লোকির সন্তানেরা

লোকির সন্তানেরা

লোকি ছিল সুদর্শন, এবং সে এটা জানত। লোকজন তাকে ভালোবাসতে আর বিশ্বাস করতে চাইত। কিন্তু সে ছিল আত্মকেন্দ্রিক আর অনির্ভরযোগ্য, দুষ্টু আর শয়তান। সে সিজিন নামে এক নারীকে বিয়ে করেছিল। যখন তাদের বিয়ে হয়, সিজিনকে সুন্দর আর সুখী মনে হতো কিন্তু এখন তাকে দেখলে মনে হয় সে সর্বদা একটা খারাপ খবরের আশঙ্কায় আছে। সে এক পুত্রসন্তান জন্ম দেয়, যার নাম ছিল নাফ্রি। কিছুদিন পর তাদের আরেক পুত্রসন্তান হয়, নাম ভালি।

মাঝেমধ্যেই লোকি নিরুদ্দেশ হয়ে যেত, অনেক দিন তার কোনো হদিশ পাওয়া যেত না। সিজিনকে দেখে মনে হতো, সে সবচেয়ে খারাপ খবরের আশঙ্কায় আছে। কিন্তু লোকি সর্বদাই তার কাছে ফিরে আসত। লোকিকে চতুর আর অপরাধী মনে হতো, কখনো মনে হতো সে কিছু একটা নিয়ে গর্বিত।

তিনবার সে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, আর তিনবারই সে একসময় ফিরে এসেছিল।

তৃতীয়বার লোকি যখন অজ্ঞাতবাস থেকে এসগার্ডে ফিরে এলো, ওডিন তাকে ডেকে পাঠাল।

“আমি স্বপ্নে দেখেছি,” তাকে বলল প্রবীণ একচক্ষু দেবতা। “তোমার সন্তানসন্ততি আছে।”

“আমার এক পুত্র আছে, নাফ্রি। ভালো ছেলে কিন্তু আমি স্বীকার করছি সে প্রায়ই তার পিতার কথা শোনে না। আরেক পুত্র আছে, ভালি, সে আবার অনুগত আর সংযত স্বভাবের।

“আমি তাদের কথা বলিনি। তোমার আরো তিন সন্তান আছে, লোকি। তুমি তুষার দানবদের রাজ্যের দানবি আঙ্গোরবদার সাথে সময় কাটানোর জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাও। তার গর্ভে তোমার তিন সন্তান জন্ম নিয়েছে। আমি ঘুমের মধ্যে অন্তর্চক্ষু দিয়ে তাদের দেখেছি, আর আমার দূরদৃষ্টি বলছে, ভবিষ্যতে তারা দেবতাদের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু হবে।”

লোকি কিছুই বলল না। সে নিজেকে লজ্জিত দেখানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তাকে বরং সন্তুষ্ট দেখাচ্ছিল।

ওডিন দেবতাদের ডেকে পাঠাল, সে থর আর টীরের নেতৃত্বে একদল দেবতাদের তুষার দানবদের রাজ্য যতুনহাইমে পাঠাল, লোকির সন্তানদের এসগার্ডে নিয়ে আসার জন্য।

দেবতারা দানবদের রাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করল। অনেক বিপদের সাথে যুদ্ধ করে তারা অবশেষে আঙ্গরবদার বাড়ি পৌঁছাল। আঙ্গরবদা এধরনের কোনো ঘটনা আশা করেনি, সে তার সন্তানদের তার বিশাল হলে খেলাধুলা করার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। লোকি আর আঙ্গরবদার সন্তানদের দেখে দেবতারা খুবই বিস্মিত হলেও তাদের কর্তব্যকর্মে ব্যাঘাত ঘটতে দিল না। তারা বাচ্চাগুলোকে ধরল, সবচেয়ে বড় বাচ্চাটাকে পাইন গাছের গুঁড়িতে বেঁধে ঝুলিয়ে নিল, দ্বিতীয় বাচ্চাটাকে মুখবন্ধ দিয়ে মুখ বেঁধে গলায় একটা দড়ি পরিয়ে নিল, তৃতীয় বাচ্চাটা বিষণ্ণ বদনে তাদের সাথে সাথে এমনিতেই হেঁটে আসতে থাকল।

তৃতীয় বাচ্চাটির ডান পাশে যারা ছিল, তারা একটি সুন্দর বাচ্চা মেয়ে দেখতে পাচ্ছিল, আর যারা মেয়েটির বাম পাশে ছিল, তারা তার দিকে না তাকানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছিল, কারণ মেয়েটির শরীরের অন্য অংশ ছিল মৃত মানুষের পচা-গলা শরীরের মতো।

“একটা জিনিস খেয়াল করেছ?” তুষার দানবদের রাজ্য যতুনহাইনের মধ্য দিয়ে ফিরতি পথে তৃতীয় দিন থর টীরকে জিজ্ঞেস করল। রাতের বেলা একটা সমতল জায়গা দেখে তারা তাঁবু ফেলেছে, টীর লোকির দ্বিতীয় সন্তানের পশমি গলায় হাত বুলাচ্ছিল।

“কী?”

“তারা আমাদের অনুসরণ করছে না, এমনকি বাচ্চাদের মাও আমাদের পিছনে আসছে না, মনে হচ্ছে যেন তারা চায়, আমরা বাচ্চাগুলোকে যতুনহাইম থেকে নিয়ে যাই।”

“ফালতু কথা,” জবাব দিল টীর। কিন্তু মুখে বললেও অজানা এক আশঙ্কায় আগুনের পাশে বসেও টীর শিউরে উঠল।

আরো দুই দিন কষ্টকর যাত্রা শেষে তারা ওডিনের রাজসভায় এসে পৌঁছাল।

“এরা হলো লোকির সন্তানেরা”, সংক্ষেপে জানান দিল টীর।

লোকির প্রথম সন্তান একটা পাইন গাছের গুঁড়িতে বাঁধা ছিল, আর সেটা ইতোমধ্যে পাইন গাছের চেয়ে বড় হয়ে গেছে। এটির নাম ছিল জরমুনগুন্ডার, আর এটা ছিল একটা সাপ। “আমরা এটাকে ধরে নিয়ে ফিরে আসার যাত্রার সময়কালে এটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।”

“সাবধান,” থর বলল। “এটা জ্বলন্ত কালো বিষ ছিটাতে পারে। এটা আমার দিকে বিষ ছিটিয়েছিল, কিন্তু আমার গায়ে লাগেনি। তাই এটাকে আমরা গাছের গুঁড়িতে বেঁধে এনেছি।”

“এটা এখনো বাচ্চা,” বলল ওডিন। “এটা এখনো বড় হচ্ছে। আমরা এটাকে এমন স্থানে পাঠাব, যেখানে এটা কারো ক্ষতি করতে পারবে না।”

ওডিন জরমুনগুন্ডারকে যেখানে সকল ভূমির শেষ, মিডিগার্ডকে চতুর্দিক ঘিরে থাকা যে সমুদ্র, সেই সমুদ্রের তীরে নিয়ে গেল আর মুক্ত করে দিল, আর তাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচে চক্রাকারে সাঁতার কাটতে কাটতে দূরে চলে যেতে দেখল।

ওডিন তার একচক্ষু দিয়ে সর্পটিকে দিগন্তে হারিয়ে যেতে দেখল, আর ভাবল কাজটি ঠিক হলো কি না। সে আসলে জানে না। সে তাই করেছে, সেটা সে স্বপ্নে দেখেছে। কিন্তু স্বপ্নরা যতটুকু দেখায়, তারচেয়ে অনেক বেশি জানে, এমনকি সবচেয়ে জ্ঞানী দেবতার কাছেও তারা সবটুকু প্রকাশ করে না।

সর্পটি মহাসমুদ্রের ধূসর জলের নিচে বাড়তে থাকবে, বাড়তে বাড়তে একসময় পুরো পৃথিবীকে বেষ্টন করে ফেলবে। মানুষজন জরমুনগুন্ডারকে মিডগার্ডের সর্প নামে ডাকবে।

ওডিন তার রাজসভায় ফিরে এলো। সে লোকির দ্বিতীয় সন্তানকে তার সামনে আসতে নির্দেশ দিল।

সে মেয়েটির দিকে তাকাল, তার মুখের একপাশে ছিল গোলাপি গাল, লোকির মতো সুন্দর সবুজ চোখ, সুন্দর ঠোঁট। মুখের অন্য পাশে ছিল মৃত মানুষের মতো পচে বিকৃত হয়ে যাওয়া ত্বক, পচা ধূসর আর ঘোলা চোখ, আর ঠোঁটবিহীন চোয়াল, তার দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছিল।

“তোমাকে তারা কী নামে ডাকে, বালিকা?” জানতে চাইল বিশ্বপিতা।

“তারা আমাকে হেল নামে ডাকে,” মেয়েটি বলল, “আপনি চাইলে আমাকে এই নামেই ডাকতে পারেন, মহামান্য বিশ্বপিতা।”

“তুমি খুব বিনয়ী,” বলল ওডিন, “এটুকু স্বীকার করতেই হচ্ছে।”

হেল কিছুই বলল না। সে শুধু তার বরফ খণ্ডের মতো শীতল সবুজ চোখ আর মৃত ফ্যাকাশে ঘোলা চোখ তুলে তাকিয়ে থাকল, তার চোখে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না।

“তুমি জীবিত?” ওডিন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল। “নাকি মৃত?”

“আমি শুধু আমি, হেল, আঙ্গরবদা আর লোকির কন্যা,” বলল মেয়েটি। “আর আমি মৃতদের সবচেয়ে পছন্দ করি। তারা খুবই সাধারণ আর আমার সাথে সম্মানের সাথে কথা বলে। জীবিতরা আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায়।”

ওডিন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হলো এবং তার স্বপ্নের কথা মনে পড়ল। তখন ওডিন বলল, “এই বাচ্চাটি সবচেয়ে গভীরতম অন্ধকার স্থানের শাসক হবে, নয় দুনিয়ার সকল মৃতের শাসক। যারা রোগে, বৃদ্ধ বয়সে, দুর্ঘটনা আর বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সেসব অভাগা আত্মার রানি হবে সে। যারা বীরের মতো যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করবে, তারা সর্বদা আমাদের সাথে এখানে ভেলহালায় যোগ দেবে। কিন্তু যারা অন্যভাবে মারা যাবে, তারা হেলের সঙ্গী হবে, তার সাথে অনন্ত আঁধারে থাকবে।”

মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসার পর এই প্রথম হেল হাসল, তার অর্ধেক জীবিত মুখে।

ওডিন তাকে পাতালে অন্ধকার রাজ্যে নিয়ে গেল। সে তাকে তার সুবিশাল হল দেখাল, যেখানে সে তার প্রজাদের গ্রহণ করবে।

“আমি আমার খাবার পাত্রের নাম দিলাম ক্ষুধা” বলল হেল। সে একটা চাকু তুলে নিল, “এটাকে ডাকব মহামারি। আর আমার শয্যার নাম হবে মৃত্যুশয্যা।”

লোকির দুই সন্তানের গতি হলো। একজনের সমুদ্রে আর আরেকজন পাতালে অন্ধকার জগতে। কিন্তু তৃতীয়জনকে নিয়ে কী করা যায়?

দেবতারা যখন লোকির সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটিকে দানবদের রাজ্য থেকে নিয়ে আসে, তখন সেটি ছিল একটি কুকুরের বাচ্চার মতো ছোট, টীর বাচ্চাটির গলায় আর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করত, তার সাথে খেলা করত। বাচ্চাটি ছিল একটা নেকড়ে, বাদামি আর কালো রঙের মিশেল, তার চোখ ছিল কয়লার মতো কৃষ্ণবর্ণ

নেকড়ে ছানাটি কাঁচা মাংস খেত, কিন্তু সে মানুষের মতো কথা বলত, দেবতা আর মানুষদের ভাষায়। তার নাম ছিল ফেনরির।

ফেনরির খুব দ্রুত বড় হচ্ছিল। একদিন যদি এটি নেকড়ের আকার হয়, পরদিন এটি ভালুকের মতো বড় হয়, তার পরের দিন বিরাট এলক হরিণের মতো বড় হয়ে যায়।

দেবতারা ফেনরিকে দেখে ভয় পেয়ে যায়, শুধু টীর ছাড়া। সে এখনো নেকড়েটির সাথে খেলাধুলা করে, সে একাই তাকে প্রতিদিন কাঁচা মাংস খাওয়ায়। প্রতিদিন বাচ্চাটি আগের দিনের চেয়ে বেশি খায় আর আগের দিনের বেয়ে আরো বড়, শক্তিশালী আর ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

ওডিন বাচ্চাটিকে বেড়ে উঠতে দেখে অমঙ্গলের আশঙ্কায় নিমজ্জিত হয়, তার স্বপ্নে সে সৃষ্টিজগত ধ্বংসের সময়কালে নেকড়েটিকে দেখতে পায়। সবচেয়ে সুদূর ভবিষ্যৎ, যা সে দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায়, সেখানে সে শুধু ফেনরিরের গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ চোখ আর সাদা দাঁত দেখতে পায়।

দেবতারা এক সভায় মিলিত হলো আর সিদ্ধান্ত নিল ফেনরিরকে তারা বেঁধে রাখবে।

দেবতারা তাদের কামারশালায় ভারী শিকল আর বেড়ি তৈরি করল আর সেটি ফেনরিরের কাছে নিয়ে গেল।

“ফেনরির, এই দেখো,” দেবতারা ফেনরিরকে বলল, যেন এটা একটা মজার খেলা। “তুমি খুব দ্রুত বড় হয়ে গেছ। আমরা তোমার শক্তি পরীক্ষা করতে চাই। আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী শিকল আর বেড়ি এনেছি, তোমার কি মনে হয় এটা তুমি ভাঙতে পারবে?”

“আমার মনে হয় আমি পারব,” বলল ফেনরির। “আমাকে বাঁধো।”

দেবতারা বিশাল শিকল ফেনরিরের চতুর্দিক ঘিরে ভালো করে বাঁধল আর তার পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিল। দেবতারা যতক্ষণ তাকে বাঁধল, ফেনরির চুপচাপ অপেক্ষা করল। বিশাল নেকড়েটিকে শক্তিশালী শেকলে বাঁধতে পেরে দেবতারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল।

“এখন,” চিৎকার করল থর।

ফেনরির তার শরীর মোচড়াল আর পায়ের পেশি ফোলাল, দেবতাদের শিকল শুকনো ডালের মতো ভেঙে টুকরো হয়ে গেল।

বিরাট নেকড়েটি চাঁদের দিকে মুখ তুলে বিজয়ানন্দে গর্জন করে উঠল। “আমি তোমাদের শেকল ভেঙে ফেলেছি,” বলল সে, “ভুলে যেও না।”

“আমরা ভুলব না,” বলল দেবতারা।

পরের দিন টীর নেকড়েটিকে মাংস খাওয়াতে গেলে নেকড়ে বলল, “আমি শেকল ভেঙে ফেলেছি, আমি খুব সহজেই সেগুলো ভেঙেছি।”

“হ্যাঁ, তুমি শেকল ভেঙে ফেলেছ, আমি দেখেছি।”

“তোমার কি মনে হয়, তারা আবার আমার শক্তি পরীক্ষা নেবে? আমি তো প্রতিদিনই আরো বড় আর শক্তিশালী হচ্ছি।”

“তারা আবার তোমাকে পরীক্ষা করবে, আমি আমার ডান হাত বাজি ধরে বলতে পারি,” বলল টীর।

নেকড়েটি ক্রমাগত বড় হচ্ছিল আর দেবতারা তাদের কামারশালায় নতুন শেকল তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। শেকলটির একেকটি অংশ এতই ভারী ছিল যে, সেটি একজন মানুষের জন্য উঠানো কঠিন ছিল। এটা ছিল দেবতাদের বানানো সবচেয়ে শক্ত লোহার শেকল, যেটি মাটির গভীর থেকে তুলে আনা আর আকাশ থেকে খসে পড়া ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছিল। তারা এই শেকলের নাম দিল ক্ৰমি।

দেবতারা শেকলটি ঘুমন্ত ফেনরিরের আছে টেনে নিয়ে এলো।

“আবার?” বলল সে।

“যদি তুমি এই শেকল থেকে মুক্তি পেতে পারো,” তাকে বলল দেবতারা, “তোমার শক্তিমত্তার কথা সকল দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। সবাই তোমার প্রশংসা করবে। যদি এই শেকল তোমাকে বেঁধে রাখতে না পারে, তাহলে প্রমাণ হবে, সকল দেবতা আর দানবদের চেয়ে তুমি শক্তিশালী।”

ফেনরির সম্মতি জানিয়ে মাথা ঝাঁকাল, আর দ্রুমি নামক শেকলের দিকে তাকাল, এতবড় আর শক্তিশালী শেকল আগে কখনো তৈরি হয়নি।

“বিপদকে মোকাবিলা করা ছাড়া সম্মান অর্জন করা যায় না,” কিছুক্ষণ ভেবে বলল নেকড়ে। “আমি বিশ্বাস করি এই শেকল আমি ভাঙতে পারব, বাঁধো আমাকে।”

তারা তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলল।

বিশাল নেকড়েটি তার শরীর মুচড়ে, পায়ের পেশি ফুলিয়ে শেকল ভাঙতে চেষ্টা করল, কিন্তু শেকল ভাঙতে পারল না। দেবতাদের চোখে বিজয়ের আনন্দ ফুটে উঠতে শুরু করল, কিন্তু বৃহৎ নেকড়েটি তার শরীর মোচড়াতে শুরু করল, সর্বশক্তিতে তার চার পায়ের সকল পেশি ব্যবহার করে শেকল ভাঙতে চেষ্টা করতে লাগল। তার চোখ জ্বলতে লাগল, দাঁত বেরিয়ে পড়ল আর মুখ থেকে ফেনা বেরুতে শুরু করল।

সে গর্জন করতে করতে শরীর মোচড়াতে শুরু করল। সে তার সর্বশক্তিতে শেকল ভাঙতে চেষ্টা করতে লাগল।

দেবতারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছনে সরে গেল, তারা পিছনে সরে ভালোই করেছিল কারণ প্রথমে শেকলে ফাঁটল ধরল, তারপর শিকলটি টুকরো টুকরো হয়ে ভয়ংকর বেগে চতুর্দিকে ছুটে যেতে শুরু করল, পরবর্তী বহু বছর ধরে দেবতারা বড় গাছে বা পাহাড়ের পাশে শেকলের ভাঙা টুকরো খুঁজে পেত।

“আমি পেরেছি,” চিৎকার করল ফেনরির, আর নিজের সাফল্যে মানুষ আর নেকড়ের মতো গর্জন করল।

নেকড়ে লক্ষ করল, দেবতারা যারা তার শেকল ভাঙার সংগ্রাম দেখছিল, তার সাফল্যে মোটেই খুশি হতে পারেনি, এমনকি টীরও নয়। ফেনরির, লোকির সন্তান, বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হলো।

আর নেকড়ে ফেনরির প্রতিদিন বড় থেকে আরো বড় হতে লাগল।

ওদিকে ওডিন এ বিষয়ে ভাবল, আর গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত হলো। সে তার মিমিরের কুয়ো থেকে পাওয়া সব জ্ঞান দিয়ে ভাবল আর বিশ্ববৃক্ষ থেকে নিজেকে উৎসর্গ করে পাওয়া জ্ঞান দিয়ে চিন্তা করল, কীভাবে একটা উপায় বের করা যায়।

অবশেষে ওডিন একটা উপায় খুঁজে পেল। সে ফ্রের সংবাদবাহক শুভ্র এলফ স্কিরনিরকে ডেকে পাঠাল, আর তাকে গ্রেইপনির নামে একটা শিকলের কথা বর্ণনা করল। স্কিরনির তার ঘোড়ায় চড়ে রংধনু সেতু পেরিয়ে ভারটালহাইমে যাত্রা করল, সাথে নিয়ে গেল বামনদের জন্য এমন এক শেকল বানানোর নির্দেশনা, সে শেকল কেউ কোনোদিন দেখেনি।

বামনরা স্কিরনিরের কাছ থেকে শেকল বানানোর নির্দেশনা শুনল, তারা ভয়ে কেঁপে উঠল, কিন্তু তারা রাজি হলো আর তাদের পারিশ্রামিকের পরিমাণ জানাল। যদিও বামনদের পারিশ্রামিক অনেক বেশি ছিল, স্কিরনির রাজি হলো, কারণ ওডিন তাকে সেরকমই নির্দেশ দিয়েছিল। বামনরা শেকল বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান জোগাড় করল।

বামনরা শেকল বানানোর জন্য ছয়টি উপাদান জোগাড় করল-

প্রথম জিনিসটি ছিল বিড়ালের পায়ের ছাপ।

দ্বিতীয় জিনিসটি হলো একজন নারীর দাড়ি।

তৃতীয় জিনিসটি ছিল পাহাড়ের ছাদ।

চতুর্থ জিনিসটি ছিল ভালুকের পেশি।

পঞ্চম জিনিসটি ছিল মাছের নিশ্বাস।

ষষ্ঠ আর সর্বশেষ জিনিসটি ছিল পাখির থুথু

এই প্রত্যেকটি জিনিস গ্লেইপনির তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল।

(তুমি বলছো, তুমি এগুলোর কোনোটাই কখনো দেখনি? অবশ্যই কখনো দেখনি। কারণ বামনরা এগুলোকে শেকল বানাতে ব্যবহার করে ফেলেছিল।)

বামনরা যখন তাদের কাজ শেষ করল, তার স্কিরনিরকে একটা কাঠের বাক্স দিল। বাক্সের ভিতর ছিল সিল্কের মতো মসৃণ আর নরম একধরনের লম্বা রশি। এটা ছিল প্রায় স্বচ্ছ আর ওজনে একেবারেই হালকা।

স্কিরনির কাঠের বাক্স সাথে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে এসগার্ডে ফিরে এলো। সে যখন ফিরে আসে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমেছে। সে দেবতাদের দেখাল বামনদের কারখানা থেকে কী জিনিস নিয়ে এসেছে, এটা দেখে দেবতারা খুবই খুশি হলো।

দেবতারা সবাই মিলে কৃষ্ণ হ্রদের তীরে গেল, আর ফেনরিরকে তার নাম ধরে ডাকল। ফেনরির দৌড়ে তাদের কাছে আসল, একটা কুকুরকে ডাকলে যেভাবে ছুটে আসে। দেবতারা তাকে দেখে বিস্মিত হলো, সে কত বড় আর শক্তিশালী হয়েছে।

“কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল নেকড়ে।

“আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী দড়ি জোগাড় করেছি,” তারা তাকে বলল। “এমনকি তুমিও এটা ছিঁড়তে পারবে না।”

নেকড়ে তার বক্ষ টান করল, “আমি যেকোনো শেকল ছিঁড়তে পারি,” সে গর্বের সাথে জানাল।

ওডিন তার হাতে থাকা গ্লেইপনির নেকড়েকে দেখাল। এটা চাঁদের আলোতে চকচক করে উঠল

“এটা?”, বলল নেকড়ে। “এটা তো কিছুই না।”

দেবতারা দড়িটা টেনে দেখাল, সেটা কতটা শক্ত। “আমরা এটা ছিঁড়তে পারছি না।”

দেবতাদের সাথে থাকা সিল্কের দড়িটার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল নেকড়ে। এটাকে দেখতে চাঁদের আলোতে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দেখাচ্ছিল। নেকড়ে মাথা ফিরাল, তাকে মোটেই আগ্রহী মনে হলো না।

“আমাকে আসল শেকল দাও, আসল দড়ি, ভারী আর বৃহৎ, আর আমাকে আমার শক্তি দেখাতে দাও।”

“এটা গ্লেইপনির,” বলল ওডিন। “এটা সব শেকল আর দড়ির চেয়ে শক্তিশালী। তুমি কি ভয় পাচ্ছ, ফেনরির?”

“ভয় পাব? মোটেই না। কিন্তু আমি যদি এই সরু দড়ি ছিঁড়তে পারি, তাহলে কী হবে? তুমি কি মনে করো আমি বিখ্যাত হব? লোকজন জড়ো হবে আর বলবে, তুমি কি জানো নেকড়ে ফেনরির কত শক্তিশালী? সে এতই শক্তিশালী যে, সে একটা সিল্কের দড়ি ছিঁড়ে ফেলেছে! গ্রেইপনির ছিঁড়ে আমার মোটেই গৌরব বাড়বে না।”

“তুমি ভয় পাচ্ছ,” বলল ওডিন।

বিশাল জন্তুটি বাতাসে নাক সিঁটকাল। “আমি বরং বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রতারণার গন্ধ পাচ্ছি,” বলল নেকড়ে, তার কৃষ্ণবর্ণ চোখ চাঁদের আলোয় জ্বলে উঠল। “যদিও আমি মনে করি, গ্রেইপনির একটা সামান্য দড়ি মাত্র, আমি এটায় নিজেকে বাঁধতে চাই না।”

“তুমি এই দড়িকে ভয় পাচ্ছ, যে তুমি সবচেয়ে বড় আর শক্ত শেকল ভেঙে ফেলেছ?”

“আমি কোনোকিছুকে ভয় পাই না,” গর্জন করে জবাব দিল নেকড়ে। “আমার বরং মনে হয়, তোমাদের মতো ক্ষুদ্র প্রাণীরাই আমাকে ভয় পাও।”

ওডিন তার দাড়ি চুলকাল। “তুমি বোকা নও ফেনরির। এখানে কোনো বিশ্বাসভঙ্গের প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমি তোমার নির্লিপ্ততা বুঝতে পারছি। একজন যোদ্ধা এমন কোনো শেকলে নিজেকে বাঁধতে চাইবে না, যেটা সে ভাঙতে পারবে না। সকল দেবতাদের পিতা হিসেবে আমি তোমাকে আশ্বস্ত করছি, যদি তুমি এই সিল্কের দড়ি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারো, তাহলে দেবতাদের তোমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমরা তোমাকে মুক্ত করে দেব, তুমি তোমার পথে চলে যাবে।”

একটা দীর্ঘ গর্জন করে নেকড়ে ওডিনের দিকে তাকাল, “তুমি মিথ্যে বলছো, বিশ্বপিতা। অন্যরা যেভাবে নিশ্বাস ফেলে, তুমি তেমনি প্রতি নিশ্বাসে মিথ্যে বলো। যদি তোমরা আমাকে এমনভাবে বেঁধে ফেলো যে, আমি নিজেকে মুক্ত করতে পারব না, আমি বিশ্বাস করি না তোমরা আমাকে মুক্ত করে দেবে। আমার মনে হয়, তোমরা আমাকে এখানেই রেখে যাবে। আমার মনে হয় তোমরা আমাকে ত্যাগ করার আর আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার পরিকল্পনা করছো। আমি এই দড়িতে নিজেকে বাঁধতে রাজি না।

“ভালো বলেছ,” বলল ওডিন। “তুমি যে ভীতু সেটা বুঝা গেছে, নেকড়ে ফেনরির। তুমি এই সিল্কের দড়িতে নিজেকে বাঁধতে ভয় পাচ্ছ। আর কোনো ব্যাখ্যার দরকার নেই।

নেকড়ের জিহ্বা তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, সে হাসল আর তার বিশাল ধারাল দাঁত দেখা গেল, একেকটা দাঁত একটা মানুষের চেয়েও বড়

“আমার বাহাদুরিতে প্রশ্ন তোলার চেয়ে, তোমরা প্রমাণ করো, তোমরা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। তোমরা আমাকে বাঁধতে পারো, যদি তোমাদের কেউ একজন আমার মুখের ভিতর তার হাত রাখে। আমি তার হাতে হালকা করে দাঁত চেপে রাখব কিন্তু কামড়াব না। যদি কোনো বিশ্বাসঘাতকতা না হয়, যখন আমাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে, আমি আমার মুখ খুলে দেব আর তার হাতের কোনো ক্ষতি হবে না, আমি শপথ করছি। আমার মুখের ভিতর কারো হাত থাকলে আমি এই দড়িতে নিজেকে বাঁধতে দিতে পারি। কে আমার মুখের ভিতরে হাত রাখবে?”

দেবতারা একে অন্যের দিকে তাকাল। বান্ডার থরের দিকে তাকাল, হাইমডেল ওডিনের দিকে তাকাল, হোনির ফ্রের দিকে তাকাল, কিন্তু কেউই এগিয়ে এলো না। অবশেষে ওডিনের পুত্র টীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে এলো আর নিজের ডান হাত তুলল।

‘আমি তোমার মুখের ভিতর নিজের হাত রাখব, ফেনরির,” বলল টীর।

ফেনরির একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল আর টীর তার ডান হাত ফেনরিরের মুখের ভিতর রাখল, যেমনভাবে ফেনরির যখন ছোট ছিল আর সে তার সাথে খেলাধুলা করত। ফেনরির সাবধানে তার মুখ বন্ধ করল, আস্তে করে দাঁত দিয়ে টীরের কবজি পর্যন্ত চেপে রাখল আর নিজের চোখ বন্ধ করল।

দেবতারা তাকে গ্লেইপনির দিয়ে বাঁধল। একটা ঝলমলে সিল্কের জালের মতো বস্তু নেকড়েকে ঢেকে দিল, তার পাগুলো বেঁধে ফেলল।

“এখন,” বলল ওডিন। “নেকড়ে ফেনরির, দেখাও তুমি কত শক্তিশালী। দড়ি ছিঁড়ে দেখাও।”

নেকড়ে শরীর মোচড়াল আর সংগ্রাম চালাল, শরীরের সকল পেশি ব্যবহার করে দড়ি ছিঁড়তে চেষ্টা করল। কিন্তু নেকড়ে যতই চেষ্টা করল, সিল্কের সরু দড়িগুলো তার শরীরে আরো আঁটো হয়ে চেপে বসল।

দেবতারা প্রথমে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, তারপর তারা মৃদু হাস্য করল। অবশেষে যখন তারা নিশ্চিত হলো নেকড়েটা একেবারে স্থির হয়ে গেছে, আর তাদের কোনো ভয় নেই, তার অট্টহাস্য শুরু করল।

শুধুমাত্র টীর চুপ হয়েছিল। সে মোটেই হাসল না। সে তার কবজির ওপর ফেনরিরের ধারাল দাঁত অনুভব করতে পারছিল, আর তার আঙুল আর তালুতে নেকড়ের উষ্ণ আর ভেজা জিহ্বা অনুভব করছিল।

ফেনরির নড়াচড়া বন্ধ করে দিল। চুপচাপ শুয়ে থাকল। যদি দেবতারা তাকে মুক্ত করতে চায়, এখনই তা করবে।

কিন্তু দেবতারা আরো উচ্চস্বরে অট্টহাস্য করতে লাগল। থরের গুরুগম্ভীর হাসি, বজ্রপাতের শব্দের মতো গিয়ে মিশছিল ওডিনের শুষ্ক হাসির সাথে, বান্ডারের ঘণ্টার মতো হাসির সাথে…

ফেনরির টীরের দিকে তাকাল। টীর তার দিকে তাকাল, নিজের চোখ বন্ধ করল আর মাথা ঝাঁকাল।

“তুমি আমার হাতে কামড় বসাতে পারো,” ফিসফিস করে বলল টীর।

ফেনরির টীরের কবজিতে কামড় বসাল।

টীর কোনো শব্দ করল না। সে শুধু তার বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের কাটা কবজিটা চেপে ধরে রাখল যাতে রক্ত পড়া কম হয়।

ফেনরির দেখল দেবতারা গ্রেইপনিরের একটা মাথা একটা পাহাড়ের মতো বড় পাথরের ভিতর দিয়ে সুতার মতো গলিয়ে নিল আর পাথরটা মাটিতে গেড়ে দিল। তারপর সে দেখল দেবতারা আরো বড় পাহাড়ের মতো একটা পাথর দিয়ে আগের পাঠরটাকে মাটির অনেক গভীরে, মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীরে পুঁতে দিল।

“বিশ্বাসঘাতক ওডিন,” চিৎকার করল নেকড়ে। “যদি তুমি আমার সাথে মিথ্যা না বলতে, আমি দেবতাদের বন্ধু হয়ে থাকতাম। তোমার ভয় তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। দেবতাদের পিতা, আমি তোমাকে হত্যা করব। আমি অনন্তকাল অপেক্ষা করব, সৃষ্টির বিনাশের সময় পর্যন্ত, আমি চন্দ্ৰকে খেয়ে ফেলব আর সূর্যকেও খাব। কিন্তু তোমাকে হত্যা করেই আমি সবচেয়ে আনন্দ পাব।”

দেবতারা সাবধান ছিল যাতে ফেনরির কাউকে কামড়াতে না পারে। কিন্তু যখন তারা পাথরটা মাটির আরো গভীরে পুঁতে দিচ্ছিল, ফেনরির তাদের কামড়ানোর জন্য হা করল। কাছে থাকা এক দেবতা তার তলোয়ার ফেনরিরের নিচের চোয়ালে গেঁথে দিল, আর তলোয়ারের হাতল তার উপরের চোয়ালে আটকে গেল। ফলে তার মুখ আর বন্ধ করতে পারল না।

নেকড়ে গর্জন করতে থাকল আর তার মুখ থেকে লালা বেরুতে লাগল, লালা বেরিয়ে এক বিশাল নদী আকারে বইতে লাগল। যদি তুমি না জানো যে, এটা একটা নেকড়ে, তোমার মনে হবে, এটা একটা ছোট পাহাড়, পাহাড়ি গুহা থেকে নদী প্রবাহিত হচ্ছে।

যেখানে নেকড়ের লালা নদীর মতো প্রবাহিত হয়ে কৃষ্ণ হ্রদে পড়ছে, দেবতারা সেই স্থান ত্যাগ করে ফিরে চলল। তারা কোনো কথা বলছিল না। কিন্তু যখন তারা স্থানটি থেকে অনেক দূরে চলে এলো, আরেক চোট হেসে নিল, একে অন্যকে বাহবা দিল আর সন্তুষ্টির চওড়া হাসি হাসল আর ভাবল তারা একটা ভালো বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।

টীর মোটেই হাসল না। সে একটা কাপড় দিয়ে শক্ত করে তার কাটা কবজিটা বেঁধে নিল আর দেবতাদের সাথে হেঁটে এসগার্ডে ফিরে গেল।

এই ছিল লোকির সন্তানদের গল্প।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *