাস্তব। আমাদের তাকাতে দেখে তিনি বললেন, ‘একবার শুনে যান, প্লিজ।’

আমরা ওনার পেছনে পেছনে আবার ওনার চেম্বারে ঢুকলাম। উনি আমাদের চেয়ারে বসার সময়টা দিলেন। তারপর বললেন, ‘এইমাত্র মন্দির থেকে একটা ফোন এসেছিল। মন্দির কমিটির সেক্রেটারি শিব ডোগরা ফোনটা করেছিলেন। উনিই জানালেন, দা প্রিস্ট হ্যাজ বিন কিলড। নাগোয়ার মন্দিরের পুরোহিত সায়ন আচার্য খুন হয়েছেন।’

আমাদের দুজনের মধ্যে বুধোদাই প্রথম শকটা কাটিয়ে উঠে জিগ্যেস করল, ‘কখন? কীভাবে?’

‘আজ সকালেই। ওনাকে মাথায় বাড়ি মেরে খুন করা হয়েছে। আর তার জন্যে যে অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটা কী জানেন? একটা হাতুড়ি। টিনামহল্লার ঘরে ঘরে এই হাতুড়ি দেখা যায়। ওরা বলে ‘হাম্বর’। মেটালের ভারী ব্লক-কে পিটিয়ে চ্যাপটা করতে এরকম ভারী হাতুড়ি ওরা ইউজ করে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মনীশ শ্রীবাস্তব বললেন, ‘এখানেই যদি গল্পটা শেষ হত তাহলেও হয়তো আপনাদের এইভাবে ডেকে ফেরাতাম না। কিন্তু তারপরে যা শুনলাম তাতে আপনাদের না ফিরিয়ে আমার উপায় ছিল না।’

বুধোদার মুখের ওপর থেকে নজর না সরিয়েই উনি ডেস্কের পাশের সুইচটার ওপর হাতের চাপ দিলেন। বাইরে কোথাও বেল বেজে উঠল। হাতটা সরিয়ে নিয়ে উনি বললেন, ‘হাতুড়িটার হাতলের ওপর খোদাই করা আছে পাঁচটা ইংরিজি অক্ষর। বি আই আর এ জে। বিরাজ।’

আমার বুকের খাঁচাটা মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন খালি হয়ে গেল।

পাশ ফিরে বুধোদার দিকে তাকালাম। ওর মুখ ভাবলেশহীন। মনীশ শ্রীবাস্তব চেয়ার ছেড়ে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ওখানে দাঁড়িয়েই উনি মোবাইল ফোনে কথা বলতে শুরু করেছিলেন। একদিকের কথা শুনে যা বুঝছিলাম, উনি ফায়ার-ব্রিগেড, ফরেনসিক-ডিপার্টমেন্ট, হসপিটাল সমস্ত জায়গায় খুনের ব্যাপারটা ইনফর্ম করে চলেছেন। সেই অবস্থাতেই হাতের ইশারায় আমাদের উঠতে বারণ করলেন।

কথা সেরে এসে চেয়ারের পেছনের হ্যাঙ্গার থেকে টুপিটা নিয়ে মাথায় পড়তে-পড়তে মনীশ শ্রীবাস্তব বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, আপনার সঙ্গের এই হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যানটি কে?’ ওনার একটু আগের সেই কনফিডেন্স দেখলাম একটা ফোন পেয়েই বেশ টলে গেছে।

বুধোদা উত্তর দিল, ‘আমার কাজিন, মাল্যবান মিত্র। আমি অবশ্য ওকে রুবিক বলেই ডাকি।’

‘ওয়েল, আপনি এবং রুবিক দুজনেই আমার সঙ্গে গাড়িতে চলুন। বুঝতেই পারছেন, এখন আমাকে অনেক দৌড়োদৌড়ি করতে হবে। অথচ বিরাজ সিং-কে খুঁজে বার করাটা এখন সব থেকে জরুরি কাজ। সেইজন্যেই বলছি। আপত্তি নেই তো?’

বুধোদা বলল, ‘আপত্তি থাকবে কেন? আমি বিরাজের বন্ধু বলে? তাহলে আপনাকে মনে করিয়ে দিই, আমি নিজে থেকে যদি এখানে না আসতাম তাহলে আপনি বিরাজের সঙ্গে আমাদের লিঙ্ক মাথা খুঁড়েও খুঁজে পেতেন না।’

 মনীশ শ্রীবাস্তব সত্যিকারেই লজ্জা পেলেন। কোনও রকমে বললেন, ‘না, না। আমি তা মিন করিনি। ও. কে., লেটস গো।’

নীল আকাশের নীচে আরও গাঢ় নীল ব্লিঙ্কারের ঝিলিক তুলে নাগোয়ার পুলিশ স্টেশনের সাদা জিপসি আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে ছুটল। পেছনের সিটে শ্রীবাস্তব সাহেবের পাশে বুধোদা, তার পাশে আমি। যেতে যেতে বুধোদা ওনাকে সব কথাই খুলে বলল। মানে বিরাজ সিং-এর সঙ্গে ওর পরিচয়ের সূত্র, এখন কয়েকদিন ধরে বিরাজের ফোন যে বন্ধ সেই কথা, একটু আগে বিরাজ সিং-এর দাদু সুরথ সিং কীভাবে ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন সেটাও। এমন কি ঊর্মিলার কান্নার কথাটাও বলতে ভুলল না।

মন্দিরের লোহার গেট ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দেখলাম, গেটের বাইরে এর মধ্যেই অন্তত দুশো মানুষের ভিড় জমে গেছে। নাগোয়ারের মতন ছোট্ট জায়গার তুলনায় সংখ্যাটা অনেক। তাছাড়া আরও অনেকে তখনও ছুটতে ছুটতে আসছে। সবার মুখেই উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। কোনও কোনও মহিলা বেশ শব্দ করে কাঁদছেন। অর্থাৎ পুরোহিতের মৃত্যুর খবরটা ছড়িয়ে পড়ছে।

আমরা এগিয়ে যেতেই গার্ডরা গেটটা খুলে আমাদের ঢুকিয়ে নিয়ে আবার সেটা বন্ধ করে দিল। মন্দিরের উঠোনে দাঁড়িয়ে বয়স্ক এক ভদ্রলোক মন্দিরের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। পুলিশ ঢুকতে দেখে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন।

ভদ্রলোক যাকে বলে তাল ঢ্যাঙা। একটা ঝলঝলে কালো কোট পরে আছেন। গায়ের রং-টা কেমন যেন ফ্যাকাশে সাদা। এগিয়ে আসতে আসতেই বললেন, ‘আসুন ও. সি. সাহেব, আসুন। দেখুন কী সর্বনাশ হয়ে গেল।’ বলতে বলতেই মনীশ শ্রীবাস্তবের পাশে বুধোদাকে দেখে বাকি কথা গিলে ফেললেন।

শ্রীবাস্তব সাহেব ওনার দ্বিধা বুঝতে পেরে বললেন, ‘আলাপ করিয়ে দিই। মিস্টার মজুমদার, ইনিই মন্দির কমিটির প্রেসিডেন্ট মিস্টার শিব ডোগরা। এখানকার সবচেয়ে খানদানি ফ্যামিলির হেড। ওনাদের জন্যেই এই মন্দির তৈরি হয়েছিল। সে গল্প পরে ওনার মুখ থেকেই শুনবেন। আর মিস্টার ডোগরা, এনারা আমার গেস্ট। ইনি মাল্যবান মিত্র আর ইনি বোধিসত্ব মজুমদার, অ্যান্টিক হান্টার।’

‘অ্যান্টিলোপ হান্টার! আরে বাপ। হরিণ শিকারী? সেটা তো ক্রাইম বলেই জানি মশাই। আপনি কি শ্রীবাস্তব সাহেবের কাছে সারেন্ডার করতে এসেছেন?’

মনীশ শ্রীবাস্তব হাত তুলে ওনাকে থামালেন। ‘আ:, মিস্টার ডোগরা, অ্যান্টিলোপ নয়, অ্যান্টিক। ওল্ড অ্যান্ড প্রেশাস থিংস। এখন চলুন কী হয়েছে একটু দেখিয়ে দিন আমাদের।

শুধু শিব ডোগরা নন, ওখানে যে আর্মির জওয়ানেরা ডিউটি দিচ্ছে, তাদের লিডার ক্যাপ্টেন মেহতাও আমাদের সামনেই মনীশ শ্রীবাস্তবকে পুরো ঘটনার বিবরণ দিলেন। যা বুঝলাম—প্রতিদিন সকাল সাতটায় পুরোহিত সায়ন আচার্য মন্দিরের পেছনের বাধানো সিঁড়ি ধরে নেমে যেতেন পার্বতী নদীতে স্নান করতে। শীত-গ্রীষ্ম কখনও তাঁর এই নিয়মের হেরফের হত না।

আরেকজন পুরোহিত আছেন সায়ন আচার্যেরই শিষ্য। তার নাম শুকদেব ঝা। শুকদেব সাতটা বাজার অনেক আগেই নদীতে স্নান সেরে পুজোর জোগাড়যন্ত্র করবার জন্যে মন্দিরে ঢুকে পড়ত।

সকাল আটটার মধ্যে সায়ন আচার্য স্নান সেরে নতুন কাপড় পরে মন্দিরে ঢুকে যেতেন। তারপর নাগোয়ার দেবের সকালের পুজো শুরু হত।

আজ সাড়ে আটটা বেজে যাওয়ার পরেও যখন সায়ন আচার্য মন্দিরে ঢুকলেন না তখন শুকদেব আটজন গার্ডের মধ্যে একজনকে বলেছিল একটু খুঁজে দেখতে উনি কোথায় গেলেন। প্রথমে মন্দিরের মধ্যেই তারা খুঁজেছিল, কিন্তু তাঁকে পায়নি। তারপর নদীতে যাওয়ার সিঁড়ি ধরে কিছুটা নামতেই তারা সায়ন আচার্যকে দেখতে পায়। ওই সিঁড়ির একটা ধাপের ওপরেই তিনি উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। নিশ্বাস পড়ছিল না। তাই তারা আর দেরি না করে ডাক্তার ডাকেন।

ডাক্তারবাবু পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। নাম শুনলাম ডক্টর বিজন কাপুর। মাঝবয়সি মানুষ। ভয়ংকর গম্ভীর। শ্রীবাস্তব সাহেব ওনার দিকে তাকাতেই উনি এগিয়ে এসে বললেন, ‘নাড়াচাড়া না করে যতটা এগজামিন করা যায়, করেছি। কোনও ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে মাথার পেছনে মারা হয়েছে। সেটা তো আপনারা খুঁজেও পেয়েছেন শুনলাম। ওই এক ঘায়েই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। রাইগার মর্টিস সেট করে গেছে। তার মানে তিন ঘণ্টার আগে কোনও এক সময়ে উনি মারা গেছেন।’

বুধোদা চট করে ঘড়িটা দেখে নিয়ে নিজের মনেই বলল, ‘এখন সাড়ে ন’টা। উনি যদি ন’টা নাগাদ বডিটা এগজামিন করে থাকেন তাহলে সে হিসেবে ছ’টার আগে সায়ন আচার্যকে খুন করা হয়েছে। ছ’টার আগে উনি ওখানে গেলেন কেন? ওনার স্নান করতে যাওয়ার কথা তো সাতটায়।’ কথাগুলো বুধোদা বলল নীচু গলায়। পাশে দাঁড়িয়েছিলাম বলে একমাত্র আমিই শুনতে পেলাম। আর কেউ শুনতেও পেলেন না, কোনও উত্তরও দিলেন না।

ক্যাপ্টেন মেহতা জানালেন মৃতদেহ ঠিক যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল সেই অবস্থাতেই রয়েছে। কেউ তাতে হাত লাগায়নি। শুধু দুজন জওয়ানকে ওখানে পাহারায় রাখা আছে।

শ্রীবাস্তব সাহেব বললেন, ‘চলুন মিস্টার মজুমদার। রুবিক তুমি বরং এখানেই থাকো। দৃশ্যটা তোমার ভালো লাগবে না।

বুধোদা, শিব ডোগরা, ক্যাপ্টেন মেহতা আর শ্রীবাস্তব সাহেব পাথরে বাঁধানো বিশাল উঠোনটা পেরিয়ে মন্দিরের পেছন দিকে চলে গেলেন।

আধ ঘণ্টা বাদে সাইরেন বাজাতে বাজাতে একটা অ্যাম্বুলেন্স গেট পেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল। একটা ভাঁজ করা স্ট্রেচার হাতে ঝুলিয়ে কয়েকজন সাদা পোশাক পরা লোক দ্রুত পায়ে মন্দিরের পেছনদিকে চলে গেলেন। একটু বাদে তারা ওই স্ট্রেচারে করেই মৃতদেহ নিয়ে উঠে এলেন। তার পেছন পেছনই বুধোদা, শ্রীবাস্তব সাহেব, ক্যাপ্টেন মেহতা এবং শিব ডোগরা—সকলেই ফিরে এলেন।

অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর আগে স্ট্রেচারটাকে উঠোনে নামানো হয়েছিল। সাদা চাদরের আচ্ছাদনটা একবার হাওয়ায় উড়ে যেতেই দেখতে পেলাম সায়ন আচার্যের মুখ। ছোটখাটো চেহারা। সাদা দাড়ি। ঘাড় অবধি লুটিয়ে পড়া সাদা ধবধবে চুল। মনে হল নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন।

দু-এক মিনিট মাত্র। তারপরেই কেউ একজন ওনার মুখের ঢাকা আবার ঠিকঠাক করে দিল। বডি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ফেলা হল। শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল গাড়ির পেছনের দরজা। মন্দিরের ভেতরের যে কর্মচারীরা দাঁড়িয়ে ছিল তারা অনেকে কেঁদে উঠল।

একজন গার্ডকে জিগ্যেস করলাম, ওদের মধ্যে শুকদেব ঝা আছে না কি?

সে ইশারায় যাকে দেখাল তার বয়েস চল্লিশ বছর হবে। প্রায় ছ’ফিট লম্বা, দশাসই চেহারা। ঘোড়ার মতন মুখ। কুতকুতে চোখে সায়ন আচার্যের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

বুধোদা উঠোন পেরিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। মনীশ শ্রীবাস্তব আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘স্যরি, আজ আর আপনাদের সঙ্গে দেখা করার সময় পাব বলে মনে হচ্ছে না। বাট আই উইল কিপ টাচ উইথ ইউ ওভার দা ফোন।’

বুধোদা হাত তুলে বলল, ‘আমাদের নিয়ে একটুও ভাববেন না। আপনি এদিকটা সামলান। শুধু একটা রিকোয়েস্ট।’

‘বলুন।’

‘ফরেনসিকের লোকদের দু-একটা জিনিস একটু খতিয়ে দেখতে বলবেন। এক নম্বর, সায়ন আচার্য আজ স্নান করেছিলেন কিনা।’

‘মানে!’

‘মানে আপনি তো দেখলেন, ওনার বডিটা পড়েছিল উপুড় হয়ে। মন্দিরের দিকে ছিল মাথা। আঘাতটা ছিল মাথার পেছনদিকে। তার মানে উনি যখন নদীর দিক থেকে মন্দিরে উঠছিলেন, মানে মন্দিরে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিলেন, তখনই কেউ পেছন থেকে হিট করেছিল। অথচ আমার যেন মনে হল ওনার ধুতি, চাদর কোথাও জলের চিহ্ন নেই। চুল দাড়ি সবই অস্বাভাবিক রকমের শুকনো, যে কারণে হাওয়ায় ফুরফুর করে উড়ছিল। যখন স্ট্রেচারের ওপর চিত করে শোয়ানো হল তখন দেখলাম ওনার কপালে কালকের বাসি তিলক।

‘সেইজন্যেই প্রশ্ন জাগছে, উনি কি আজ স্নান না সেরেই ফিরে আসছিলেন? কিন্তু কেন?’

‘নেক্সট?’

‘এটাও ফরেনসিকের ব্যাপার। যে হাতুড়িটা দিয়ে ওনাকে মারা হয়েছে সেটা একেবারে ব্র্যান্ড নিউ। দেখে মনে হল সবে বাজার থেকে কিনে আনা হয়েছে। ওটা দিয়ে মেটাল পেটানোর মতন কোনও তুচ্ছ কাজ আদৌ কোনওদিন করা হয়েছে কি? এই পয়েন্টটাও যেন একটু রিপোর্টে থাকে।’

‘আর?’

‘ওরকম একটা উন্ড থেকে যতটা ব্লিডিং হওয়ার কথা ততটা দেখলাম না। এর এক্সপ্ল্যানেশন কী? ব্যস, আপাতত এইটুকুই।’

শ্রীবাস্তব সাহেব তার নোটবুক পকেটে ঢুকিয়ে দু-পা চলে গিয়েও আবার ফিরে এলেন। বুধোদার একদম সামনে দাঁড়িয়ে খুব চাপা গলায় বললেন, ‘আপনি সিমলা কেসটায় দারুণ হেল্প করেছিলেন এইটুকুই শুধু জানি। কিন্তু আপনি অ্যাকচুয়ালি কে বলুন তো মিস্টার মজুমদার? ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের কোনও অফিসার? ইন্টারপোল?’

বুধোদা বুকের কাছে দুটো হাত জড়ো করে বলল, ‘আমি সামান্য একজন অ্যান্টিক হান্টার শ্রীবাস্তব সাহেব। শিল্প সন্ধানী। তবে কি জানেন—কোনও ক্রাইম, যদি নিখুঁতভাবে করা যায়, তাহলে সেটাও একটা শিল্প।’

চার

কালকের ঘটনায় মেজাজটা কেমন যেন ভার হয়েছিল। আজ সকালে বাইরে বেরোতেই কিন্তু মনটা অনেক হালকা হয়ে গেল। তার একটা কারণ তো অপূর্ব ওয়েদার আর প্রাকৃতিক দৃশ্য। আর অন্য একটা কারণ, কটেজের পেছনের পিচরাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া মানুষজন। কাল অবধি ওরা ছিল না।

বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না যে, ওরা চারপাশের গ্রাম থেকে আসছে। আসছে নাগোয়ার দর্শন করতে, মেলা দেখতে। বয়স্কই হোক কিংবা কমবয়সি, সকলের গায়ে যথাসাধ্য নতুন আর রঙিন পোশাক। সকলের গলায় গান, মুখে হাসি। অনেকেরই হাতে দোতারা কিংবা বাঁশির মতন কোনও না কোনও বাজনা। হাসিতে গানে বাজনায় চারিদিকে উৎসবের মেজাজ।

মঙ্গলবারটা সায়ন আচার্যের মৃত্যুর জন্য মন্দির বন্ধ ছিল। আজ বুধবার থেকে সবাইয়ের জন্যে মন্দির খোলা। সকাল থেকেই তাই মানুষের ঢল বয়ে চলেছে মন্দিরের দিকে।

দেখতে দেখতে আমাদের ভেতরেও একটা বেরিয়ে পড়ার ছটফটানি শুরু হয়ে গেল। বুধোদা ক্যামেরা-ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘চল।’

আমরা ঠিক করলাম মন্দিরের দিকটাই আগে একবার ঘুরে আসা ভালো। কাল নাগোয়ার মূর্তি দেখতে পাইনি। আজ যদি সেটা হয়ে যায়।

একটা সুবিধে হল, কালকের সেই ক্যাপ্টেন মেহতা মন্দিরের গেটের কাছে ডিউটি দিচ্ছিলেন। আমাদের দেখেই উনি একগাল হেসে ভেতরে ডেকে নিলেন। বললেন, ‘ভালো সময়েই এসেছেন। আর কিছুক্ষণ বাদেই পাবলিকের জন্যে দরজা খুলে দেওয়া হবে। তার আগে চট করে দেখে আসুন। আমি বলে দিচ্ছি। তবে ক্যামেরা আর মোবাইলগুলো কাইন্ডলি আমার কাছে রেখে যান। জানেনই তো এখানে এটাই নিয়ম।’

পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আবছা অন্ধকার গর্ভগৃহের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালাম। বুধোদা দেখলাম চারিদিকের কাঠ আর মেটালের কারুকাজগুলো হা করে দেখছে। একটু বাদে বাদেই ওর মুখ দিয়ে নানারকমের মন্তব্য বেরিয়ে আসছিল—অসামান্য, ভাবা যায় না, এরা কি মানুষ না গন্ধর্ব? এইসব।

তবে ও একটা কথা বলল, যেটার সঙ্গে আমিও একমত হলাম। মন্দিরের সমস্ত কারুকার্যের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায় নাগোয়ার দেবতার সোনার মূর্তি। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। কখনও মনে হয় একটাই সাপের মূর্তি আট ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। পরক্ষণেই মনে হয়, না তো! আটটা আলাদা আলাদা সাপ একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে একটা অদ্ভুত পদ্মফুলের মতন নকশা তৈরি করেছে, যার পাপড়িগুলো এক একটা সাপের ফণা।

বুধোদা ফিসফিস করে বলল, ‘এই জিনিসের একটা ছবি নিতে পারলাম না এটা বড় আফসোস রে রুবিক। যাই হোক, মানুষের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে হয়। চোখে যে দেখতে পেলাম এটাই যথেষ্ট।’

ক্যাপ্টেন মেহতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বুধোদা দেখলাম পার্স থেকে একটা ছোট কাগজের টুকরো বার করে তাতে চোখ বোলাচ্ছে। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘ওটা কী?’

বুধোদা বলল, ‘মিস্টার শিব ডোগরা কালকে ওনার বাড়ির রাস্তাটা ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। রিকোয়েস্ট করেছিলেন যেতে। বাড়ির নামটা বেশ বাহারের—”ডোগরা ক্যাসল”। ভাবছি একবার ঘুরে আসি।’

ম্যাপ মিলিয়ে যেখানে পৌঁছোলাম, কোনওকালে হয়তো সেখানে বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা বাগান ছিল। এখন জঙ্গলে ভরে গেছে চারিদিক। সেইসব বুনো গাছের জটলার মধ্যে থেকেই দু-একটা ভদ্রবংশের চেরি আর আপেলের গাছ অনেক কষ্টে উঁকি মারছে। গেটের ওপাশে নুড়ি বিছানো রাস্তার ওপরেও গোছা গোছা ঘাস জন্মেছে। সেই রাস্তার শেষে একসারি বিশাল পপলার গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডোগরা ক্যাসল।

সিনেমা কিংবা বইয়ের পাতায় এরকম হানাবাড়ির ছবি অনেক দেখেছি। কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি। খসে পড়া টালি। ভাঙা রেলিং। দেয়ালের ওপর থেকে রং কিংবা পালিশের আস্তরণ অনেকদিন আগেই উঠে গেছে। অসংখ্য দরজা জানলা, কিন্তু সবক’টাই আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ।

আমি ফিসফিস করে বুধোদাকে বললাম, ‘আর গিয়ে লাভ আছে? বোঝাই তো যাচ্ছে, ওখানে কেউ থাকে না।’

‘কী যে বলিস! ভদ্রলোক কালকেই নিজের হাতে আমাকে অ্যাড্রেস লিখে দিলেন, আর তুই বলছিস…’ বুধোদা দরজার দিকে এগিয়ে গেল বটে, কিন্তু ওর নিজের গলাতেও সেরকম কনফিডেন্স দেখলাম না।

দরজার কড়া নেড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে ভেতর থেকে পায়ের শব্দ এগিয়ে এল, ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে খুলে গেল দরজার পাল্লা। দেখলাম দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং শিব ডোগরা।

উনি দেখলাম বাড়িতেও সেই বেঢপ মাপের স্যুটটা পরে আছেন।

শিব ডোগরা হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমরা দুজনেই ওনার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম। উনি বললেন, ‘ভেতরে আসুন মিস্টার মজুমদার। আসুন রুবিকবাবু।’

বাইরের তাজা হাওয়া থেকে ঘরের মধ্যে পা দিতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে ঝাপটা মারল। ফার্নিচারের ঢাকায়, পর্দার কাপড়ে, মেঝের কোনায় আর দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা সম্বর হরিণ আর লেপার্ডের মাথায় কত বছরের ধুলো পুরু হয়ে জমে আছে কে জানে।

শিব ডোগরা আমাদের মুখের ভাব লক্ষ করছিলেন। বুঝতে পারছিলেন বোধহয় আমরা কী ভাবছি। তাই কিছু জিগ্যেস করার আগেই খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘এত বড় প্রপার্টি ঠিকমতো মেনটেইন করি এমন আর্থিক অবস্থা আমার আর নেই। ফলে সব কিছুই ভেঙে পড়ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

দুটো সোফার ওপর থেকে ধুলো ঝেড়ে উনি আমাদের বসতে ইশারা করলেন। নিজে আরেকটা সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বললেন, গত দশ বছর ধরে দুর্ভাগ্য আমার পেছনে ছিনেজোঁকের মতন লেগে রয়েছে। প্রথমে কল্পার আপেলবাগান বন্যার জলে ভেসে গেল। সিমলায় আমার দুটো সিনেমা হল ছিল, সে দুটো নতুন মাল্টিপ্লেক্সগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না। বন্ধ হয়ে গেল। শেষমেষ গত বছরে কুলুর হোটেলটায় আগুন লেগে গেল। ভাবতে পারেন, একটা চারতলা বাড়ি, উইদিন থ্রি-আওয়ারস শেষ? কাঠের কনস্ট্রাকশন ছিল। পুরোটাই ছাই হয়ে গেল। ভাগ্য ভালো, বোর্ডারদের কোনও ক্ষতি হয়নি।

হঠাৎ মিস্টার ডোগরা খাড়া হয়ে বসে বললেন, ‘দেখেছেন, নিজের দু:খের কথা শুনিয়ে আপনাদের বোর করছি। ছাড়ুন ওসব কথা। কী খাবেন বলুন। আমার এক বন্ধু নিজের ফার্মে তৈরি ভালো অ্যাপল জুস পাঠিয়েছে। তাই একটু টেস্ট করুন। এ জিনিস কোথাও কিনতে পাবেন না। এই মাঙ্গুরাম!’

কুড়ি-বাইশ বছরের গাঁট্টাগোট্টা একটা ছেলে ঘরে ঢুকল। বুঝলাম এই হল মাঙ্গুরাম।

‘সাবলোগোকে লিয়ে অ্যাপল জুস লাও।’

তারপর বুধোদার দিকে তাকিয়ে শিব ডোগরা যা বললেন, সেটা শোনার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। উনি বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, কালকে যে কারণে আপনাকে এখানে আসতে রিকোয়েস্ট করেছিলাম সেটা বলি। আপনি তো অ্যান্টিক নিয়ে ডিল করেন। আমার ইমিডিয়েটলি কিছু টাকার প্রয়োজন পড়েছে। আমার পূর্বপুরুষের আমলের কয়েকটা গোল্ড কয়েনস আমার কাছে আছে। আপনি দেখবেন? যদি ওগুলো নিয়ে আমাকে কিছু টাকা দিতে পারেন।’

বুধোদা বেশ আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘দেখান।’

শিব ডোগরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ বাদে একটা নীল ভেলভেটের বটুয়া নিয়ে ফিরে এলেন। তারপর বটুয়াটার মধ্যে থেকে ছ’টা সোনার কয়েন, যাকে বলে মোহর, বার করে বুধোদার সামনে রেখে উৎসুক দৃষ্টিতে বুধোদার মুখের দিকে তাকালেন।

বুধোদা একটা একটা করে মোহর চোখের কাছে নিয়ে উলটেপালটে দেখে মন্তব্য করল, ‘ও:! ভাবা যায় না। এর সবক’টাই তো দেখছি মোগল আমলের। দেখুন মিস্টার ডোগরা, আপনাকে সত্যি কথাই বলছি, এর দাম দিতে পারি সে ক্ষমতা আমার নেই। আপনি আরও বড় কোনও ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। কোনও সরকারি মিউজিয়ামকে বললে তারাও ন্যায্য দাম দিয়ে কিনে নিতে পারে।’

শিব ডোগরা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। বিক্রি আমি দুদিন পরেও করতে পারি। কিন্তু আপনার মতন একজন বিশেষজ্ঞ যে এগুলোকে দামি জিনিস বলে ডিক্লেয়ার করলেন, সেটাই আমার কাছে অনেক। আমি নিশ্চিন্ত হলাম।’

অ্যাপল জুসে চুমুক দিতে-দিতে এরপর শিব ডোগরার মুখে নাগোয়ারদেবের ইতিহাস শুনলাম।

মৃত্যুর কয়েক বছর আগে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর প্রিয় সন্তান মুয়াজ্জেমকে পাঠিয়েছিলেন বিদ্রোহী জাঠদের শায়েস্তা করতে। শায়েস্তা করার বদলে যুবরাজ মুয়াজ্জেম নিজের প্রাণটাই খোয়াতে বসেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে পালাতে পালাতে তিনি এসে পড়েন এই নাগোয়ারের রাস্তায়।

এখানে তখন কোনও লোকালয় ছিল না। ডোগরা উপজাতির মেষপালকেরা গরমের দিনগুলোতে এখানে ভেড়া চরাত। শীত পড়লে তারা নেমে যেত আরও নীচে। এখন নাগোয়ার মন্দিরে বেদির ওপর যে শিলাপটের পুজো হয়, সেদিনের সেই ডোগরা মেষপালকরা ওই পাথরটাকেই নাগোয়ার দেবতা হিসেবে পুজো করত। তখন অবশ্য এমন চমৎকার মন্দির ছিল না, ছিল এক পাহাড়ের গুহা, যার মধ্যে রাখা থাকত ওই শিলা।

ডোগরা মেষপালকদের বিশ্বাস ছিল, শুধু সাপের কামড় নয়, খোলা মাঠে, বনজঙ্গলে, নদীতে যে-কোনও বিপদ-আপদ থেকে তাদের বাঁচিয়ে রাখেন ওই নাগদেবতাই।

খিদেয় তেষ্টায় যখন যুবরাজ মুয়াজ্জেমের অবস্থা মরো-মরো তখন অমন এক মেষপালকই তাকে দেখতে পায় এবং নিজের পাতার ঝুপড়িতে নিয়ে গিয়ে সেবা শুশ্রূষা করে প্রাণ বাঁচায়।

দু-বছর বাদে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে যুবরাজ মুয়াজ্জেম যখন বাহাদুর শাহ নাম নিয়ে দিল্লির মসনদে বসেন, তখন তিনি সেই ঋণ শোধ করেন। ডোগরাদের আরাধ্য দেবতার নাগোয়ারের সোনার মূর্তি বানিয়ে দেন, গুহা থেকে দেবতাকে নিয়ে আসেন আজকের এই মন্দিরে।

আর সেই ডোগরা মেষপালক, যে তাঁকে সেবা শুশ্রূষা করে বাঁচিয়ে তুলেছিল, তাকে তিনি দান করেন একসঙ্গে বহু জমি আর এক হাজার সোনার মোহর।

গল্প শেষ করে শিব ডোগরা বললেন, ‘বুঝতেই পারছেন, আমি হলাম তিনশো বছর আগের সেই ভাগ্যবান মেষপালকের হতভাগ্য বংশধর। সেই জন্যই কাল মনীশ শ্রীবাস্তব আপনাকে বলেছিলেন, আমাদের জন্যই এই মন্দির তৈরি হয়েছিল।’

অ্যাপল জুস শেষ হয়ে গিয়েছিল। বুধোদা গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার ডোগরা। আপনার সঙ্গে কথা বলে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আমরা তাহলে এখন উঠি।’

শিব ডোগরা বললেন, ‘চলুন, আপনাদের একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।’—এই বলে উনি আমাদের সঙ্গে সেই নুড়ি বিছোনো রাস্তা দিয়ে ভাঙা গেট অবধি এগিয়ে এলেন।

আমরা যখন গেটের কাছে পৌঁছেছি, তখন হঠাৎ অনেক নারীপুরুষের গলার আওয়াজ, হাসির শব্দ আর গান কানে ভেসে এল। আওয়াজটা আসছে ডোগরা ক্যাসল ছাড়িয়ে আরও ওদিক থেকে। ওদিকে আমরা যাইনি।

আমাদের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। কারণ, ওদিকে ঘন জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছিল না। ওখানে কথা বলে কারা?

শিব ডোগরা আমাদের মুখের ভাব দেখে হাসলেন। বললেন, ‘এও একটা তিনশো বছরের পুরোনো গল্প। চলুন দেখিয়ে আনি।’

পাঁচ

শিব ডোগরার পেছন পেছন আমি আর বুধোদা ডোগরা ক্যাসল ছাড়িয়ে আরও প্রায় দুশো মিটার এগিয়ে এলাম। এখানে মেন রোড থেকে একটা সরু পায়ে চলা রাস্তা ডানদিকে বেঁকে জঙ্গল ফুঁড়ে এগিয়ে গেছে। সেই রাস্তা ধরে মিনিট সাত আট হাঁটার পরেই জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। দেখলাম আমরা পার্বতী নদীর নুড়ি বিছানো তীরের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছি।

রোদে ভেসে যাচ্ছে রিভার-বেড আর তার ওপর চার-পাঁচটা বড় বড় তাঁবু। তাঁবুর বাইরে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের চেহারা আর পোশাক-আশাক দেখলেই বোঝা যায় তারা কারা। বেদে-বেদেনি। বেদের দল এখানে তাঁবু ফেলেছে। ওদেরই হাসি গান আর কথাবার্তার আওয়াজ নদীর হাওয়ায় সঙ্গে ভেসে আমাদের কানে পৌঁছেছিল।

শিব ডোগরা বললেন, ‘বেদের দলের যে নানান দুর্নাম তা জানেন নিশ্চয়ই। ওরা নাকি চোর, ওরা নাকি ছেলেধরা, ওরা নাকি মানুষকে ওষুধ খাইয়ে গুণ করতে পারে। নাগোয়ারের কোথাও ওরা তাঁবু ফেলার জায়গা পায় না। কিন্তু আমাকে ওদের জায়গা দিতেই হয়। আমাদের সঙ্গে ওদের তিনশো বছরের পুরোনো বন্ধুত্ব।’

‘মানে?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।

‘সেই যখন নাগোয়ারের শিলাপট গুহামন্দিরে অধিষ্ঠান করত, তখন থেকেই না কি যাযাবর বেদেরা যাতায়াতের পথে সেই দেবতাকে গান শুনিয়ে যেত। নতুন মন্দির হওয়ার পরেও সেই রীতিতে ছেদ পড়েনি। এখনও ওরা কোত্থেকে যেন বছরের এই সময়টায় ঠিক চলে আসে। মেলায় ব্যালেন্সের খেলা দেখায়। মন্দিরের চাতালে বসে গানও গায়। মুশকিল হচ্ছে এখন আর কেউ ওদের থাকার জায়গা দেয় না। সবাই দূর দূর করে তাড়ায়। কিন্তু আমি তো তাড়াতে পারি না। আমার আর ওদের পূর্বপুরুষেরা যে বন্ধু ছিল। তাই আমার এস্টেটের একদিকে ওরা প্রত্যেকবাবুর তাঁবু ফেলে।’

আমি একটু কাছ থেকে দেখবার জন্যে ওইদিকে এগোচ্ছিলাম। শিব ডোগরা বাধা দিয়ে বললেন, ‘আর এগিয়ো না। ওদের তাঁবু পাহারা দেওয়ার জন্যে বাঘের মতন কয়েকটা কুকুর আছে। সেগুলো মোটেই শিক্ষিত নয়।’

শুনে আমি পিছিয়ে এলাম। সত্যিই তাঁবুর পেছন থেকে কুকুরের গর্জন ভেসে আসছিল। ওরা নিশ্চয়ই অচেনা মানুষের গন্ধ পেয়েছে।

আমরা আবার ডোগরা ক্যাসলের সামনে ফিরে এলাম। শিব ডোগরা তার হানাবাড়িতে ঢুকে গেলেন। আমরা ল্যাভেন্ডার লজের দিকে হাঁটা লাগালাম।

হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ বুধোদা মন্তব্য করল, ‘শুধু-মুধু আমার বিদ্যে মাপবার জন্যে শিব ডোগরা আমাকে বাড়িতে ডেকে আনল কেন বল তো?’

আমি তো অবাক। বললাম, ‘তোমার বিদ্যে আবার কখন মাপল?’

‘কেন, ওই নকল মোহরগুলো আমার সামনে সাজিয়ে দিল যে।’

‘হায় ভগবান! ওই মোহরগুলো নকল ছিল? তুমি ওর মুখের ওপর বলে দিলে না কেন?’

বুধোদা বলল, ‘আমার তো মনে হল বোকা সাজলেই লাভ বেশি। তাই বোকাই সাজলাম। শিব ডোগরা আপাতত নিশ্চিন্ত, আমি আন্টিকের অ্যা-ও বুঝি না।’

একবার নয়, শিব ডোগরা যে অন্তত দুবার আমাদের ঠকাবার চেষ্টা করেছিলেন সেটা জানতে পারলাম পরদিন, মানে বৃহস্পতিবার থানায় শ্রীবাস্তব সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে।

শ্রীবাস্তব সাহেব বলেই রেখেছিলেন, উনি সকাল সাতটায় থানায় পৌঁছে যাবেন এবং আমরা দুজন যেন ওইসময়েই একটু ওনার সঙ্গে দেখা করে যাই। কারণ, তারপর থেকেই উনি নানান কাজে এদিক ওদিক দৌড়োদৌড়ি করতে শুরু করবেন।

সেই মতন আমি আর বুধোদা ঠিক সাড়ে সাতটায় নাগোয়ার থানায় ঢুকে পড়েছিলাম। বুধোদা শ্রীবাস্তব সাহেবকে কালকের ডোগরা ক্যাসল দর্শনের গল্প বলছিল। সব শুনেটুনে শ্রীবাস্তব সাহেব বললেন, ‘হু:! ব্যাটা আবার দুর্ভাগ্যের গল্প করে। জুয়া মশাই, জুয়া। জুয়া থেলে বাপ-পিতামহের সব সম্পত্তি উড়িয়েছে লোকটা। আমাদের গভর্মেন্টের ওপর খুব রাগ, মন্দিরের দেখাশোনার দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে বলে। প্রায়ই বলে, নাগোয়ার মন্দির ওদের পারিবারিক সম্পত্তি। ভাবুন একবার। ওর হাতে থাকলে তো এতদিনে মন্দিরের সব সম্পত্তি বিক্রি হয়ে যেত।’

তারপর শ্রীবাস্তব সাহেব বললেন, ‘আপনি শুনলে খুশি হবেন মিস্টার মজুমদার, ফরেনসিক রিপোর্ট আপনার সবক’টা আইডিয়াটাকেই সাপোর্ট করেছে। ওই হাতুড়ি সবে কেনা হয়েছে। তার ওপরে অ্যালফাবেট-গুলো ভেরি রিসেন্টলি খোদাই করা হয়েছে। হাতলে কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। এটা একদম কোল্ড ব্লাডেড অ্যান্ড প্রি-প্ল্যান্ড মার্ডার। বিরাজকে ফাঁসানো ছাড়া এর আর অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।’

বুধোদা বলল, ‘জানতাম এটাই বেরোবে। বিরাজ যে খুনি নয় সেটা একশোভাগ নিশ্চিত। যে কাজটা নদীর ধারে পড়ে থাকা একটা বড়সড় পাথর দিয়ে সারা যেত, সেটার জন্যে বিরাজ কোন দু:খে নিজের নাম লেখা হাতুড়ি ইউজ করবে বলুন তো।

‘তবুও সারা হিমাচলের পুলিশ বিরাজকে যেভাবে খুঁজছে খুঁজে যাক। রাস্তার প্রত্যেকটা চেকপোস্টে, প্রত্যেক রেলস্টেশনে যেভাবে বিরাজের ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, লাগানো থাক। যারা আমাদের বিশ্বাস করাতে চাইছে, বিরাজ সিং খুনি, তারা যেন নিশ্চিন্ত থাকে যে, গল্পটা আমরা বিশ্বাস করেছি।’

‘যেমন শিব ডোগরা?’

‘ঠিক বলেছেন। যেমন শিব ডোগরা। আপনি কিন্তু ওনার ওপরে একটু ওয়াচ রাখবেন।’

‘হি ইজ অলরেডি আন্ডার ওয়াচ।’

আমি মনে-মনে ভাবলাম শ্রীবাস্তব সাহেব পাক্কা পুলিশ অফিসার। রুটিন মেনে যখন যা করার ঠিক করে ফেলেন।

শ্রীবাস্তব সাহেব এরপর আলমারি থেকে একটা পাতলা ফোল্ডার বার করে এনে আবার চেয়ারে বসলেন। তারপর সেটার পাতাগুলো ওলটাতে ওলটাতে বললেন, ‘আপনার অন্য অবজার্ভেসনগুলোও, ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে বুঝতে পারছি, একদম ঠিক ছিল। সায়ন আচার্য গতকাল স্নান করার আগেই খুন হয়েছিলেন। অথচ বডির পজিশন দেখে মনে হচ্ছিল উনি যেন নদীর দিক থেকে উঠে আসছিলেন। প্রায় যখন মন্দিরে পৌঁছে গেছেন, তখনই যেন কেউ পেছন থেকে মাথায় মেরেছে।

‘তাছাড়া ডক্টর কাপুর যে কথাটা বলেছিলেন, সেটা পোস্ট-মর্টেমেও এসটাব্লিসড হয়েছে। সায়ন আচার্য সকাল সাতটার সময় খুন হননি। হয়েছেন আরও কিছুটা আগে।’

‘এ ব্যাপারে আমার একটা থিয়োরি আছে।’—বুধোদা বলল।

‘কী থিয়োরি?’

‘সেটা হল, সায়ন আচার্যকে ওই সিঁড়ির ওপরে আদৌ মারা হয়নি। ওনাকে সাতটার অনেক আগেই অন্য কোথাও খুন করে বডিটা ওখানে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময়েই বডির পজিশনটা ওরকম গোলমেলে হয়ে যায়। আর সেইজন্যেই ওখানে রক্তের দাগও পাওয়া যায়নি। রক্তপাতটা হয়েছে আসল খুনের জায়গায়।’

শ্রীবাস্তব সাহেব মুখে কিছু না বলে যেভাবে ঘাড়টা ওপরে নীচে নাড়লেন, তাতে বুঝলাম বুধোদার কথাটা উনি মেনে নিলেন। কিন্তু ওনার মুখের মেঘ একটুও কাটল না। তার কারণটাও ওনার পরের কথাতেই বুঝতে পারলাম।

উনি বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার। যাদের যাদের ইন্টারোগেট করার, করা হয়ে গেছে। মন্দির আর আশেপাশের সমস্ত জায়গা সার্চ করিয়েছি। আমাদের যারা ইনফর্মার আছে তাদেরও কাজে লাগিয়েছি। কিন্তু এখনও অবধি খুনের ব্যাপারে কোনও ক্লু পাইনি। বিরাজ সিং কোথায় গেল সেটাও বুঝতে পারছি না। এখন আমার হাতে একটাই রাস্তা। বিরাজের দাদু সুরথ সিংকে থানায় তুলে এনে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করা। দরকার হলে ইয়ে…মানে একটু চাপ দিয়ে…।’

বুধোদা বলল, ‘একদম ওই কাজটা করতে যাবেন না। কথা বার করার জন্যে একজন আটাত্তর বছরের বৃদ্ধের ওপর টর্চার করাটা অত্যন্ত অমানবিক তো বটেই। কিন্তু তা ছাড়া অন্য একটা কারণেও কথাটা বলছি।’

শ্রীবাস্তব সাহেব মুখে কিছু না বলে ভুরু দুটো ওপরে তুললেন।

বুধোদা বলল, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পুরো গল্পটা সুরথ সিং-ও জানেন না। ওনাকে ওনার পার্ট-টুকু বলা হয়েছে। উনি সায়ন আচার্যের হত্যাকারীর নামও জানেন বলে মনে হয় না। এখন আপনি যদি ওনাকে তুলে আনেন তাহলে আসল কালপ্রিটরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে। জীবনে তাদের আর খুঁজে পাবেন না। অথচ পরে কোনও সময় তারা একই প্ল্যান নিয়ে আবার নাগোয়ারে ফিরে আসতে পারে। তখন হয়তো আমি আপনি কেউই থাকব না।

‘তার চেয়ে আপনি ছিপ ফেলে যেমন বসে আছেন বসে থাকুন। ঠিক যখন রাঘব বোয়ালটা এসে টোপে মুখ দেবে তখনই মারবেন হ্যাঁচকা টান। দেখবেন আপনার সবক’টা সমস্যার উত্তর একসঙ্গে পেয়ে যাবেন।’

ছয়

এখানে শুক্রবার বিকেলটা দেখলাম আমাদের দুর্গাপুজোর নবমীর সন্ধের মতন। পরেরদিনই পার্বতী নদীতে স্নানের পর নাগোয়ারের মূর্তি আবার একবছরের মতন সবার চোখের আড়ালে চলে যাবে। তাছাড়া চারদিনের মেলার আজই শেষ দিন। সমস্ত আনন্দের মধ্যেও তাই কোথায় যেন একটা মনখারাপের সুর ভেসে বেড়াচ্ছিল। বুধোদা অবশ্য বলল, আমি যেটাকে মনখারাপের সুর বলছি, সেটা আসলে বেদেদের গানের সুর।

সেটা হতেই পারে। সকাল থেকেই প্রায়ই পনেরো-ষোলো জন বেদে নারীপুরুষ মন্দিরের উঠোনে বসে নানারকমের বাজনার সঙ্গে একটা গান গেয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি হাওয়ার সঙ্গে সেই গান সারা নাগোয়ারে ছড়িয়ে পড়ছে। গানটার ভাষা এক বর্ণও বুঝতে পারছি না, কিন্তু একঘেয়ে সুরটা মনটাকে কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলছিল।

সকালে আমরা গাড়ি ভাড়া করে মনিকরণ গিয়েছিলাম। সারাদিন সেখানে বেড়িয়ে বিকেলে নাগোয়ার মন্দিরের সামনে মেলার মাঠে পৌঁছোলাম। বুধোদা বলল, ‘আজকেই তো মেলার শেষ দিন রে রুবিক। বাড়ির জন্যে, বন্ধুদের জন্যে কিছু কিনবি না?’

বললাম, ‘কিনলে তো ভালোই হত। চলো না ওই শ্যুভেনিরের দোকানগুলো একটু দেখি।’

দোকানগুলোতে খুব সুন্দর রঙিন ক্রিস্টালের গয়না পাওয়া যাচ্ছিল। আমি মায়ের জন্যে একটা হার কিনলাম। বাবার জন্যে একটা পেতলের অ্যাশ-ট্রে।

বুধোদার চোখ আছে। ও খুঁজে খুঁজে এক বুড়ো দোকানিকে বার করল। সে বসেছিল মেলার একদিকে একটা অন্ধকার কোণে। বুড়ো তুলোট-কাগজের ওপর হাতে আঁকা ছবি বিক্রি করছিল। জিনিসগুলো অনেকটা আমাদের মেদিনীপুরের পটের ছবির মতন। ঠাকুরদেবতার ছবিই বেশি। হিমাচলের এক এক জায়গায় এক একজন স্থানীয় দেবতার পুজো হয়। সেরকম অনেকেরই ছবি দেখলাম। বুধোদা তার মধ্যে পছন্দ করে চারটে কিনল। তারপর বুড়োকে জিগ্যেস করল, ‘নাগোয়ারের ছবি নেই?’

বুড়ো তাই শুনে একেবারে হা হা করে উঠল। বলল,’ওরে বাবা! ওনার ছবি তোলা, ছবি আঁকা, মূর্তি গড়া সবই ভয়ংকর পাপ। এত যে দোকান রয়েছে, কোথাও দেখেছেন ওনার একটাও ছবি বা মূর্তি বিক্রি হতে? ওরকম চেষ্টা করলে নাগোয়ারের অভিশাপে একেবারে ধনেপ্রাণে মারা পড়বেন।’

বুধোদা চিন্তিত মুখে বলল, ‘তাহলে?’

কীসের ‘তাহলে’ কে জানে?

আমরা ল্যাভেন্ডার লজের দিকে ফিরতে-ফিরতে দেখলাম, চারদিনের মধ্যে এই প্রথম আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। হিম হাওয়ার সঙ্গে পাহাড়ের পায়ের কাছ থেকে রাশি রাশি ধূসর মেঘ হু হু করে ওপরে উঠে আসছে। দেখতে দেখতে প্রথমে দূরের পাহাড়গুলো, তারপর নাগোয়ার গ্রামের আলো, মেলার আলো, সব শেষে সামনের পাইনবনটাও সেই মেঘে ঢেকে গেল। আমরা চলার স্পিড বাড়িয়ে দিলাম।

ঘরে ঢুকে এক কাপ চায়ে চুমুক দিতে দিতে বুধোদা একটা ম্যাগাজিন খুলে বসল। কিন্তু ওর পরের কথাতেই বুঝলাম পড়াশোনায় ও মন দিতে পারছে না। পাতা ওলটাতে ওলটাতে বলল, ‘তুই যাই বলিস, রুবিক, শ্রীবাস্তব সাহেব কিন্তু সার্থকনামা লোক। বাস্তব বুদ্ধিটা ওনার বেশ প্রখর। না হলে আমাকে এতটা স্বাধীনতা দেন? উনি বেশ বুঝতে পারছেন, আমি একটা কিছুর গন্ধ পেয়েছি, যেটা আখেরে ওনারই উপকারে লাগবে।

‘কিন্তু আমি নিজেই ঠিক কনফিডেন্স পাচ্ছিনা। আর বারো ঘণ্টাও নেই, তারপরেই স্নানযাত্রা শুরু হয়ে যাবে। এখনও বুঝতে পারলাম না আঘাতটা কোনদিক থেকে আসছে। অথচ আসছে যে, সে ব্যাপারে তো কোনও সন্দেহ নেই। এত কিছু কি এমনি এমনি ঘটছে?

‘এখনও যদি সায়ন আচার্যের খুনির নামটা বার করতে পারতাম-রে রুবিক! ওটাই হেঁয়ালির চাবিকাঠি। মন বলছে, ওটা জানতে পারলে বাকি রহস্যগুলো এমনিই সলভড হয়ে যাবে।’

এমন কাকতালীয় ঘটনা, এই কথা বলার আধঘণ্টার মধ্যে বুধোদা সেই খুনির হদিশ পেয়ে গেল সেটার পেছনে আমারও একটু অবদান রইল। অবশ্য বুধোদা আর মনীশ শ্রীবাস্তবের বক্তব্য যদি বিশ্বাস করতে হয় তাহলে পুরো কৃতিত্বটাই আমার।

হল কি, বুধোদার ওই কথাগুলো শোনার পর থেকে আমারও টিভি, বই কিছুতেই মন বসছিল না। খুব বোর হচ্ছিলাম। ঘড়িতে দেখলাম পৌনে আটটা বাজে। পাহাড়ি জায়গা বলে এমনিতেই এই সময়ে চারিদিক নিঝুম হয়ে যায়। তার ওপরে আজ তুমুল বৃষ্টি নেমেছে। গত দু-দিন মেলার গান-টানের আওয়াজ ভেসে আসত। আজ বৃষ্টির চোটে সব বন্ধ। রাতের খাবার দিতে এখনও অন্তত এক ঘণ্টা দেরি। এই সময়টা কীভাবে কাটাই ভাবতে ভাবতে বুধোদাকে বললাম, ‘বুধোদা, তোমার ক্যামেরাটা দাও তো। ছবিগুলো একটু দেখি।’

বুধোদা বলল, ‘ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে না দেখে কম্পিউটারে ফুল-স্ক্রিনে দ্যাখ। আসল বিউটিটা পাবি।’—এই বলে ক্যামেরা, ল্যাপটপ আর ডাটা কেবল আমার হাতে দিয়ে, নিজে বিছানার ওপর টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল।

 কম্পিউটারে ছবি দেখার মজাই আলাদা। এক এক করে এখন অবধি বুধোদা নাগোয়ারে যা ছবি তুলেছে দেখতে শুরু করলাম।

গত ক’দিনে বুধোদা যত পাখি, প্রজাপতি আর বন-পাহাড়ের ছবি তুলেছিল সব দেখতে-দেখতে শেষ অবধি পৌঁছে গেলাম এখানে প্রথমদিন সকালে তোলা সেই ছবিগুলোয়।

বুধোদা কী যেন নাম বলেছিল পাখিটার? হিমালয়ান গ্রিফন, তাই না?

অসামান্য উঠেছে গ্রিফনের ছবিগুলো। সকালের সোনালি আলোয় মনে হচ্ছে পাখিটা যেন ডানায় সোনার গুঁড়ো মেখে উড়ে চলেছে। পরপর আটটা ফ্রেমে পাখিটার আটরকম পজিশন।

দেখলাম, ক্যামেরার ফোকাস যদিও পাখিটার ওপর, তবু ব্যাকগ্রাউন্ডে নাগোয়ারের মন্দিরটাও দেখা যাচ্ছে। মন্দিরটাকে আরও বড় করে দেখব বলেই ছবিটাকে জুম করতে শুরু করলাম। পাখিটা ফ্রেম থেকে বেরিয়ে গেল, চলে এল মন্দিরের ছবি। একটু আবছা, তবু ভালোই লাগছিল। আর তখনই দেখতে পেলাম ছবির ভেতর মানুষটাকে।

কোনও সন্দেহ নেই, একটা মানুষই হাওয়ার ভেতর দিয়ে নেমে আসছে। যেন একজন প্যারাশুটিস্ট, প্লেন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পরেও যার প্যারাশুটটা খোলেনি। প্রথম ফ্রেমে মন্দিরের পেছনদিকে একটা ঘরের জানলা দিয়ে সে ছিটকে পড়ছে। শেষ ছবিতে আছড়ে পড়েছে ঘাটের সিঁড়ির ওপর। আটটা ফ্রেমে স্টেপ বাই স্টেপ ধরা রয়েছে সায়ন আচার্যের হত্যারহস্য।

আমার হাত কাঁপছিল। কোনওরকমে ডাকলাম, ‘বুধোদা!’

আমার সেই ডাকটার মধ্যে নিশ্চয় এমন কিছু ছিল, যে বুধোদা সঙ্গে সঙ্গে নিজের বিছানা থেকে লাফ মেরে নেমে আমার পাশে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘কী হয়েছে রুবিক? কী হয়েছে? কী দেখে ভয় পেলি?’

আমি কোনও কথা না বলে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে আঙুল তুলে দেখালাম।

আর কিছু বলতে হল না। বুধোদা নিজেই ছবিগুলো পর পর দেখে নিয়ে মোবাইলে শ্রীবাস্তব সাহেবকে কানেক্ট করে বলল, ‘হ্যালো, এক্ষুনি একবার আমাদের হোটেলে চলে আসুন। না, মিস্টার শ্রীবাস্তব, এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি জরুরি কোনও কাজ আপনার নেই। এক্ষুনি আসুন।’ তারপর আদর করে আমার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলল, ‘স্টেডি, স্টেডি। তুই তো এর আগে আমার সঙ্গে বেরিয়ে এর থেকে অনেক ভয়ংকর সব ঘটনা নিজের চোখে দেখেছিস।’

ঠিক পঁচিশ মিনিট বাদে শ্রীবাস্তব সাহেব বুধোদার ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বললেন, ‘স্পেলনডিড। রুবিক, তোমার জবাব নেই।’

উনি যখন পকেট থেকে নিজের পেনড্রাইভটা বার করে ফোটোগুলোর কপি নিচ্ছিলেন তখনই বুধোদা পেছনে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি বলতে পারবেন শ্রীবাস্তব সাহেব, যে ঘরটার জানলা দিয়ে বডিটা ফেলা হল, সেটা কোথায়? কার ঘর?’

শ্রীবাস্তব সাহেব বললেন, ‘কেন পারব না? নাগোয়ার মন্দিরের প্ল্যান আমার মুখস্থ। এই ঘরটা মন্দিরের বেসমেন্টে। অ্যাকচুয়ালি এর ছাদের ওপরেই মন্দিরটা দাঁড়িয়ে আছে। দেখতেই পাচ্ছেন একটা রাইট-অ্যাঙ্গেলে টার্ন নিয়ে নদীর ঘাটে পৌঁছোবার সিঁড়িটা এই ঘরের জানলার ঠিক নীচ দিয়েই নেমে গেছে।’

‘কে থাকে ঘরটায়?’

‘এখন থাকে শুধু শুকদেব ঝা। তিনদিন আগে সায়ন আচার্যও ওই ঘরেই থাকতেন। ওটাই ছিল পুরোহিত দুজনের থাকার ঘর। সব হিসেব মিলে গেল মিস্টার মজুমদার। সাতটার অনেক আগে কোনও এক সময় শুকদেব ওনাকে খুন করে জানলা দিয়ে নীচে ফেলে দিয়েছিল, যাতে মনে হয় উনি চান করে ফেরার সময় ওই সিঁড়ির ওপরেই খুন হয়েছেন। হাতুড়িটাও নিশ্চয় শুকদেব ওই জানলা দিয়েই ফেলে দিয়েছিল, কিংবা যখন নিজে চান করতে নেমেছিল তখন বডির পাশে রেখে দিয়ে এসেছিল।

‘শুকদেব সবকিছুই করেছিল হাতে গ্লাভস পরে, মানে একদম কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার। আর এইজন্যেই লাশের কাছে রক্ত পাওয়া যায়নি। নিজের ঘরের সব চিহ্ন পরিষ্কার করার জন্যে স্কাউন্ড্রেলটা অনেক সময় পেয়েছিল। আমার লোকেরা যখন ওর ঘর সার্চ করেছে তখন আর কিছুই পায়নি।’

বুধোদা কোনও মন্তব্য না করে শুধু ঘাড় নেড়ে জানাল শ্রীবাস্তব সাহেব ঠিক বলছেন।

শ্রীবাস্তব সাহেবের গলা রাগে থমথম করছিল। তিনি বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, আপনি আমাকে আর বাধা দেবেন না। ওই রাস্কেলটাকে তুলে আনি। এনে গুছিয়ে থার্ড ডিগ্রি অ্যাপ্লাই করি। তাহলেই হুড়হুড় করে সব বলে ফেলবে।’

বুধোদা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানাল। বলল, ‘শুকদেব আপনাকে কতটা বলবে? যতটা ও নিজে জানে তার বেশি তো নয়? বাকি বদমাইশদের আপনি খুঁজে বার করবেন কেমন করে?’

শ্রীবাস্তব সাহেব ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘ঠিক বুঝলাম না।’

বুধোদা বলল, ‘ধরুন গত কদিন ধরে নাগোয়ারে একটা নাটক চলছে। আজ এখুনি আপনি জানতে পারলেন সেই নাটকে শুকদেবের একটা রোল আছে। ঠিক জেনেছেন। খুব গুরুত্বপূর্ণ রোল। কিন্তু একমাত্র রোল তো নয়। তাই ও পুরো স্ক্রিপ্ট-টা জানে না। আপনি ওকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে পেটালেও ও সবটা বলতে পারবে না। যা বলবে তাও আপনি কোর্টে প্রমাণ করতে পারবেন না। তার জন্যে আপনাকে অন্য অ্যাকটরদের মঞ্চে আসার সুযোগ দিতে হবে। পুরো নাটকটা ধৈর্য ধরে দেখতে হবে। বোঝাতে পারলাম?’

শ্রীবাস্তব সাহেব বললেন, ‘তাহলে এখন আমরা পুলিশ ফোর্সের সবাই গালে হাত দিয়ে বসে নাটক দেখব? এটাই কি আপনি চান?’ কথাটা বিরক্ত মুখে বললেন বটে, কিন্তু গলা শুনেই বুঝতে পারলাম উনি বুধোদার যুক্তি অনেকটাই মেনে নিয়েছেন।

বুধোদা ওনার কথা শুনে হেসে ফেলল। বলল, ‘গালে হাত দিয়ে বসে থাকবেন কেন? নাটকের স্টেজ সাজাতে হবে না? মঞ্চের পরদা উঠবে কাল, নাগোয়ারের মূর্তি নিয়ে শোভাযাত্রা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে।’

শ্রীবাস্তব সাহেব বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, এখনও অবধি আমি অন্ধের মতন আপনাকে ফলো করে যাচ্ছি। আপনি বিরাজের জন্যে সার্চ চালু রাখতে বলেছেন, আমি রেখেছি। আপনি শিব ডোগরা, বেদেদের তাঁবু, সুরথ সিং-এর বাড়ি আর মন্দির—যেখানে যেখানে নজরদার রাখতে বলেছেন রেখেছি। এখন আপনি বলছেন প্রমাণ থাকা সত্বেও শুকদেবকে অ্যারেস্ট না করতে? ওয়েল, আপনার যুক্তি আমি মেনে নিচ্ছি। আমরা কোনও রকম স্টেপ নিলেই ক্রিমিনালরা জাল গুঁটিয়ে নিয়ে পালাবে। আপনি চাইছেন ওদের রেড-হ্যান্ডেড ধরতে।

‘কিন্তু আমার দিকটা একবার ভাবুন। পুলিশ সুপার আমাকে বলে দিয়েছেন, উনি কাল নাগোয়ারের ফেস্টিভাল শেষ হওয়া অবধি ওয়েট করবেন। তারপর যদি সায়ন আচার্যের খুনের ব্যাপারে রিপোর্ট দিতে না পারি তো আমাকে উনি দেখে নেবেন।’

বুধোদা শ্রীবাস্তব সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই ক’দিন আপনি আমার ওপর যে বিশ্বাস রেখেছেন, আর কয়েক ঘণ্টা সেটা ধরে রাখুন। কথা দিচ্ছি, কাল রাতে আপনি যে রিপোর্টটা পুলিশ সুপারের হাতে দেবেন সেটা যাতে নাগোয়ার থানার ইতিহাসের সবচেয়ে রিমার্কেবল রিপোর্ট হয় সেটা আমি দেখব।’

আমরা দুজনেই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে বুধোদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শ্রীবাস্তব সাহেব আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। কারণ, বুধোদা এমন বিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিল যে, তারপর আর প্রশ্ন করা যায় না। উনি দরজার দিকে পা বাড়ালেন। বুধোদা পেছন থেকে ডাকল, ‘মিস্টার শ্রীবাস্তব, একটা রিকোয়েস্ট।’

‘বলুন।’

‘নাগোয়ারের মূর্তির সঙ্গে এখানকার দেড় লক্ষ মানুষের সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে রয়েছে। সেই সেন্টিমেন্টের যে কোনও দাম কষা যায় না তা আমি জানি। ওই মূর্তির সঙ্গে যে ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে তারও দাম হিসেব করা যায় না। কিন্তু শুধু মূর্তির গায়ের সোনা আর পাথরগুলোর দাম, আপনিই বলেছিলেন, পঁচিশ কোটি টাকা।

‘হিমাচল প্রদেশ সরকার তার এই পঁচিশ কোটি টাকার সম্পত্তি বাঁচানোর জন্যে কালকে দশ-বারোজন কম্যান্ডোর একটা টিম দিতে পারবে?’

শ্রীবাস্তব সাহেব কিছুক্ষণ বুধোদার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘কাল সকাল দশটার মধ্যে সিমলা থেকে কম্যান্ডো পৌঁছে যাবে।’

আর একটাও কথা না বলে মনীশ শ্রীবাস্তব ল্যাভেন্ডার লজের দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিল।

সাত

পরদিন শনিবার সেই বৃষ্টি কমবার একটুও লক্ষ্মণ দেখা গেল না। উপরন্তু যোগ হল বরফের মতন ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা। সকাল দশটার সময় বুধোদা বলল, ‘না:, আর ওয়েট করা যায় না। রুবিক, তৈরি হয়ে নে। রেন-কোট এনেছিস তো?’

ব্রেকফাস্ট সেরে রেনকোট ছাতা নিয়ে যখন বেরোলাম তখন ঘড়িতে সাড়ে দশটা। আজ আর পাইনবনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ ও রাস্তা দিয়ে নদীর মতন জল বয়ে চলেছে। পাকা রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় উলটোদিক থেকে একটা পুলিশের জিপ এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। ড্রাইভার স্যালুট করে বললে, ‘ও.সি. সাহাবনে ভেজা হামকো। আপলোগ চড় যাইয়ে গাড়িমে।’

পাঁচ মিনিটে পৌঁছে গেলাম নাগোয়ার থানায়। শ্রীবাস্তব সাহেবের ঘরের দিকে এগোতে এগোতেই দেখলাম দশ-বারোজন কম্যান্ডো সেই হলঘরটার মেঝেয় প্লাস্টিকের শিট পেতে বসে তাদের গিয়ার গুছিয়ে নিচ্ছে।

শ্রীবাস্তব সাহেবের ঘরে ঢুকে দেখলাম, উনি প্রায় সাড়ে ছ-ফিট লম্বা ছিপছিপে চেহারার এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। ইউনিফর্ম দেখেই বুঝতে পারলাম, ইনি ওই কম্যান্ডো টিমের একজন। শ্রীবাস্তব সাহেব আলাপ করিয়ে দিলেন, ক্যাপ্টেন সুমন ঘোষ। কম্যান্ডো টিমের লিডার। ক্যাপ্টেন ঘোষের বাড়ি কলকাতার চিড়িয়া মোড়ে। গত তিন বছর ধরে এইদিকে পোস্টেড। শ্রীবাস্তব সাহেব আমাদের সবার জন্যে কফির অর্ডার দিলেন। তারপর বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, আপনি বলেছিলেন আজকের গেমপ্ল্যান এখনই আমাকে দিয়ে দেবেন। দিন।’

বুধোদা শ্রীবাস্তব সাহেবের চেয়ারটাকে একটা পাক দিয়ে ওনার কম্পিউটারটারের সামনে পৌঁছে গেল। তারপর ঝুঁকে পড়ে ইউ এস বি পোর্টের মধ্যে নিজের পেন ড্রাইভটাকে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, ক্যাপ্টেন ঘোষ, আপনিও দেখে নিন। এখানে এক দুই করে সব লিখে রেখেছি। সেভ করবেন না। প্রিন্ট আউট নেবেন না। জাস্ট মুখস্থ করে নিন।’

মনে পড়ল, কাল রাতে ঘুমে যখন আমার চোখ জুড়ে আসছিল তখনও বুধোদা ওর ল্যাপটপটাকে কোলে নিয়ে বসে কীসব যেন করছিল। তখন তাহলে ও এই প্ল্যানটাই বানাচ্ছিল? কী আছে, কে জানে ওই প্ল্যানে?

শ্রীবাস্তব সাহেব মন দিয়ে লেখাগুলো দেখছিলেন। দেখা হয়ে গেলে বুধোদার দিকে ফিরে বললেন, ‘ইট ইজ আ টাফ টাস্ক মিস্টার মজুমদার। আপনি সব কিছুই করতে বলেছেন আফটার দা প্রসেশন স্টার্টস। কিন্তু তখন কি আমি প্রসেশনের জায়গা ছেড়ে নড়তে পারব? ওটাই তো আমার সবচেয়ে বড় ডিউটি—নাগোয়ারের মূর্তিকে প্রাোটেকশন দেওয়া।’

বুধোদা বলল, ‘নড়বেন কেন? আপনি তো প্রসেশনের সঙ্গেই থাকবেন। কোত্থাও যাবেন না। আপনাকে না দেখলে কালপ্রিটরা সন্দেহ করবে কোনও গোলমাল আছে। বলা যায় না, তখন একেবারে শেষ মুহূর্তে ওরা অপারেশন অ্যাবানডন করে পালাতে পারে।

‘কাজেই এই কাজগুলোর দায়িত্ব আপনি আপনার সেকেন্ড অফিসার পবন খের আর ক্যাপ্টেন সুমন ঘোষের টিমের মধ্যে ভাগ করে দিন।’

‘ও. কে.।’ মনীশ শ্রীবাস্তব বুধোদার হাতে পেনড্রাইভ ফেরত দিয়ে কম্পিউটার অফ করে উঠে দাঁড়ালেন। মাথার টুপিটা একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে বললেন, ‘তাহলে আপনাকে আর রুবিককে নিয়ে একটা গাড়ি মন্দিরে চলে যাক। আমি পবন খের আর ক্যাপ্টেন ঘোষকে ওনাদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আসছি।’

বৃষ্টির তেজ একটু কমছিল, কিন্তু আকাশ এখনও সেরকমই মেঘে ঢাকা। মন্দিরের পেছনে একটা ওয়াচ টাওয়ার ছিল। ওপরে একজন জওয়ান বসে বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে চারিদিকে নজর রাখছিল। আমরা মন্দিরে পৌঁছোতেই ক্যাপ্টেন মেহতা আমাদের সেই ওয়াচ টাওয়ারের ওপরেই তুলে দিলেন। বললেন, ‘যান, ওখান থেকে দেখুন অ্যাবনর্মাল কিছু চোখে পড়ে কি না।’

উনি নিজে দেখে আসতে গেলেন সেখানে যেরকম সিকিউরিটি থাকার কথা, আছে কি না।

কোথা দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম না। সাড়ে এগারোটার সময় শিব ডোগরা এসে আমাদের ডেকে নিয়ে গেলেন উঠোনের একদিকে দোতলা গেস্ট হাউসটার দিকে। ওখানেই আমরা সবাই চমৎকার ভোগ খেলাম।

বারোটার সময় দর্শন বন্ধ হয়ে গেল। সাধারণ লোকের জন্য বন্ধ হয়ে গেল মন্দিরের গেট। বেদেরাও তাদের বাজনাবাদ্যি গুটিয়ে দিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে গেল।

বহু বছর ধরে নাগোয়ারের এই স্নানযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর প্রতিটি খুঁটিনাটি এখানকার মানুষের মুখস্থ। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম যার যেখানে দাঁড়াবার, দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। যার যা করার, করে যাচ্ছিল। কোনও গণ্ডগোল নেই। কাউকে কিছু বলতে হচ্ছিল না।

বিশাল বিশাল রঙিন পতাকা নিয়ে প্রায় পঞ্চাশজন মানুষ সারি দিয়ে প্রথমে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের পেছনে নানান ধরনের ঢোলক, ড্রাম, বাঁশি, শিঙা, করতাল নিয়ে আরও প্রায় পঞ্চাশজন মানুষ। তার পেছনে স্থানীয় ড্যান্সারদের একটা দল, মেয়ে পুরুষ দুই-ই রয়েছে সেই দলে। তারপর আবার পতাকাবাহীদের একটা দল। তাদের পেছনে আরও বাদ্যকর, আরও অনেকগুলো নাচের দল। এরপর শুরু হচ্ছে গাড়ির সারি। সবার আগে ডিস্ট্রিক কালেক্টরের গাড়ি, তারপর পুলিশের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেডের লাল গাড়ি।

মিছিল রেডি। শ্রীবাস্তব সাহেব আমাদের হাতের ইশারায় ডেকে নিলেন। বললেন ‘চলুন, চলুন। গাড়িতে উঠে পড়তে হবে। আর একটুও সময় নেই।’

দেখলাম শ্রীবাস্তব সাহেবের হাতে একটা ওয়াকিটকি। সেটার মাধ্যমে উনি ক্রমাগত বিভিন্ন জায়গার থেকে রিপোর্ট নিয়ে চলেছেন।

আমি, বুধোদা আর শ্রীবাস্তব সাহেব মারুতি জিপসিতে উঠে বসে পড়লাম। শিব ডোগরা প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতেই চলে গেলেন পেছনে মন্দির-কমিটির এস ইউ ভি-টার দিকে।

ঠিক একটা বাজতে যখন পাঁচ মিনিট বাকি তখন পুরোহিত শুকদেব ঝা মন্দিরের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। তার মাথায় নাগোয়ারের সোনার মূর্তি। তাকে ঘিরে দশ-বারোজন জওয়ানের একটা চলমান দেয়াল। প্রত্যেকের হাতে স্টেনগান।

কয়েক হাজার মানুষের গলা থেকে নাগোয়ারের নামে জয়ধ্বনি উঠল। একবার, দুবার, তিনবার।

শুকদেব ঝা সোনার মূর্তি মাথায় নিয়ে পতাকাবাহীদের প্রথম দলটার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তুমুল শব্দে কাড়া-নাকাড়া রামশিঙা বেজে উঠল।

ঠিক একটার সময় মিছিল চলতে শুরু করল। উদ্দেশ্য বরুণাঘাট।

মিছিল কিছুটা এগিয়ে বরুণাঘাটের রাস্তায় ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই উলটোদিক থেকে পুলিশের অন্য একটা জিপ ফাঁকা রাস্তা দিয়ে তীব্রবেগে মিছিলকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে এল। শ্রীবাস্তব সাহেব হাত দেখাতেই জিপটা আমাদের গাড়ির পাশে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। দেখলাম ভেতরে সেকেন্ড অফিসার পবন খের এবং আরও অন্তত সাত-আটজন পুর্লিশের লোক বসে আছেন। প্রত্যেকেরই হাতে ফায়ার আর্মস একদম রেডি।

পবন খের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে শ্রীবাস্তব সাহেবকে স্যালুট করলেন। শ্রীবাস্তব সাহেব বললে, ‘সব ঠিক আছে খের?’

‘ইয়েস স্যার।’

‘বি কেয়ারফুল। ইউ মে ফেস ভেরি স্টিপ রেজিসট্যান্স।’

পবন খের বললেন, ‘উই আর প্রিপেয়ার্ড ফর দ্যাট স্যার।’ উনি হাত দুটো অল্প তুলে হাতে ধরে থাকা এস, এল.আর-টা দেখিয়ে হাসলেন। তারপর আর কোনও কথা না বলে জিপটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

শ্রীবাস্তব সাহেব বুধোদাকে বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, আপনার প্ল্যান ওয়ান কমপ্টি করার জন্যে পবন খের বেরিয়ে গেল।’

বুধোদার মুখটা দেখলাম পাথরের মতন শক্ত। ওইভাবেই বলল, ‘থ্যাঙ্কস আ লট।’ কথাগুলো এতই আস্তে বলল, যে পাশে বসে আমিও ভালো করে শুনতে পেলাম না।

বরুণাঘাটে পৌঁছোতে আমাদের প্রায় দু-ঘণ্টা সময় লাগল। এমনিতেই তিনটের সময় পাহাড়ে রোদ্দুরের তেজ কমে আসে। তার ওপর আজ আকাশ মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি এখনও পড়ছে, তবে টিপটিপ করে।

আমরা সকলেই গাড়ি থেকে নেমে নদীর তীরে দাঁড়ালাম। এদিকটায় আগেও একদিন বেড়াতে এসেছিলাম। পাহাড়ি নদীতে স্নানের ঘাট তৈরি করা মুখের কথা নয়। বরুণাঘাটে যে সেই কাজটা করা গেছে, তার দুটো কারণ। এক, নদীর বেড-টা এখানে হঠাৎ খুব চওড়া হয়ে গেছে। ফলে জলের তোড়টা কম। আর দুই, কোনও এক অদ্ভুত কারণে এখানে নদীর বুকে একটাও বোল্ডার নেই। ফলে পাথরে পা পিছলে পড়ার চান্সটাও কম। তবে জল তো সেই বরফ গলা জলই রয়েছে। ফলে নেহাত দায়ে না পড়লে কেউ ওই ঠান্ডা জলে পা দেবে না।

দায়টা এখন একমাত্র শুকদেব ঝা-র। তবে ওর তো প্রতিদিন ভোরবেলায় এই ঠান্ডা জলে চান করার অভ্যেস রয়েছে। সেইজন্যেই বোধহয় অবিচলিত পায়ে জলের মধ্যে নেমে গেল। মাথার ওপর দু-হাত দিয়ে ধরে রেখেছে নাগোয়ারের মূর্তি।

ঠিক সেই সময় জোরালো হাওয়া বইল। মেঘ সরে যেতে শুরু করল আর মেঘের ফাঁক দিয়ে বল্লমের মতন একটা রোদ্দুরের ফলা এসে পড়ল সোজা সেই মূর্তির গায়ে। ঠিকরে পড়া সোনালি আলোর জেল্লায় আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

তীর থেকে ক্রমাগত ভক্তদের ‘জয় নাগোয়ার’, ‘জয় নাগোয়ার’ চিৎকারের মধ্যেই শুকদেব ঝা জল ভেঙে মাঝনদীর দিকে এগিয়ে চলল। পাশ ফিরে দেখলাম, বুধোদার চোখে ওর সব থেকে দামি কার্ল জাইসের বাইনোকুলার, যেটা ও উড়ন্ত পাখি দেখার সময় ইউজ করে।

শুকদেব প্রথমে কোমরজল, তারপর বুকজল, সবশেষে গলাজলে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর নাগোয়ারের মূর্তি সমেত ডুব দিল। একবার, দুবার, তিনবার। তারপর মাথায় মূর্তি নিয়েই ভিজে কাপড়ে তীরের দিকে ফিরতে শুরু করল।

মন্দিরের কর্মচারীদের মধ্যে একজন দৌড়ে গিয়ে শুকদেবের গায়ে একটা শাল জড়িয়ে দিল। শোভাযাত্রা এবার ফেরার পথ ধরল।

তবে নাগোয়ারদেব আর গর্ভগৃহে ঢুকলেন না। ঘাটের সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকেই তিনি উঠে গেলেন একটা বুলেটপ্রুফ গাড়িতে। সঙ্গে রইলেন মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে শিব ডোগরা আর রাজ্যের পক্ষ থেকে ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর টি.এন.মিশ্র, আই.এ.এস। আগে পিছে আরও চার গাড়ি ভর্তি আর্মির জওয়ান।

ওরা রওনা দিলেন কুলুর কোনও একটা ব্যাঙ্কের দিকে, যে ব্যাঙ্কের লকারে আগামী এক বছর মূর্তিটা নিরাপদে থাকবে। শ্রীবাস্তব সাহেব একবার কথায় কথায় বলেছিলেন ভল্টের কম্বিনেশন-লকের আট সংখ্যার পাস-ওয়ার্ডের অর্ধেকটা জানে শিব ডোগরা আর বাকি অর্ধেকটা টি.এন.মিশ্র। কাজেই ওরা দুজন হাজির না থাকলে ভল্ট খোলা-বন্ধ করা যায় না।

ভাবছিলাম, নাগোয়ারের স্নানযাত্রা তাহলে একশোভাগ নিখুঁতভাবে মিটে গেল? কোথাও কোনও গোলমাল হল না? বুধোদার জন্যে খুব খারাপ লাগছিল। আমার কানে ভাসছিল মাত্র গত পরশুই ও থানায় বসে যে আশঙ্কার কথা বলেছিল—’…আসল কালপ্রিটরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে। জীবনে তাদের আর খুঁজে পাবেন না। অথচ পরে কোনও সময় তারা একই প্ল্যান নিয়ে আবার নাগোয়ারে ফিরে আসতে পারে। তখন হয়তো আমি আপনি কেউই থাকব না।’

ভাবছিলাম, সেই আশঙ্কাই কি সত্যি হল? কোনওভাবে ওরা কি সন্দেহ করল যে পুলিশ ওদের পেছনে পড়ে গেছে? সমস্ত প্ল্যান কার্পেটের তলায় চালান করে দিয়ে কালপ্রিটরা কি চম্পট দিল, পরে আবার কখনও ফিরে আসবে বলে?

বুধোদার মধ্যে অবশ্য হতাশার কোনও লক্ষ্মণই দেখলাম না। বরং ও আর শ্রীবাস্তব সাহেব একটা অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। দুজনেই পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে খুব তাড়াতাড়ি একটা সাধারণ লাল মারুতিতে চেপে বসল। আমাকেও চটপট উঠে পড়তে বলল বুধোদা। ড্রাইভিং-সিটে বসেছিলেন ক্যাপ্টেন মেহতা। আমরা ওঠা মাত্র তিনি ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে দিলেন অচেনা একটা রাস্তায়।

বেশিক্ষণ নয়, মিনিট দশেক চলার পরেই তিনি একটা নির্জন পথের বাঁকে গাড়িটাকে দাঁড় করালেন। রাস্তাটার একদিকে গভীর খাদ, অন্যদিকে পাহাড়। দেখলাম বুধোদা, শ্রীবাস্তব সাহেব, আর ক্যাপ্টেন মেহতা পাহাড়টায় চড়তে শুরু করলেন। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, তবু আমিও ওদের পেছন পেছন উঠে গেলাম।

একটু ওপরে একটা সমতল ধাপের মতন জায়গায় দুটো লোক প্লাস্টিক শীট পেতে মাটির ওপর উপুড় হয়ে শুয়েছিল। আমার সঙ্গের তিনজন বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের পাশেই শুয়ে পড়ল। বুধোদা আমাকেও ইশারা করল চটপট শুয়ে পড়তে।

উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়েই দেখলাম, আমাদের ঠিক সামনে এখন অ্যাজেলিয়া ফুলের একটা ঝোপ। বুঝলাম ইচ্ছে করেই এই জায়গাটা বাছা হয়েছে, বাছা হয়েছে, যাতে সবার নজরের আড়ালে থাকা যায়। কিন্তু কাদের নজরের কথা ভাবা হচ্ছে? আমরা এটা কোথায় এলাম?

ঝোপের ফাঁক দিয়ে সামনের দিকে চাইতেই বুঝতে পারলাম, কোথায় এসেছি। আমাদের পায়ের ঠিক নীচে, খাদের উলটোদিকে বরুণা ঘাট। ওই তো স্নানযাত্রা উপলক্ষে যে তোরণগুলো বানানো হয়েছিল, সেগুলো এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ছড়িয়ে থাকা ফুল আর রঙিন কাগজের কুচি। সন্ধে নেমে আসছে। একটু আগে লোকের ভিড়ে গিজগিজ করছিল যে ঘাট সেখানে এখন একটাও মানুষ নেই। শুধু দুটো লম্বা লোমওয়ালা কুকুর পড়ে থাকা খাবারের খোঁজে মাটি শুকে বেড়াচ্ছে। আড়চোখে দেখলাম, বুধোদার চোখে আবার বাইনোকুলার উঠে এসেছে।

আট

পাঁচ মিনিট কেটে গেল…দশ মিনিট।

শ্রীবাস্তব সাহেবের গলা পেলাম। উনি খুব উদ্বিগ্ন স্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘নাথু, এর মধ্যে কেউ এসেছিল?’

আমাদের আগে থেকেই যে দুজন লোক ওখানে শুয়ে ঘাটের দিকে নজর রাখছিল তাদেরই একজনের নাম নাথু। সে বলল, ‘না স্যর। প্রসেশন ফিরে যাওয়ার পর থেকে একটা লোকও এদিকে আসেনি।’

আবার কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর বুধোদার গলা দিয়ে একটা চাপা হিসস করে শব্দ ভেসে এল। আমরা যাতে কথা না বলি বা উঠে না দাঁড়াই সেইজন্যেই ও আমাদের সাবধান করল। তার মানে ও বাইনোকুলারের মধ্যে দিয়ে কিছু দেখতে পেয়েছে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরাও দেখতে পেলাম। চারজন লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসে বরুণাঘাটে দাঁড়াল। পোশাক-আশাক দেখে বুঝতে পারলাম চারজন বেদে। ওদের মধ্যে দুজন এদিক ওদিক তাকিয়ে জামাকাপড় খুলে নদীর জলে নেমে পড়ল। ওই দুজনের হাতে মাছ ধরার ঘুনির মতন একটা বড় বেতের চুবড়ি। ঠিক যেখানে কিছুক্ষণ আগে নাগোয়ার দেবতার মূর্তি মাথায় নিয়ে শুকদেব ঝা ডুব দিয়েছিল, সেখানেই ওরা দুজনও ডুব দিল। তারপর সেই চুবড়িটা নিয়ে আবার পাড়ে ফিরে এল। গা-হাত-পা মুছে, জামাকাপড় পরে, যেদিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই আবার রওনা দিল, মানে মন্দিরের উলটো দিকে।

ওরা চোখের আড়ালে চলে যাবার মিনিট পাঁচেক পরে বুধোদা উঠে দাঁড়াল। ওর মুখের ভাব একেবারে পালটে গেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে যে মুখ টেনশনে পাথরের মতন হয়েছিল, এখন সেই মুখে কৌতুকের হাসি। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও উঠে দাঁড়ালাম।

শ্রীবাস্তব সাহেব বুধোদার দিকে হ্যান্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘ইট ইজ আ গ্রেট জব মজুমদার। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনি ম্যাজিক জানেন।’ বুধোদা উত্তরে ভারী বিনয়ী একটা হাসি হাসল।

আমার আর ক্যাপ্টেন মেহতার অবস্থা একইরকমের করুণ। সকাল থেকে বুধোদা আর শ্রীবাস্তব সাহেবের টেনশনের কারণ যদিও বা বুঝতে পারছিলাম, এখন এই সেলিব্রেশনের বিন্দুবিসর্গও না। কিছু জিগ্যেস করারও উপায় নেই। এটা একটা পুরোদস্তুর পুলিশি অপারেশন চলছে। শ্রীবাস্তব সাহেব যাকে যতটুকু বলবেন, তার বাইরে কিছু জানতে চাওয়াটাই যে বেয়াদপি হবে সেটা বেশ বুঝতে পারছি।

শ্রীবাস্তব সাহেব পকেট থেকে ওয়াকিটকিটা বার করে কাকে যেন বললেন, ‘ওদের দেখতে পেয়েছ? ঠিক আছে, ফলো করো। এক মিনিটও যেন চোখের আড়ালে না যায়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, নেকস্ট অর্ডারের জন্যে ওয়েট করবে। তাড়াহুড়ো করে কিছু করতে যাবে না।’

বুঝলাম, নদী থেকে উঠে যে চারজন চলে গেল তারা পুলিশের নজরের মধ্যেই রইল।

তারপর শ্রীবাস্তব সাহেব বুধোদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এবার কী মিস্টার মজুমদার? আপনার প্ল্যান থ্রি, তাই তো?’

বুধোদা একবার ঘড়িটা দেখল। তারপর বলল, ‘আর আধঘণ্টা ওয়েট করুন। আমরা আর কোথাও না গিয়ে বরং এখানেই বসে বাকি নাটকটা দেখি। জায়গাটা খুব সেফ। কেউ আমাদের দেখতে পাবে না। কিন্তু আমরা অ্যাকটরদের সবাইকেই দেখতে পাব।

পনেরো মিনিট বাদে আমাদের পায়ের নীচের রাস্তা দিয়ে একটা কালো ট্রেকার বেরিয়ে গেল। গাড়িটা এল মন্দিরের দিক থেকে। চলে গেল উলটোদিকে। নাম্বার প্লেট না দেখতে পেলেও চিনতে অসুবিধে হল না। শিব ডোগরার গাড়ি।

আরও পনেরো মিনিট অপেক্ষা করার পর বুধোদা বলল, ‘চলুন। আপনার কম্যান্ডোরা পজিশন নিয়ে নিয়েছে ক্যাপ্টেন মেহতা?’

ক্যাপ্টেন মেহতা বললেন, ‘ওরা তো সেই আড়াইটে থেকে পজিশন নিয়ে বসে আছে স্যার। আমরা অর্ডার দিলেই অ্যামবুশ করবে।’

‘ঠিক আছে, চলুন। বেশি দেরি করাও ঠিক নয়। পাখি পালাবে।’

নাথু আর তার সঙ্গী রয়ে গেল যেখানে ছিল সেখানেই। আমরা চারজন আবার লাল মারুতিতে উঠে রওনা দিলাম। এবার রাস্তাটা চিনতে পারছিলাম। আমরা মন্দিরকে এড়িয়ে অন্য একটা রাস্তা দিয়ে সোজা ডোগরা ক্যাসলের কাছাকাছি উঠে পড়েছি। ডোগরা ক্যাসল পেরিয়ে কিছুটা গিয়েই গাড়িটাকে একটা গাছের আড়ালে দাঁড় করিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন মেহতা। তারপর আমরা চারজন রাস্তা নয়, রাস্তার পাশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম। ঘন অন্ধকার ঘিরে ধরল আমাদের।

দেখলাম, কখন যেন ক্যাপ্টেন মেহতা আর শ্রীবাস্তব সাহেব দুজনের হাতেই একটা করে রিভলবার চলে এসেছে। সেগুলোকে সামনের দিকে তাক করে ধরে ওনারা গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছিলেন। পেছন পেছন আমি আর বুধোদা।

কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই আমাদের হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়তে হল, কারণ পিঠের মাঝখানে রাইফেলের নলের চাপ পড়লে তারপরেও হাঁটাটা রিস্কি হয়ে যায়। হ্যাঁ, গাছের আড়াল থেকে চারজন কালো পোশাক পরা লোক নি:শব্দে বেরিয়ে এসে আমাদের পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছে।

চারজনের মধ্যে একজন একটা ছোট টর্চ বার করে খুব তাড়াতাড়ি আমাদের মুখগুলো দেখে নিয়ে রাইফেল নামিয়ে সরে দাঁড়ালেন। তারপর অনুযোগের গলায় বললেন, ‘একটু জানিয়ে আসবেন তো স্যার।

 শ্রীবাস্তব সাহেব পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে কাতর গলায় ক্যাপ্টেন সুমন ঘোষকে বললেন, ‘জানানোর সময়টা দিলেন কোথায়? তার আগেই তো পিঠের মধ্যে বন্দুকের নল গেঁথে দিলেন। এনি ওয়ে। যার কথা বলেছিলাম সে এসেছে?’

‘এসে গেছে স্যার। ঠিক সাত মিনিট আগে ওখানে ঢুকে গেছে।’ কম্যান্ডো আঙুল তুলে বেদেদের তাঁবুগুলোকে দেখালেন।

‘আপনাদের দেখতে পায়নি তো?’

ক্যাপ্টেন ঘোষ জবাব না দিয়ে মুচকি হাসলেন, যেন এমন অসম্ভব কথা তিনি বহুদিন শোনেননি। অন্ধকারে চোখ সয়ে গিয়েছিল বলে হাসিটা শ্রীবাস্তব সাহেবও নিশ্চয় দেখেছিলেন, যে কারণে উনি তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘ও. কে.। ঠিক দশমিনিট বাদে হিট করবেন। আপনার বাকি সঙ্গীরা কোথায়? তাদের কম্যুনিকেট করে দিন।’

‘ওকে স্যার।’ অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে কালো চিতার মতন হারিয়ে গেলেন চারজন কম্যান্ডো।

ঠিক দশমিনিট বাদে দুটো কুকুর তারস্বরে ডেকে উঠেই চুপ করে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ধাঁধানো জোরালো আলো আর কানফাটানো শব্দে ভেসে গেল বেদেদের পাঁচটা তাঁবু। অনেকগুলো গলার একসঙ্গে আর্তনাদ। তারপর সব চুপ।

আমার হাতের মুঠিদুটো শক্ত হয়ে উঠছিল। এই শীতেও কপালে ঘামের ফোঁটা জমছিল। মনে হচ্ছিল অনন্তকাল এই অন্ধকারের মধ্যে বেদেদের তাঁবুর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। হঠাৎ আমাদের একদম ঘাড়ের কাছ মানুষের গলার আওয়াজে আমরা চারজনেই চমকে উঠলাম। সুমন ঘোষ কোথা দিয়ে কীভাবে আমাদের এত কাছে চলে এলেন আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। খুব শান্ত গলায় উনি বললেন, ‘অপারেশন সাকসেসফুল স্যার। চলুন, যাবেন তো?’

শ্রীবাস্তব সাহেব, দম নিতে নিতে বললেন, ‘তোমরা কী সব সময়েই এরকম ভূতের মতন চলাফেরা করো না কি? একটু জানান দিয়ে আসতে পারো না? আরেকটু হলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মরে যাচ্ছিলাম যে।’

সুমন ঘোষকে ফলো করে আমরা একটা তাঁবুর মধ্যে ঢুকলাম। দেখলাম, বেদের দলের সবক’টা লোককে এই তাঁবুটার মধ্যে এনে ঢোকানো হয়েছে, ছেলেমেয়ে সবাইকে। ওরা ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে হাঁটু মুড়ে মেঝের ওপরে বসেছিল। চারজন কম্যান্ডো তাদের দিকে বন্দুকের নলগুলো নামিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল ওদের মধ্যে কেউ হাত নামানোর বা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেই গুলি করবে।

‘এদিকে আসুন স্যার।’—ক্যাপ্টেন ঘোষ আমাদের ডাকলেন। আমরা পাশের একটা তাঁবুতে ঢুকলাম। লোকটা বলল, ‘এদের আপনি বেদে বলবেন? দেখুন কি পরিমাণ আর্মস জড়ো করেছে।’

সত্যিই তাই। তাঁবুটার মেঝেতে দেশি বন্দুক, ছোরা, বল্লম আর হাতবোমার একটা ছোটখাটো স্তূপ জড়ো করা রয়েছে।

ক্যাপ্টেন মেহতা বললেন, ‘সর্বনাশ! আপনারা ওদের কবজা করলেন কীভাবে?’

লিডার বললেন, ‘আমরা স্টানার বম্ব ইউজ করেছিলাম। ওগুলো ফাটালে চোখ ধাঁধানো আলো আর তার সঙ্গে কানফাটানো শব্দ হয়। সামনে স্টানার ফাটলে মানুষ কিছুক্ষণের জন্যে নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সেই সুযোগেই আমরা ওদের পেড়ে ফেলেছিলাম। না হলে দুদিকেই বেশ কিছু মানুষ মরত।’

‘স্পেলনডিড!’ ক্যাপ্টেন মেহতা আর শ্রীবাস্তব সাহেবের মুখ থেকে একসঙ্গেই বেরিয়ে এল কথাটা।

‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। কিন্তু মিস্টার মজুমদার বোধহয় আরও কিছু দেখতে চাইছেন।’ লিডার সুমন ঘোষ কৌতুকের চোখে বুধোদার দিকে ইঙ্গিত করল। সত্যিই তাই। বুধোদা কেমন যেন অস্থির ভাবে এদিক ওদিক চাইছিল।

‘এদিকে আসুন মিস্টার মজুমদার। আপনি যা যা খুঁজছেন, সব ওই পাশের তাঁবুতে রয়েছে।’

আমরা চারজনেই পাশের তাঁবুতে ঢুকলাম। এখানে মাত্র একজন লোক ওই একই ভঙ্গিতে ঘাড়ের পেছনে হাত রেখে মাটির ওপর উপুড় হয়ে পড়েছিল। পাশে যথারীতি দুজন কম্যান্ডো রাইফেলের নল তাক করে দাঁড়িয়েছিল। তবে লোকটাকে চিনতে কারুরই অসুবিধে হল না।

শিব ডোগরা।

শিব ডোগরা একা নয়, ঘরের মধ্যে আরও একজন ছিল। একদিকে একটা চাটাইয়ের ওপর পড়েছিল পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে। দেখে মনে হল অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কম্যান্ডো লিডার বললেন, ‘ওকে পাহারা দেওয়ার দরকার নেই। বেচারাকে হেভি ডোজে কোনও ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রাখা হয়েছে। তবে একটা অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। ওকে এক্ষুনি হসপিটালে ট্র্যান্সফার করা দরকার।’

বুধোদা পায়ে পায়ে ছেলেটার কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধ ধরে নাড়া দিল। দুবার ডাকল, ‘বিরাজ! বিরাজ!’ তারপর অসহায় মুখে মনীশ শ্রীবাস্তবের দিকে তাকাল।

মনীশ শ্রীবাস্তব বললেন, ‘ডোন্ট ওয়ারি মিস্টার মজুমদার। বাইরে অনেকগুলো গাড়ি এসে দাঁড়ানোর শব্দ পেলেন নিশ্চয়ই? ওর মধ্যে একটা অ্যাম্বুলেন্সও আছে। এরকম প্রয়োজন যে হতে পারে সেটা আমি আগেই ভেবেছিলাম। বিরাজ সিং-কে এখনই হসপিটালে রওনা করে দিচ্ছি। কিন্তু আসল জিনিসটা কই?’

‘এইখানে স্যার।’ ক্যাপ্টেন সুমন ঘোষ শিব ডোগরাকে একটা ধাক্কা দিয়ে চিৎ করে দিলেন। তারপর ওর বুকে জড়িয়ে ধরা কাপড়ের ব্যাগটা একটা হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিয়ে খুলে ফেললেন।

আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বুধোদা ব্যাগের ভেতর থেকে হাতে কী একটা তুলে নিল? নাগোয়ারদেবের মূর্তি? তাহলে একটু আগে শুকদেব ঝায়ের মাথা থেকে যেটা ব্যাঙ্কের ভল্টের উদ্দেশে চলে গেল, সেটা কী?

বুধোদার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। আমি আর ক্যাপ্টেন মেহতা মূর্তিটার দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। আমরা দুজনেই ওটা ছুঁয়ে দেখতে চাইছিলাম, সত্যি, না কল্পনা।

মনীশ শ্রীবাস্তবের মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা খুব মুশকিল। তবে উনিও বেশ কিছুক্ষণ সম্মোহিতের মতন মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর গলা খাকারি দিয়ে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মেহতা অ্যান্ড রুবিক, ফর ইয়োর ইনফর্মেশন, এটাই নাগোয়ারদেবের আসল মূর্তি। আজ বিকেলে শিব ডোগরা যেটাকে ব্যাঙ্কের লকারে রেখে এলেন, সেটা ফেক। বাকিটা পরে বোধিসত্ব মজুমদারের কাছ থেকে শুনে নিও। ক্যাপ্টেন মেহতা, এখন সব কিছু গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা করুন।’

নয়

এখন ঘড়িতে রাত দশটা। কোনওদিন যে বৃষ্টি নেমেছিল মনেই হচ্ছে না। পরিষ্কার আকাশে বিরাট একটা চাঁদ উঠেছে। পার্বতী নদীর জলকে আজ জল নয়, মনে হচ্ছিল গলানো রুপো। বহুদূরে ধৌলাধার রেঞ্জের বরফ ঢাকা চূড়াগুলোর গায়েও সেই রুপোলি আলোর ছটা।

এত কিছু সত্বেও মনের ভেতর কবিতা আসছিল না, কারণ ভীষণ গদ্যময় একটা গন্ধে শ্রীবাস্তব সাহেবের কোয়ার্টারের বাগান ম ম করছিল।

মাংস রান্নার গন্ধ। খোলা বাগানে বার-বি-কিউ স্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে মনীশ শ্রীবাস্তব কাঠকয়লার আগুনে দুম্বার মাংস রোস্ট করছিলেন। ওনার গায়ে এখন ইউনিফর্মের বদলে গরম কাপড়ের পাঞ্জাবি আর পাজামা। বুক থেকে একটা অ্যাপ্রন ঝুলছে।

আমি, বুধোদা আর ক্যাপ্টেন মেহতা একটু দূরে শেডের নীচে গার্ডেন চেয়ারে বসেছিলাম। ক্যাপ্টেন মেহতা একদমই সময় নষ্ট করতে চাইছিলেন না। আমরা গুছিয়ে বসা মাত্র বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার। শ্রীবাস্তব সাহেব কিন্তু কথা দিয়েছিলেন, আপনি আমাকে আর রুবিককে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবেন। নিন, শুরু করুন।’

বুধোদা হাসতে-হাসতে বলল, ‘ও. কে., ও. কে.। দেখুন, সুরথ সিং-এর মিথ্যে কথা আর ঠিক স্নানযাত্রার আগে আগেই সায়ন আচার্যের খুন হওয়া, এদুটোকে মিলিয়ে প্রথম থেকেই আমার কোনও সন্দেহ ছিল না যে, কোথাও কেউ নাগোয়ারের মূর্তি চুরির একটা প্ল্যান কষছে। কিন্তু এই প্রচণ্ড সিকিউরিটির কড়াকড়ির মধ্যে সেই কাজটা কীভাবে করা সম্ভব, সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না।

‘শিব ডোগরা যে নাটের গুরু সে ব্যাপারেও প্রথম থেকেই আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। ও বেশি চালাকি করতে গিয়ে নিজেই নিজেকে ধরিয়ে দিয়েছিল।

‘কিন্তু আসল ব্রেক-থ্রুটা পেলাম কাল রাতে, যখন জানতে পারলাম শুকদেব ঝা-ই সায়ন আচার্যের হত্যাকারী। তখনই ভাবতে শুরু করলাম ওর ইন্টারেস্ট কী? সায়ন আচার্যর জায়গায় শুকদেবই না হয় পুজোর দায়িত্ব পেল। কিন্তু ও তো আর মন্দিরের ভেতর থেকে নাগোয়ারের মূর্তি তুলে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না।

‘না, তা পারবে না। কিন্তু একটা বিশেষ দিনে, বিশেষ কিছুটা সময়ে ও নাগোয়ারের মূর্তি হাতে নিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

‘নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম, তাতেই বা ওর কী লাভ? ও তো তখনও সবার চোখের সামনে থাকছে।

‘হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতন মাথায় এল—না। সারাক্ষণ সবার চোখের সামনে ও থাকছে না। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে হলেও ও চোখের আড়াল হচ্ছে…যখন ও পার্বতীর জলে ডুব দিচ্ছে। তখনই যদি ও নাগোয়ারের মূর্তিটাকে জলের নীচে রেখে দেয়? অত ভারী মূর্তি, যতক্ষণ কেউ না ওটাকে তুলে আনছে, ওটা যেখানে ফেলা হবে সেখানেই পড়ে থাকবে। পরে একসময় তুলে আনলেই হল।

‘বিনা ঝামেলায় কাজটা শেষ করার জন্যে প্রথমে ওরা নিশ্চয় সায়ন আচার্যের কাছেই মূর্তি চুরির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সৎ ও ধর্মভীরু মানুষ সায়ন আচার্য রাজি হলেন না, দেবতার মূর্তি নিয়ে এমন পাপ কাজ করতে। ফলে তাঁর আর বাঁচার অধিকার রইল না। সায়ন আচার্যকে শুকদেবের হাতে মরতে হল। এইখানে শিব ডোগরা আর শুকদেব ঝা একটা শয়তানি চাল চালল। সায়ন আচার্যের হত্যাকারী হিসেবে বিরাজ সিং-এর নামটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল। এর ফলে শুকদেবের ওপর কারুর সন্দেহ জাগার ভয় রইল না।

‘শুকদেব ঝা না হয় নদীর জলে আসল সোনার মূর্তি ডুবিয়ে দিয়ে এল; পরে কোনও এক সময়ে শিব ডোগরা সেই মূর্তি তুলেও আনল। কিন্তু শুকদেব কি খালি হাতে উঠে আসতে পারবে?

‘না, হাজার হাজার লোকের সামনে খালি হাতে ও উঠে আসতে পারবে না। ওকে নদীর জল থেকে নাগোয়ারের মূর্তি মাথায় নিয়েই উঠতে হবে। শুধু তাই নয়, সেখান থেকেই সেই মূর্তিকে মিলিটারি-পাহারায় ব্যাঙ্কের ভল্টেও পাঠাতে হবে। সেইজন্যেই ওদের দরকার পড়ল নাগোয়ারদেবের মূর্তির একটা অবিকল নকল।

‘ব্রিলিয়ান্ট প্ল্যান, তাই না? নকল মূর্তি থেকে যেত ব্যাঙ্কের লকারে। অন্তত বেশ কিছুদিন কেউ বুঝতেই পারত না, সোনার মূর্তির জায়গায় পেতলের মূর্তি চলে এসেছে। তার মধ্যে শিব ডোগরা সব গুছিয়ে নিয়ে কেটে পড়ত।

‘কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম সুরথ সিং-এর হাতে আগুনের আঁচের চিহ্ন কেন? সুরথ সিং কেন বাধ্য হয়েছেন ছ’বছরের অবসর ভেঙে আবার ফার্নেসের ধারে ফিরে যেতে? কী তৈরি করছেন সুরথ সিং?’

‘নকল মূর্তির কথা মাথায় আসতেই উত্তরটা পেয়ে গেলাম। সুরথ সিং নাগোয়ারের নকল মূর্তি বানাচ্ছেন।’

‘সুরথ সিং হচ্ছেন পুরোনো জামানার একমাত্র জীবিত শিল্পী, যিনি নিজের হাতে জটিলস্য জটিল ছাঁচ বানিয়ে যে-কোনও মেটালের মূর্তি ঢালাই করতে পারেন। কাজেই নাগোয়ারের নকল মূর্তি বানানোর জন্যে তিনিই হচ্ছেন একমাত্র লোক।’

‘শিব ডোগরা সুরথ সিংকে এমন একটা মূর্তি বানিয়ে দেবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।’

‘সুরথ সিং হয়তো বুঝতে পারেননি শিব ডোগরা কেন এরকম প্রস্তাব দিচ্ছেন। কিন্তু তা না পারলেও কথাটা শুনে তিনি নিশ্চয়ই শিউরে উঠেছিলেন। তিনশো বছর ধরে নাগোয়ার গ্রাম আর আশেপাশের মানুষ জেনে এসেছে সর্পদেবতার সোনার মূর্তির ছবি আঁকা কিংবা তার আদলে আরেকটা মূর্তি গড়া সব কিছুই নিষিদ্ধ। তাহলে শিব ডোগরা তাকে এরকম অন্যায় কাজ করতে বলছেন কেমন করে? তিনি রাজি হলেন না।’

‘শিব ডোগরার হাতে কিন্তু সুরথ সিংকে রাজি করানো ছাড়া আর কোনও রাস্তা ছিল না। আর কেউ তো ওই মূর্তি বানাতে পারত না। কাজেই শিব ডোগরা সুরথ সিং-এর প্রাণের চেয়েও প্রিয় নাতি বিরাজ সিংকে কিডন্যাপ করল। তখন শিব ডোগরার কথা মতন নাগোয়ারের মূর্তির নকল বানানো ছাড়া সুরথ সিং-এর হাতে আর কোনও উপায় রইল না। শুধু তাই নয়, এসব কথা জানাজানি হলে বিরাজ যে প্রাণে বাঁচবে না, সে কথাও নিশ্চয় শিব ডোগরা সুরথ সিংকে ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, যে কারণে সরল পাহাড়ি মানুষ সুরথ সিং মনের যন্ত্রণা মনেই চেপে রেখে আমাদের কাছেও মিথ্যে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।’

‘নকল নাগোয়ারদেবের মূর্তিটাই ছিল বিরাজের মুক্তিপণ।’

‘মন্দির কমিটির সেক্রেটারি হওয়ার সুবাদে শিব ডোগরার অবাধ যাতায়াত ছিল মন্দিরের যে-কোনও জায়গায়। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, গতবছরেই এরকম সময়ে শিব ডোগরা সেই স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে নাগোয়ার দেবের কিছু ছবি লুকিয়ে নিজের ক্যামেরা বা মোবাইলে তুলে রেখেছিল। সেই ছবিই নিশ্চয় সুরথ সিং-কে সে দিয়েছিল মূর্তি তৈরির মডেল হিসেবে। না হলে এ কাজ সুরথ সিং-এর পক্ষেও করা সম্ভব ছিল না।’

‘আরও একটা কথা আমার মনে হয়েছিল, যদিও তার কোনও প্রমাণ দিতে পারব না। নাগোয়ারের মূর্তি চুরির কাজটা নির্বিঘ্নে হয়ে গেলে শিব ডোগরা বিরাজ-সিং-এর পুরো পরিবারটাকেই গুম করে দিত, যাতে সায়ন আচার্যের মৃত্যু চিরকাল একটা রহস্য হয়েই থেকে যায়। সেইজন্যেই আজ স্নানযাত্রার প্রসেশন শুরু হওয়া মাত্র আমি শ্রীবাস্তব সাহেবকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম সুরথ সিং আর ঊর্মিলাকে ওদের বাড়ি থেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে। সেই কাজটা ঠিকঠাক করে ফেলেছেন সেকেন্ড অফিসার পবন খের। এটা ছিল আমার ‘প্ল্যান ওয়ান’।’

‘সায়ন আচার্য খুন হলেন। শুকদেবের হাত দিয়ে নাগোয়ারের মূর্তি অদল বদলের ব্যাপারটাও নিশ্চিত করা গেল। সুরথ সিং নাগোয়ার মূর্তির অবিকল নকল বানিয়ে দিলেন। কিন্তু শিব ডোগরার মাথায় আরেকটা নতুন দুশ্চিন্তা ঢুকে গেল। চিন্তাটা আমাকে নিয়ে।

‘ও জেনেছিল আমার অ্যান্টিক সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান আছে। আবার শ্রীবাস্তব সাহেবের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে স্নানযাত্রার শেষে নকল মূর্তিটার কাছে যাওয়ার সুযোগও আমার ছিল। তখনই যদি আমি চিৎকার করে বলে উঠি—মূর্তি বদলে গেছে? এটা আসল মূর্তি নয়, নকল। শিব ডোগরা তাই আমার বিদ্যে মাপার চেষ্টা করল।

‘আমি ওকে বুঝিয়ে দিলাম অ্যান্টিক সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। ও নিশ্চিন্ত মনে নিজের প্ল্যান মতন এগোতে লাগল।

‘একেবারে শেষ কাজটা করার জন্যে বেদেদের দলের সাহায্য নিয়েছিল শিব ডোগরা। মানে নদীর জলে আগেভাগেই নকল মূর্তি রেখে আসা আর মূর্তিবদলের পর আসল মূর্তিটাকে নদীর জল থেকে তুলে নিজেদের তাঁবুতে নিয়ে আসা। ওদের পুরো অপারেশনটাই আমরা আড়ালে লুকিয়ে বসে দেখেছিলাম। আমার ‘প্ল্যান-টু’।

‘ওই ভয়ংকর দলটা বংশানুক্রমে ডোগরা ফ্যামিলির অনুগত। আমার মন বলছিল, বিরাজ সিংকে অন্য কোথাও নয়, ওই বেদেদের ক্যাম্পেই ধরে রাখা হয়েছে। ওদের সবাই ভয় পায়, তাই ওদিকে কারুর যাবার চান্স নেই। কাজেই একটা ছেলেকে কিডন্যাপ করে লুকিয়ে রাখার পক্ষে ওর চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে? আজ তো দেখা গেল, আমি ঠিকই ভেবেছিলাম।

‘বেদেদের তাঁবুতে ঢুকে বিনা রক্তপাতে বিরাজ সিংকে আর নাগোয়ারদেবের মূর্তিটাকে উদ্ধার করে আনা যে লোকাল পুলিশের পক্ষে সম্ভব হবে না সেটা বুঝতে পেরেই আমি কম্যান্ডো আনার কথা বলেছিলাম। ওই কম্যান্ডো অপারেশনই আমার ‘প্ল্যান থ্রি’।’

ক্যাপ্টেন মেহতা চেয়ার থেকে ঝুঁকে পড়ে বুধোদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট স্যার। টুকরো টুকরো ঘটনাগুলোকে আপনি কল্পনার সুতো দিয়ে জুড়েছেন। ঘটনাগুলো জানলেও ওই জোড়া লাগানোর মতন কল্পনাশক্তিটা তো সবার থাকে না। ব্রিলিয়ান্ট।’

বুধোদা আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘রুবিক না থাকলে কিন্তু জানতেও পারতাম না যে, আমার নিজের ক্যামেরাতেই সায়ন আচার্যের খুনের ছবি রয়ে গেছে। আর হিমাচলের হেঁয়ালি তখন হেঁয়ালি-ই থেকে যেত। কেউ জানে না আরও কত বছর বাদে মানুষ বুঝতে পারত যে, নাগোয়ারদেব আর সোনার নাগোয়ারদেব নেই!’

‘সেইজন্যে রুবিককে আর আপনাকে এই পাসিন্দা কাবাবের প্লেট দিয়ে সম্মানিত করা হল।’ শ্রীবাস্তব সাহেব আমার আর বুধোদার সামনে দুটো ধোঁয়া ওঠা কাবাবের প্লেট নামিয়ে রাখলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *