লাবিয়ার মাকড়ি – ১

লাবিয়ার মাকড়ি – নিরুপন্যাস – মলয় রায়চৌধুরী

          চিনেবাদামের খোসার রঙের দশতলা আদালত-বাড়িটা  ঘন পাইন জঙ্গলের ভেতরে, যেখানে আসতে হলে সোঁদা গন্ধের সুড়ঙ্গ বেয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়, হাজার হাজার লোক দুশো ছেচল্লিশ বছর যাবত এই পথে চলে চলে বর্ষার পরেও চোরকাঁটা গজাতে দেয় না, জঙ্গলের ভেতরে বলে পেশকার-মুহুরি আর উকিল-মক্কেলরা ক্লান্ত হয়ে গেলে,  শুকনো পাতার ওপর বসে কিংবা শুয়ে জিরিয়ে নেয়, ঝোপঝাড়ের সবুজ আড়ালে পুরুষরা দাঁড়িয়ে আর মহিলারা উবু হয়ে হিসি করে, হাগে, তার কারণ আদালতবাড়ির প্ল্যান অনুমোদন করার সময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, পায়খানা রাখাকে আইনের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করে বাদ দিয়েছিলেন ।

        জঙ্গলের ভেতরে অনেকে দল বেঁধে এলে টিফিন বাক্স খুলে মান্দ্রাজি  চাদর পেতে বাজরার রুটি আর বাকরখানি খিচুড়ির পিকনিকও করে নেয় । যে আসামীরা জেল হাজত থেকে আসে, তারা একের পেছনে আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে যায়, পালাবার উপায় নেই, কেননা সবার কোমর দড়ি দিয়ে বাঁধা, হাতে হাতকড়া, সামনে একজন পুলিশের হাতে দড়ির এক দিক, পেছনের পুলিশের হাতে আরেক, পাহারা দেবার বন্দুকধারীরা পাশে-পাশে লেফ্ট-রাইট ।

        এই আদালত বলতে যে বিচারালয় বোঝায় না তা জজ সাহেব নিজেই এজলাসে বসার সময় প্রতিদিন ব্যাখ্যা করে দিতেন । তিনি এও বুঝিয়ে দিতেন যে জেল বলতে কারাগার বোঝায় না । উনি বলেছিলেন, এগুলো সিস্টেমের অংশ, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা প্রকাশের আধার, ব্যাস, মেনে নিতে হয়, মেনে নিতে হবে, জয়ো হে ।

        আদালতে যাবার পথে কোমরে-কোমরে দড়ি-বাঁধা, হাতে হাতকড়া, তরুণ তরুণী যুবক যুবতী প্রৌঢ় প্রৌঢ়া বুড়ো বুড়ি সব রকমের মদ্দামাগি আসামীরা সার দিয়ে ট্যাগোর-রক সুরে বাঁধা এই গানটা গাইতে গাইতে যায়, গানটা অনেকটা অ্যাসিড রকের মতন :

         “হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে–
         যেমন বন্ধ খাঁচার পাখি মনের আনন্দে রে ।
         ঘন পাঁকের ধারা যেমন বাঁধন-হারা,
         ডিজেল বাতাস যেমন আকাশ লুটে ফেরে ।
         হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে দে রে —
         দলদাসের নাচন যেমন সকল রাস্তা ঘেরে,
         বংশ যেমন বেগে ঢোকে পিছন ফেড়ে,
         অট্টহাস্যে সকল পাড়ার শান্তির বুক চেরে ।
         হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে…..”।

         যখন আমি জামিনে ছাড়া পাইনি তখন আমিও অমনভাবে সকলের সঙ্গে সারি দিয়ে গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যেতুম । পাহারাদাররা সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পোঁদে লাথি মারতে-মারতে যেতো, ডানদিকের পাহারাদার বাঁ পা দিয়ে আর বাঁ দিকের পাহারাদার ডান পা দিয়ে ।

         লাথি খেতে-খেতে আমাদের গাইতে আরও ভালো লাগত, উৎসাহ পেতুম , তার কারণ এই অনুন্দ্যসুন্দর দেশে লাৎখোররাই সবচেয়ে বেশি আনন্দে থাকে, তাদের ভবিষ্যত স্হিতিস্হাপক হয়ে ওঠে ।

         আমার মতন যারা জামিনে ছাড়া পেয়ে কেস লড়ছে, তারা বাসা থেকে বা হোটেল থেকে বা জ্ঞাতির বাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে পোঁছোয়, উকিল মুহুরি মোক্তার জজ কেরানিদের সঙ্গে পাশাপাশি ।

         কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদাররা আদালত চত্বরেই বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে, তাদের ভুঁড়ি-ফোলা বাচ্চারা কেমন করে স্কুলে বা কলেজে পড়তে যায় জানি না । কে জানে, হয়তো বড়ো হয়ে তারাও কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদারি বা মুহুরিগিরি করবে বলে স্কুলে যাওয়া দরকার মনে করে না।

         জংলি ঝোপঝাড়ের বদান্যতা, আর ফেলে ছড়ানো ঢ্যাঙা গাছে, সব্জেটে অন্ধকারে জঙ্গলটা ঠাণ্ডা হলেও, গথিক ঢঙের আদালতবাড়িটা বেশ গরম, শীতকালেও বিশেষ হেরফের হয় না । প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভেবেছিল শহর থেকে দূরে জঙ্গলের ভেতরে হলে শহরের ভোঁচকানি তিকড়মবাজি আদালতে এসে পৌঁছোবে না । কিন্তু সে ভাবনার পোঁদে হুড়কো দিয়ে শহর ঠিক পৌঁছে গেছে তার নচ্ছারমো নিয়ে । মাকড়সাদের না মেরে শুধু তাদের জাল আর ঝুল ঝাড়ার ঠিকে দেয়া হয় এক নম্বর পিন্ডিকেটকে ; আরশোলাদের না মেরে কেবল মশা তাড়াবার ঠিকে দেয়া হয় দুই নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পানের পিক বাঁচিয়ে চুনকাম করার ঠিকে দেয়া হয় তিন নম্বর পিন্ডিকেটকে ; ছারপোকাদের বাঁচিয়ে আসবাব পালিশের ঠিকে দেয়া হয় চার নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ কতোগুলো যে পিণ্ডিকেট আছে তার ঠিকঠিকানা নেই ।

         প্রতিষ্ঠান আদমসুমারি করে দেখেছে যে যারা আদালতবাড়িতে আসে তাদের শতকরা নিরানব্বুই জন দুঃস্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে ; আর, কে না জানে, পিণ্ডিকেটের সাহায্য  না পেলে দুঃস্বপ্ন গড়া সম্ভব নয়।

         প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কড়া মাদক আর নেই ; অভ্যাস, লোভ আর নেশায় আকাশের দিকে পোঁদ করে সাষ্টাঙ্গ হয়ে যায় অমন নেশাখোররা। ডারউইন নামে একজন সাহেব নাকি ওনার ‘অরিজিন অফ টার্নকোটস’ গ্রন্হে লিখে গেছেন যে অমন নেশায় বাঁদরদের লাল পোঁদও রাতারাতি হলুদ নীল সবুজ কমলা বেগুনী হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে ।

         আদালতের নয়তলায় নয় নম্বর এজলাসের গুমোট গরম, বেঞ্চে ছারপোকার চামড়া-চাটা হুল, দেয়ালে বারোয়ারি পিকের থুতুর সাতবাস্টে দরানি, বদবুদার ঘামের চটচটে হলকায়, যখন আমার মামলা চলছিল, সপ্তাহে পনেরো মিনেটে মুখে-তাম্বাকু উকিল দাঁড়িয়ে কিছু বললে, আবার পরের সপ্তাহে দশ মিনিট  কুঁজোকেল্টে কেউ গলাখাঁকারি-সাক্ষ্য দিলে, ঢিকিয়ে-ঢিকিয়ে এই ভাবে চলছিল, ক্ষয়াটে সিঁড়ি পাকিয়ে একবার ওপরে, আবার হুড়হুড়ে ভিড়ের ঠেলায়, পাক খুলে নিচের তলায়, তখন আরও অনেক বিচারাধীনের মামলার মারপ্যাঁচ শুনতুম আর ভাব করার চেষ্টা করতুম, বিশেষ করে যারা খুন করে জামিনে রয়েছে, তাদের সঙ্গে ; কেউ পাত্তা দিত না, কেননা আমার মোটর সাইকেল চুরির মামলাটা ওদের ওজনদাঁড়িতে ছিল খবরের কাগজ কিনিয়েদের ওজনমারার মতন ছিঁচকান্তি।

         তবু বিশেষ একজনের মামলার ডেট পড়লে, পেছন থেকে যার অন্যমনস্ক হাঁটা দেখলে ঘুষঘুষে জ্বর এসে যায়,  আমি তার শুনানিতে পৌঁছে কান পাততুম পক্ষে-বিপক্ষে কিরকম বেলাগাম তক্কাতক্কি চলছে, এতই প্যাঁচানো ছিল তার কেস, আর সেই তক্কে খুনের দায়ে মামলাটা যে লড়ছে তার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল, প্রথমদিকে ভয়ে-ভয়ে, কেননা খুনি যখন খুনি, একটু শ্রদ্ধা তো তাকে করতেই হবে, আমি যা কোনোকালে পারব না তা সে করে ময়ুরকন্ঠী গলা উঁচিয়ে, বুক ফুলিয়ে, খোঁপার বাঁধন নামিয়ে, আদালত চত্বরে ঢেউ তুলেছে ।

         সমাজের ভেতরে-বাইরে খুনিরা সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার পাত্র বা পাত্রী, অন্য আসামীরা তার তলায় । আমি ছিলুম সবচেয়ে তলার পাদানিতে, ফেকলু মোটর সাইকেল লিফটার । উকিলকে বলেছিলুম, যে বারবার মোটর সাইকেল না বলে বাইক বলুন না, তা উনি বললেন বাইক বললে লোকে ভাববে সাইকেল ।

         সরকারি উকিল, চাকরিতে ঢোকার সময়ে যে কালোকোট ছিল তাইতেই চালিয়ে যাচ্ছে, আমার কেস উঠলেই, আমার দিকে হাড়গিলে আঙুল তুলে বলত, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটর সাইকেল রেপিস্ট, তার কারণ নতুন মোটর সাইকেল দেখলে নিজেকে আজও সামলাতে পারি না, মনে হয় লিফ্ট করে নিয়ে পালাই, আর উড়িয়ে রেপ করি, কোনোটা লাল, কোনোটা হলুদ, কোনোটা ঝকঝকে কালো, দেখলেই মাঝরাতের কুয়াশায় তুলে নিয়ে ছুটিয়ে বেড়াই দূর দূর হাইওয়ের ওপর । কিন্তু একসময়ে, রাতকয়েকে মন ভরে গেলে, কিংবা আরও চিকনতনু মোটর সাইকেল দেখতে পেলে, যেখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলুম, তার কাছাকাছি রেখে দিয়ে কেটে পড়ি ।

        জজ সাহেব আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে আসল রহস্যটা কী ।

        আমি সহজ উত্তর দিয়েছিলুম, যে, জগতসংসারের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার দমক আর যুক্তিপূর্ণ জীবনের চাহিদার টানাপোড়েনের বিকৃত ভারসাম্যের টাল সামলাবার জন্যে আমাকে নতুন-নতুন মোটর সাইকেল চুরি করে চার-পাঁচ শো কিলোমিটার চালাতেই হয়, এছাড়া এই নির্মম পৃথিবীর প্রতি অনুশোচনাহীন রোষ, আর মানুষে-মানুষে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশের উপায় জানি না ; নান্দনিক বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য ভার্জিন মোটর সাইকেল চাপতেই হয় আমাকে, নইলে নিজের ছেৎরানো আত্মপরিচয়কে সামলাতে পারা অসম্ভব হয়ে উঠবে।

        জজ জানতে চেয়েছিলেন, কোন ব্র্যাণ্ডের জাঙিয়া পরে চালান ?

        আমি যা সত্যি তাই বলেছিলুম, মি লর্ড, আমি সারা জীবনে কখনও জাঙিয়া পরিনি, এখন এই যে আদালতে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো আণ্ডারওয়্যার নেই ; মনে-রাখা-অভিজ্ঞতাকে নষ্ট করে দ্যায় আণ্ডারওয়্যার।

        জজ বলেছিলেন, এ হল নৈরাত্মসিদ্ধিরর প্রকোপ, মেশিন আপনার মগজকে মিউটিলেট করে দিয়েছে ; সে কারণেই আপনি ভার্জিন মোটর সাইকেলে চেপে গর্ববোধ করেন, মগজ অসুস্হ হলে মানুষের শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে, যতো কলঙ্ক ততো বিহ্বলতার অসুস্হতা আপনার মগজকে পেয়ে বসে ; প্রেম, মানুষ পশু বা যন্ত্র, যার সঙ্গেই হোক, তা এক আতঙ্কদায়ী অনুভব ।

        আমি বলেছিলুম, আপনি যথার্থ বলেছেন হুজুর, যে সব লোকেরা নিজেদের সঠিক জন্মদিন জানে তাদের সম্পর্কে আমার ঘেন্না হয়, মোটর সাইকেল তো কবে জন্মায় কেউই জানতে পারে না, অথচ দেখুন হুজুর, তার জন্মদিনের নথি তৈরি হয় বিক্রির দিন ।

        জজ বলেছিলেন, হুম । সমাজকে বাধ্য হয়ে আপনার মতন নিহিলিস্ট, অ্যানার্কিস্ট আর দিবাস্বপ্নদ্রষ্টাদের প্রশ্রয় দিতে হবে, নয়তো এই সমাজের অবসান থামানো যাবে না  । তারপর জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন, নারীদের অপছন্দ করেন কেন?

        যা সত্যি তাই বলেছিলুম আমি, পোশাক খুললেই ম্যানেক্যুইন বেরিয়ে পড়ার ভয়ে, মি লর্ড ; আর তাছাড়া, স্ত্রীলোকদের গোপনাঙ্গকে বড়ো গ্রটেস্ক স্থাপত্যের ব্যাপার মনে হয় । শোবার ঘরের চারটে দেয়ালে যদি আয়না লাগানো থাকে তাহলে প্রেমকর্মকে কি হাস্যকর মনে হবে না ? বলুন আপনি !

        বুড়ো জজ, কাঁচাপাকা না-আঁচড়ানো চুল, নাকে ঝোলানো চশমা, আমাকে, যেহেতু একশো বছর পর কুড়ি টাকার নোট লুপ্ত হয়ে যাবে, কুড়ি টাকা জরিমানা করেছিলেন, আর সাবধান করে দিয়েছিলেন যাতে ভবিষ্যতে এরকম কাজ প্রমাণসাপেক্ষে না করি, উপদেশ দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর হলেও, আমি যদি ইংরেজিতেও স্নাতকোত্তরটা করে নিই, তাহলে বুকার প্রাইজের যোগ্য ‘বাইসাইকেল রেপিস্টস সিকরেট লাইফ’ নামে একখানা বেস্ট সেলার লিখতে পারব ; জজসাহেবও জানেন যে বাংলার বেস্ট সেলার লিস্টটা চারশো বিশ, সে কথা উনি ওনার রায়ে লিখেছেনও ।   

         পুলিশের যে দুজন সাক্ষ্য দিয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে, তারা কখন যে শোরুমের পাশের দেয়ালে  যখন দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করছিলুম, সে সময়ে, আড়চোখে মোটর সাইকেল দেখতে থাকা আমার ফোটো তুলে নিয়েছিল, ক্লিক শব্দ শুনেও,  জানতেও পারিনি । সাক্ষ্য দেবার সময়ে তারা বলেছিল, আমি নাকি জেলহাজতে কুন্দনলাল সাইগল গাইতুম ।

         রায় দেবার পরে জজসাহেব জানতে চেয়েছিলেন, ভোট দিই কিনা ।

         আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম, যে স্যার, ভোট ব্যাপারটা তো বুমেরাং, তাই ভয়ে দিই না, মানবতার মতন চালাকি আর নেই ।

           নাকের একটা চুল উপড়ে জজ সাহেব বলেছিলেন, ভালো নির্ণয়, আমিও তাই মনে করি । আদর্শের ভেতরে যতো তাড়াতাড়ি ম্যাগট জন্মায় ততো তাড়াতাড়ি ডাস্টবিনের পচা কুকুরের শবেও জন্মায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষ তত্ব ফাঁদে কোনো-না-কোনো পরাজয় বা অসফলতাকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ।

         আমি বলেছিলুম, জি হুজুর, কম বয়সে যা লাল সেলাম ছিল তা বুড়ো বয়সে ফোকলা দাঁতে ঘোলাটে চোখে অ্যাঁড় খেলাম হয়ে গেছে।

          জজ জিগ্যেস করেছিলেন, বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ।

         বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, কিন্তু মোটর সাইকেলে নয়, হাওয়াই জাহাজে করে ।

         বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে ? কানে কড়ে আঙুল ঢুকিয়ে আরামের পরশ দিতে-দিতে জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন ।

         যা সত্যি আমি তা-ই বলেছিলুম, দিশি পায়খানায় বসে জলে ছোঁচাবার অভ্যাস থাকায়, বিদেশে গিয়ে টয়লেট পেপার ব্যবহারের দরুণ, টাইমস স্কোয়ারে রঙ-করা মাই-খোলা মেমদের সঙ্গে ফোটো তোলাবার সময়েও হাসি মুখ করতে পারতুম না, সব সময় মনে হতো পোঁদে গু লেগে আছে ।

         জজ সাহেব বলেছিলেন যে উনি  ব্যারিস্টারের পরিবারের বলে ছোটোবেলা থেকে কমোডে বসে টয়লেট পেপার প্রয়োগ করে হেগে চলেছেন, এমনকি প্রতিদিন রায় দেবার সময়েও উনি নিজের পশ্চাদ্দেশ সম্পর্কে চিন্তা করেন না ; তবে এর পর টাইমস স্কোয়ারে গেলে রঙ-করা উন্মুক্ত-স্তন মেমদের সঙ্গে অবশ্যই ফোটো তোলাবেন ।

         আসলে যে টিভিতে জাপানি তেল, বুলেট তেল আর হনুমানের মালা বিক্রি করে তারাই মোটর সাইকেল ধর্ষক লিখে লিখে আমার কেসটাকে গুবলেট করে দিয়েছিল, ওদের কাগজেই রসিয়ে রসিয়ে লিখত, পাবলিক পড়ে নিজেদের টাকে হাত বুলিয়ে ভাবত, এ শালা মোটর সাইকেলকে কেমন করে রেপ করে, নাকি ছুটন্ত মোটর সাইকেলের ওপর কোনো মেয়েমানুষকে চিৎ করে শুইয়ে রেপ করতে করতে গাড়ি ওড়ায় । ওদের সাংবাদিক আমায় জিগ্যেস করেছিল যে মেয়েদের দিকে তাকালে আমার যৌনতার উদ্রেক হয়, নাকি মোটর সাইকেলের দিকে তাকালে ।

         আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম ওনাদের যে, ধোয়া সত্য, লালচে তুলসী পাতায়, নতুন ঝকঝকে মোটর সাইকেল দেখলে আমার লিঙ্গোথ্থান হয়, কিন্তু কোনো যুবতী আমাকে জড়িয়ে চুমুখেলেও আমার দেহে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না ; মনে হয় পাঁঠার মাংসের কার্টিলেজ চুষছি, আমি মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সিটি বাজাইনি কখনও, শোরুমের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন মোটর সাইকেলের দিকে ঠায় তাকিয়ে হুইসল দিয়ে গান করি ।

         জজসাহেব, কানের ঝুলঝুলে লতিতে পাকাচুল, ভুরুতে পাকাচুল, ঝাবড়া গোঁফের চুলও পেকে ঝুলে পড়েছে, আমার মামলার যে আদেশপত্র লিখেছেন, লিখতেও মাস দুয়েক সময় নিয়েছিলেন, তার সঙ্গে আমার মামলার যে কী সম্পর্ক বুঝতে পারিনি বলে আমার রাশভারি উকিল চটে গিয়েছিলেন । উনি বলেছিলেন, মহাশয়, আপনি যদি কাউকে বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা আপনার চরিত্রদোষ ।

         জজ সাহেব লিখেছেন, “মোটর সাইকেল বহু ভাষায় স্ত্রীলিঙ্গ, আসামী মোটর সাইকেল চুরি করেননি, তার কারণ ধারা তেইশের বারো বি অনুযায়ী, কোনো মহিলাকে চুরি করা যায় না, কিডন্যাপ করা যায়, আসামী কাউকে কিডন্যাপ করেননি, কোনো ক্ষতি করেননি, যেমন চুরি করেছেন তেমনই বিনা আঁচড়ে ফেরত দিয়েছেন, যদিও চুরি করা মহাপাপ নয়, কিঞ্চিদধিক পূণ্য-মিশ্রিত পাপ, তাই মোটর সাইকেলে চাপা পাপ নয়, আদি মানব সমাজে পাপ নামে কিছুই ছিল না, থাকার কারণ নেই, তখন মোটর সাইকেল ছিল না, আদি মানবীদের আমরা মহিলা বলি না, মহিলা বা তরুণী বললে, কিডন্যাপের প্রশ্ন উঠবে, তখনকার দিনে মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্হা ছিল, পুরুষদের সিডিউস করার প্রথা ছিল, মোটর সাইকেলকে সিডিউস করা সম্ভব নয়, যদিও বহু মোটর সাইকেলের বিজ্ঞাপনে প্রায় ল্যাংটো মেয়েমানুষের শরীর ব্যবহার করা হয়ে থাকে ; ধারা একচল্লিশের উপধারা তিন অনুযায়ী বিজ্ঞাপনে নগ্ন নারীর ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু আসামীকে নগ্ন নারী বিজ্ঞাপনে ব্যবহারের জন্য দায়ি করা চলে না, আসামী জাঙিয়া পরে মোটর সাইকেলে চাপেন না, সমাজের উন্নতির জন্য প্রত্যেক নারী-পুরুষের উচিত জাঙিয়া না পরা । একথা ঠিক যে মোটর সাইকেলেও ছিদ্র থাকে যার ভিতরে পেটরল নামের ধাতুরস ফেললে তা উত্তেজিত হয়, এবং কেবল সেকারণেই তাকে নারীছিদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় না । নারীছিদ্রে পৌরুষের পেট্রল ফেললেই যে তা উত্তেজিত হয়ে উঠবে, তার প্রমাণ নেই । পুরুষ হলেই যে তার পৌরুষ থাকবে তা অকাট্য নয় । যাহা হউক, আসামী যেহেতু আসামী, এবং টাকার দাম বিশ্ববাজারে পড়ে যাচ্ছে, আসামীকে কেবল পড়ে যাওয়া টাকায় দণ্ডাজ্ঞা দেয়া হল । আমাদের মনে রাখতে হবে যে টাকার কোনো লিঙ্গ হয় না, তা হেটেরোসেকসুয়ালও নয় এবং হোমোসেকসুয়ালও নয় ।”[১]

         যাক, সিঁড়ির পাকে ঠ্যাঙ পাকিয়ে আর খুলে, আমার মামলাটা চুকেছে, কিন্তু আদালতে আমি চান করে চুল আঁচড়ে একগাল ভাত খেয়ে, নতুন ধুতি-শার্ট পরে, নিয়ম করে আসি, খুনি ময়ূরকন্ঠীর মামলার চাপানওতোর শুনতে ।

         খুনিকে বউ বলব না তরুণী না যুবতী না মহিলা বুঝতে পারতুম না, কেননা বুক দেখে না পাছা দেখে না কোমর দেখে না মাথার চুল দেখে কেমন করে যে ঠাহর করতে হয় তা তখন জানতাম না,কিন্তু তার সঙ্গে, পারস্পরিক ক্লান্তির কারণে ভাব হয়ে গিয়েছিল, উকিল মক্কেল ফরিয়াদি বাদি আসামীদের তেলচিটে জমঘটে যৎসামান্য পোঁদ রাখার মতন  তো আর জায়গা থাকত না, আমরা গিয়ে আদালতের গুটকা ছেটানো জংধরা আধঝোলা লোহার গেটের সামনে ইঁটের দাঁত বেরোনো আদালতভোগান্তি পাবলিকের ছিরিচরণ ঠ্যাঙানো ফুটপাতে বসে গ্যাঁজাতুম, প্রথম-প্রথম ছোঁয়া বাঁচিয়ে, ওই যে, ভাটাম গাছটার তলায়, পানের দোকানের ডান দিকে, গাছের ঝগড়ুটে কাকেদের গু ফেলার এলাকার বাইরে। মেয়েটা বেশ ঢ্যাঙা, চোখ দুটো এতই বড়ো যে সরাসরি তাকালে, খুনির চোখ যখন, তখন বিঁধবেই,  বুকের ভেতরে সেঁদিয়ে চোখ দুটো আমার সারা শরীর ছানবিন করে বেরিয়ে আসতো গলার কাছে, টের পেতুম ।

        ময়ূরকন্ঠীর কোনো মুখোশ নেই, আনন্দেরও নেই, দুঃখেরও নেই, নয়তো আদালতে যারা একতলা থেকে নয় তলা, উকিলদের ঘরে গোমড়া মুখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে, পেশকারদের আড্ডায় হাই তোলে, কোর্টপেপারের লাইনে আড়মোড়া ভাঙে, তাদের চুপসে মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, এককালে আনন্দের অসুখে ভুগেছিল, এখন দুঃখের পোঁচড়ে খানিক ঝুলে আছে, লুকিয়ে রেখেছে যে যার নুনের ছিটে ।

         ময়ূরকন্ঠীর কথা শুনে-শুনে আমি ওর মনের অশান্তির ঝড়ঝাপটা টের পাচ্ছিলুম, যা চলে গেছে আর যা চলছে, বাস্তব কিংবা ফেনানো, কোনটা আগে কোনটা পরে তা যদিও বুঝতে পারছিলুম না, তরতরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আমার সামনে ছবি এঁকে-এঁকে, কন্ঠস্বর যেন জানে সে কি ঘটিয়ে ফেলেছে, যাতে সারল্য সম্পর্কে সন্দেহ গড়ে ওঠে ।

         একদিন হঠাৎই ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, প্রেম জিনিসটা স্হূল, অশিষ্ট, রূঢ়, বর্বর, অমার্জিত ; মানুষকে ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য করে তোলে, বিচারবুদ্ধিহীন ফানুসে পালটে দ্যায় ; কাউকে যতো বেশি ভালোবাসবে তার প্রতি ততো রূঢ়, বর্বর, অশিষ্ট, অমার্জিত, হতে হবে তোমায় ; তুমি যখন কারোকে ফাকিং করবে তখন তোমায় নিজের যন্ত্রণাবোধকে, যার সঙ্গে সঙ্গম করছ তার যন্ত্রণাবোধের সঙ্গে মিশিয়ে অনুভব করতে হবে । একজনের সঙ্গে যদি প্রতিদিন সঙ্গম করো তাহলে প্রেম লোপাট হয়ে যাবে ; মগজ তো হিসাব রাখে, ক্যালেণ্ডারে টিক দ্যায় । একথাও মনে রাখতে হবে যে প্রেমে লাৎ না খেলে প্রেম সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি হয় না, কেননা প্রেমের নিষ্ঠুর নোংরা বুনো ধ্বংসাত্মক নিহিলিজমের আরাম উপভোগ করার পরেই প্রেম সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে ।

       জবাবে আমি বলেছিলুম, আমি তো নতুন মোটর সাইকেল ছাড়া আর কারোর সঙ্গে কখনও প্রেম করিনি, তাই হয়তো ঝাড়পোঁছ করে ফেরত রেখে এসেছি ; একে আরেকজনকে পণ্ড করিনি, প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতন । 

        আমার মামলার ডেট না থাকলেও ওর যদি ডেট থাকতো, পৌঁছে যেতুম ওর এজলাসে, হাত তুলে অপেক্ষা করার ইশারা করলেও, আর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওর মামলার প্যাঁচগুলো শুনতে থাকলেও, বুঝতে পারতুম না যে কেন ও খুন করেছে, নাকি করিয়েছে, বেশ কয়েকজনকে, আর কোনো সাক্ষী নেই যে বলবে  খুনের জন্যে ময়ূরকন্ঠীই দায়ি । পুলিশ যে দুটো লোককে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলেছিল তারা ঘাবড়ে গিয়ে বেমালুম বলে দিয়েছে যে মেয়েটাকে তারা চেনে না, দেখেনি কখনও। ভালো দেখতে এরকম একজন যুবতী কী করে আর কেন যে খুনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল হদিশ পেতুম না । সত্যিই খুন করেছে, নাকি নিজের সম্পর্কে গল্প বানিয়ে আসামীত্বের আনন্দ নিচ্ছে, তা্‌ও সন্দেহ হতো আমার ।

       আমি ওকে ওর নাম জিগ্যেস করেছিলুম, বলতে চায়নি, আদালতে পেশকার কেস নম্বরের লোক হাজির কিনা চেঁচায়, যেমন আমার মামলায়, আমার নাম উঠতোই না কখনও, পেশকার কেস নম্বর হাঁকতো। যখন আমরা ফুটপাথে বসা আরম্ভ করলুম, ছোঁয়াছুঁয়ির দূরত্ব কমে এলো, মেয়েটি বললে, ঠিক আছে, আমি তোমাকে ৬১৪ বলে ডাকবো আর তুমি আমাকে ৩৯০ বলে ডেকো, যেমনটা আমাদের কেস নম্বর । প্রস্তাবে সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম মনে আছে, আমার দরকচা বয়সে নম্বরদার খুনি বন্ধুনী পাওয়া চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য, তাও এরকম চুলবুলে তরতাজা স্তন ফোলানো, খোঁপা নামানো, পিঠে বাংলা আঁচল-ফেলা মেয়ে, কোনো কোনো দিন ডেনিম জিনসে, পায়ে রঙিন কেডস, হাতে প্লাসটিকের বালা । খুনি মেয়ের স্টাইল স্টেটমেন্ট বেশ ভালো লাগত, দিল খুশ করে দিত ।

       একদিন আমি বলেই ফেললুম, যেদিন ও লাল ফুলের চুড়িদার পরে এসেছিল, তোমার মামলার কিছুই তো বুঝতে পারলুম না, তোমার বিরুদ্ধে শুনছি প্রমাণ নেই, তবু তোমায় গ্রেপ্তার করা হল, পুলিশ হাজতে ছিলে, তারপর জেল হাজতে ছিলে কতো দিন, আর এখন দু বছর যাবত মামলা চলছে । হেসে বলেছিল, যেন স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে অশ্লীল জোকস শেয়ার করছে, সব জানতে পারবে একদিন, আমি এটা নিয়ে একটা লেখা জড়ো করেছি, কয়েকজনের লেখা,  সেই কাগজগুলো তোমায় দিয়ে যাবো, তুমি সাজিয়ে নিও ।

       যেদিন ওর দশ বছরের জেল হয়ে গেল, সেদিন আমাকে একটা প্লাসটিকের ব্যাগ আর সোনার গয়নার ডিবে দিয়ে বললে, এতে আছে কাগজগুলো, আর সোনার ডিবেতে আছে মুক্তোর মাকড়ি । ডিবে খুলে দেখলুম তিনটে মাকড়ি । আমার কোঁচকানো ভুরুর দিকে তাকিয়ে ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, তিনটে মাকড়ি কেন জানতে চাইছ তো, লেখা আছে, তিনটেই করিয়ে ছিলাম অর্ডার দিয়ে ।

        জজ সাহেব ময়ূরকন্ঠীর রায়ে যা লিখেছেন, তাও যে বড়ো একটা বুঝতে পেরেছি, তার দাবি করব না।

       দণ্ডাদেশ দেবার সময়ে অপারেটিভ প্যারায় উনি লিখেছেন, “যাকে বা যাদের খুন আপনি করেছেন, সে বা তারা তখনই আপনার ভেতরে ঢুকে পড়েছে, আর সারাজীবন থাকবে, সাজা শেষ হবার পরও থাকবে, আপনি তাকে বা তাদের নিজের ভেতরে বইতে-বইতে অনাথ হয়ে যাবেন । এটা ঠিক যে বাজে লোকেদের সঙ্গে মিশলে জ্ঞান বাড়ে, আপনাকে সেই সমস্ত মানুষই ঘিরে থেকেছে শৈশব থেকে । ইস্কুল মাস্টার টাইপের ভালোমানুষরা বড্ডো পানসে, অভিজ্ঞতাহীন, তা আপনি জানেন । শুধু টাকা রোজগার করে কেউ সারভাইভ করে না, তাই খুন চুরি ডাকাতি রাহাজানি লুটপাট গুণ্ডামি মারপিট ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের মিথ্যা জোচ্চুরি ছলনা প্রতারণা  অসাধুতা ভণ্ডামিকে প্রতিরোধের পথ হিসাবে এই সমস্ত কাজ জরুরি হয়ে ওঠে, নইলে তো সারা জীবন বমি করতে করতে কেটে যাবে ; আপনার তো বটেই, সকল অপরাধীরই, বোধ ব্যাপারটা আংশিক, গানের সুরের মতন তা কোনো একটি লাইন ধরে এগোয় না । হত্যা করা মোটেই হিংস্রতার প্রকাশ নয় । আপনি জানতেন যে যা করবেন মন দিয়ে করবেন, ফলাফলের জন্য ভাবতে গেলে সব গুবলেট হয়ে যাবে, কেঁচে যাবে । একথা সত্য যে, সব সুড়ঙ্গের শেষে আলো থাকলেও সে আলো সকলের ভাগ্যে জোটে না ; লক্ষ শুক্রাণুর মধ্যে একটিই কেবল ডিম্বাণুর আলো পায় । একথাও সত্য যে এক-এক সময়ে বেঁচে থাকা অসহ্য হয়ে ওঠে, আর কিছুকাল পর তা ভালো লাগতে আরম্ভ করে, অসহ্যের নেশা হয়ে যায় । আপনার বিরুদ্ধে খুনের প্রমাণ অকাট্য নয়, আনুষঙ্গিক,  এবং আপনি একজন আসামী । আসামী মাত্রেই সাজার পাত্র । অপরাধী-সমাজে খুন যেহেতু সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় বলে পরিগণিত, তাই ধারা একশো সাঁইত্রিশের উপধারা সাত অনুযায়ী আমি আপনাকে শ্রমবর্জিত কারাদণ্ড দিচ্ছি । দণ্ডভোগের জন্য আপনি বেনারসি কটকি মুর্শিদাবাদি বালুচরি যেমন শাড়ি ইচ্ছা পরতে পারেন, আরামকেদারায় বসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখতে পারেন ।”[২]

        পাঁচজন আসামীকে জজ সাহেব ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন, মনে আছে, তারা সবাই দলীয় পতাকাকে লুঙ্গির মতন করে পরে একজন পোয়াতি বউকে ধর্ষণ করে খুন করেছিল । জজ সাহেব রায়ে লিখেছিলেন, “মানুষ একদিন মরে যাবে বলেই বেঁচে থাকে, এবং মরে যাবার পর চিতায় ওঠাই ভালো, কেননা তাহলে কাউকে আপনাদের পঁচাশি কুইন্টালের স্মৃতি বইতে হবে না । ফাঁসির মঞ্চে আপনাদের মুখে লিউকোপআস্ট লাগিয়ে দুপুর বারোটায় আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হবে, তার কারণ হল আপনারা ধর্ষণ ও হত্যাকে জীবনের উদ্দেশ্য করে তুলেছেন, অন্তত উদ্দেশ্য তো ছিল আপনাদের । ফাঁসির হুকুম দিয়ে কলমের নিব ভাঙা নিয়ম, কিন্তু আমি বল-পেন ব্যবহার করি।”[৩]

        সেন্ট্রাল জেলের জেলার সরসিজ বসু, বেশ  ঢ্যাঙা ভদ্দরলোক, হাসির গমকে কয়েদিরা কুঁকড়ে যায়,  কড়িকাঠ থেকে আরশোলা-টিকটিকি খসে পড়ে, আমি যখন জেল হাজতে চোদ্দদিন পচছি, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটরসাইকেল রেপিস্টের পুলিশি প্রতিবেদন পড়ে, আর টিভিতে গরমাগরম কানার-বচন শুনে,  বলেছিলেন, বোঝা-যায়-না এরকম একখানা গম্ভীর স্বকপোলসত্য কাহিনি জেলের সুভেনিরের জন্যে তৈরি করে দিতে, যা লোকে পড়ে বুঝতে পারবে না, ভাববে বাংলায় বিদেশি ভাষা পড়ছি, অথচ ঘাড় কাৎ করে বাহবা দেবে । ঠিকই, বাংলায় লিখে অমনটা করতে পারব, ইংরেজিতে লিখলে যতোই প্যাঁচালো হোক, যারা পড়ে তারা উজবুক হলেও বুঝে ফ্যালে।

       আমি ওনাকে বলেছিলুম, স্যার আমি লিখনদার কিংবা বেচনদার কিছুই হতে চাই না, চাইনি, হবো আবার কি, যা আছি, তা-ই আছি, এই প্যান্ট-জামায়, ব্যাস, লিখে হবেই বা কি ! আপনি হয়তো বলবেন, লেখালিখি অনেক ভালো কাজ, কিন্তু স্যার ভালো কাজ মানেই তো পারভারশান, প্রেম করার মতন আঠালো, ঠাণ্ডা মাথায় আরেকজনের আত্মপরিচয়কে মুছে নস্যাৎ করে তার কল্পনাকে জবরদখল করা ছাড়া প্রেম আর কি হতে পারে বলুন ?  লেখালিখিও তাই নয় কি !

        জেলার সরসিজ বসু বললেন, আপনি না চাইলেই বা, হেরে যাবে জেনেও মানুষ একে আরেকজনকে ভুল বুঝিয়ে ঝগড়ার মাধ্যমে কি সম্পর্ক তৈরি করে না ? তবে ! আপনার কতো লোকের সঙ্গে বুনো মাকড়সার জালের মতন অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠবে, দেখবেন । মনে রাখবেন যে যুদ্ধ হল চরম আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ; লেখালিখিও যুদ্ধ । আর প্রকৃত প্রেম বলে কিছুই হয় না, সবই মানবদেহের রসায়ন । আমরা তো কতো লোককে ঘৃণা করি, আবার তাদেরই যারা ঘৃণা করে, এমন লোকের সঙ্গে দেখা হলে গর্বে হাসাহাসি করে ফুলে উঠি, নয়কি ! আসলে ঘৃণা করাটা হল এক ধরণের সহিষ্ণুতা । যাক, আপনি লিখুন, এখনও তরতাজা যুবক, নয়তো যতো বয়স বাড়বে, ততো বেশি অবাঞ্ছিত লোকেদের পাবেন আপনার চারিপাশে, আসল শত্রুদের চেয়ে কাল্পনিক শত্রুদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে । এখন আমার কাজ আছে, কয়েদিরা স্বমেহন করে-করে জেলের নর্দমা জ্যাম করে দিয়েছে, ইলিশের ডিম উপচে পড়ছে নর্দমাগুলো থেকে ।

         কিন্তু স্যার, আমি তো কখনও লেখালিখি করিনি, বলেছিলুম জেলার সাহেবকে ।

         উনি বললেন উনি যখন চাকরিতে সবে ঢুকেছিলেন, পায়ে পালিশ-করা বুটজুতো, টানটান উর্দি, তখন জানতেনই না আসামীদের টর্চার করার কাজটা কীভাবে আরম্ভ করতে হয়, প্রথমবার একজন আসামীকে টর্চার করে মুখ খোলাতে গিয়ে কেমন গলদঘর্ম হয়েছিলেন, আসামীটা নিজেই হাসাহাসি টিটকিরি ইয়ার্কি করছিল ; তারপর ধাপে ধাপে সব শিখে নিয়েছেন, সব রকমের টর্চার । টর্চার করে করে মন ভরে গেছে বলে প্রতিষ্ঠানে কাঠখড় পুড়িয়ে জেলার হয়েছেন । টর্চার ব্যাপারটা অনেকটা সঙ্গম করার মতন, মিশনারি আঙ্গিক থেকে এগোতে এগোতে চুরাশি আঙ্গিকের চেয়েও বেশি আঙ্গিক দখলে চলে আসে, নতুন নতুন আবিষ্কার, এই আরকি । টর্চার করা যেমন কেউ শিখিয়ে দেয় না, তেমনই সঙ্গম করা । ইউ জাস্ট ডু ইট অ্যাণ্ড এনজয় দি ফার্স্ট ব্লাড ।

      জেলার সাহেবের আদেশ মেনে নিয়েছি । তবে আমি ওনাকে বলেছি যে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গম্ভীর-গদ্য থেকে মশলা টানবো না স্যার, তাতে লোকে আমাকে মুকখু মনে করবে, আমি তাই বিটকেল নামের বিদেশীদের গিঁট দেয়া ড্যাংগুলিই খেলবো, তাহলে লোকে আমাকে অন্তত বিদ্বান তো মনে করবে ।

Double space

       আজকে দুপুরবেলা আকাশ কালো করে যখন বৃষ্টি হবো-হবো করেও হল না, অনেক খুঁজে ময়ূরকন্ঠীর দেয়া কাগজগুলো বের করে সাজিয়েছি, দেখি খুনের কারণ জানতে পারি কিনা, ঢুকে যেতে পারি কিনা ওর ভেন্ট্রিল্যাকুইস্ট বিবেকে, জানতে পারি কিনা ওর অসুখ আর কর্তৃত্বের ইতিহাস, যা ময়ূরকন্ঠীকে আত্মধ্বংসের মোহনায় ভাসিয়ে দিয়েছে, নিজের ভেতর যে তাঁবু ফেলেছে তার রহস্য কি । হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে ওর তাঁবুর লন্ঠনালোকে আনন্দালোকে ।

        ময়ূরকন্ঠী যখন জেল থেকে সেজেগুজে বেরোবে তখন তো আমি কোথায় কোন মোটর সাইকেল উড়িয়ে নিয়ে চলেছি তার ঠিকঠিকানা নেই, তাই জেলার সরসিজ বসুকে বলেছি,  ২০২৪ সালের ২৮শে অক্টোবর বারোটা তিরিশ মিনিটে ময়ূরকন্ঠী যখন ছাড়া পাবে, ওর হাতে ছাপা সুভেনিরের একখানা কপি তুলে দিতে । উনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেখবেন লেখাটা যাতে খুনির প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ হয় ।

        আদালতবাড়ি পাইন বনের জঙ্গলে বলে প্রতিষ্ঠানের ঠিকেদাররা জেল তৈরি করিয়েছে সেগুন বনের জঙ্গলে। সে অনেকটা হাঁটা পথ ।

        লিখতে বসে যে চিন্তাটা প্রথমে এলো তা এই যে প্রেমের সফলতার জন্যে রঙিন কনডোম কেন, সুগন্ধি কনডোম কেন ? তাহলে কি প্রকাশ্য দিবালোকে প্রেম করা উচিত ! প্রেমের প্রকৃত গন্ধ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রেমযন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা ! বাস্তব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে না কি প্রেমিক-প্রেমিকারা !

       আমি কি বাস্তবকে কল্পনায় পালটাতে পারব, এত বিশৃঙ্খলার ভেতর জীবন কাটিয়েছি, একজন মানুষকেও দেখলুম না যে অসৎ নয়, যে লোকগুলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছে,  সবচেয়ে অসৎ হবার সম্ভাবনা তাদের মধ্যেই পাই ।

Double space

       ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি লিখে, ঘুমোতে যাবার আগে কাগজগুলো সাজানো শুরু করলুম । জানি ব্যর্থ হবো, তবু আরম্ভ করতে দোষ কোথায় !

        সবায়ের জন্যে তো লিখছি না,  যারা সাজা পেয়ে ভুগছে আর ভবিষ্যতে এসে ভুগবে, শুধু তাদের জন্যে লিখছি । যারা বিনা কারণেই সাজা পেয়েছে আর ভবিষ্যতে অকারণে সাজা পাবে, তাদের পড়ে আনন্দ হবে।

        জেলার বলেছিলেন, রাতে ঘুমোবার সময় যখন স্বপ্ন দেখবেন, তখন স্বপ্নের ঘোরে লিখবেন, মনে রাখবেন যে জন্মাবার সময়ে আপনার সারা শরীর রক্তে ভাসছিল, তার স্মৃতি নষ্ট হতে দেবেন না ।

        আমি বলেছিলুম, যা সত্যি তাই বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, খুনখারাপি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের বদল হয় না, প্রথমে সাফাই করতে হয় ওপরতলার লুম্পেনদের, তারপরে এক এক সিঁড়ি লুম-লুম-পেন-পেন করে নামতে হয়, তবে গিয়ে মহাকাব্য  ।

 Three line space      

         জগার্স পার্কে ছয়টা দৌড়-পাকের পর সিমেন্টের ফিকে লাল বেঞ্চে, পাখিদের যৌথ গু এড়িয়ে, অর্ধেক ফাঁকা জায়গায় শাদা শর্টস আর লাল টিশার্ট স্পোর্টশ শু, যুবক বসল, ইউ ডি কোলোনিত একহাতি গামছা পকেট থেকে বের করে মুখ মুছে, তাকালো আগে থাকতে বসে থাকা যুবতীর দিকে, যুবতীর পাছার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছিল যুবক, তার আগেই যুবকের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে যুবতী কথা বলা আরম্ভ করল, এমন ঢঙে যেন মৃত্যুর উনি মালকিন ।[৪]

         এই বোকাচোদার মরণ, জানিস না যে মেয়েদের দিকে একনাগাড়ে তাকানো অশ্লীল, তাকে দখল করে যৌনতায় কয়েদ করার ইচ্ছে…তখন থেকে দেখছি…কুমিরের কুতকুতে চোখ মেলে স্টকিং করছিস…আর মেয়েমানুষ পাসনি…যা না…ওই তো অতো কচি কচি মেয়েরা মাই দুলিয়ে পোঁদ নাচিয়ে জগিং করছে…ওদের পেছন পেছন গিয়ে দৌড়োতে পারিস না বানচোদের মরণ…আমার পাশে এসে বসার  কি দরকার…আমার চোখ দুটো বড়ো আমার ঠোঁট বেশ পাতলা… আমার স্কিন বেশ ঝকমকে…আমার মাই দুটো হইচই মার্কা…এইসব এক ফাঁকে বলবি বলেই তো পেছু নিয়েছিস…নাকি…আর ইউ ডেফ…ইউ মরণের মাদারফাকার…হোয়াই ডোন্ট ইউ স্টপ স্টকিং…এছাড়া… আর কোনো কারণ আছে তো বল…শুতে চাস এক্ষুনি…নাকি…রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি আর তুই চাপ আমার ওপর…আমি শাড়ি তুলে ধরি আর তুই তোর কম্মো করে কেটে পড়…এই চাইছিস তো…কি রে… মুখে কথা সরছে না যে…রাসকেলের মরণ…হাঁ করে তাকিয়ে আছিস…মাই টিপবি…চল তাহলে পার্কের ঘাসে  গিয়ে বসি…ছাতা-টাতা এনেছিস…আড়াল করার জন্য…যত্তো বোকাচোদাগুলো আমার পেছনেই লাগে…ক্ষমতার কেন্দ্রে জরায়ু থাকবেই…

         যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, একজন মেয়ের সঙ্গে প্রথমবার শোবার কথা ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে ; সাজগোজ করে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, সেই তো চটচটে ঘাম, যতো সব আঠালো ক্লান্তি, জখমের খোসা, প্রথমবার পাতপাড়ার মতন বসে হলে সবদিক থেকে ভালো । কিন্তু মানতে হবে, এই মেয়েটা শ্রোতার সন্মানহানির কায়দা আলজিভে রপ্ত করে ফেলেছে । [৫]

         যুবতী : যা যা… কেটে পড়…বাড়ি যা…তোর মা ব্রেকফাস্ট নিয়ে অপেক্ষা করছে…তবু ফলো করিস…চটি খুলে পেটাবো নাকি…না হাঁক পেড়ে লোক জড়ো করব…আপনি কি ভাবছেন…আপনি স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম বলে পার পেয়ে যাবেন…উরুর চুল পায়ের গোছের চুল দেখিয়ে হিম্যান প্রমান করতে চাইছেন..আপনার গৌরবর্ণ দোহারা ঢ্যাঙা চেহারা…একমাথা কোঁকড়া চুল দেখে ফেঁসে যাব আমি…অতই সস্তা পেয়েছেন নাকি আমাকে…যান নিজের পথে যান…বিরক্ত করবেন না…ভালো করে কথা বলছি…এর পর চটি পেটা করব সত্যি-সত্যি…কোথা থেকে যে জুটলো এই গবেটটা…নেড়ি কুকুরের মতন লেগেই আছে পেছনে…এই ঢ্যামনা রোমিওর মরণ…নিজের পথ দ্যাখো…আমার পঁচিশ বছর বয়স হয়ে গেছে বলে ভেবো না যে শোবো বলে মুখিয়ে আছি…বারো বছর বয়স থেকে এই বোকাচোদাগুলোকে ফেস করতে হচ্ছে…বাসে চাপো তো পোঁদে বডি ঠেকিয়ে মরণের ল্যাওড়া ফোলাবে…উৎসবে যাও তো ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মাই চটকে বেরিয়ে যাবে…বেশ্যালয়ে যাবার মুরোদ নেই মরণের বানচোদগুলোর…রাস্তায় বিনিপয়সার মাগ পেলেই লেগে যাবে পেছনে…আমাকে স্টকিং করার হলে হিটলার করবে…জোসেফ স্ট্যালিন করবে…জুলিয়াস সিজার করবে…

        যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, রোমান্টিক শব্দটা ইংরেজি, এর বাংলা প্রতিশব্দ  নেই, মেয়েটা যে কথার ঝাড়ের মাঝে শ্বাসের সময় নিচ্ছে, তা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে, কথাগুলোর চেয়ে মাঝের নিঃশব্দ ফাঁকটাই আতঙ্কের।

         যুবতী : তা সে তুমি যতই নায়কের মতন হাবভাব করো…চলো…চলো…যাও…যাও…কী ভাবছ…আমি ভার্জিন কিনা…হ্যাঁ…আমি ভার্জিন…কারোর সঙ্গে শুইনি…আগে ম্যাস্টারবেট করতুম… এখন অটোমেটিক অরগ্যাজমের টেকনিক রপ্ত করে ফেলেছি…লাবিয়ায় মুক্তো লাগানো একটা মাকড়ি লাগিয়ে নিয়েছি…এই যে দুই কানে যেমন দেখছিস, তেমনই…সেই মাকড়িটা….পার্কে এক পাক হাঁটলেই…বুঝেছিস তো…কিছুক্ষণের ঘষটানিতে আপনা থেকেই অরগ্যাজম হতে থাকে…সেটাই এনজয় করি পার্কের বেঞ্চে বসে…কোনো মরণের কুত্তাপুরুষের দরকার হয় না…হাঃ হাঃ…কি বুঝলি…মাকড়ি তো…দুই কুঁচকিতে উল্কিও করিয়েছি…প্রজাপতি উড়ছে…উল্কি জানিস তো…ট্যাটু…অরগ্যাজমে উড়তে থাকে প্রজাপতি দুটো…বুঝলি…কি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন যে…বিশ্বাস হচ্ছে না…ভাবছিস কে কে আছে আমার যে এই সব মজা নিই লাইফের…আছে রে দু দুটো বাপ…একজন অন্ধ…পিটুনির চোটে অন্ধ হয়ে গেছে…আরেকজন অ্যালঝিমার রুগি…ভাবছিস মাটা কমনে আছে…সে বেটি পালিয়েছিল আরেকজন কচি কচকচের সঙ্গে…ছোঁড়াগুলোর টেস্টও বলিহারি…টিভিতে মাকে দেখে প্রেম করে বসল এক ছোঁড়া…মা তার সঙ্গে লিভ-টুগেদার বেঁধেছে…টিভির গল্পটাকেই নিজের জীবনে অ্যাডপ্ট করে নিয়েছে…তুই এখনও তাকিয়ে আছিস যে…কুঁচকির প্রজাপতি দেখতে চাইছিস নাকি…তাহলে তোকে বলি যে আমার বুকের খাঁজে কাঁকড়ার উল্কি আছে…তোরা তো হাজার হাজার বছর আগে গুহায় যেমন থাকতিস এখনও তেমনই আছিস…তুই কি ভাবছিস আমি কারোর সঙ্গে শুতে চাই না…চাই…চাই…চাই…স্ট্যালিনের সঙ্গে শুতে চাই…মাওয়ের সঙ্গে শুতে চাই…হিটলারের সঙ্গে শুতে চাই…সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে শুতে চাই…লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে শুতে চাই…আর এন ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাই…রামকিঙ্কর বেইজের সাথে শুতে চাই…এক এক রাতে এক এক স্বপ্নে শুতে চাই…ফর মি লাভ ইজ ইনসারেকশান…স্টকিং হল প্রতিবিপ্লব…[৬]

         যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এরা এক এক সময়ে এক একটা মানুষকে পছন্দ করে, তারপর সারাজীবন একজনকে  নিয়ে কেমন করে কাটায় ! আসলে অন্ধকার জমাট বাঁধতে থাকে, সম্পর্ক গলতে থাকে । সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শিল্প হল কনফিউজন ক্রিয়েট করা । সেটাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে , যেন কোনো আক্রমণ থেকে প্রাণপণে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে ।

         যুবতী : তোর এখনও শুনে আশ মেটেনি…যা দিকিন এখান থেকে…কার কাছে ট্যাটু করিয়েছি তাই ভাবছিস তো…কোনো মহিলা-টহিলার পারলরে নয়, পুরুষেরই ট্যাটু পারলরে, প্রজাপতি দুটোর গায়ে তিন রকমের রঙ আছে…কাঁকড়াটা লাল করিয়েছি…কোনো মরণের বানচোদ ধর্ষকের পাল্লায় যদি পড়ি কখনও তো তাকে লাল কাঁকড়া ফেস করতে হবে…যদিও জানি যে লাবিয়ার মাকড়িতে তার নুনু আটকে ফর্দাফাঁই হয়ে যাবে…বুঝলি…কী…শুনে ভয় পেয়ে গেলি…এতক্ষণে ধারণা করে নিয়েছিস নির্ঘাত যে আমি বেহেড পাগল…তা ঠিক…আমি কম কথার মেয়ে…বেশি বক বক করতে পারি না…আমি কি করে দুটো বাপকে চালাই ভাবছিস…অন্ধ বাপের পেনশন জোটেনি…কেস চলছে…শালা কবে যে ফয়সালা হবে…তাও আমাকেই সামলাতে হয়…বাপের দপতরে গেলে মরণের কেরানিগুলো আমার খাপেখাপ দেখতে থাকে…অরগ্যাজমের উত্তেজনা-আনন্দ উপভোগ করব…তা নয় মাকড়ি খুলে দৌড়োও আদালতে…জানতে চাইছিস বোধহয় যে দুটো বাপ কেমন করে হতে পারে…হতে পারে..হতে পারে…এই ধরো আমি তোমাকে বিয়ে করে নিলুম…তারপর তোমায় ডিভোর্স না দিয়ে চুপচাপ আরেকজনকে বিয়ে করে নিলুম…একজনের সঙ্গে শুয়ে কি আশ মেটে..বলো তুমি…মেটে না…মেটে না…সব মিথ্যে…ইউ লিভ ফর ওয়ান্স ওনলি…জানতে পেরে আমি দুজনকে এক ছাদের তলায় এনেছি…ভাবছ বাপেদের ককটেল চরিত্র পেয়েছি আমি…তা ঠিক ধরেছ…দুজনের চরিত্র আমার ওপর একসঙ্গে বর্তেছে…কোন বাপের মেয়ে আমি জানি না…বিজ্ঞানের সাহায্য নেয়া যেতে পারত…নিইনি…শেষে হয়তো দেখব এদের দুজনের কেউই আমার বাপ নয়…পুরো টাকা গচ্চা…তাছাড়া জেনেই বা কী হবে কোনটা আমার বাপ…বলো…

         যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই মেয়েটা, সব মেয়ের মতনই, বিভ্রমের বাস্তবতায় বাস করে, যেন ঘুম ভেঙে দেখছে এতোকাল খরগোশের গর্তে ঘুমোচ্ছিল আর হঠাৎ উঁকি দিয়েছে শেয়ালের হাসিহাসি হাঁ-মুখ।[৭]

         যুবতী : তুই ভাবছিস আমি কি করি…হ্যাঁ…রান্নাবান্না করি…আমি আসলে ওই হাসপাতালটায় রিসেপশানিস্ট ছিলাম…বুঝলি…তোর জন্যেই তো চাকরিটা গেল…আমি কিই বা করেছি…আমার কোনো দোষ ছিল না…পুরো বিজ্ঞানের দোষ…বিজ্ঞান মানেই ফাঁদ…ফেলে দিল আমাকে ফাঁদে…তুই তো জানিস…দেখেছিলেন তো কী হয়েছিল সেদিন…নার্সটাকে বলেছিলাম এম আর আই রুমে ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে আসতে…তাকে বলা হল কিছু সে শুনলো আরো কিছু…সে বেটি কি করলে…সে করিডরে রাখা অক্সিজেন সিলিণ্ডারটা নিয়ে রাখতে চলে গেল এম আর আই রুমে…তারপর যা হবার তাই হলো…এম আর আই মেশিনের রাক্ষসি ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে অ্যাক্টিভেট করে দিলে মেটাল সিলিণ্ডারটা…সেকেন্ডের মধ্যে নার্সটাকে আর যে টেকনিশিয়ান সেখানে দাঁড়িয়েছিল দুজনকেই খেলনার মতন টেনে নিলে মেশিনটা…সে কি আওয়াজ…আর চিৎকার… চার ঘণ্টা ধরে আটকে ছিল ওরা…তাতে আমার কি দোষ…ওই দুর্ঘটনার জন্যে নাকি আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে…দিনকাল খারাপ যাচ্ছে মনে করলে তাকে আরও খারাপ করে তুলে পার পাওয়া যায়…

         যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই যুবতী ভবিষ্যতের কলোনিতে ডেরা ডেলে আছে, সময়কে নষ্ট করে-করে অতীতে পৌঁছোতে চাইছে মনে হয় । এর মগজ সময়কে ভুলে গিয়ে থাকবে, কিন্তু মগজ দাগ রেখে গেছে এর সময়ে । তাই সময়কে নষ্ট করে চলেছে , আর কতো পাক খুলবে কে জানে, নষ্ট হওয়া ছাড়া সময়ের তো অন্য কোনো গতি নেই । হঠাৎ কথা বন্ধ করে আবার আরম্ভ করে, বোধহয় এই নৈঃশব্দের সময়টায় ওর অরগ্যাজমের তুলতুলে বিস্ফোরণ হয় ।

         যুবতী : জেনেরাল ইলেকট্রিক থেকে একজন ইনজিনিয়ার এসে মেশিনটা ডিঅ্যাক্টিভেট করার পর ম্যাগনেটিক ফিল্ডটা গেল…মরণের নার্সের তো কনুই ফ্র্যাকচার…টেকনিশিয়ান বেচারা একদিকে নার্স আর সিলিণ্ডারের মাঝে…দুই হাত নার্সের দুই বুকে অথচ টিপতে পারার মতন জ্ঞান নেই…অন্যদিকে মেশিনের হাঁ-মুখে…বেচারার ইউরিনারি ব্লাডার ফুটো হয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড…ওদের দুজনকে সারিয়ে তুলতে নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, অরথোপেডিক সার্জন, নেফরোলজিস্ট, প্লাসটিক সার্জন, ইনটেনসিভিস্ট কতো ডাক্তারের যে সময় গেল…নার্সটা কখনও কাজ করেনি এম আর আই রুমে…জানতো না যে এম আর আই রুমে মেটাল নিষিদ্ধ…তোকে এসব কেনই বা বলছি…তুই জেনে কিই বা করবি…মেশিন সুইচ অফ করলেই ওর ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিঅ্যাক্টিভেট হয় না…আমি তো দৌড়ে গিয়ে সুইচ অফ করে দিয়াছিলাম…তারপরেও ওদের দুজনকে টেনে বের করা যাচ্ছিল না… ম্যাগনেটকে মেশিন থেকে আলাদা করতে সময় লেগে গিয়েছিল…চার ঘণ্টা ওইভাবে আটকে…নার্সের দুই মাইয়ে দুই হাত…টিপবে তেমন জ্ঞান নেই…কত দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল…ইনটারনাল এনকোয়ারিতে আমাকেই বলির-ছাগলি করা হল…চাকরি খোয়ালাম…নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে…হসপিটালিটি কোর্সটা না করে কমার্স পড়লে বরং ভালো ছিল…

         যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, যাক এর বকবকানির কারণ জানা গেল । অ্যাদ্দিনে প্রগতির সহজাত তোতলামির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, হয়তো সেই থেকে যারা ওকে পছন্দ করে তাদের ও অপছন্দ করে । এ যখন জানতে পারবে যে আমি একটা বুনো জানোয়ার, তখন কি হবে !

         যুবতী : প্রথম বাপটা আমার জন্যেই অন্ধ হয়ে গেল…পিটুনি খাবার পর যে হাসপাতালেই নিয়ে গেছি…আমার মুখ আর নাম দেখেই নার্সগুলো দুর্দুর করে তাড়িয়েছে…ট্রিটমেন্ট হল না ঠিকমতন…প্রথম বাপটা অন্ধ হয়ে গেল…সেই থেকে পৃথিবীটাকে জুতোতে ইচ্ছে করে…হাসপাতালগুলোকে রাতের অন্ধকারে একদিন পেটরল ঢেলে আগুন লাগাব…তুই তো পেছনে লেগেছিস…হেল্প করবি…নাকি…শুনেই মরণের গাঁড় চুপসে গেল…আমি এক বাক্যির মেয়ে…কাউকে রেয়াত করি না…বদলা নেবোই…বলির পাঁঠা বানালো কিনা আমাকে…আমার কি দোষ…নার্সটাকে বলেছিলাম ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে গিয়ে দিতে…উনি অক্সিজেন সিলিণ্ডার নিয়ে ঢুকে পড়লেন…মানুষকে আর বিশ্বাস করি না…কথা বলাকেও বিশ্বাস করি না…বলা হয় কিছু…আরেকজন শোনে কিছু…শেষে কাণ্ড ঘটে অন্যকিছু…দুর্বাঁড়া তোকে কেনই বা বলছি এসব…       

         যুবকের দিকে পাশ ফিরে বলতে থাকল  যুবতী, বড়ো টানা স্মাজফ্রি কাজলচোখ কুঁচকে ।

         যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলছিল, সাতসকালে জগিং পার্কে কাজলটানা চোখ ! হলুদ ব্লাউজের সঙ্গে ম্যাচিং ফিকে হলুদ প্রজাপতি ওড়ানো সিনথেটিক শাড়ি । চুলে হলুদ ক্লিপ । পায়ে হলুদ ফুল  ফ্লিপ-ফ্লপ, জগিং শু নয় । প্রতিদিন আসে না, সপ্তাহে দিন তিনেক । কোনো দিন টপ আর স্ল্যাক্স, কোনোদিন ডেনিম জিনস, কোনোদিন চুড়িদার, ওকে দেখতে পেলে টানের দরুণ কোনো না কোনো যুবক বসে ওর পাশে গিয়ে ।

        আজকের যুবকের  দেখে মনে হল মেয়েটা হাঁ করে কুয়াশা খায় আর সেগুলো কথার মোড়কে পুরে ওড়ায়, সেটাই বোধহয় ওর নিজের নিয়ন্ত্রণ খোলার তরকিব, জানে যে ওর কথাগুলো ভাইরাসে আক্রান্ত, ওর ভেতরের পরগাছাগুলোকে কথা শুনিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে ।

Double space

         হাঁটতে বেরিয়ে এই পার্কে কেবল বুড়িদেরই  শাড়িতে দেখেছে যুবক, বা চুড়িদার পরে আসতে । যুবতীরা টপ আর ডেনিম জিন্স, কানে গান, অনেকে ব্রেজিয়ারহীন, মাই থলথলে, কুছ পরোয়া নেই গর্ব । এই যুবতীকে জগিং করতে দেখেনি যুবক, হাত দুলিয়ে হাঁটে, স্রেফ এক পাক, মানে আধ কিলোমিটার , তারপর গিয়ে ওই নির্দিষ্ট সিমেন্টের সিটে ।

         যুবক শুনে থতমত, কোনো তরুণীর মুখে এরকম কিলবিলে কথার তোড় শোনেনি এর আগে, মানে সাজুগুজু শিক্ষিতা টাইপের মুখে, তুইতোকারির সঙ্গে আপনি-তুমি মিশিয়ে কী বলতে চাইছে বুঝতে পারছিল না যুবক, সন্দেহও হচ্ছিল যে ইচ্ছে করেই বলছে, আধপাগলি সাজছে । 

          সকালে জগিং করার সময়ে তৃতীয় পাক দেবার পর আজ তৃতীয়বার দেখল মেয়েটাকে, সিমেন্টের বেঞ্চে ঠেসান দিয়ে কাঁপছে । জগিং করে না, কেবল হাঁটে মেয়েটা, এক পাক দিয়েই বসে পড়ে বেঞ্চে আর কাঁপে, তিনচার বার কেঁপে বসে থাকে মিনিট দশেক, তারপর উঠে পড়ে । যে যুবকরা টান খেয়ে বসে তাদের কেউ কেউ ওর পেছন-পেছন যায়, কে জানে কোথায় যায় । সত্যিই তাহলে যুবকেরা একে স্টকিং করে।

          কথার তোড়ের পর, শুয়ে থাকা বাছুরের ভয় পাওয়ার ঢঙে, আচমকা উঠে দাঁড়াল যুবতী, বলল, ফলো করবি না, তোদের সবকটাকে চিনি ।[৮]

          মেয়েটি উঠে পড়ার পর ওকে সতর্ক করার জন্যে, স্টকিঙের উদ্দেশ্যে নয়, এই মেয়েকে দেখে দেখে আশ মিটে গেছে, এখন ছুঁয়ে দেখতে দিলে প্রস্তাবটা লুফে নেবে ।  আজকে যুবতীর সমস্যার কথা বলবে বলে, পিছু নিয়েছিল যুবক, লোকজন বিশেষ নেই এরকম ফাঁকা দেখে বলবে, কিন্তু চারিদিকে ব্যস্ত পথচারীদের আনাগোনার দরুণ, যদিও কেউ পথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেও এদের কারোর কিছু এসে যাবে না,  বলতে না পেরে, পেছন-পেছন যাচ্ছিল । জগিং পার্ক থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে লাল থোকায় ঝিলমিলে গুলমোহর গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে, খসে পড়া পাপড়ি মাড়াতে-মাড়াতে, যুবতী যুবকের দিকে পেছন ফিরে বলল, মাদারচোদ ।

         গালাগালটা শুনে, আশ্চর্য, যুবকের বেশ ভালো লাগল, জাস্ট হিল্লোল । একজন যুবতীর মুখে এই গালাগাল যে মধুমাখানো রহস্যময় হেঁয়ালি হতে পারে, তা এর আগে জানত না, হৃৎপিণ্ড জিনিসটা রক্তের স্রোতকে ইশারা করে  মগজে পৌঁছে দিয়ে প্রশ্ন করতে থাকল, ইহার পর কী ইহার পর কী ইহার পর কী । বলতে চাইল, শোবেন নাকি আমার মায়ের ভুতাত্মার সঙ্গে, উনি তো স্বর্গে। তার বদলে চুপ করে রইল, আরও হেঁয়ালির গোলকধাঁধার আশায় । [৯]

Double space

         যুবতী জানতো গালাগাল শুনেও এই যুবক ফলো করায় বিরতি দেবে না। আগেও এরকমই হয়েছে । স্মাজফ্রি কাজলটানা আড়চোখে দেখে নিয়ে, মেয়েটি এবার সরাসরি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল, যুবকের মুখোমুখি হবার জন্য, আর বলল, কি রে মরণের বানচোদ, বললাম না, তা সত্ত্বেও পিছু ছাড়ছিস না দেখছি, লোক জড়ো করব নাকি, অ্যাঁ, মারের চোটে বাপের নাম ভুলে যাবি, যদি না অলরেডি ভুলে গিয়ে থাকিস ।

         মেয়েটি যে সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিল, সেখানে আজ রক্তের দাগ দেখেছিল যুবক । দাঁড়িয়ে উঠতে, ফলো করে বুঝতে পারছিল, যুবতীর শাড়ির আঁচল আর পাছায় রক্ত লেগে । প্রতিদিন কাঁপে, নিশ্চয়ই কোনো অসুখ অনুমান করে, যুবক ভাবছিল, ফাঁকা পেয়ে বলবে যে, আপনার আঁচলে আর শাড়িতে রক্ত লেগে । বলতেই যাচ্ছিল, আপনি বোধহয় আজকে ফিসফিস বেঁধে আসেননি ।

        দাঁড়িয়ে আছিস, বোকাচোদার মরণ, ফাক অফ, স্টকিং করবেন না, আমি ডিসগাস্টেড ফিল করি, স্কুলের সময় থেকেই আপনাদের মতন রোমিওদের আচরণে বিরক্ত হয়ে-হয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি । কাইন্ডলি ফলো করবেন না । কেন ফলো করছেন জানি, আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি, সিরিয়াল স্টকার।

        যুবক বলল, আপনাকে যে কথাটা বলতে চাইছি, সেটাই সরাসরি বলি, তাহলে বুঝতে পারবেন কেন স্টকিং করছি । আপনার মাকড়ি ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে, ব্লিডিং হচ্ছে বুঝতে পারেননি, তাকেই বোধহয় অরগ্যাজমের আঠা মনে করছেন । আঁচলে আর পেছনে হাত দিয়ে দেখুন ।

        যুবতী তক্ষুনি  পেছন হাত দিল না, চোখে এক চিলতে নকল ভয় খেলিয়ে,  আঁচল সামনে এনে রক্ত দেখতে পেয়ে পেছনে হাত দিয়ে টের পেল  চুপচুপে । বলল, সরি, বুঝতে পারিনি, আজকে তো ডিউ ডেট নয়, ডিউ ডেটের আগেই হয়ে গেছে, ডিউ ডেটের একদিন আগেই মাকড়ি খুলে ন্যাপকিন বেঁধে রাখি ।

         এই ভাবেই পথ দিয়ে হেঁটে যাবেন ? আমার মোটর সাইকেল আছে, চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। চিন্তা করবেন না, দরোজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ি চলে যাবো । ভাগিয়ে ধর্ষণ করতে নিয়ে যাব না কোথাও, তাছাড়া আপনার লাবিয়ায় মাকড়ির প্রটেকশান তো আছেই ।

         চল চল চল চল চল, ভালো আইডিয়া দিয়েছিস , এই ভাবে তো পথে হাঁটা যাবে না, মাছিতে পেছন ঝালাপালা করে দেবে ।

Double space

         মোটর সাইকেলের পেছনের সিটে বসে যুবককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল যুবতী, বলল, যাগগে, এবার তুই তোর গল্প বল ।

        স্টার্ট দিয়ে যুবক বলল, এতোক্ষণ আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে, গালমন্দ করছিলেন, এখন আমার পিঠে বুক চেপে আছেন কেন, অস্বস্তি হচ্ছে , পিঠে আপনার ডাবল ব্যারেল মাংসের পিস্তল ঠেকাবেন না, আনইজি ফিল করছি । আর আমার গল্প বলতে আমার জীবনের কোনো গল্প নেই, তাতে অন্য কেউ-না-কেউ আছেই।[১০]

        যুবকের ঘাড়ে গরম ভাপের শ্বাস ফেলে যুবতী বলল, অস্বস্তি হচ্ছে কেন শুনি ? যখন স্টকিং করছিলিস তখন তো অস্বস্তি হয়নি, দেখি দেখি, হ্যাঁ, তোর তো ফুলে উঠছে রে ! একটুকু ছোঁয়াতেই এই অবস্হা ! এক পরশেই শহিদ মিনার তুলে ফেলতে পারিস, আগের জন্মে গাধা ছিলিস নাকি রে ! অক্টারলুনির তো অনেককাল লেগেছিল ।

        মোটেই ফোলেনি, হাত সরান, হাত সরান, কী করছেন কী ? লোকজন যাতায়াত করছে ; দেখতে পেলে তারাই এবার চটি পেটা করবে আমাদের দুজনকে । কোন মাংসের মেয়ে আপনি !

        দুজনে একসঙ্গে মার খেলে কী হবে জানিস  তো ? আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে জুড়ে যাবো, সাপের মতন, লোকেদের চোখে, নিজেদের চোখেও । আমি তোর পরগাছা, তুই আমার পরগাছা, ওই দম্পতি বলতে যা বোঝায়, দুজনে দুজনকে চুষতে থাকো ছিবড়ে না হওয়া পর্যন্ত , চকাস-চকাস।

        আবার হাত দিচ্ছেন, আমি অকওয়ার্ড ফিল করি এসব ব্যাপারে । প্লিজ । গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। তার চেয়ে আপনার গালাগালের বক্তৃতা শুরু করুন বরং, আমার শুনতে ভালো লাগছিল, সেক্সুয়াল থ্রিল পাচ্ছিলাম ।

        তোর নাম কি হার্দিক ? এতো হৃদয়বান ড্যাংগুলি । আই মিন হার্ড ডিক ! তোর ডিক তো একটু ছোঁয়াতেই হার্ড হয়ে গেল রে । ম্যাস্টারবেট করিস তো ? তবে এতো সেনসিটিভ কেন, লজ্জাবান লন্ঠন ?

        মোটেই হার্ড হয়নি, ওটা আপনার কল্পনা ; আমি যদি হার্ডিক হই তাহলে আপনি তো লাবিয়া কুইন । আগে কখনও শুনিনি যে অরগ্যাজমের জন্যে কেউ লাবিয়ায় মাকড়ি পরে । বাজারে কি কলা-বেগুন-মুলোর অভাব ?

        তুই যে আকাট তা তো তোকে ঝাড় দিয়েই বুঝতে পেরেছি । স্বয়ংক্রিয় ব্যাপারটা বুঝিস না । পিস্তলের কথা বলছিলিস একটু আগে, তা বিছানায় হোক বা প্রতিষ্ঠানের সিংহাসনে, না ঠেকালে নড়ে না রে, ঠেকাও আর গুড়ুম । দুঃখের কথা কি জানিস, সিংহাসনটা কখনও খালি থাকে না, ল্যাংড়া গিয়ে নুলো আসে।

        বাঁ হাত দিয়ে যুবতীর হাত নিজের বুকের কাছে এনে যুবক বলল, তুই তুই করবেন না । আমিও যদি আপনাকে তুই তুই করি তাহলে কাজের বউ হয়ে উঠবেন । আমার এক ক্লায়েন্ট অবশ্য কাজের বউয়ের সঙ্গেই সংসার করে ।

        এবার ডান দিক, হ্যাঁ, সোজা গিয়ে প্রথম রাইট টার্ন ।

        এতো দূর থেকে পার্কে হাঁটতে যান, নিজের বাড়ির কাছে বাগান টাগান নেই ? তাছাড়া মাকড়ির আনন্দ তো রাস্তায় হাঁটলেও পেতে পারেন ।

          তিন গলির মোড়ের মুখে দুজন যুবক, প্রায় ষণ্ডাগোছের, ডোরাকাটা ফুলশার্ট, শার্টের কলারে লাল টাই, কালো ট্রাউজার,  রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাত তুলে থামতে বলল ওদের ।

          এরা যদি মেয়েটার পেছনে লাগে, তাহলে, যুবক পরিকল্পনা ছকে নিল, মেয়েটাকে এদের কব্জায় ফেলে বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে শর্টকাট মারবে নিজের আস্তানার দিকে ।

         মোটর সাইকেল থামতে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন , শহিদ মিনারকে পড়ে যেতে দেবেন না যেন, দু সেকেণ্ডেই ফুসকি হয়ে গেলে ফিরে আরো ভয়ংকর গালাগাল দেবো, বলে, মেয়েটা নিজেই নেমে এগিয়ে গেল স্মার্ট যুবক দুজনের দিকে ।

         এরা মেয়েটার বডিগার্ড বা বাউন্সার নাকি  ! যা গালাগাল ছাড়ছিল, আর যাদের সঙ্গে এর মেলামেশা, কোন লাইনের মেয়ে রে বাবা ! হুকার ইন ডিসগাইজ নয়তো ! যুবক কয়েকটা শব্দ ভাসা ভাসা শুনতে পেল, সুপারি,  টাকা, কাট ডাউন, ক্যারি, মিডনাইট। ওদের একজন মেয়েটাকে একটা কাঁধে ঝোলাবার চামড়ার স্লিং ব্যাগ দিল । অন্যজন একটা পুরিয়া দিল, মোড়ক খুলে শুঁকে, হাতে রেখে নিল যুবতী।

           অ্যাক্সিলাটারে স্পিড নেবে ভাবছে যখন, ফিরে এসে সিটে বসল যুবতী । ওকেই মেরে ফেলার প্ল্যান করছে নিশ্চই ; রোজ একটা ছেলেকে ফাঁসায় আর খুনের হুমকি দিয়ে র‌্যানসাম আদায় করে বোধহয় । স্পিড নিয়ে এঁকে বেঁকে মেয়েটাকে ফেলে দেবার কথা মনে এসেছিল যুবকের, তখনই যুবতী আবার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল যুবককে, নিজের বুক যুবকের পিঠে চেপে ধরে । ডান হাত এগিয়ে যুবকের কুঁচকিতে রেখে মেয়েটি বলল, কেমন যুবক আপনি, হার্ড ডিক এক সেকেন্ডেই সফ্ট চিক হয়ে যায়, বাঁ হাতে পুরিয়া খুলে নিজের ঠোঁটে মাখিয়ে যুবতী বলল, এদিক ফের, এদিক ফের, তোকে একটা চুমু খাই ।

          গাড়ি থামিয়ে পেছন ফিরল যুবক, এমন সুযোগ ছাড়ার মানে হয় না । লোকজনের যাতায়াতকে ডোন্টকেয়ার করে যুবককে চুমু খেল যুবতী, ঠোঁটের গুঁড়ো যুবকের মুখের ভেতরে জিভ দিয়ে পাঠিয়ে ।

          এটা কি জিনিস, জানতে চাইল যুবক, বলল, এ তো চিনি নয়, বেকিং সোডার স্বাদও নেই, হেরোইন -কোকেন খাইয়ে দিলেন নাকি, গাড়ি চালাতে গিয়ে দুজনেই ডিগবাজি খেয়ে পড়ব । আর কতো দূরে আপনার বাসা ?

          যা চাটলি তাকে বলে মেয়াও-মেয়াও-কিস, সায়েন্স পড়েছিস না আর্টস ? চাটার অভিজ্ঞতা আছে, নাকি নউশিখিয়া আনাড়ি ! চাটতে না পারলে কোনো প্রেম টেকে না, তা সে নেশা হোক বা সেক্স ।[১১]

          আবার তুই তুই করছেন, সসেজ-পোড়া গন্ধের চুমু খেলেন যখন,  অন্তত তুমি তুমি তো করতে পারতেন । না, আমি দর্শনে সান্মানিক স্নাতক  পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়েছিলাম ।

          মুকখু ? ওঃ, তাই গালাগাল খেয়েও মুখ বন্ধ করে ছিলিস , বলবি তো যে তুই আকাট , দর্শন আবার বিষয় নাকি, অন্য সাবজেক্টে সিট না পেয়ে শেষে দর্শন, তারপর দার্শনিক হয়ে ঘোলা জলে সাঁতার, বোমক্যাওড়া সাতল্যাওড়া বক্তিমে, যা কখনও কারোর কাজে লাগে না ! চোখ কান নাক মুখ হাত থাকতেও লোকে কেন দার্শনিক হয় জানিস ? দুনিয়ার বাদবাকি মানুষকে তারা মনে করে বোকাচোদার মরণ, তাদের চোখ কান নাক মুখ হাত নেই । তোরও সেই অবস্হা ।

          আকাট নই, ভালো রেজাল্টই করতাম, দাদা ক্যানসারে মারা যাবার পর দোকানটা আমাকেই চালাতে হচ্ছে । বাবা মারা যেতে মা চালাতেন, মা মারা যাবার পর দাদা চালাতো, দাদাও মারা গেল, এখন আমি চালাই । যে মেয়েটার সঙ্গে দাদার বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাদের বাড়ির লোক তো আমার সঙ্গে তার বিয়ে দেবার জন্যে ঝুলোঝুলি করছিল । আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো মেয়ে তাকে বিয়ে করা যায় নাকি ! ভেতরে ঢুকে কি সাঁতার শিখব ? তাছাড়া মেয়েদের চেয়ে আমার নতুন মোটর সাইকেল বেশি পছন্দ ।

         দোকান ? কিসের দোকান ?

         দশকর্মভাণ্ডার । জন্ম থেকে নিয়ে চিতায় চড়া পর্যন্ত সব রকমের ফর্দ মেনে সাপলাই দিই ।

         ওঃ, যতো অশিক্ষিত সুপারস্টিশাস লোকেদের সঙ্গে তোমার কারবার, ঘোমটাদেয়া সিঁথিতে সিঁদুর শাঁখাপলা বউ, খাটো ধুতি পৈতে ঝোলা পেটমোটা বামুন, খ্যাংরাকাঠি কায়েত, দশ আঙুলে দশ রত্নের আঙটি বদ্যি বামুন, তাদের গঙ্গাজলের নামে কলের জল বিক্রি করো, থার্মোকোলের শালপাতা, কাগজের মাটির ভাঁড়, হলদে রঙের কাঠের গুঁড়োকে হলুদ, কৃষ্ণচূড়ার ডালকে বেলকাঠ, জানি জানি । ওসব ছাড়তে হবে তোমায় । আমি শিখিয়ে দেবো যে মেয়াও-মেয়াও-কিস থেকে কতো বেশি রোজগার করা যায় ।

          আপনার কেউ মরে গেলে বলবেন । আমি নিজে ঈশ্বর ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস করি না, এই সব দশকর্মতেও বিশ্বাস করি না, অন্যেরা বিশ্বাস করছে বলে তাদের জ্ঞান দিতেও যাই না । লোকে যেমন আলু-পটল মাছ-মাংস বিক্রি করে, আমি ঐতিহ্য বিক্রি করি ।

          ঐতিহ্য ? গুড ওয়র্ড । ভালো করিস । কেউ মরে গেলে আমি ভালোবাসায় সোপর্দ করি । তারপর যুবতী যোগ করল, এখানে এক মিনিট দাঁড়া, ওই পেটমোটাকে এই ব্যাগটার মাল দিয়ে আসি, বলে, নেমে, রাস্তার পাশে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল যুবতী ।

Double Space

         আম কাঠের পালিশ-ওঠা আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে কোলে বন্দুক রেখে বসে থাকা লোকটার হাতে স্লিং ব্যাগ থেকে দুটো হাফ কিলো ময়দার প্যাকেট দিতে, সে পেতলের হাতবাক্স থেকে নোটের তাড়া বের করে যুবতীকে দিল । কোনো কথাবার্তা হল না । এই দেয়ানেয়াও এক ধরণের কথা । সেক্স করার মতন, কথা বলার দরকার হয় না, নাক মুখ দিয়ে নানা রকমের শ্বাস আর আওয়াজ বের করে আনন্দ দেয়ানেয়া করে, ছেলে-মেয়ে, মেয়ে-মেয়ে, ছেলে-ছেলে।

          যুবতী তাড়াতাড়ি হেঁটে ফিরে এলে, যুবক কন্ঠস্বর নামিয়ে, যুবতীর খোলা নাভির দিকে তাকিয়ে বলল, বুঝেছি, এই নেশার গুঁড়োর ব্যবসা করেন । নিজেকে কানে কানে জিগ্যেস করল, নাভিতে কি সাবান লাগায় ? নাকি সব সাবান মুখে? নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমে গেছে ।

          তা খারাপ কি ? তুই দশকর্মের গাঁজা বেচিস, আমি মেয়াও মেয়াও বেচি, বলল যুবতী, যুবকের চোখ অনুসরণ করে নিজের নাভি শাড়িতে আড়াল করল ।

          আপনার নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমেছে, ওখানেও সাবান লাগাতে হয়।

          আমি ওয়াশিং মেশিন নই যে লিন্ট জমবে ; আর যদি জমেও থাকে, তা থেকে কি উল বানিয়ে তোর জন্যে সোয়েটার বুনে দেবো ?

          ফ্রি রাইড দেবার বিনিময়ে একটা ফ্রি প্রশ্ন করছি, দশাশই পেটমোটাটা কে ? অমন আরও পেটমোটা আছে নিশ্চয়ই তোমার ক্লায়েন্ট লিস্টে ? কথাগুলো বলে, নিজের কানে কানে যুবক বলল, এ ব্যাটা এতো মোটা, ছোঁচায় কেমন করে ! ছোঁচাবার লোক রাখতে হয়েছে নিশ্চয়ই । যতো বজ্জাত তাদের পোশাক ততো ধবধবে সাদা হয় আজকাল ।

          তোরও তো পেটমোটা-ঢাউসবুক বউরা আছে ক্লায়েন্ট লিস্টে ।

          তা আছে, তাদের কাকিমা মাসিমা জেঠিমা বলে ডাকতে হয় । তোমার এই পেটমোটাটা কি কাকু জেঠু দাদু মেসো পিসে ।

          পেটমোটাটা নেতা, নেতার বয়স আর বডির ওজন যতই হোক, তাদের দাদা বলে ডাকতে হয়।  মিছিলের লোকেদের মেয়াও মেয়াও খাইয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটাতে পারে, র‌্যালি-র‌্যালায় মাঝরাত পর্যন্ত না-খাইয়ে বসিয়ে রাখতে পারে । অন্য টাইমে রঙচঙে ঝিলমিলে টুনি জ্বালিয়ে হিজড়েনাচের অনুষ্ঠান করে ওর বাংলা-মাতাল চেলাদের জন্যে, ভাই-বেরাদরদের জন্যে বার-ডান্সার আনিয়ে ঝিনচাক একশো ডেসিবেল অনুষ্ঠান করে । নেতাগিরির জন্য যা যা করা দরকার সবই করে । দেখছিস না, নিজের কোলে রাইফেল, পাশে বডিগার্ডদের পকেটে-কোমরে পিস্তল । গুণ্ডা-মাস্তানের দল ছাড়াও, ওর স্টকে অনেক ভিখিরি আছে, প্রায় শ’দুয়েক হবে, সবাই ভালো অভিনেতা, দরকার পড়লে টিভি-সিনেমার পরিচালকরা ওর কাছ থেকে ভাড়া করে নিয়ে যায়, বেশ্যার ব্যবসাও আছে ওর, তিন চারটে পাড়ায় বেশ্যা বসিয়েছে, তা প্রায় শ’তিনেক হবে । ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ আছে, তাদের মেয়াও-মেয়াও চাটিয়ে পাঠিয়ে দ্যায়, পার্টির র‌্যাশান  কার্ডের ঠিকানা জানিয়ে ; তুই জয়েন করতে পারিস, তোর তো মোটর সাইকেল রয়েছে ।

         নিশ্চয়ই ডোনেশান দ্যায় সৎ কাজের জন্যে ? জানতে চায় যুবক, কন্ঠস্বরে শ্লেষ ।

         শ্লেষকে পাত্তা দেয় না যুবতী, শর্টস-পরা যুবকের চুলে-ভরা উরুতে হাত রেখে বলে, হ্যাঁ, কতো ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ মেটায়, বিধবাশ্রমকে দান করে, স্কুল-কলেজে ভর্তি করায়, ওর নিজেরই আছে ইনজিনিয়ারিং আর মেডিকাল কলেজ ।

          শুকোতে থাকা ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে যুবক পেছন ফিরে বলল, হাত সরান, গুঁড়োয় কিন্তু আমার নেশা আরম্ভ হয়েছে, অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে ; এ-রাস্তাও কতোকাল সারানো হয়নি, জানি না, তার ওপর পিঠে আপনার দোনলার গুঁতো দিয়ে চলেছেন, এরকম ছুঁচালো নকল বডিস পরেন কেন ।

          যুবতী বলল, কন্ঠস্বরে আত্মাভিমানের ঝিলিক, নকল নয়, আসল, ছুঁচালো বলে নকল মনে করার কারণ নেই । বডিসও পরে নেই আমি, এখনও ঝুলে যাবার বয়স হয়নি, কেবল ব্লাউজের ওপর শাড়ি ।

          গর্বের ব্যাপার বলুন ? আর কতো দূর আপনার গর্বের খোঁচা খেতে খেতে যেতে হবে ?

          ওই যে, শ্মশানকলোনির সামনে,  পুরোনো আমলের একতলা বাড়ি দেখছো, ওটাই আমার ঠেক ।

          তুমি এতো ঘোরালে কেন তাহলে ? এটা তো জগার্স পার্কের পেছনের শ্মশানকলোনি , এই শ্মশানের ধারে বাড়ি, কাদের বাড়ি এটা, ভাড়া না নিজেদের, এরকম ফাঁকা জায়গায় বাড়ি, রাতের বেলায় মড়া এলে কান্নাকাটিতে ঘুমের দফারফা । এই শ্মশানকলোনি আমি তো চিনি, বাবা, মা দাদাকে এখানের চিতাতেই তুলেছি । একটামাত্র বাড়ি তবু লোকে একে শ্মশানকলোনি কেন বলে জানি না ।

          ফর ইওর ইনফরমেশান, আজকাল শবযাত্রীরা আর কান্নাকাটি করে না, গান গাইতে গাইতে আসে, গান গাইতে গাইতে যায় । কান্নাকাটি আগের প্রতিষ্ঠানের সময়ে ছিল, এখন তামাদি হয়ে গেছে । আর কি জানিস, তোর উরু-পায়ের গোছে চুল দেখে তোকে  এতো ভালো লেগে গেল, ওই যাকে খারাপ লোকেরা বলে চিত্তচাঞ্চল্য, ভাবলাম আজকে এই ছেলেটাকেই ধরি । তোকে দেখেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল । আর এই বাড়িটা আমার নিজেরও নয় ভাড়ারও নয়, জবরদখল করা, কখনও কোনো জমিদারের বাইজি-নাচাবার জন্যে তৈরি হয়েছিল ।           

         জবরদখল ? মানে ?

         অন্যের আচার-বিচার, আদর্শ, মতামত, দর্শন, পাঁচালি যদি দখল করে নিজের বলে চালাতে পারিস, বিক্রি করতে পারিস, তাহলে বাসা জবরদখলের দোষ কোথায়, বল তুই আমায় ! ব্রিটিশরা তো এই দেশটাকে জবরদখল করে কলোনি বানিয়েছিল ; আমরা এটাকে শ্মশানকলোনি বানিয়েছি। [১২]

          গান গাইতে-গাইতে ?

          হ্যাঁ, সেই যে একজন সামাজিক সুপারম্যান মারা গেল, শহরচত্ত্বরে যার ডেডবডি রাখা হয়েছিল পাবলিকের দুখদর্শনের জন্যে, নাকে ভ্যানিলাগন্ধের তুলো গুঁজে, তার শবযাত্রী চেলারা গান গাইতে গাইতে এসেছিল, গাইতে গাইতে ফিরে গিয়েছিল, তখন থেকেই ক্রেজটা ধরে নিয়েছে পাবলিক ।

          ক্রেজ ?

          হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়, দেখিসনি, সঙ্গে বাজনা-টাজনাও থাকে অনেক শবযাত্রার , একবার একজন বাজিয়ের শব এসেছিল, তার শবযাত্রীরা হেভি মেটাল বাজাতে বাজাতে এসেছিল । বছর দশক হয়ে গেল, নিরীক্ষামূলক শবযাত্রার চল হয়েছে । তোর মা-বাপ-দাদা পটল তুলেছেন অলরেডি, নয়তো তুইও কোনো রক ব্যাণ্ড ভাড়া করে আনতে পারতিস , শ্মশানের অফিসঘরে কানট্রি রক, ফোক রক, পাওয়ার মেটাল, থ্র্যাশ, গ্রাঞ্জ, পাঙ্ক রক, গ্ল্যাম মেটাল, হেভি মেটাল, সকলের ফোন নম্বর আর রেটচার্ট আছে । তবে আজকাল ট্যাগোর রকের চল বেশি ।

Double space

         আচ্ছা, আপনি যান, আমি চলি । আপনার গা থেকে আমার দোকানের দশকর্মের জিনিসপত্রের গন্ধ বেরোচ্ছে, আশ্চর্য । নিজের অনিশ্চয়তাকে বোঝার চেষ্টায় বলে ফেলল যুবক, যদিও টের পেল যে বলে ফেলাটা বোকামি হয়েছে, কেননা এই যুবতীর গা থেকে যে গন্ধ বেরোচ্ছে তা আঁশটে, যেন লইট্যা মাছ লুকিয়ে রেখেছে কোঁচড়ে ।

         ভেতরে চল, দেখতে পাবি, আমার অ্যাঁড়গোবিন্দ ড্যাডি, অন্ধ হয়ে গেছে আড়ং ধোলাইয়ের চোটে, স্রেফ গোটাকতক টাকিয়াল গোঁপুড়ে দাড়িয়ালের দর্শনকে নিজের বলে চালাতে গিয়ে । শেষে ওর শিষ্যরা খুনোখুনি, ব্যাংকলুঠ, ঠিকেদারি, হুমকিটাকা, দালালি, লাশলোপাট, বোমাবাজি, মেয়ে পাচার, এই সব কাজে ঢুকে পড়ল আর বাপের দর্শন-আদর্শের দফারফা করে ছাড়লে ।

         বাড়িটার দাবিদার আসেনি, কোনো টেকো বা দাড়িয়াল, সিনডিকেটের লাঠিয়াল, কিংবা মাগি-ধুমসিদের মাফিয়া ? জানতে চায় যুবক, এমন কন্ঠস্বরে যেন আগে জানলে সে-ই দখল করে নিতো ।

         কতোকাল হয়ে গেল কোনো দাবিদার আসেনি । সেসময়ে কান্নাকাটি শুনতে আমার ভালো লাগত । মড়া এলেই জানলা খুলে দিয়ে কান্নার রোল শুনতুম । মড়াপোড়ার অমায়িক সুগন্ধ ভালো লাগে । মানুষের হাসি প্রায় সবায়ের একই রকম হয়, কিন্তু কান্না সবায়ের আলাদা-আলাদা, যাকে দেখতে যেমন তার কান্না ঠিক তার উল্টো, যতো ভালো দেখতে, ততো কুচ্ছিত তার কান্না । আজকাল অবশ্য কাঁদবার প্রথা তামাদি হয়ে গেছে।

           যুবতী মোটর সাইকেল থেকে নামতে, যুবক পকেটের  রুমাল-ধরণের ছোটো গামছা বের করে সিটের রক্ত পুঁছে শুঁকলো, আর রুমালটা পকেটে রেখে নিল ।

           কি, স্বর্গীয় সুগন্ধ না ? থুতনি উঁচিয়ে, জিগ্যেস করল যুবতী, থুতনির কালো তিলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর পাতলা ঠোঁটে শ্লেষ খেলিয়ে যোগ করল, রুমালের বদলে গামছা ?

           যুবক বলল, পৌঁছে দিলাম তো, তার মাশুল হিসেবে রক্তগন্ধা রেখে নিলাম । এই মাপের গামছা দশ রকমের সংস্কারের সব কয়টায় ইউজ হয়, আমি তাতে তোমার রক্ত পুঁছে এগারো নম্বর যোগ করলাম ।

           ব্যাস এইটুকু ? চলো চলো বাড়ির ভেতরে চলো, এখনও তো মেয়াও-মেয়াও-কিস সম্পর্কে জ্ঞান দিইনি ।

           যুবক চোখ মেরে বলল, জ্ঞান নেবো, একটা শর্তে ।

           বোকাচোদার মরণ,  মুকখুর আবার শর্তও আছে, প্রথম আলাপেই চোখ মারে ! কী, শুনি ? চোখ মারার মাশুল হিসাবে কথায় স্ল্যাং মিশিয়ে বলল যুবতী ।

           লাবিয়ার মাকড়িটা আমি নিজে হাতে খুলে দেবো, তোমাকে খুলতে তো হবেই, স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধার জন্য । সেই সুযোগে প্রজাপতি দুটোকেও দেখে নেবো, আমি অমন প্রজাপতি জীবনে দেখিনি, লাবিয়ার মাকড়িও জীবনে দেখেনি, পুরুষ্টু লাবিয়ার ঠোঁটই দেখিনি তো তার মাকড়ি আর কোথ্থেকে দেখবো। ব্যাস, মাকড়ি খুলব, আর কোনো আগ্রহ নেই, বলেছি তো আপনাকে, মেয়েদের চেয়ে নতুন মোটর সাইকেলের বডি আমাকে বেশি টানে, কতো মসৃণ হয় মোটর সাইকেলের ত্বক ।

          চলুন, ভেতরে চলুন, একদম আওয়াজ করবেন না দাঁড়ান, তালা খুলি, বাপেদের তালা দিয়ে যেতে হয় । একবার তালা দিয়ে যাইনি, আলঝিমার বাপ গিয়ে আধসাজানো চিতার ওপর শুয়ে পড়েছিল, যারা লাশ নিয়ে এসেছিল তারা চ্যাংদোলা করে গান গেয়ে গালাগাল দিতে-দিতে ফেরত দিয়ে গিয়েছিল ।

         তালা খোলার পর অন্ধকার বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুর্গন্ধে হেঁচে ফেলল যুবক, ওয়াক সামলে নিল ।

         আওয়াজ শুনে চেঁচাতে শুরু করল কোনো বুড়ো হাঁফ-ধরা কন্ঠস্বর ।

         মার শালাকে মার শালাকে….

মার মার মার মার মাথা ফাটিয়ে দে, ছাড়িসনি, চুলের মুঠি ধরে উপড়ে নে…

লাগা ক্যাঁৎকা… লাগা, বানচোদ নিজেকে ভেবেছে জ্ঞানের পাতকো…

মার শালাকে মার মার মার মার মার মার বোকাচোদাটাকে….

আমাদের দলের সঙ্গে পাঙ্গা, বুঝিয়ে দিচ্ছি কাদের চটিয়েছে বানচোদ…

টেবিলের কাঁচটা ভেঙে দে, লাঠি দিয়ে হবে না, লোহার রড দিয়ে ভাঙ ভাঙ ভাঙ…

আবার কমপিউটার রাকা হয়েছে, কতো লোকের চাগরি খেয়ে নিলে কমপিউটারগুনো…

মার মার মার মার বানচোদকে…

দেয়ালে ওগুনো কাদের ছবি টানিয়েছে গাণ্ডুটা, আমাদের কোনো নেতার নয়…

মার ডাণ্ডা…ভাঙ ভাঙ…কি পারছিস না…আমাকে দে…

মাথা ফাটিয়ে দে ল্যাওড়ার বাচ্চার…

চোখে মার, নাক ফাটিয়ে দে..

মার মার মার মার মার, টেলিফোনের তার ছিঁড়েছিস…ছেঁড় ছেঁড়…

টাবিলের কাঁচ তুলে ফেলে দে…

শালা পুলিশের ভয় দেখাচ্ছিল আমাদের…

জানে না আমরা কার পোষা…

মার মার জামা ছিঁড়ে দে…পারছিস না…কেটে বের করে নে…

খালি পিঠে বাড়ি না মারলে বোকাচোদার মনে থাকবে না..

দে রদ্দা দে রদ্দা…

মার পেটা পেটা কামিনাটাকে…ল্যাখাপড়ার হিরোগিরি বের করছি বানচোদের…

ইনজিরি ঝাড়ছিল চুতিয়ার বাচ্চা…

বাল উপড়ে নে…

         ড্যাডি, কী হচ্ছে কি, আমি আমি, এসেছি, চেঁচিও না, বলে বারণ করল যুবতী ।

         অন্ধকারে যে লোকটা চেঁচাচ্ছিল, আবছা বোঝা গেল সেই ড্যাডি নামের বাবা, আরেকটা লোকও বসে আছে, গুম হয়ে, তাকে কী বলে ডাকে তার জন্য অপেক্ষা করছিল যুবক । দুজনের চোখেই কালো চশমা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, লম্বা দাড়ি, ঝাবড়া গোঁফ, মনে হয় চুল কেটে দেবার, দাড়ি কামাবার, গোঁফ ছাঁটার সুযোগ থেকে এরা বঞ্চিত ।

         বিরাট হলঘরে, যেখানে কখনও মোসাহেবদের নিয়ে পাশবালিশ জড়িয়ে বিলিতি মদ খেতো জমিদার, চারটে বেতের চেয়ারের দুটোয় সামনা সামনি বসে, দুজনেই উলঙ্গ, দুজনেই নিজের লিঙ্গ বই দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছে ; বইগুলো বোধহয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ভুগোলের শক্ত মলাটের অ্যাটলাস । দুজনের মাঝে কোনো টেবিল নেই । ড্যাডি লোকটা একটা পাইপ ফুঁকছে, কিংবা ফোঁকার ভান করছে ।

         যুবতী, বাঁ দিকে তাকিয়ে, স্লিং ব্যাগ থেকে, ইলেট্রনিক টর্চ বের করে ড্যাডি নামের বাবার ওপর ফোকাস করে জিগ্যেস করল, ব্রেকফাস্ট করেছ । বাঁদিকে ফেরার সময়ে বুক দুটো যুবকের দিকে তাক করা ছিল , নিঃঃশব্দে গুড়ুম শুনতে পেল যুবক, অদৃশ্য ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল ।

        ড্যাডি ঘাড় নাড়ালো, আলোয় চিকচিক করে উঠলো মলম লাগানো খোসপাঁচড়া, তারপর বলল, ভালোবাসা খায়নি  মনে হয় , তুই ওদের খেতে দিয়ে যাসনি বোধহয়, গান তো গায়নি ওরা , ভালোবাসা জানে, মাংসই সর্বজনীন ।    

        অন্য বুড়োটার দিকে মাথা নিচু করে,  যুবতী জিগ্যেস করল, তোমার কফি খাওয়া হয়েছে ?

        বুড়ো, যাকে যুবতী জিগ্যেস করেছিল, চকচকে মোদো মুখ তুলে যুবতীর দিকে চুমু ওড়ানোর ঢঙে বলল, তোর ড্যাডির যখন চোখ ছিল, জ্ঞানচক্ষু নয়, চামড়ার চোখ, জ্ঞানচক্ষু তো ওর নেইই,  তখনও নিজের অন্ধত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারিনি ।

       ড্যাডি, গুমরে উঠে, বলল, একদিন পৃথিবীর বদল ঘটবেই, আর তা ঘটাবে অন্ধ, কালা আর বোবারা, দেখে নিস নর্দমার পোকা ; চোখ আছে বলে গোমরে ফেটে পড়ছিস স্কাউন্ড্রেল । শোন বানচোদ, পুরোনো সমাজের একেবারে নিচু স্তর থেকে ছিটকে পড়া যেসব লোক বেকার হয়ে পচছে, সেই লুম্পেনদের সুপারলুম্পেনরা  বিপ্লবের খাতিরে এখানে-ওখানে আন্দোলনের মধ্যে ঝেঁটিয়ে নিয়ে আসবে একদিন, কিন্তু এদের জীবনযাত্রার ধরণটা এমনই যে, তা প্রতিক্রিয়াশিল ষড়যন্ত্রের ভাড়াটে হাতিয়ারের ভূমিকার জন্য তাদের অনেক বেশি করে তৈরি করে তুলবে । আর তা করছিস তোরাই । একদিন সব বদলে যাবে, দেখিস, নতুন দিগন্ত দেখা দেবে ।

        বাপি নামের বুড়ো বলল, বকওয়াস শালা, কি যে মাথামুণ্ডু বাংলিশ বকছে, নিজেই লুম্পেনদের পুষেছিল, তারাই তোর পোঁদে বাশ করে অন্ধ করে দিলে । লুম্পেনদের নিয়ে তত্ববাজি হয় না, এই লুম্পেনরা ইউরোপের লুম্পেন নয়, খাঁটি দেশি লুম্পেন, পিওর দেশি ব্রিড । যখন চোখ ছিল তখন দেখেছিলিস তো এদেশের রাস্তার কুকুর আর ওদের দেশের রাস্তার কুকুররা কতো আলাদা ।

         তারপর যুবতীর দিকে তাকিয়ে বাপি জিগ্যেস করল,ভালোবাসার জন্যে  আর খোরাক পাওয়া যাচ্ছে না বুঝি রে ?

         ড্যাডি দিল কথাটার উত্তর, খুনখারাপি না করলে উত্তরণ ঘটবে না ; মনে করো পোল্যাণ্ডের জঙ্গলের মাটির তলাকার হাড় ,খুনখারাপি হল মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রধান বার্তামাধ্যম, রক্ত রক্তের সঙ্গে কথা বলে ।

         বাপি পোঁদ উঁচু করে জোরে পাদল, ড্যাডির কথার উত্তর হিসাবে, বোধহয় আটকে রেখেছিল, সঠিক সময়ে ছাড়বে বলে ।

         বাপির কানে ফিসফিসিয়ে যুবতী বলল, যুবক শুনতে পায় এমন কন্ঠে, একটাকে ফাঁসিয়ে এনেছি, মেয়াও মেয়াও গিলিয়েছি, আরও কয়েকবার মুখে ঠুশে দেবার পর গতি করতে হবে ।

         বাপি সে কথায় ততো গুরুত্ব না দিয়ে সামনের বুড়োকে বলল, গামবাট অন্ধ ল্যাঁড়টা আবার জ্ঞান দিতে লেগেছে, শালার চোখ গেলে দিয়েছে পিঁজরেপোলের বাছুর ছেলেছোকরারা, তবু পুঁথির গুদলেট চোরাপাঁক থেকে বেরোতে পারল না। জীবন থেকে আর কিছু পায় না, পায়নি, বিদেশিদের লেখা অনুবাদ করা বদগন্ধের  বই পড়ে-পড়ে বস্তাপচা বুকনি ঝাড়ে । ম্যাকলে যদি ইংরেজি চালু না করত, তাহলে বুকনি ঝাড়ার, বই পড়ার, এলেমও থাকত না গেঁড়েগুলোর ।

         এই চোপ ।

         তুই চুপ কর অন্ধ ; তোর তো কোথাও যাবার যো নেই ।

         তুই পড়ে আছিস কেন, এখানে, পোঁদ মারাতে ?

         আমি আসতে চাইনি । আমি এই খুনশ্মশানের  অংশ হতে চাইনি, মেয়েটাই জোর করে নিয়ে এলো, ওর মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার জন্যে, নয়তো ওর মায়ের চাকর হয়ে ভালোই ছিলাম, ওর মায়ের কচি কচকচে বরকেও মেনে নিয়েছিলাম ।

         যুবতী বলল, মাকেও যে কবে ভালোবাসায় সোপর্দ করব তার অপেক্ষায় আছি ।

         অন্ধ সামনের বুড়োর উদ্দেশে বলল, শালা, মাগের নাঙ কোথাকার । এই ভেড়ুয়াটাকে দেখলেই বঙ্কিমের সেই কথাগুলো মগজে বাজতে থাকে, সেই যে সাম্যতে উনি লিখেছিলেন, রাম সেলাম করিয়া, গালি খাইয়া, কদাচিৎ পদাঘাত সহ্য করিয়া, অথবা ততোধিক কোনো মহৎ কার্য করিয়া, কোনো রাজপুরুষের নিকট প্রসাদপ্রাপ্ত হইয়াছে । রাম চাপরাশ গলায় বাঁথিয়াছে — চাপরাশের বলে বড়োলোক হইয়াছে । আমরা কেবল বাঙ্গালির কথা বলিতেছি না — পৃথিবীর সকল দেশেই চাপরাশবাহকের একই চরিত্র — প্রভূর নিকট কীটানুকীট, কিন্তু অন্যের কাছে ? ধর্মাবতার !! তুমি যে হও, দুই হাতে সেলাম করো, ইনি ধর্মাবতার । ইঁহার ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই, অধর্মেই আসক্তি — তাহাতে ক্ষতি কি ? রাজকটাক্ষে ইনি ধর্মাবতার । ইনি গণ্ডমূর্খ, তুমি সর্বশাস্ত্রবিৎ — সে কথা এখন মনে করিব না, ইনি বড় লোক ইঁহাকে প্রণাম করো । বলে, পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল লোকটা ।

         দেড়ফুটিয়াটা বঙ্কিম চুরি করে আমায় জ্ঞান দিচ্ছে, আর এতক্ষণ বলছিল আমিই নাকি অন্যের মতাদর্শ নিজের বলে চালাই । ম্যাকলের ধোলাই খেয়ে বঙ্কিম বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে, এর শিষ্যগুলোর তো বঙ্কিম পড়তে হলে ভয়ে বিচি শুকিয়ে যায় । সংস্কৃতকে তুলে দিয়েছিল, এখন বোঝো ।

        চালাস তো । লেখালিখি আর ছাপানোর ব্যাপার না থাকলে তোরা কি আর পৃথিবীটাকে এরকম বদনাম করতে পারতিস ?

         আমি যে আলো দেখতে পাই তুই তা পাস না, তুই এক রকমেরই আলো দেখিস, যার নাম অন্ধকার ।

         যুবতী চেঁচিয়ে উঠল, আঃ, একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দাও না তোমরা দুজনে । আমি তো তোমাদের সমস্যার সমাধান করছিই, ধৈর্য্য ধরতে পারো না !

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *