ডনের বাঘ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ডনের বাঘ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শ্রীমান ডন ঘরে ঢুকে বলল, ‘মামা, দুটো টাকা দেবে?’ খুব মন দিয়ে একটা রহস্য কাহিনি লিখছিলুম। তাই ঝামেলা না বাড়িয়ে বললুম, ‘আচ্ছা দেব’খন।’

ডন এগিয়ে এসে লেখার কাগজে হাত রাখল। এখন জোর করে ওর হাতটা যদি সরানোর চেষ্টা করি, তাহলে কী ঘটবে, তা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার আছে। অভিজ্ঞতাও কম নেই। এই যে চেষ্টা করে অনেক ভেবেচিন্তে একটা পাতা প্রায় শেষ করে এনেছি, পুরোটাই গচ্চা যাবে। কাজেই ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে ওর মুখের দিকে তাকালুম।

ডন মিটিমিটি করে হাসছিল। এ-হাসির মানে আমি ভালোই জানি। বেড়াল যখন কোনো হতভাগা ইঁদুরকে থাবার তলায় পেয়ে যায়, তখন তার মুখে ঠিক এই হাসিটা ফুটে ওঠে।

ডন বলল, ‘তুমি বুঝি ভাবছ আমি ঘুড়ি কেনার জন্যে টাকা চাইছি? ঘুড়ির দাম তো অত না।’

‘তাহলে?’

ডন এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমি একটা বাঘ কিনব।’

এসব সময়ে ডনের সামনে হাসবার ঝুঁকি অনেক। তাই আমিও গম্ভীর হয়ে বললুম, ‘সত্যিকার বাঘ, না খেলনা বাঘ?’

‘সত্যিকার বাঘ।’ বলে ডন সেটার সাইজও দেখিয়ে দিল দু-হাত দিয়ে।

‘বাঘটা কি জ্যান্ত?’

‘হুঁউ।’ ডন আবার আমার কনুইয়ের কাছে চিমটি কাটল। ওর চিমটি খাওয়ার অভ্যেস আমার আছে। তবে এটা নিতান্তই ফার্স্ট ওয়ার্নিং।

অতএব ড্রয়ার থেকে ওকে দুটো টাকা বের করে দিলুম। ডন আড়চোখে ড্রয়ারের ভেতরটা দেখে নিয়ে ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল, ‘বাঘ কী খায়, মামা?’

‘পাঁঠার মাংস।’

‘মাংসের টাকাটা পরে নেব মামা। আগে বাঘটাকে নিয়ে আসি।’ বলে ডন প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

লেখার তাল কেটে গেলে এই এক সমস্যা। তার ওপর রহস্য-কাহিনি বলে কথা! যতবার কাগজের পাতায় রহস্য আনার চেষ্টা করি, ততবার ডনের বাঘ এসে হালুম করে ডেকে ওঠে। ডনের এই বাঘটার রহস্য আমার কাল্পনিক রহস্যটাকে বোকা বানায়। অগত্যা কাগজ-কলম রেখে হাই তুলে ভাবতে বসলুম এবং ভাবতে বসেই ভীষণ চমকে উঠলুম। ডন কী সত্যিই বাঘ কেনার জন্য দুটো টাকা নিয়ে গেল? দু-টাকায় বাঘ! সত্যিকার এবং জলজ্যান্ত বাঘ? ডনের বিচ্ছুপনার শেষ নেই। কিন্তু পারতপক্ষে আমার কাছে তো সে মিথ্যে কথা বলে না। অন্তত বলার কোনও প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাইনি। অনেক ক্ষেত্রে তার বোঝবার ভুল হয়েছে বলে তার অনেক কথা মিথ্যে প্রতিপন্ন হয়েছে। কিন্তু সে তো তার দোষ নয়। যেমন, আজব চাকতি খেয়ে রামু ধোপার গাধাটার ভালুক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। চাকতিটা যে লোকটা ডনকে বেচেছিল, মিথ্যেবাদী তো সেই লোকটাই। চাকতি থেকে গাধা ভালুক কিংবা ভালুক গাধা হয় না, সে কী ডন জানত?

ডনের দু-টাকায় বাঘ কেনা নিয়ে যত ভাবলুম, তত অস্বস্তি হল। এ-বাজারে দু-টাকায় বাঘ কেনা যায়, তার চেয়ে আশ্চর্য, বাঘের যে বড্ড আকাল পড়ে গেছে। ঘণ্টাখানেক পরে ধুপ ধুপ শব্দে টের পেলুম শ্রীমান আসছে। দরজায় উঁকি মেরে তাকে দেখতে পেয়ে বললুম, ‘কই রে? তোর বাঘ কোথায়?’

ডন হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘আমার সঙ্গে এসো তো মামা! শিগগির এসো।’

‘কোথায় যাব তোর সঙ্গে?’

‘আ, এসো না! বাঘটাকে নিয়ে আসবে।’

ডন আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল। মুখ খুলতেই দিল না, খেলার মাঠ পেরিয়ে ঝিল। ঝিলের ওধারে জঙ্গলের ভেতর ভাঙা শিবমন্দির। সেখানে গিয়ে সে চাপাস্বরে বলল, ‘বাঘটা মন্দিরের ভেতর আছে। আমার ভয় করছে বড্ড। তুমি ওকে নিয়ে এসো মামা।’

একটু অবাক হয়ে বললুম, ‘তুই দেখেছিস, মন্দিরের ভেতর বাঘ আছে?’

‘হুঁউ। চলো, তুমিও দেখবে।’

বুকটা ধড়াস করে উঠল। মন্দিরের ভেতর যদি সত্যি-সত্যিই একটা বাঘ থাকে, তাহলে তো বড্ড ভয়ের কথা। আমাকে দেখে যদি হালুম করে ওঠে, নির্ঘাত ভিরমি খেয়ে পড়ব, আর বাঘটা এসে আমার মাংস ছিঁড়ে খাবে। ভাবতেই শরীর ঠাণ্ডা হিম হয়ে গেল। বললুম, ‘ডন, তুই কী বলছিস? এই ভাঙা মন্দিরে বাঘ আসবে কোত্থেকে? আজকাল কী আর যেখানে-সেখানে বাঘ আছে নাকি? সব বাঘ তো এখন টাইগার প্রজেক্টে গিয়ে ঢুকেছে।’

ডন রাগ করে বলল, ‘ভ্যাট! তুমি বড্ড ভীতু, মামা। আগে গিয়ে দেখবে তো।’

পা টিপে-টিপে বটগাছের ঝুরির আড়ালে এগিয়ে গেলুম। ডন আমার পেছনে। এবার ফিসফিস করে বলল, ‘ওই দ্যাখো, লেজ নড়ছে। কী? দেখতে পাচ্ছ তো?’

সত্যি ওটা একটা লেজই বটে। কিন্তু কীসের লেজ, তা আরও ভালো করে দেখার জন্য প্রচন্ড সাহসে আরও কয়েক পা এগিয়ে গেলুম। তারপরই দেখতে পেলুম বাঘটাকে। বুকের রক্ত ছলাৎ করে উঠল। হাত-পা একেবারে অবশ হয়ে গেল যেন। হুঁ, সত্যিকারের বাঘ! একেবারে জলজ্যান্ত ডোরাকাটা কেঁদো বাঘ! দুই থাবার মাঝখানে মাথাটা রেখে জুলজুল করে তাকাচ্ছে। লেজটা মাঝে মাঝে নড়ছে, কিংবা পেছনের থাবা দিয়ে লেজ চুলকোচ্ছে।

ডন আমাকে আঙুলের ডগা দিয়ে খুঁচিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, ‘দেখলে তো?’

ওকে চোখ টিপে ইশারা করে অনেকটা তফাতে নিরাপদ জায়গায় সরে এলুম। তারপর দম আটকে-যাওয়া গলায় বললুম, ‘আশ্চর্য ডন! খুবই আশ্চর্য! এ যেন স্বপ্ন দেখছি রে ডন।’

ডন মুচকি হেসে বলল, ‘দু-টাকায় কিনেছি মামা।’

‘কিন্তু কিনলি কার কাছে?’

‘একটা লোকের কাছে।’

‘কোথায় সে?’

ডন এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। এখানেই বসেছিল লোকটা। আমি ওই গাছে ঘুড়ি পাড়তে উঠেছিলুম। ঘুড়িটা উঁচুতে আটকে আছে। পাড়তে পারলুম না। গাছ থেকে নেমে দেখি লোকটা বসে আছে।’

‘বুঝলুম। তারপর?’

‘লোকটা বলল, খোকাবাবু, বাঘ কিনবে? দু-টাকা দাম।’

‘তখন বাঘটা কোথায় ছিল?’

‘ওর পাশেই শুয়েছিল।’

‘তোর ভয় করল না?’

‘করছিল তো। লোকটা বলল, খুব ভালো বাঘ। কামড়ায় না। পোষা বাঘ কিনা।’

‘তারপর?’

ডন আনমনা হয়ে বলল, ‘তারপর তো তোমার কাছে টাকা চেয়ে এনে দিলুম। ও বলল, বাঘটা মন্দিরের ভেতর প্রণাম করতে ঢুকেছে। প্রণাম করা হলে বাড়ি নিয়ে যেও।’

‘তারপর সে চলে গেল তো?’

‘হ্যাঁ। যাবার সময় মন্দিরের সামনে গিয়ে বাঘটাকে বলে গেল, বুদ্ধুরাম! এই খোকাবাবুর সঙ্গে যাস। ওর কথা শুনিস।’ ডন দম নিয়ে ফের বলল, ‘বাঘটার নাম বুদ্ধুরাম, মামা!’

‘হুঁ! তারপর তুই বাঘটাকে আনতে গেলি বুঝি?’

‘গেলুম। কিন্তু বড্ড ভয় করল। তখন তোমাকে ডাকতে গেলুম।’

একটু ভেবে বললুম, ‘বাঘটার নাম বুদ্ধুরাম, তাহলে আয় তো, এবার ওকে নাম ধরে ডেকে দেখি!’

দুজনে আবার খুব সাহস করে ঝুরির আড়ালে এগিয়ে গেলুম মন্দিরের কাছে। তারপর সাহস করে এবং খুব স্নেহ-ভালোবাসা মাখিয়ে ডাকলুম, ‘বুদ্ধুরাম! ও বুদ্ধুরাম!’

কিন্তু আমাদের দুজনকেই ভীষণ হকচকিয়ে দিয়ে বাঘটা একেবারে মানুষের গলায় যেন বলে উঠল, ‘কে? গঙ্গু এলি নাকি! উঃ! খিদেয় নাড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে রে।’

তারপর সে মুখ তুলে আমাদের দেখতে পেল। দেখতে পেয়ে তড়াক করে উঠে বসল।

আসলে শরৎকালের ঝকমকে রোদ্দুরে এই জঙ্গলের ভেতর ঝাঁকড়া বটগাছের তলায় চকরা-বকরা ছায়া জমে আছে। আর ভাঙাচোরা মন্দিরের ভেতরটা দিনদুপুরেই আঁধার হয়ে আছে। চোখের ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ‘তবে রে ব্যাটাচ্ছেলে!’ বলে হুঙ্কার ছেড়ে এগিয়ে গেলুম। ‘একটা বাচ্চা ছেলেকে পেয়ে ঠকানোর মজা দেখাচ্ছি এবার!’ অমনি বুদ্ধুরাম মন্দিরের ভেতর থেকে বাঘের মতো চার ঠ্যাঙে (দরজাটা ছোট্ট) বেরিয়ে এক লাফ দিল। মতলব টের পেয়ে আমিও একখানা লাফ দিলুম। তবে বুদ্ধুরামের লেজের ডগাটাই শুধু ধরতে পারলুম এবং সেই শুকনো ডোরাকাটা জিনিসটা আমার মুঠোয় রয়ে গেল। বুদ্ধুরাম দুই ঠ্যাঙে নড়বড় করে দৌড়ে জঙ্গলের ভেতর উধাও হয়ে গেল।

ঘুরে দেখি, শ্রীমান মনমরা হয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। ওর কাছে গিয়ে বললুম, ‘যাক গে, যা হবার হয়ে গেছে। দুঃখু করিসনে। দু-টাকায় অন্তত বাঘের লেজ কিনতে পেরেছিস, এই যথেষ্ট। এই নে।’

ডন লাল-হলুদ রঙের ডোরাকাটা ন্যাকড়া জড়ানো খড়ের লেজটা হাতে নিল বটে, কিন্তু তক্ষুনি সেটা ছুড়ে ফেলে দিল। মুখটা বাঁকা। দৃষ্টি নীচের দিকে।

কাঁধে হাত রেখে বললুম, ‘দোষটা আমারই, জানিস? গতকাল ওই বুদ্ধুরাম গায়ে রঙ মেখে বাঘ সেজে খেলা দেখাচ্ছিল বাজারে। ওর সঙ্গী গঙ্গারাম ঢোল বাজিয়ে গান গাইছিল আর বুদ্ধুরাম বাঘের নাচ দেখাচ্ছিল। রাতারাতি ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিলুম। আজকাল আর আমার কিছু মনে থাকে না রে!’

ডন ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে গলার ভেতর বলল, ‘তাহলে ঘুড়িটা পেড়ে দেবে এসো।’

যাবার সময় বাঘের লেজটা কী ভেবে কুড়িয়ে নিল। খুশি হয়ে বললুম, ‘ওটা দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা যাবে। দু-টাকা দিয়ে কেনা একটা দারুণ স্যুভেনির! কী বলিস?’

ডন জবাব দিল না। এখন ওর চোখ সেই গাছটার দিকে, যার ডগায় ওর রঙিন ঘুড়িটা আটকে আছে। শরৎকালের ঝলমলে নীল আকাশের গায়ে মাথা কোটার ভঙ্গিতে ঘুড়িটা দুলে-দুলে উঠছে। ঘুড়িটার জন্য ডনের মতোই মায়া লাগছিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *