এক
আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে, বাংলায় তখন হুসেন শাহের রাজত্ব, হুগলির পোড়াবেগুন গ্রামে একটা ফ্লাইং-সসার নেমেছিল। এ কথাটা কোনও ইতিহাস বইয়ে পাবে না। কেন পাবে না, কোন বইয়ে পাবে—অত কথার আমি জবাব দিতে পারব না।
যা বলছিলাম। তখন সবে সন্ধে হয়েছে। শেয়াল ডাকছে। জোনাকি জ্বলছে। মশার ঝাঁক মহোৎসাহে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এমন সময় লায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের টার্নিকেট গ্রহ থেকে আগত সেই বিশাল মহাকাশযান সারা গ্রামের আকাশকে ঢেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
সেই ফ্লাইং-সসারের চেহারা ঠিক আলোয় গড়া এক দৈত্যাকার জেমস লজেন্সের মতন। তার গা থেকে যে উজ্জ্বল আলো ঠিকরে পড়ছিল তাতে পোড়াবেগুনের পথে পথে প্রাণভয়ে দৌড়ে বেড়ানো মানুষজনের প্রত্যেককে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু সেই মহাকাশযানের ভেতরে যারা ছিল, তারা পোড়াবেগুনের পথেঘাটে ছড়িয়ে থাকা কোনও জিনিসেই উৎসাহ দেখাল না। পোড়াবেগুনের বিখ্যাত জোড়ামণ্ডার খ্যাতি কামরূপ কলিঙ্গ অবধি বিস্তৃত ছিল। ভিনগ্রহের লোকেরা সেই জোড়ামণ্ডা মুখে তুলেও দেখল না। শুধু ভ্যাকুয়াম পাম্প দিয়ে অ্যালকেমিস্ট দধিবামন দেবশর্মাকে তার ঘরের মধ্যে থেকে চোঁ করে সসারের পেটের মধ্যে টেনে নিল।
এবার তাহলে দধিবামনের একটু পরিচয় দিতে হয়। আবার দধির কথা বলতে গেলে অ্যালকেমির কথা না বললেও চলে না।
অ্যালকেমিকে যদি আজকের কেমিস্ট্রির জনক বলা হয়, তাহলে বলতেই হবে, ছেলের থেকে বাপ অনেক বেশি সুন্দর ছিল। কারণ অ্যালকেমি মোটেই কেমিস্ট্রির মতন অমন ফর্মুলাকণ্টকীত নীরস সাবজেক্ট ছিল না। সাংঘাতিক রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল অ্যালকেমি। মাটির নীচের ঘরে, মশালের কাঁপা-কাঁপা আলোয়, তামা আর রুপোর তৈরি আলো-আঁধারি সব পাত্রের মধ্যে নানা রঙের সব তরল টগবগ করে ফুটত। আর সেইসব পাত্রের ওপর ঝুঁকে পড়ে, অ্যালকেমিস্ট দিনের পর-দিন বছরের পর-বছর ধরে চেষ্টা করে যেতেন পরশপাথর কিংবা প্যানাসিয়া আবিষ্কারের। প্যানাসিয়া কাকে বলে জানো তো? যে ওষুধ খেলে সমস্ত অসুখ সেরে যায়, তাকে বলে প্যানাসিয়া। এর কাছে কি ‘বাতাসের নিম্ন অপসারণের দ্বারা হাইড্রোজেন সালফাইড সংগ্রহ’ লাগে? তোমরাই বলো।
পাঁচশো বছর আগে ইওরোপে এই অ্যালকেমির ব্যাপক চর্চা ছিল। কখনও অ্যালকেমিস্টরা রাজার অনুগ্রহ পেত, আবার কখনও তাদের ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হত। পোড়াবেগুনের কালীবাড়ির পুরুতমশাইয়ের ছোটছেলে দধিবামনের যে কেমন করে এই ইউরোপীয় বিদ্যায় হাতেখড়ি হয়েছিল, তা আজকে বসে বলবার উপায় নেই। তবে দধির বিজ্ঞানমনস্কতা ছিল অসাধারণ। মাথাও ছিল খুব সাফ। গ্রামে ফ্লাইং-সসার নামার অল্প কিছুদিন আগেই সে একটা অদ্ভুত জিনিস বানিয়ে ফেলেছিল। না, না, পরশপাথর নয়। গায়ে মাখার সাবান। মনে রেখো, এটা পাঁচশো বছর আগের কথা। যদি দধিবামনের মা সেই সাবান গায়ে মাখতে গিয়ে হাত পিছলে পুকুরের জলে হারিয়ে না ফেলতেন, তাহলে হয়তো পৃথিবীর মানুষকে আরও কয়েকশো বছর গায়ে গন্ধ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হত না।
দধিবামনের সম্বন্ধে আর যা বলবার, তা হল, তার বয়েস উনিশ বছর, রোগাসোগা ভালোমানুষ গোছের চেহারা আর জিলিপি খেতে খুব ভালোবাসে।
তো, এই দধিবামনকেই ফ্লাইং-সসারের মধ্যে টেনে নিল ভিনগ্রহের চার জীব। বলাই বাহুল্য দধি তখন অজ্ঞান।
জীবগুলোকে কেমন দেখতে শুঁড় আছে না ডানা আছে, সে সব কথা পরে বলব।
আপাতত সেই ফ্লাইং-সসারের ভেতরের ছবিটা একটু দেখি।
সেই ফ্লাইং-সসারের আরোহী মোট চারজন। তাদের নাম, ধরা যাক আলফা, বিটা, গামা আর ডেল্টা।
আলফা এই মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন। বিটা শল্যচিকিৎসক। গামা বৈজ্ঞানিক।
আর ডেল্টা?
ডেল্টার বাবা এই মহাকাশযাত্রা স্পনসর করেছেন।
টার্নিকেট গ্রহের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য-সংস্থার মালিকের ছেলে হওয়া ছাড়া ডেল্টার আর কোনও গুণ নেই। সে মহা বখাটে এবং নেশাখোর একটি জীব।
মহামতি নিউটন তিনটি সূত্র আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন, যেগুলি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র, সবসময়ে সত্য। সে তো তোমরা নিশ্চয়ই জানো। ইদানীং আরও কয়েকটি সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। তারই একটি হল—মহাবিশ্বের সর্বত্রই সন্তানস্নেহ জিনিসটা অন্ধ।
তাই এ হেন ডেল্টাও যখন তার বাবার কাছে বায়না ধরল যে সে ফ্লাইং-সসারে চেপে মহাকাশ ভ্রমণে যাবে, তখন তার বাবা ক্যাপ্টেন-আলফাকে ডেকে বলে দিলেন, ওহে! তাহলে আমার ছেলেও তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছে। ব্যবস্থা করো!
মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করলেও আলফা বিটা গামা, সবাইকেই চুপচাপ ডেল্টার অন্তর্ভুক্তি মেনে নিতে হয়েছিল। কারণ পঞ্চম সূত্রটি হল,—সারা মহাবিশ্বেই স্পনসরদের কথাকে বেদবাক্য ধরা হয়। তাদের কেউ চটাতে চায় না। তারা চটে গেলে পয়সা দেবে কে?
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর, ফ্লাইং-সসারটা প্রথমেই কোনও লোকালয়ে নামেনি। নেমেছিল হিমালয়ের এক নির্জন অরণ্যে। একটা পাইন বনের মধ্যে সসারটা ল্যান্ড করা মাত্র ডেল্টা আড়মোড়া ভেঙে বলল, উঃ, বাকেট-সিটে চুপচাপ বসে থেকে থেকে সারা শরীরে জং লেগে গেছে। যাই একটু হাত-পা ছাড়িয়ে আসি। এই বলে কারুর অনুমতির তোয়াক্কা না করে, দরজা খুলে নেমে গেল।
মনে রেখো, এটা পাঁচশো বছর আগের কথা। তখন হিমালয় আজকের থেকেও অনেক নির্জন ছিল। আলফা তার রাডারে দেখল কিছু লেপার্ড আর কাক-চড়াই ছাড়া এ তল্লাটে অন্য কোনও প্রাণীর অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না। কাজেই ডেল্টা মহাকাশযান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়াতে সে খুব অপমানিত হল ঠিকই, কিন্তু কোনও বিপদের আশঙ্কা করল না।
বিপদটা কিন্তু লুকিয়েছিল একটা গুহার মধ্যে।
ডেল্টার মতনই এক চ্যাংড়া ছোঁড়া—সে অবশ্য পৃথিবীরই মানুষ—যতটা না ভক্তির টানে, তার চেয়ে বেশি নিশ্চিন্তে নেশাভাং করবে বলে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিল। সেই নবীন সন্ন্যাসী ওই ল্যান্ডিং-এর জায়গাটি থেকে একটু দূরেই এক গুহায় বসে অল্পস্বল্প ধ্যান করছিল, আর প্রচুর গাঁজা টানছিল। হঠাৎই গুহার মুখে একটি অদ্ভুত মূর্তি মুখ বাড়াল। সে মানুষ নয়।
এত অল্প পরিশ্রমেই যে দেবতা না হোক, কোনও অপদেবতারই দ্যাখা পাওয়া যাবে তা তো সেই সন্ন্যাসী স্বপ্নেও ভাবেনি। তার ওপর যখন সেই অদ্ভুত অপদেবতা দিব্যি তার পাশে বসে, তারই কলকেতে গাঁজা খেলেন তখন সেই সন্ন্যাসী তো যাকে বলে ‘আপ্পুত’ হয়ে গেল। দু-চার দিন ওই সন্ন্যাসীর সঙ্গে কাটিয়ে ডেল্টার গাঁজার নেশাটা যখন বেশ ভালোরকম ধরে গেল, তখন একদিন সে হঠাৎই গুহার বাইরে থেকে কিছু গাঁজাগাছের চারা আর সন্ন্যাসীর প্রমাণ সাইজের কলকেটা পকেটস্থ করে ফ্লাইং-সসারের দিকে হাঁটা দিল।
সন্ন্যাসীর কলকে হারিয়ে কোনও দুঃখ ছিল না। কারণ অপদেবতাটি যাবার সময়ে একটা শিরস্ত্রাণ গোছের কিছু গুহাতেই ফেলে গেছিলেন, যেটার ওজন হবে কম করে দশ কিলো আর যেটা পুরোটাই সোনার তৈরি। সন্ন্যাসী তো সেই শিরস্ত্রাণ বগলে নিয়ে দুই লাফে হিমালয় থেকে ভাগলপুরে নেমে এল। তারপর গেরুয়া-টেরুয়া ছিঁড়ে ফেলে একশো বিঘে জমি কিনে জমিদার বনে গেল।
ওদিকে ডেল্টা ফ্লাইং-সসারে ঢোকামাত্র আলফা অবাক হয়ে বলল, ও কী বাবা ডেল্টা! তুমি স্পেস-হেলমেটটা কোথায় ফেলে এলে?
বিটা নাকটাক কুঁচকে বলল, এঃ, কেমন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ ছাড়ছে। তুমি কি গাঁজার নেশা ধরেছ না কি? এ গাছ তো টার্নিকেটে জন্মায় না। পেলে কোথায়?
ডেল্টা ঢুলুঢুলু চোখে উত্তর দিল,—অস্তি অলকানন্দা তীরে প্রভূত গঞ্জিকা তরু।
গামা বলল, বাবাঃ! এ যে দুদিনেই পৃথিবীর ভাষা শিখে গেছে দেখছি। যাই হোক আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। এই ছোকরা দুটো দিন বরবাদ করে দিয়েছে। আমাদের গন্তব্য এখন হুগলির পোড়াবেগুন গ্রাম। ল্যাটিচিউড একশোবারো দশমিক ছয়, লঙ্গিচিউড ছাপ্পান্ন।
তারপর তো ফ্লাইং-সসার সেই পোড়াবেগুন গ্রামের আকাশ ঢেকে দাঁড়াল, এবং দধিবামনকে সেই গ্রহান্তরের জীবেরা মহাকাশযানের মধ্যে টেনে নিল।
তারপর কী হল?
তারপর দধিবামনের মাথায় তারা অস্ত্রোপচার করল। মানে, মূল অপারেশনটা সার্জেন বিটাই করল। তাকে সাহায্য করল বাকি সকলে।
কেন সেই অস্ত্রোপচার, কী ছিল তার উদ্দেশ্য আর পরিণামই বা কী হল,—তা ওই চারটি জীবের সেই মুহূর্তের কথোপকথন থেকেই বুঝতে পারবে।
বিটা—স্ক্যানের রিপোর্ট তো খুবই আশাব্যঞ্জক, ক্যাপ্টেন আলফা। এই মানুষটির মস্তিষ্ক আমাদের সবরকম প্রযুক্তির ব্লুপ্রিন্ট নেওয়ার পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে।
আলফা—তা হলে আর দেরি কীসের সার্জন বিটা? আমাদের পাঁচশো বছর এগিয়ে থাকা প্রযুক্তি চালান করে দেওয়া হোক এই মর্ত্যমানুষের মস্তিষ্কে। আহা, বেচারারা আর কতকাল গোরুর গাড়ি চেপে যাতায়াত করবে? যাঁতা ঘুরিয়ে ডাল পিষবে? প্রদীপের আলোয় পড়াশোনা করবে? ভাবো, কম্পিউটার তো দূরের কথা, কলমের ব্যবহার অবধি জানে না। হাঁসের পালক-টালক দিয়ে লেখে। এই দ্যাখো, ডেল্টা আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। ওহে ডেল্টা! উঠে পড়ো। অপারেশনের ব্যবস্থা করতে হবে তো।
গামা—আমি কিন্তু আবারও বলছি কম্যান্ডার বিটা, খোদার ওপর এই খোদকারি আমার একটুও ভালো লাগছে না। বিবর্তনের নিয়মে মানুষ ইলেকট্রিসিটি থেকে কম্পিউটার অবধি সবকিছু স্বাভাবিক ভাবেই শিখে নিত। হয়তো দু-পাঁচশো বছর বেশি সময় লাগত। আমাদের এই হস্তক্ষেপে ওদের উপকার হবে, না অপকার, তা কে বলতে পারে।
বিটা—তুমি বড় হতাশায় ভোগো হে গামা। একটু মর্নিং-ওয়াক টোয়াক করতে পারো না?
এ কি, ডেল্টা! তুমি যে নেশার ঝোঁকে কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর গিয়ে পড়ছ! অত গাঁজা খেলে কাজকর্ম করা যায়? তোমার মতন নেশাড়ুকে টিমে ঢোকানোই ভুল হয়েছে। সেই যে হিমালয়ের সাধুবাবার কাছ থেকে নেশাটা ধরলে, আর ছাড়তে পারলে না।
আলফা—যা বলেছ! একেবারে বড়লোকের বখা ছেলে বলতে যা বোঝায়। কিন্তু গামা, তুমি আমাদের আর বাধা দিও না। পরোপকারের এমন সুযোগ বারবার আসে না। আর ভেবে দ্যাখো, এই এক দধিবামনের মাথা থেকে পরপর বেরিয়ে আসবে দেশলাই কাঠি, সেলাইমেশিন, বিদ্যুৎ, স্টিম ইঞ্জিন, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, মোবাইল, কম্পিউটার…আর বছরে বছরে পৃথিবীর চেহারা বদলে যাবে। ক্ষমতার জোরে এই সামান্য রোগাপটকা ছেলেটা হয়ে উঠবে সারা পৃথিবীর অধীশ্বর। তখন কি ভীষণ মজা হবে না? আমরা ছাড়া আর কেউ তো জানবে না পেছনের গল্পটা। এমনকী এই ছেলেটারও জ্ঞান ফেরার পরে এই মহাকাশযানের কথা কিছুই মনে থাকবে না।
আরে এই ডেল্টা! তুমি পায়ে মাফলার বেঁধে বসে আছ কেন? নাও, নাও, ছেলেটার ব্রেন-স্টেমে ব্লু-টুথ লাগিয়ে দাও। ডাটা ট্র্যান্সফার করতে হবে তো।
বিটা—অপারেশন কমপ্লিট ক্যাপ্টেন। এই ডেল্টা! তোমার কি নেশা কেটেছে? তাহলে আমাকে একটু হেল্প করো। এই ছেলেটাকে ঠিক পাঁচ ঘণ্টা ঘুম পাড়িয়ে রাখার মতন করে হিমায়িত করে দাও। অপারেশনের পরে ওইটুকু রেস্ট ওর দরকার।
মনে রেখো, ওদের হিসেবে পাঁচ ঘণ্টা। আমাদের পাঁচ ঘণ্টা মানে কিন্তু ওদের পাঁচশো বছর। ভুল কোরো না।
পাড়িয়েছ ঘুম? চলো, এবার তাহলে আমরা ওকে ওর বাড়িতে নামিয়ে রেখে আসি। ক্যাপ্টেন আলফা, আমাদের মহাকাশযানকে আবার একটু নীচে নামান, মানে ওই পোড়াবেগুনের কালীবাড়ির ঠিক মাথার ওপরটায় নিয়ে আসুন। আমরা ছেলেটাকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিই।
আলফা—যা ভয় পাচ্ছিলাম তাই হয়েছে। ওই ব্যাটা ডেল্টা নেশার ঘোরে কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর গিয়ে পড়েছিল। কাঁটা ফাঁটা সব নড়ে গেছে। এখন আর পোড়াবেগুনের লোকেশন খুঁজে পাচ্ছি না। পায়ের নীচে তো দেখছি ঘোর জঙ্গল। বাঘ-টাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছেলেটাকে এখানে নামালে তো বাঘে খেয়ে ফেলবে। জঙ্গলের পাশে আবার সমুদ্রও আছে দেখছি।
গামা—মরেছে! আপনি একটু দক্ষিণ দিকটায় গিয়ে দেখুন দেখি,—লোকালয় দেখতে পান কি না। আর সার্জন বিটা, আপনি ডেল্টার মাথায় এক বালতি জল ঢালুন। ইমিডিয়েটলি।
আলফা—এখানে তিনটে গ্রাম দেখছি কম্যান্ডার গামা। সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলিকাতা। একটা কালীবাড়িও দেখছি জঙ্গলের মধ্যে। চিতে ডাকাতের কালীবাড়ি। জায়গাটার নাম চিতপুর। বেশ নিরিবিলি জায়গা। বাঘের ভয়েই বোধহয়, লোকজন বেশি আসে না। দধিবামনকে এখানে টুক করে নামিয়ে দেব?
বিটা—হ্যাঁ দিন। ডেল্টাকে বলুন মাথার দিকটা ধরতে। আইস-বক্সটাকে মাটির নীচে ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখবেন। না-হলে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই দধিবামন বুনোশুয়োর কিম্বা বাঘের পেটে চলে যাবে। আশা করি জেগে উঠে ওই কালীবাড়িতে আশ্রয় পেতে ওর অসুবিধে হবে না।
ওঃ! ভাবতে পারছি না। আর দু-চার দিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে ওর ভেলকিবাজি। বদলাতে শুরু করবে পৃথিবী। ওঃ, ভাবা যায়, পরের বছর এই সুতানুটি গ্রামে ট্রাম চলবে। আমরা একবার এসে দেখে যাব কেমন, ক্যাপ্টেন আলফা? চলুন, এখন আমাদের প্রিয় টার্নিকেট গ্রহে ফেরা যাক।
ভিনগ্রহীদের কথোপকথন এইখানেই শেষ। নিজেদের গ্রহে ফেরার পরে ওদের মধ্যে তিনজনের আর পোড়াবেগুন কিংবা পৃথিবীর কথা মনেও রইল না। কিন্তু চতুর্থজন, অর্থাৎ ডেল্টার নাওয়া খাওয়া ছুটে গেল। কারণ, সে স্বগ্রহে ফিরে আসার পরে হঠাৎই আবিষ্কার করল যে গাঁজার কলকেটা দধিবামনের সঙ্গে সেই আইসবক্সের মধ্যেই শুইয়ে রেখে এসেছে। সেটা আর টার্নিকেটে ফেরত আসেনি।
দুই
চিলেঘরে বসে অঙ্ক কষছিল নীল্টু। তার ভালো নাম নীলোৎপল, তবে অত শক্ত নাম ধরে কেউ ডাকে না। সবাই নীল্টুই বলে। নীল্টু ক্লাস ফাইভে পড়ে।
তখন দুপুরবেলা। এই সময়ে বাইরে চিতপুর রোডটা দু-এক ঘণ্টার জন্যে হঠাৎই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়। ট্রামের ঘড়ঘড়ানি শোনা যায় না। গাড়ির হর্নগুলোও যেন একটু কম কম বাজে। আজ রোদ উঠেছে প্রচণ্ড। সেই জন্যেই বোধহয় রাস্তায় মানুষজনও নেই বললেই চলে। বর্ষা নামলে, রথের দিন থেকে, তাদের বাড়ির উল্টোদিকের যাত্রা কোম্পানিগুলোর অফিসে ভিড় শুরু হবে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসবে যাত্রাপালা বুকিং-এর জন্যে। আপাতত ওই সব অফিসের লোকগুলোও মান্ধাতার আমলের ঝুল কালি মাখা টেবিলফ্যান চালিয়ে হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। চারদিকেই কেমন যেন একটা ঘুম ঘুম ভাব।
নীল্টু আরেকবার সামনে খুলে রাখা অঙ্ক খাতাটার দিকে তাকাল। বাবা পুরো গরমের ছুটিটায়, রোজ দুপুরে কুড়িটা করে অঙ্ক দিয়ে যাবে বলেছে। আজই প্রথমদিন। কুড়িটার মধ্যে তিনটে অঙ্ক করেও ফেলেছে সে। কিন্তু সেই তিনটে অঙ্কের উত্তরের দিকে তাকিয়ে আর কোনও অঙ্ক কষার ইচ্ছেটাই চলে গেল নীল্টুর।
প্রথম অঙ্কটা ছিল পিতা আর পুত্রের বয়সের অঙ্ক। দশ বছর বাদে পিতার বয়স কত হবে, পুত্রেরই বা কত? নীল্টুর উত্তর বেরিয়েছে পিতার বয়স হবে তেরো বছর, আর পুত্রের বাইশ।
দ্বিতীয়টা, চৌবাচ্চায় জল ভরা আর খালি হওয়ার অঙ্ক। কতক্ষণে চৌবাচ্চাটি ভরতি হইবে? উত্তর—তিনশো তিরিশ বছর ন’মাস আঠেরো দিনে।
সবচেয়ে আশ্চর্য উত্তর বেরিয়েছে গরু, মহিষের অঙ্কটায়। কুড়িটি গরুর দামে ওই ব্যক্তি ক’টি মহিষ কিনিতে পারিবে? নীল্টুর উত্তর বেরিয়েছে চার পূর্ণ তিনের ছাপ্পান্নটি।
চার পূর্ণ তিনের ছাপ্পান্ন! মানে ভগ্নাংশের মোষ! নীল্টু নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। এরকম মোষ কি হয়? মা দুর্গার পায়ের কাছে অবশ্য দেখেছে সে ভগ্নাংশের মহিষ,—এদিকে একের দুই, ওদিকে একের দুই। মধ্যিখান থেকে খড়গ হাতে দাঁত খিচিয়ে উঠে এসেছে মহিষাসুর। কিন্তু তাই বলে তিনের ছাপ্পান্ন! এই খাতা সন্ধেবেলায় বাবার সামনে পড়লে, তার ফলাফল কী হবে, তাই ভাবছিল নীল্টু।
হঠাৎ তার কানে এল বাইরে ছাদ থেকে প্রবল ইলিচ মিলিচ কিলিচ আওয়াজ। তাড়াতাড়ি চিলেঘর থেকে ছাদে বেরিয়ে নীল্টু দেখল, একটা বাঁদর। যে বাঁশের খুঁটিটায় কাপড় মেলবার দড়িটা বাঁধা আছে, সেই তৈলাক্ত বাঁশটা বেয়ে চার হাত উঠছে, আবার পিছলে তিন হাত নেমে যাচ্ছে। পিছলে পড়ার সময় ভয়ের চোটে অমন পরিত্রাহি আওয়াজ ছাড়ছে।
নীল্টু প্রচণ্ড রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল,—এই হতচ্ছাড়া বাঁদর। কী দরকার তোর তেলমাখা বাঁশে অত কষ্ট করে ওঠবার? আমাদের বাঁশ দেওয়ার জন্যে?
সেই চিৎকার শুনে বাঁদরটা নার্ভাস হয়ে হাত-পা এলিয়ে ঝপাং করে পড়ল একেবারে পাঁচিল টপকে নীচে। এই রে, মরে গেল না কি?
নীল্টু তাড়াতাড়ি ছাদের পাঁচিল থেকে মুখ বাড়িয়ে নীচের দিকে তাকাল, এবং অবাক হয়ে দেখল, কে যেন নীচে দুটো জলপূর্ণ চৌবাচ্চা বানিয়ে রেখে গেছে। তার একটায় ঘণ্টায় কুড়ি গ্যালন জল ঢুকছে, আরেকটা থেকে মিনিটে দু-লিটার জল বেরিয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, সেই চৌবাচ্চায় পড়েছে বলে বাঁদরটা বেঁচে গেছে। কিন্তু চৌবাচ্চার পাড়ে বসে যে অসাধু ব্যবসায়ীটি তিন অনুপাত দুই হারে দুধে জল মেশাচ্ছিল, তার এতে ভয়ংকর ক্ষতি হয়ে গেছে। বাঁদরের বদলে সে-ই এখন তারস্বরে চেঁচাচ্ছে।
নাঃ, এত গোলমালের মধ্যে আর যাই হোক, অঙ্ক হয় না। একটু পার্কের দিক থেকে ঘুরে আসি।—এই ভেবে নীল্টু রাস্তায় বেরোল।
হাম্বা আ আ আ। নীল্টু চমকে পেছন ফিরে তাকাল। যা ভেবেছে তাই। গরু, মোষেরা মাঠ থেকে চরেটরে ফিরছে। কুড়িটা গরু, চারটে মোষ…আর সামনে ওটা কী? অবাক হয়ে নীল্টু দেখল, কালো কালো ভিজে ভিজে একটা থ্যাবড়া নাক, তার নীচে কোদালের মতন চওড়া একপাটি দাঁত আর গোলাপি খড়খড়ে জিভ—ব্যস, এইটুকুই। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে।
বুঝতে আর কিছুই বাকি রইল না নীল্টুর। ওইটাই সেই তিনের ছাপ্পান্ন অংশ মহিষ। ছাপ্পান্ন ভাগের তিন ভাগ মাত্র। এর চেয়ে আর কত বেশি হবে? কিন্তু খেপে আছে না কি নীল্টুর ওপরে ওই আধখ্যাঁচড়া মোষটা? থাকতেই পারে। সত্যি কথা বলতে কী, নীল্টুর গণিতপ্রতিভার কারণেই তো ওর এরকম অসম্পূর্ণ শরীরে পৃথিবীতে আসা। সেই জন্যেই বোধহয় কোদালের মতন দাঁতগুলো সোজা ওর দিকে তেড়ে আসছে। ভয়ের চোটে কাঁপুনি লেগে গেল নীল্টুর শরীরে।
না, না কাঁপুনি লাগেনি। কে যেন ঝাঁকাচ্ছে ওকে ধরে।
—দাদামণি, এই দাদামণি! ওঠ। অঙ্ক কষার নাম করে চিলেঘরের মেঝেয় শুয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিস যে বড়!
অতিকষ্টে চোখ মেলে নীল্টু দেখল, ওর বোন রিনি মহা উত্তেজিত মুখে ওকে জাগাবার চেষ্টা করছে। ওকে চোখ মেলতে দেখে রিনি বলল,—শিগগিরি দেখবি চ, একটা কেমন অদ্ভুত লোক আমার খেলার ঘরে বসে আছে।
নীল্টু রিনির সঙ্গে একতলায় নেমে এল।
নীল্টুদের এই বাড়িটার বয়েস অনেক। একশো বছর তো হবেই। এককালে খুব সুন্দর দেখতে ছিল বাড়িটা, যখন নীল্টুর দাদুর বাবা সাহেবি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তাঁর তৈরি করা এই বাড়ি। নীল্টু ঠাকুমার কাছে গল্প শুনেছে, তিনিও নাকি বিয়ে হয়ে এসে সেই সৌন্দর্যের কিছুটা দেখতে পেয়েছিলেন। এক কালে নাকি দোতলার ওই মস্ত ছাদে পোষা ময়ূর চরে বেড়াত। পুরো দোতলাটাকে ঘিরে যে টানা বারান্দা, তার মেঝেটা ছিল নানান রঙের পাথরের টুকরো বসিয়ে পালিশ করা, আর বাড়ির সবক’টা জানলা দরজার মাথায় যে ফুল লতাপাতার সুন্দর আলপনার কিছুটা এখনও দেখা যায়, সেগুলো তখন সবই আস্ত ছিল। ওগুলোকে বলে পঙ্খের কাজ।
যে বাড়িটায় সে জন্ম থেকে বড় হয়েছে সেই বাড়িটাকে নীল্টুর মাঝে মাঝে কেমন যেন রহস্যময় মনে হয়।
মনে হয়, এই বাড়িটার মধ্যেই এমন অনেক জায়গা আছে যেসব জায়গায় সে এখনও পৌঁছোতে পারেনি। কখনও সে বারান্দা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দ্যাখে—একতলার ওপরে, কিন্তু দোতলার একটু নীচে একটা ঘরের ছাদের মতন কী যেন দেখা যাচ্ছে। ওটা কি সত্যিই একটা ঘর? তাই যদি হয়, তাহলে কোনদিকে সেই ঘরে ঢোকার রাস্তা? কে থাকে ওখানে? কখনও নীল্টু একটা ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে মুখ গলিয়ে দেখতে পায়, ওদিক দিয়ে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে। তাদের বাড়িতে তো একটাই সিঁড়ি। ওই সিঁড়িটা তাহলে কোথায় যাচ্ছে! ভারি অবাক হয় নীল্টু। বাবা কিংবা মাকে এসব কথা জিগ্যেস করলে তারা হেসেই উড়িয়ে দেয়। বলে রহস্য গল্প পড়ে পড়ে তুই নিজেই রহস্য বানাতে শিখে গেছিস। কিন্তু নীল্টু নিশ্চিত জানে, এর একটাও তার বানানো নয়। এই বাড়িটার মধ্যে সত্যিই আরেকটা বাড়ি লুকিয়ে আছে। সে শুধু ভাবে সেই আরেকটা বাড়িতে কি আরেকটা পরিবারও আছে, তাদের মতন? তাদের সঙ্গে কি কোনওদিন দেখা হয়ে যেতে পারে তার?
রিনির কথা শুনে প্রথমেই নীল্টুর মনে হল, সেরকমই কারুর সঙ্গে কি রিনির দ্যাখা হয়ে গেল তা হলে?
নীচে নেমে এসে নীল্টু দেখল, ইতিমধ্যে মা-ও ঘুম থেকে উঠে পেছনের উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই উঠোনেরই এককোণে রিনির খেলাঘর। সেটাকে ঘর বলা যায় কি না, সে ব্যাপারে অবশ্য সন্দেহ রয়েছে। আসলে বাড়ির পেছন দিক থেকে যে সিঁড়িটা দোতলায় উঠে গেছে, মানে যেটা দিয়ে দাদুদের আমলে মেথরেরা দোতলার বাথরুম পরিষ্কার করতে উঠত, তারই তলার জায়গাটা। সেই সিঁড়ির ঘরটাকেই মা পরিষ্কার-ঝরিষ্কার করে রিনির খেলার ঘর বানিয়ে দিয়েছিল। সারা দুপুর রিনি নিরুপদ্রবে ওই নিরিবিলি ঘরে তার পুতুলের সংসার নিয়ে বসে থাকত। আজ দুপুরে পুতুলের ঘরে ঢুকে সে দ্যাখে কি সেখানে একটা আস্ত মানুষ বসে আছে।
রিনি মেয়েটার বয়েস মাত্র পাঁচ বছর হলে কী হবে? সে ভয়ংকর সাহসী। যে কারণে নীল্টু সন্ধেবেলায় একতলায় কোনও কাজে যেতে হলে বোনকে ডেকে নিয়ে যায়। আজও লোকটাকে তার খেলার ঘরে বসে থাকতে দেখে রিনি একটুও ঘাবড়ায়নি। বলেছে,—জানো, আমার ফুলমামু পুলিশ? তুমি যদি দুষ্টুলোক হও তাহলে তোমাকে ফুলমামু ধরে নিয়ে যাবে।
তাতেও যখন লোকটা কোনও সাড়াশব্দ করেনি, তখন সে প্রথমে বাড়ির ভেতরে গিয়ে মাকে ডেকে, তারপরে চিলেঘরে গিয়েছিল দাদাকে ডাকতে।
নীল্টুর মা প্রথমে খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন রিনির কথা শুনে। কিন্তু দিনেদুপুরে চিতপুর রোডের মতন ঘিঞ্জি জায়গায় ভয় বেশিক্ষণ টিকতে পারে না; আপনা থেকে পালায়। একটা হাঁক ছাড়লে এক্ষুনি একহাজার লোক জড়ো হয়ে যাবে। ভয়টা কীসের? রিনির মা কোমরে আঁচল জড়িয়ে দেখতে গেলেন মুখপোড়াটা কে? কিন্তু সিঁড়ির ঘরে ঢুকে যা দেখলেন, তাতে তাঁর মনের ভাব সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল। মুখপোড়া কোথায়? এ তো রামায়ণ-মহাভারতে যে ঋষি-কুমারদের কথা পড়া হয়, সেরকমই এক ঋষিকুমার! প্রায় কিশোরই বলা যায়। ফরসা ছিপছিপে চেহারা। পরনে ধুতি, আর গায়ে একটা উড়নি। চান করে এসেছে বোধহয়, সারা গা মাথা জলে সপসপ করছে। রিনির মা দেখলেন, ছেলেটার গলায় বেশ মোটাসোটা একটা পৈতেও আছে। তাহলে কি এ পুরুতমশাই? কিন্তু এ পাড়ার সব পুরুতমশাইকে তো তিনি চেনেন, একে কখনও দেখেছেন বলে তো খেয়াল পড়ছে না। সে যাই হোক, ছেলেটার মুখটা দেখলেই মায়া লাগে। এমনভাবে জড়সড়ো হয়ে ঘরের কোণে বসে আছে যে, মনে হচ্ছে মেলায় হারিয়ে যাওয়া কোনও শিশু।
নীল্টুর মা ছেলেটার দিকে এক পা এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলেন,—তুমি কে বাবা? এই অবেলায় চান করেছ কেন? আর এখানেই বা কী করছ?
ছেলেটা সেইরকমই ভয়বিহ্বল দৃষ্টিতে নীল্টুর মায়ের মুখের দিকে চেয়ে বলল,—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এটা কোন জায়গা? পোড়াবেগুন কোথায়?
রিনি খিলখিল করে হেসে উঠল। নীল্টু ছেলেটার পেছনে দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় আঙুল ঠেকিয়ে মুখে হতাশ ভঙ্গি করে ঘাড় নাড়াল।
নীল্টু যা ইঙ্গিত করছিল, তার মায়েরও সেইরকমই সন্দেহ হল ছেলেটার কথা শুনে। বেচারা পাগল। তবু আরেকটু নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য প্রশ্ন করলেন,—তুমি বেগুনপোড়া খেতে ভালোবাসো বুঝি?
—খেতে ভালোবাসি না। পোড়াবেগুন গ্রামে আমার বাড়ি। সেই বাড়ির ঘরে আমি ঘুমিয়েছিলাম। তারপর যখন ঘুম ভাঙল, দেখলাম, ওই গর্তটার মধ্যে শুয়ে আছি। আমার চারপাশে বরফকুচি ছড়ানো ছিল। আমার শীত করছিল খুব। তাই ওপরে উঠে এলাম।
—গর্ত! ও মা! গর্ত আবার কোথায়? ছেলেটাকে পেরিয়ে রিনির মা সিঁড়ির ঘরের অন্ধকার কোণটার দিকে এগিয়ে গেলেন, এবং যা দেখলেন তাতে তার চোখ কপালে উঠে গেল। গর্ত নয়, ঠিক যেন একটা মানুষপ্রমাণ লম্বা বাক্স; মেঝেতে পোঁতা রয়েছে। সেই বাক্সের ডালাটা এতদিন মেঝের সঙ্গে মিশেছিল। আজ সেটা উলটে পড়ে আছে একটু দূরে। ডালার ওপরটা কাদা মাটিতে মাখামাখি ঠিকই, কিন্তু ভেতর দিকটা রুপোর মতন ঝলমল করছে। আরেকটু কাছে গিয়ে বাক্সটার মধ্যে মুখ নামিয়ে কী আছে তা দেখার চেষ্টা করলেন নীল্টুর মা। নাঃ, আর কিছু নেই। তবে সত্যিই ভেতরটা ভীষণ ঠান্ডা, আর কেমন একটা ওষুধ-ওষুধ গন্ধ। ছেলেমেয়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে রিনির মা বললেন,—আমার মাথা ঘুরছে রে নীল্টু। কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের ঘরে বাক্সের মধ্যে জ্যান্ত মানুষ পোঁতা ছিল? যা, তোদের বাবাকে শিগগিরি ডেকে আন। তবে ঘরে লোকজন থাকলে চেঁচামেচি করে এতসব কথা বলতে যাস না।
—তাহলে কী বলব?
—বলবি ইয়ে…। তোমার নাম কী বাবা? ছেলেটিকে প্রশ্ন করলেন নীল্টুর মা।
—দধিবামন দেবশর্মা।
—বলবি, একবার ওদিকে চলো। দধিদাদা এসেছে।
তিন
বাবাকে ডাকতে রিনি বা নীল্টুকে বেশি দূর যেতে হল না। বাড়ির একতলারই কোণার একটা ঘরে তিনি যথারীতি মাইক্রোস্কোপে মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওইটাই তাঁর ল্যাবরেটরি। দিনের মধ্যে আঠেরো ঘণ্টা তিনি ওই ঘরেই পড়ে থাকেন। তাঁর পুরো নাম বিজন রায়। পাড়ার লোকে পরিহাস করে বলে বিজু বৈজ্ঞানিক।
ঘরে ঢুকেই অবশ্য ওরা বাবাকে কিছু বলবার সুযোগ পেল না। কারণ একজন অচেনা লোক তখন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ংকর চেঁচামেচি করছিল। বাবার বানানো ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে তার বাড়ির ইঁদুরগুলোর নাকি শুয়োরের মতন স্বাস্থ্য হয়েছে। সে কথা শুনে যদি বাবা একটুও দুঃখিত হত, তাহলে হয়তো লোকটার রাগ পড়ে যেত। কিন্তু বাবা উল্টে এ খবরে মহা উৎসাহিত হয়ে বলল,—বা, বা, বা। এ তো দারুণ খবর শোনালেন। তাহলে ওটাকে ইঁদুর মারা বিষ হিসেবে ব্যবহার না করে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলেই তো হয়। ইসস, ফরমুলাটা আবার কোথায় হারিয়ে ফেললাম। এই তো পেয়েছি। হুঁ, হুঁ, হুঁ, টেটোক্লোরা রডোডেনড্রন আর ডাইবেঞ্জোন্যাপথালিন…কিনবেন না কি আপনি ফরমুলাটা? জিনিসটা বানিয়ে কৌটোর গায়ে লিখে দেবেন, ইহা সেবন করাইলে এক সপ্তাহে হাতির আকারের পাঁঠা পাইবেন।’ দেখবেন কসাইদের মধ্যে কেনবার জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে।
লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ বিজুবাবু বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আসলে, রিনি-নীল্টুর বাবা সারাক্ষণ এক কল্পনার জগতে বিচরণ করেন। সে জগতে তিনি চিতপুর রোডের ভাঙা বাড়ির বাসিন্দা, দারিদ্র্যে ডুবে যাওয়া বিজন রায় নন; সেখানে তিনি এক বিশ্ববিখ্যাত আবিষ্কারক। মাইকেল ফ্যারাডে কিংবা অ্যালফ্রেড নোবেলের মতন তাঁর আবিষ্কারগুলোও সারা পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছে। তাঁর বাড়ির সামনে ব্যবসায়ীদের লাইন পড়ে যাচ্ছে পেটেন্টের জন্যে।
নীল্টু ডাকে বিজুবাবুর সম্বিত ফিরল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কীরে, ডাকতে এসেছিস কেন?
নীল্টুর আর রিনি তাঁকে ঝড়ের বেগে দধিবামনের আগমন কাহিনির আদ্যোপান্ত শুনিয়ে দিল।
—বলিস কীরে! মাটির নীচে বাক্সের মধ্যে শুয়েছিল? প্রাচীনকালে কি তাহলে কলকাতাতেও মৃত্যুর পরে মমি করার প্রচলন ছিল? ওহো, না-না। এ তো জ্যান্ত মানুষ বলছিস। তাহলে বোধহয় কোনও যোগীপুরুষ-টুরুষ হবেন। আমাদের দুঃখ দূর করবার জন্যে আমাদের ঘরে ইয়ে…আবির্ভূত হয়েছেন।
মোটামুটি এই শেষের ধারণাটাই নীল্টুদের পরিবারের চারজনেরই বেশ মনে ধরে গেল। তারা ঠিক করল, এক্ষুনি কাউকে কিছু বলবে না। দু-চারদিন দ্যাখাই যাক না, যদি দধিবামন নিজে থেকে কিছু বলে। না বললেই বা ক্ষতি কী। চোর-ডাকাত তো আর নয়, আর বাইরে থেকেও আসেনি। সত্যি কথা বলতে কী দধি আক্ষরিক অর্থেই তাদের ‘ঘরের লোক’। তাদের ঘরের মধ্যেই বলতে গেলে ওর পুনর্জন্ম হয়েছে।
পরের দুদিন রিনি আর নীল্টুর পড়াশোনা ডকে উঠল। তারা দুজনে সারাক্ষণ দধিদাদার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, আর যা কিছু অদ্ভুত দ্যাখে, দৌড়ে গিয়ে মা-বাবাকে জানায়।
—জানো তো মা, দধিদাদা বলছে ও কখনও জামার বোতাম দ্যাখেনি।
—জানো তো, ওদের গৌড়ের রাজবাড়িটাও না কি আমাদের বাড়ির মতনই ছোট ইট দিয়ে বানানো।
—দধিদাদা না একবর্ণও ইংরেজি জানে না।
—আর কাগজও দ্যাখেনি কোনওদিন। আমার বই-খাতাগুলো দেখে জিগ্যেস করছিল, এমন ধবধবে সাদা ভুর্জপত্র কোথায় পেলে?
—হ্যাঁ গো, ছেলেটা জাতিস্মর নয় তো? নীল্টুর মা বিজুবাবুকে জিগ্যেস করলেন।
—জাতিস্মরদের তো বর্তমান জন্ম বলেও একটা জিনিস থাকে। এর তো সেরকম কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। না কি বর্তমান জন্মটা ভুলে গেছে, আর গতজন্মটা মনে আছে? সেরকমটা হওয়া অবশ্য একটু বাড়াবাড়ি।
নীল্টুর মা মানতে বাধ্য হলেন যে হ্যাঁ, সেটা বাড়াবাড়ি।
—তাছাড়া, দধি তো বলতে গেলে রিনির প্রায় চোখের সামনেই মাটির নীচের ওই বাক্স থেকে উঠল। সেটার ব্যাখ্যা কী?
সত্যিই। তারও কোনও ব্যাখ্যা ছিল না কারুর কাছে।
ব্যাখ্যা ছিল না দধিবামনের আরও অনেক আচরণের। সে একবার জানলা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরেই সেই যে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেছে, আর তাকে কিছুতেই বার করা যায়নি। এবং বাড়ির মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় ঘর বিজুবাবুর ল্যাবরেটরিটি। সেই যে দুদিন আগে সে ওই ঘরটায় ঢুকেছে, সেখান থেকে আর বেরোয়ইনি বলতে গেলে। বিজুবাবু প্রথম প্রথম একটু উদ্বিগ্ন ছিলেন দধিকে নিয়ে—পাছে সে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা কাচের শিশিবোতল, টেস্ট-টিউব, ফ্লাস্ক এসব ফেলে দেয় কিংবা বুনসেন-বার্নার থেকে আগুন ধরিয়ে ফেলে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বিজুবাবু বুঝে গেলেন যে ল্যাবরেটরির কাজে দধি তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।
দধিবামন নিজের মনে সারাক্ষণ খুটখাট কাজ করে যাচ্ছে ল্যাবরেটরিতে। জিগ্যেস করলে বলে, তার মাথায় নানান আইডিয়া ঠেলাঠেলি করছে। তাড়াতাড়ি সব বানিয়ে ফেলতে হবে। একদম সময় নেই।
কীসের তাড়া কে জানে? তবে বিজুবাবুর মন্দ লাগে না। এতদিন একা একা ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন। এখন আরেকটা মানুষ পাশে এল। তবে দধিবামন আরেকটু আলাপী হলে ভালো হত। ছেলেটা বড্ড গম্ভীর।
নীল্টুর মা বলে, মোটেই গম্ভীর নয়। আসলে চিন্তামগ্ন। সারাক্ষণ মাথায় ওর কী সব যেন ঘুরছে।
বিজুবাবু ভাবেন,—জয়গুরু। সিদ্ধপুরুষটি যদি আমার ল্যাবরেটরিতে বসে মোক্ষম একটা কিছু বানিয়ে ফেলে, তবে বেশ হয়। ওর কি আর নামডাকের দিকে খেয়াল আছে? লোকে না-হয় জানল বিজন রায়ই একটা সাংঘাতিক জিনিস আবিষ্কার করেছে।
বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না বিজুবাবুকে। তিনদিনের মাথায়, রাত তখন প্রায় বারোটা বাজে, দধিবামন ভারি অহঙ্কারী মুখে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল।
বিজুবাবু মশারি খাটাচ্ছিলেন। দধিকে দেখে জিগ্যেস করলেন,—কী ব্যাপার দধি?
নীল্টু, রিনি আর ওদের মা-ও কৌতূহলে ঘিরে ধরল দধিবামনকে।
—কী আবিষ্কার করেছি দেখুন! গর্বে ফেটে পড়ছে দধিবামনের মুখ।
—দ্যাখাও। দ্যাখাও, দ্যাখাও।
দধিবামন একটা বড় পিচবোর্ডের মতন জিনিস মেঝেতে পাতল। তারপর খুব সাবধানে একটা হাতদেড়েক লম্বা প্যাকাটি, তার মুখের কাছটায় আবার কালো কালো কী সব মাখানো, বার করে সেই পিচবোর্ডের ওপর দূর থেকে সাবধানে ঘষা মাত্র ফোওওস করে কাঠিটায় আগুন জ্বলে উঠল। সেই জ্বলন্ত কাঠিটা মশালের মতন ঘোরাতে ঘোরাতে দধিবামন বলল,—চকমকি পাথরের দিন শেষ। এবার থেকে ঘরে ঘরে ব্যবহার হবে আমার এই দীপশলাকা।
—দীপশলাকা! মানে দেশলাই? মুখে আঁচল চাপা দিয়েও হাসির তোড় সামলাতে পারছিল না নীল্টুর মা। বাকিদেরও অবস্থা তথৈবচ।
হাসতে হাসতেই নীল্টুর মা রান্নাঘর থেকে একবাক্স দেশলাই এনে দধিবামনের হাতে দিয়ে বললেন,—তুমি কোন যুগের লোক? আমরা তো জন্ম থেকেই টেক্কা মার্কা দীপশলাকা ব্যবহার করছি। চকমকি পাথর চোখে দেখিনি।
নীল্টুর মায়ের বাড়িয়ে ধরা বাক্সটা থেকে দধিবামন সাবধানে একটা দেশলাইকাঠি জ্বেলে হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ না কাঠিটা পুড়তে পুড়তে তার হাতে এসে ছ্যাঁকা দিল। তারপর সে পোড়া কাঠিটা ফেলে দিয়ে আস্তে আস্তে নীচে নেমে গেল। পেছন থেকে নীল্টু খুব আস্তে বলল,—বেচারা।
পরের ঘটনাটা এর ঠিক দুদিন পরের।
একতলার রান্নাঘরে বসে রান্না করছিলেন নীল্টুর মা। দধিবামন দরজার সামনে দিয়ে তার প্রিয় ল্যাবরেটরির দিকে যাচ্ছিল। যেতে যেতে সে হঠাৎ রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। উনুনে তখন টগবগ করে ভাত ফুটছিল। ভাতের হাঁড়ির ঢাকনাটা ভুটভাট শব্দে উঠছিল নামছিল। সেইদিকে তাকিয়ে দধিবামন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখে আর পলক পড়ে না।
দধিবামনের এই ভাবান্তর নীল্টুর মায়ের চোখ এড়ায়নি। তিনি জিগ্যেস করলেন,—কী হল দধি? খিদে পেয়ে গেছে না কি?
—উঁহু। সম্মোহিতের মতন ঘাড় নাড়ল দধিবামন। তারপর আর একটিও কথা খরচা না করে চলে গেল ল্যাবরেটরির দিকে। সেখান থেকে বেরোল একেবারে পরদিন সকালে। হাতে পুরোনো পাউডারের টিন, দু-চারটে পাইপ আর রিনির পুরোনো খেলনা জিপগাড়ি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি একটা জিনিস। সেটা হাতে নিয়ে সে রান্নাঘরের দিকেই এগোল। পেছনে পেছনে রিনি, নীল্টু, ওদের বাবা-মা।
দেশলাই কাঠিঘটিত বিপর্যয়ের ব্যাপারটা এখনও মাথা থেকে যায়নি। তাই বেশি উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে সরাসরি কাজের মধ্যে ঢুকে গেল দধিবামন। হাতের যন্ত্রটাকে উনুনের ওপর বসিয়ে বলল,—এই আবিষ্কার পৃথিবীকে বদলে দেবে।
—তাই বুঝি? বিজুবাবুর গলায় ব্যঙ্গের স্বর।
—হ্যাঁ। দধিবামন একইরকম সিরিয়াস স্বরে বলে গেল,—গতকাল আপনার রান্নাঘরে উনুনের ওপর ভাতের হাঁড়ির ঢাকাটাকে ওঠানামা করতে দেখে বিদ্যুতের মতন মাথায় এসে গেল ভাবনাটা,—এই বাষ্পের শক্তিকে কল চালানোর কাজে লাগালে কেমন হয়? এই কৌটোটার মধ্যে জল আছে। দেখুন বাষ্পের জোরে কেমন চাকা ঘোরে।
একটু বাদে ফোঁস ফোঁস শব্দে খেলনা জিপগাড়ির চাকা ঘুরতেও লাগল। সেইদিকে তাকিয়ে দধিবামন ভাবুকের মতন বলে যেতে লাগল,—খুব শিগগিরি এর থেকে একশোগুণ বড় চাকা হাজারগুণ বেশি শক্তিতে চালাবে বড় বড় তাঁতকল, আস্ত শহরের মতন বিশাল জলযান…সে সবের ছবিও আমার মাথার মধ্যে আছে। শুধু বানিয়ে ফেলার অপেক্ষা।
ওরা চারজন হতভম্বের মতন দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ বিজুবাবু ভয়ংকর রেগেমেগে দধিবামনের হাত ধরে হিড়হিড় করে রাস্তার দিকের জানলায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন তাকে। বললেন,—দ্যাখো তো, ওই রোড-রোলারটা কীসে চলছে।
সামনের রাস্তায় পিচ দেওয়া হচ্ছিল। বিরাট স্টিম রোলারটা ফোঁস ফোঁস শব্দে একবার এগোচ্ছে, একবার পিছোচ্ছে, আর তার বয়লারের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে রাশি রাশি সাদা বাষ্প।
দধিবামন কিছুক্ষণ হাঁ করে সেই দৃশ্য দেখে তারপর জানলার সামনে থেকে দু-হাতে মুখ ঢেকে তাড়াতাড়ি পিছিয়ে এল। আবার যখন নীল্টুদের দিকে ফিরে চাইল, তখন তার চোখে শূন্য দৃষ্টি।
সেই চোখের দিকে চেয়ে আজ নীল্টুরাও আর হাসতে পারল না।
চার
প্রফেসর কইশিঙি ইঁচামুড়া একজন প্রতিভাবান বদমাশ।
টোকিও অবজার্ভেটরি থেকে দামি দামি মেশিন চুরি করার অপরাধে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাতে প্রফেসর ইঁচামুড়ার বয়েই গিয়েছিল। তিনি সেইসব চোরাই মেশিন দিয়ে জাপান উপসাগরের জনমানবহীন দ্বীপ আনখাইয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাডারটি বসিয়ে ফেলেছিলেন। এই কাজের তিনি কোনও সাক্ষী রাখতে চাননি। তাই তার কোনও মানুষ সহযোগী ছিল না। ছিল কেবল এক সর্বকর্মা রোবট সহকারী—প্রফেসর ইঁচামুড়া আদর করে তার নাম দিয়েছিলেন ‘কাজেকামে মোটামুটি’। নামটা জাপানি হলেও ও নামের মানেটা বাংলার কাছাকাছি। ‘কাজেকামে মোটামুটি’ মানুষের সমস্তরকম কাজই মোটামুটিভাবে সেরে ফেলতে পারত।
যতই প্রতিভাবান হন, প্রফেসর ইঁচামুড়াও ভাবতে পারেননি যে, রাডারটার ট্রায়াল-রান দেওয়ার সময়েই ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর কাছ থেকে রেডিয়ো সংকেত পেয়ে যাবেন।
সংকেত তো নয়, আকুল আবেদন।—’শোনো হে, শোনো হে, শোনো হে পৃথিবীর মানুষ! গতকাল সন্ধেবেলায় কলকাতা গ্রামের চিতপুর কালীবাড়ির কাছে একটি ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আসার সময়ে ভুলক্রমে আমার প্রিয় গাঁজার কল্কেটি আইস বক্সের মধ্যে ফেলে এসেছি। যদি পেয়ে থাকো, দয়া করে পরের মহাকাশফেরিতে টার্নিকেট গ্রহের মিস্টার ডেল্টার কাছে পাঠিয়ে দিও। আমাকে এরা গ্রহবন্দি করে রেখেছে। না-হলে আমি নিজেই চলে যেতাম।’
গতকাল সন্ধেবেলায় পৃথিবীতে অন্য গ্রহের মহাকাশযান নেমেছিল! কোথায় এরকম কোনও খবর তো কোনও অবজার্ভেটরি থেকেই পাওয়া যায়নি। প্রফেসর ইঁচামুড়া কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে ব্যাপারটা ভাবলেন। তারপরেই তার খেয়াল হল টার্নিকেট আর পৃথিবীর সময়ের হেরফেরের ব্যাপারটা। দ্রুত কিছু অঙ্ক কষে ফেললেন তিনি, এবং দেখলেন, টার্নিকেটের মহাকাশযান কলকাতার চিতপুরে নেমেছিল পৃথিবীর হিসেবে পাঁচশো বছর আগে।
এরপর প্রফেসর নেট সার্চ করে দেখলেন ‘গাঁজার কল্কে’ জিনিসটা কী? তিনি ভেবেছিলেন কোনও দুর্লভ বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম হবে। যখন দেখলেন একেবারেই অন্য জিনিস তখন তিনি পুরো ব্যাপারটাতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। তাছাড়া অন্য গ্রহের জীবটি জানে না, মহাকাশফেরির মতন আধুনিক জিনিস এখনও পৃথিবীতে চালু হয়নি।
তবু প্রায় ঠাট্টার ছলেই প্রফেসর ইঁচামুড়া একটা জবাবি রেডিয়ো সংকেত পাঠালেন,—’ছেলেটার ব্যাপারে যদি একটু ডিটেলে বলেন, তবে আপনার কল্কে উদ্ধারের চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
সঙ্গে-সঙ্গেই মহা উৎসাহে খটাখট করে টার্নিকেট গ্রহের ডেল্টা মশাইয়ের কাছ থেকে জবাব চলে এল,—’ছেলেটার নাম দধিবামন। আমার সঙ্গীরা ভেবেছিলেন, পৃথিবী গ্রহটা জ্ঞানবিজ্ঞানে অনেক পেছিয়ে আছে। তাই তারা দধিবামনের মাথায় আমাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান লোড করে দিয়ে চলে এসেছিলেন। দধিবামনকে আমি পাঁচঘণ্টার জন্যে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছিলাম। এতদিনে তো সে নিশ্চয়ই সারা পৃথিবীতে বীরের সম্মান পাচ্ছে। সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য সারা পৃথিবী নিশ্চয়ই তার কাছে ঋণী।’
প্রফেসর ইঁচামুড়াকে এমনি এমনি প্রতিভাবান বলিনি। তিনি এই উত্তর পেয়েই ডেল্টার কাছে জানতে চাইলেন,—’পাঁচ ঘণ্টার হিসেবটা কাদের মাপে করেছিলেন? টার্নিকেটের, না পৃথিবীর?’
কিছুক্ষণ সমস্ত রাডার চুপচাপ।
তারপর উত্তর এল,—এই রে…।’
—কাজেকামে! এই কাজেকামে, হাঁক পাড়লেন প্রফেসর ইঁচামুড়া।
ডাক শুনে ঘরে ঢুকল কাজেকামে মোটামুটি। তাকে দেখলে অবশ্য রোবট বলে বোঝার কোনও উপায় নেই। একটি বছর দশেকের জাপানি বালকের মতন দেখতে কাজেকামেকে। গায়ে কিন্তু তার সাংঘাতিক জোর, আর বুদ্ধিও কম নয়।
—কাজেকামে গোছগাছ করে নাও। আমাদের একটু ইন্ডিয়ায় যেতে হবে। টু বি স্পেসিফিক, যেতে হবে কলকাতায়। আরও স্পেসিফিকালি বলতে গেলে, চিতপুরে গিয়ে খুঁজতে হবে দধিবামনকে। তার ঘুম ভাঙার সময় হয়ে গেছে। খুব সম্ভবত উঠেই পড়েছে এতক্ষণে।
‘গদাধর অপেরা’ নামের যাত্রা কোম্পানির মালিক গদাধর সানা তার ষোলোর দুই চিতপুর রোডের একচিলতে অফিস-ঘরে টেবিলের ওপর দু-পা তুলে দিয়ে, টিনের চেয়ারে বসে ঘুমোচ্ছিলেন।
গদাধর অপেরা একেবারেই ছোট কোম্পানি। আলাদা আলাদা লোককে কাজে লাগানোর মতন পয়সা নেই বলে গদাধর সানা নিজেই যাত্রাপালা লেখেন, নিজেই সেই পালার জন্যে গান বাঁধেন, সুর দেন। নায়ক হওয়ার মতন চেহারাটা নয়, তাই নায়কের অ্যাক্টিংটা করতে পারেন না। তবে ভিলেনের রোলটা করে পয়সা বাঁচান।
সাধারণত, যাত্রাপালা হয় তিনরকমের। সামাজিক, ঐতিহাসিক কিংবা পৌরাণিক। গদাধর সানার পড়াশোনাটা একটু কম আর কল্পনাশক্তিটা ভয়ংকর রকমের বেশি বলে, তার লেখা পালাগুলোয় এই তিনরকমের ধাঁচ প্রায়ই মিলে মিশে যায়। যেমন ধরা যাক, শুরুটা হল পৌরাণিক দিয়ে। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন তাঁর অজ্ঞাতবাসের কালে ব্যাধের বেশে মণিপুরের বনের ভেতর দিয়ে চলেছেন। কাঁধে ধনুক, পরনে বাঘছাল। হঠাৎই পেছন থেকে উচ্চস্বরে আদেশ ভেসে এল,—হল্ট। অর্জুন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, আজাদ হিন্দ ফৌজের কিছু সৈনিক তাঁর দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অর্জুনকে তো তারা ব্রিটিশের চর ভেবে ধরে নিয়ে গেল তাদের ক্যাম্পে। সেখানে অর্জুনের হাতের অসামান্য টিপ দেখে তাকে আজাদ হিন্দ ফৌজে ঢুকিয়ে নেওয়া হল। মানে ঐতিহাসিকের দিকে পালা ঘুরে গেল আর কী। অতঃপর ক্যাম্পের চারিধারে যেসব আদিবাসীরা থাকে, তাদের ওপর জমিদারমশাইয়ের অত্যাচার দেখে অর্জুনের প্রাণ কেঁদে উঠল, এবং তিনি জমিদারের উদ্দেশে বাণ নয়, একটি করুণ সুরে গান ছাড়লেন। শুরু হয়ে গেল সামাজিক। এইরকম আর কী!
তো, এই সানামশাই ফুরফুর করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। ঠেলেঠুলে যে তার ঘুম ভাঙাল তাকে আমরা ইতিমধ্যেই চিনে গেছি। হ্যাঁ, প্রফেসর ইঁচামুড়া।
প্রফেসর ইঁচামুড়ার সঙ্গে গদাধর সানার দীর্ঘক্ষণ ব্যবসায়িক কথাবার্তা হল। ঠিক হল জাপানে আগামী বছর যে বিশ্ব নাট্য উৎসব হতে চলেছে, যার প্রধান কর্মকর্তা না কি মিস্টার ইঁচামুড়া, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে একমাত্র গদাধর অপেরাই যাওয়ার সুযোগ পাবে। বলা বাহুল্য সবটাই গুল। তবে এইসব গুল মেরে ইঁচামুড়া যে কাজটা হাসিল করল, সেটা হল, কাজেকামে মোটামুটিকে গদাধর অপেরার চিতপুর রোডের ঘরটায় আগামী দু-মাসের জন্যে রাখার ব্যাপারটা পাকা করে ফেলল। কাজেকামে ওই ঘরে থাকবে, গদাধরের যাত্রাপার্টির লোকেদের কাবুকি ড্যান্স শেখাবে, অল্পসল্প জাপানি ভাষা এবং আদবকায়দাও শেখাতে পারে।
গদাধর সাগ্রহে কাজেকামেকে অফিসঘরে থাকার বন্দোবস্ত করে দিল, কারণ জাপানিরা যাতে তাদের আপন করে নেয় সেই জন্যেই না কাজেকামে তাদের ওই সব শেখাতে চাইছে।
তবে এতসব কিছুর পেছনে প্রফেসর ইঁচামুড়ার আসল উদ্দেশ্যটা যে ছিল রাস্তার ঠিক উলটোদিকের বাড়িটার ওপর নজরদারির ব্যবস্থা করা, তা তোমরা নিশ্চয় এতক্ষণে ধরে ফেলেছ। ইঁচামুড়া পুরোনো বইপত্র ঘেঁটে ঠিক বার করে ফেলেছে—ওইখানেই পাঁচশো বছর আগে ছিল চিতে ডাকাতের কালীমন্দির। আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই বাড়িটারই তো এখন নম্বর দুশো বারোর দুই। নীল্টুদের বাড়ি। মানে দধিবামনের বর্তমান আবাসস্থল।
সত্যি কথা বলতে কী, গতকাল বিকেলে উলটোদিকের ফুটপাথে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে ভাঁড়ে চা খেতে খেতে ইঁচামুড়া দধিবামনকে দেখেও নিয়েছে। কাল বিকেলের দিকে আকাশ কালো করে কালবোশেখির মেঘ জমেছিল। বাজ পড়ছিল মুহুর্মুহু। তার মধ্যেই ধুতি পরা রোগা মতন ছেলেটা ঘুড়ি ওড়াবার জন্যে দুশো বারোর দুইয়ের ছাতে উঠে এল। সে ঘুড়ির সুতোয় আবার সুইচ বাঁধা। ঘুড়ি উড়ল, এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হল। অর্থাৎ, সুতো বেয়ে নেমে আসা বিদ্যুতের ধাক্কায় দধিবামন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের মতনই ছাতের কোনায় ছিটকে পড়ল, এবং জ্ঞান হওয়া মাত্র ইউরেকা…থুড়ি…অহো অহো বলে দু-হাত তুলে নাচতে লাগল।
প্রফেসর ইঁচামুড়া একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এক চুমুকে ভাঁড়ের বাকি চা-টা শেষ করে ফেললেন। যাগগে। দধিবামন এখন সবে ইলেকট্রিসিটির চরিত্র আবিষ্কার করেছে। মানে হাতে এখনও বেশ কিছুটা সময় আছে।
পাঁচ
ষোলোর দুই চিতপুর রোডে, গদাধর অপেরার অফিসঘরে, পুরোদমে যাত্রার রিহার্সাল চলছিল। গদাধর সানার আগামী পালা ‘বালক কৃষ্ণ’। এই পালা নিয়েই সে জাপান-সফরের স্বপ্ন দেখছে।
ভারত-জাপান মৈত্রীর ব্যাপারটাকে জোরদার করার জন্যে সে কাজেকামেকে দিয়েছে বালক কৃষ্ণের পার্ট। আপাতত গদাধর অপেরার অফিসঘরে বালক কৃষ্ণ হাতে জাপানি হাতপাখা নিয়ে, লম্বা কিমোনোয় শরীর ঢেকে, ঘুরে ঘুরে কাবুকি নাচছে। কাবুকিছন্দে খোল বাজাতে বাজাতে যাত্রা কোম্পানির পুরোনো সদস্য পাঁচুগোপাল মন্তব্য করল,—কৃষ্ণের গায়ের রংটা একটু বেশি ফরসা হয়ে গেল না, গদা-দা?
—তুই থাম তো পাঁচু। ফরসা রংকে কালো করতে ক’মিনিট লাগে রে? এই বাসুকি কোথায় গেল, বাসুকি? আয়, ঠিক এইখানটাতে মাথা নীচু করে বোস। কৃষ্ণ তোর মাথায় উঠে নাচবে।
গদাধরের ডাকে মাধব মিত্তির ঘরের মাঝখানটায় এসে হাঁটু গেড়ে বসল। মাধবের বয়েস এখন চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে। বছরদশেক আগেও সে গুরু হনুমানজির আখড়ার চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগির ছিল। পাহাড়ের মতন চেহারা। গদাধর অপেরার যে-কোনও পৌরাণিক পালায় তার একটা না একটা পার্ট বাঁধা। রামলীলায় রাবণ, কংসবধে কংস, কর্ণার্জুনে ভীম। ‘বালক কৃষ্ণ’ পালায় সাপের মুখোশ-টুখোশ লাগিয়ে সে-ই সাজবে বাসুকি নাগ। আপাতত, মাধব একটা লাল টুকটুকে হাফপ্যান্ট পরে তার পাহাড়ের মতন চেহারাটা নিয়ে ঘরের মাঝখানটিতে এসে হাঁটু মুড়ে বসল। কাজেকামে কাবুকি নাচতে নাচতে তার মাথার ওপর লাফিয়ে উঠে পড়ল।
—বাপরে মারে মরে গেলাম রে! কাটা পাঁঠার মতন ছিটকে পড়ল কুস্তিগির মাধব মিত্তির। তারপর শুয়ে শুয়েই ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে কাঁদতে শুরু করল,—আমার ঘাড়টা ভেঙে গেল গো, গদা-দা। আমি চোখে সরষেফুল দেখছি যে গো-ও-ও-ও।
কাজেকামে অপ্রস্তুত মুখে ঘরের এক কোনায় সরে গেল। মাধবকে ঘিরে ধরল গদাধর আর অন্যান্য অভিনেতারা। তার মুখচোখে জলের থাবড়া দিতে দিতে পাঁচুগোপাল বলল,—তুই কি সত্যি বলছিস রে মাধব? ওই একরত্তি ছেলেটার চাপে তোর ঘাড় ভেঙে গেল? আরে, হনুমান সেজে যে তুই রাম আর সীতার মতন দুটো জোয়ান মরদ অ্যাকটরকে ওই কাঁধে চাপিয়েই ঘুরিস, সে তো আমাদের নিজের চোখে দ্যাখা। আজ তাহলে হল কী?
গদাধর বারবার নিজের কপালে দু-হাত জড়ো করে ঠুকতে ঠুকতে বলতে লাগল,—কী হল, সে আর মাধব কেমন করে বুঝবে রে পাঁচুগোপাল? তবে তোদের একটা কথা বলি—সেরকম মন দিয়ে অ্যাকটিং করলে ভক্তের শরীরে ভগবানের আবির্ভাব হয়। কাজেকামের শরীরে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল। সেই জন্যেই…
—সেই জন্যেই আমি সত্যিকারের বাসুকিবধ হয়ে যাচ্ছিলাম, না? রাখো গদা-দা তোমার আবির্ভাব। আমি বাসুকির রোল করতে পারব না। ওঃ, ব্যাটাচ্ছেলের পা তো নয়, যেন লোহার মুগুর। তোমার ইচ্ছে হয় তো তুমি ওকে ঘাড়ে তুলে নাচো, আমি নেই।
ঘাড়ে ভিজে গামছা ঘষতে ঘষতে বেরিয়ে গেল মাধব মিত্তির।
ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে মনে মনে জিভ কাটল কাজেকামে। ইসস, বড্ড অসাবধানতার কাজ হয়ে গেছে। লোহা নয়, লোহার চেয়েও অনেক ভারী ইরিডিয়ামের অ্যালয় দিয়ে প্রফেসর ইঁচামুড়া তার শরীরের কাঠামোটা বানিয়েছেন। ওজন পাঁচশো কেজির কাছাকাছি। অমন লাফ মেরে মাধবের ঘাড়ে চড়াটা একদম ঠিক হয়নি। ব্যাটা মরে গেলে সব প্ল্যান কেঁচে যেত।
প্রফেসর ইঁচামুড়া সব শুনে কাজেকামেকে এই মারে তো সেই মারে। বলল,—তোমাকে আর নজরদারি করতে হবে না। যথেষ্ট হয়েছে, তুমি এবার সরাসরি চলে যাও আমাদের পরের প্ল্যানে। এনট্রি নাও বিজন রায়ের বাড়িতে।
পরেরদিন ভোরবেলায় সদর দরজা খুলতে গিয়ে নীল্টুর মা দেখেন কি একটা খাঁদা বোঁচা মিষ্টি মতন বাচ্চা ছেলে বিষণ্ণ মুখে গালে হাত দিয়ে তাদের রোয়াকে বসে আছে। দেখে ভারি মায়া হল নীল্টুর মায়ের। আহা, ছেলেটার বয়েস নীল্টুর মতনই হবে। জিগ্যেস করতে, পরিষ্কার বাংলায় বলল, সে খুব গরিব ঘরের ছেলে। পয়সা রোজগারের জন্যে বাবা যাত্রাদলে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। গ্রামে থাকতে সে ইস্কুলে পড়ত। সেই ইস্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছে বলেই তার খুব মনখারাপ।
এই সব শুনে নীল্টুর মা তো একেবারে মুগ্ধ। আহা। স্কুল যেতে পারছে না বলে কষ্ট পাচ্ছে…এরকম সোনার টুকরো ছেলেও হয় তা হলে! তার নীল্টুকে দেখলে তো এ কথা বিশ্বাস করাই কঠিন। তিনি কাজেকামের মাথায় হাত-টাত বুলিয়ে জিগ্যেস করলেন,—তোমার নাম কী, বাবা?
—কাজেকামে মোটা…ইয়ে…কাজল কুমার মাইতি।
—বাঃ! খুব সুন্দর নাম। তা বাবা কাজল, তুমি পড়াশোনার জন্যে একদম ভেবো না। গদাধর অপেরা থেকে যখনই ছুটি পাবে, এই বাড়িতে চলে আসবে। এখানে দধিদাদা আছে। সে তোমাকে পড়া দেখিয়ে দেবে। আর নীল্টু বলে আমার একটা ছেলে আছে। তোমারই বয়সি হবে। তুমি না হয় তার বইখাতাগুলো নিয়েই পড়াশোনা কোরো।
নীল্টুদের সঙ্গে কাজেকামের তখনই আলাপ হয়ে গেল। কিন্তু নীল্টু বা রিনি কারুরই কাজেকামেকে একটুও পছন্দ হল না। কেন যে হল না, সেটা ওরা ওদের মাকে ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারল না। পরে রিনি নীল্টুকে বলল,—কাজলের গায়ে কেমন মেশিন মেশিন গন্ধ, না রে দাদামণি?
—ঠিক বলেছিস। আর চোখ দুটো ঠিক যেন কাচের তৈরি। কোনও ভাব ফোটে না।
ওদের যে তাকে পছন্দ হয়নি, সেটা কাজেকামে ঠিকই বুঝে নিয়েছিল। তাই সেদিন দুপুরে সে আর দোতলায় নীল্টুদের ঘরের দিকে গেল না। সোজা একতলায় ল্যাবরেটরিতে ঢুকে পড়ল। গত দুদিনে উলটোদিকের বাড়িতে বসে বসে কাজেকামে লক্ষ করেছে যে, ঠিক এই সময়টাতেই বিজু বৈজ্ঞানিক একটু ঘুমোবার জন্যে ওপরে চলে যায়। একতলায় থাকে কেবল দধিবামন।
সেদিনও দধিবামন ল্যাবরেটরিতেই ছিল। একা-একাই কাজ করে যাচ্ছিল সে। সামনে লোহার হুক থেকে টাঙানো গোটাকতক ব্যাঙের ঠ্যাং, নুন জলে ভেজানো। আজ সে অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু অন্যমনস্ক ছিল।
পরপর কত কিছুই যে তার মাথার মধ্যে ভিড় করে আসছিল। পোড়াবেগুনের বাড়িতে তার নির্জন সাধনকক্ষটির কথা মনে পড়ে গেল দধিবামনের। সেখানে সারা জীবনে যা আবিষ্কার করতে পারত না, এখানে পাঁচদিনে তার থেকে বেশি আবিষ্কার করে ফেলেছে সে। দুঃখ একটাই। তার সমস্ত আবিষ্কারই কেমন করে যেন অনেক আগেই কেউ না-কেউ জেনে ফেলেছে। কবে যে পোড়াবেগুনের বাইরের পৃথিবীটা এত এগিয়ে গেল! সে তো কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। যেমন এ-ও সে কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, কেমন করে সে এই সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায়, অচেনা মানুষগুলোর মধ্যে এসে পড়ল।
পোড়াবেগুন থেকে ছিটকে বাইরে চলে আসার এই যে দুঃখ, বাবা-মা-বন্ধুবান্ধব কাউকে দেখতে না পাওয়ার এই কষ্ট—সমস্তই দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে দধিবামন শুধু একটাই আশায়। সে তার আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে একদিন আর্যভট্টের মতন, নাগার্জুনের মতন বিখ্যাত হবে। এখন শুধু মন দিয়ে মাথার মধ্যেকার নির্দেশগুলোকে বাইরে নিয়ে আসা।
কী হতে পারে তা জেনেই যেন দধিবামন একটা তামার তার দিয়ে সামনে ঝোলানো ব্যাঙের ঠ্যাংটা ছুঁয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ঠ্যাংটা লাফিয়ে উঠল, আর উৎফুল্ল হয়ে উঠল দধিবামনের মুখ।
—মাস্টারমশাই!
কে এমন অদ্ভুত সম্বোধন করে! ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল দধিবামন।
—মাস্টারমশাই, আমি কাজে…সরি কাজলকুমার। আপনার কাছে অঙ্ক শিখতে এসেছি।
অঙ্ক না শেখানোর কিছু নেই। পোড়াবেগুনের অনেক বাচ্চাই তার কাছে শুভঙ্করীর আঁক শিখতে আসত। দু-দশ মিনিট বাচ্চাটার পেছনে খরচ করলে তার গবেষণার এমন কিছু ক্ষতি হবে না। বরং একঘেয়েমি থেকে একটু মুক্তি পাবে—এই ভেবে দধিবামন সস্নেহে বলল,—কই, কীরকম আঁক, নিয়ে এসো তো দেখি।
দু-চার মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল, অঙ্কের ব্যাপারে কাজেকামেই দধিবামনকে স্নেহ দেখাতে পারে। কারণ কাজেকামের মাথায় লোড করা আছে গণিতের সর্বাধুনিক শিক্ষা, আর দধিবামনের মাথায় টার্নিকেট গ্রহের জীবদের ভরে দেওয়া যে প্রোগ্রাম, তা এখনও মেট্রিক পদ্ধতি অবধিই পৌঁছোতে পারেনি।
ব্যাপারটা বুঝে নিয়েই কাজেকামে নিজেকে সংযত করে ফেলল। অঙ্কের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সে ভারি ঘনিষ্ঠ মানুষের মতন দধিবামনের গা ঘেঁষে বসল। তারপর আহ্লাদের গলায় বলল,—একটু বেড়াতে যাবেন মাস্টারমশাই?
—বেড়াতে! কোথায়?
—ওই কলেজ স্কোয়ারে? মেলা বসেছে জানেন না? যাবেন?
—না, না। আমার এখন মেলাটেলা দেখার সময় নেই। অনেক কাজ রয়েছে আমার। তুমি বরং এখন এসো। আবার কালকে অঙ্ক দেখিয়ে দেব।
কাজলকুমারের রোগা ফরসা হাতদুটো দধিবামনকে জড়িয়ে ধরল। তারপরেই দধিবামন ভারি আশ্চর্য হয়ে দেখল তার পা দুটো মাটি থেকে শূন্যে উঠে গেছে। মানে, কাজলকুমার তাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে ঘরের বাইরে।
ভয়ে বিস্ময়ে দধিবামনের বাকরোধ হয়ে গেল। ছেলেটা কি মানুষ নয়? ভূত? কাজেকামের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্যে সে শেষচেষ্টা হিসেবে পা দুটো জোরে ছুড়ল। টাল সামলাতে পারল না কাজেকামে। একটু টলে যেতেই তার হাতটা ল্যাবরেটরির টেবিলের ওপর রাখা একটা টিনের চাকতির স্তূপের মতন কীসের ওপর গিয়ে যেন পড়ল।
শব্দ হল…দুম…ফট…চ্যাঁক…ঘচাং।
বিচ্ছিরি শব্দ করে দাঁড়িয়ে গেল কাজেকামে। দধিবামনকে জড়িয়ে ধরা তার হাত দুটোও নেতিয়ে পড়ল দুপাশে। মুক্ত দধিবামন একটা লাফ মেরে ঘরের কোণায় সরে গেল এবং অবাক হয়ে দেখল, এক জাপানি সাহেব ঘরে ঢুকে কাজলকুমারকে জড়িয়ে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে চলেছে। কাজল সেই সাহেবের কাঁধে ভর দিয়ে কোনওরকমে লেঙচে লেঙচে হাঁটছে, আর সবচেয়ে বীভৎস কাণ্ড, তার ব্রহ্মতালু থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
এই সব দেখেটেখে দধিবামনের মাথাটা এমন ঘুরে গেল, যে সে ধপ করে ল্যাবরেটরির মেঝের ওপরেই বসে পড়ল।
ছয়
কাজেকামেকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন প্রফেসর ইঁচামুড়া। তার সমস্ত কুকাজের সহায় এই রোবটটি এখনও অবধি কথাটথা বলতে পারছে না। হাঁটা চলা করতে গেলেও পা টলছে। দক্ষিণ কলকাতার গলির মধ্যে একটা ছোট হোটেলে নিজের নামে বুক করা ঘরে বসে প্রফেসর ইঁচামুড়া কাজেকামের মাথার পেছনের একটা পুড়ে যাওয়া সার্কিট বদলে দিলেন। তারপরেও কোনও উন্নতি হল না। এখানে বসে এর থেকে বেশি কিছু করা, তার পক্ষে সম্ভবও নয়। এরপরেও যদি কাজেকামের কাজ কর্মের উন্নতি না হয়, তা হলে ওকে অচল করে দিয়ে প্যাকিংবাক্সে ভরে জাপানে ফেরত নিয়ে যেতে হবে। আনখাই দ্বীপের ওয়ার্কশপ ছাড়া ওর মতন জটিল রোবটকে খুলে জোড়া লাগাবার ব্যবস্থা আর কোথাও নেই।
হোটেলের বয় চা দিয়ে গিয়েছিল। সেই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রফেসর ইঁচামুড়া ভাবলেন, দোষটা তারই। বড্ড ছোট করে দেখেছিলেন দধিবামনের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতাকে। আরও একটু সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিল কাজেকামেকে, ওর ওপরে জোর খাটানোর ব্যাপারে। তাহলে বেচারা কাজেকামে ভোল্টায়িক সেলের ওপর হাত দিয়ে ফেলত না। জোরালো কারেন্টও খেত না।
ওই ভোল্টায়িক সেলই তাহলে দধিবামনের সর্বশেষ আবিষ্কার।
তবে আজকের এই অ্যাকসিডেন্টে একটা উপকার হয়েছে। দধিবামনের অগ্রগতির হারের একটা হিসেব পেয়ে গেছেন প্রফেসর ইঁচামুড়া। গতকাল তিনি দেখেছিলেন, ব্যাটা ছাদে দাঁড়িয়ে বেঞ্জামিন ফ্যাঙ্কলিনের ঘুড়ির পরীক্ষা করছে। ফ্র্যাঙ্কলিন নিজে ওই পরীক্ষাটা করেছিলেন সতেরোশো বাহান্ন সালে। আর আলেসান্দ্রা ভোল্টা তাঁর ব্যাটারি বানিয়েছিলেন আঠেরোশো একে। তার মানে, মানুষের পঞ্চাশ বছরের বিবর্তন দধিবামন এক এক দিনে টপকাচ্ছে। তার মানে…
প্রফেসর ইঁচামুড়া চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরে পায়চারি করতে শুরু করলেন। আপন মনেই বলতে লাগলেন,—তার মানে আর চারদিনে ওই অ্যালিয়েনদের বরপুত্র দু-হাজার সালে পৌঁছে যাবে। হয়তো আবিষ্কার করে ফেলবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোচিপস, কিংবা শূন্য রোধের তড়িৎবর্তনী। করুক, করুক। ওসবে আমার আগ্রহ নেই। যা হয়ে গেছে তাতে আমার কোনও আগ্রহ নেই। কিন্তু তার পরদিন কী হবে?
দধিবামনের মাথার মধ্যেকার প্রোগ্রামিং ছুঁয়ে ফেলবে দু-হাজার পঞ্চাশ সালকে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই দু-হাজার দশ সালে বসে ওর অসাধারণ মাথাটা ঠিক খুঁজে পেয়ে যাবে এমন সব জিনিস, যা আবিষ্কার করতে বিবর্তনের সাধারণ নিয়মে আমাদের আরও চল্লিশ বছর লাগবে। তারপরের দিন ও পৌঁছে যাবে দু-হাজার একশো সালে…তার পরের দিন দু-হাজার একশো পঞ্চাশে…তার পরের দিন…কাজেকামে, তুই বুঝতে পারছিস, ওই মানুষটা একেক দিনে বিজ্ঞানের গণ্ডিকে পঞ্চাশ বছর করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে!
কাজেকামে উত্তর দেওয়ার মতন অবস্থায় ছিল না। কিন্তু ইঁচামুড়া তা লক্ষও করলেন না। উলটে একটা শয়তানি হাসিতে ভরে গেল তার ল্যাপা পোঁচা মুখখানা। কুঁতকুঁতে চোখ দুটো সেই হাসির ঠেলায় প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। তিনি বলেই চললেন,—আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার কি জানিস? যে লোকটা এই অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী, সে নিজেই জানে না তার এই ক্ষমতার কথা। তার মনের বয়েস একটা বারো বছরের ছেলের মতন।
এবার তুই বল কাজেকামে, এমন লোকের কি কোনও অধিকার আছে—ওই অপূর্ব সব আবিষ্কারের মালিক হওয়ার?
হাঃ হাঃ হাঃ করে এরপর যে হাসিটা হাসলেন প্রফেসর, সে হাসি শুনলে গদাধর সানা তাকে চোখ বুজে কংসের রোলটা দিয়ে দিত। হাসতে-হাসতেই প্রফেসর বললেন,—আরে, না-না। তাই কি হয় না কি? দধিবামনের সমস্ত আবিষ্কারের মালিক হব আমি—এই প্রফেসর কইশিঙি ইঁচামুড়া।
কিন্তু পরক্ষণেই একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় ইঁচামুড়ার সেই হাসি মুছে গেল। কথাটা আর কিছুই নয়। দধিবামন এখনও বহাল তবিয়তে দুশো বারোর দুই চিতপুর রোডেই বসে রয়েছে। তিনি তাকে কিডন্যাপ তো করাতে পারেনইনি। উপরন্তু দধিবামন তাকে আর কাজেকামেকে বদ লোক বলে জেনে ফেলেছে। এখন তাদের দেখতে পেলেই সে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করবে নিশ্চয়ই।
—এই কাজেকামে! এমন বুঝভুম্বুল হয়ে বসে থাকলে চলবে? কিছু বল। কাজেকামের কাঁধদুটো ধরে ঝাকানি দিলেন প্রফেসর।
কাজেকামে আস্তে আস্তে সোজা হয়ে বসল, তারপর খাড়া হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো একটু বেশিই যেন জ্বল জ্বল করছে। তারপর পরিষ্কার বাংলায় উদাত্ত স্বরে আবৃত্তি শুরু করল—
কারে তুমি বলিতেছ বুঝভুম্বুল
হে মাতুল?
কার কাছে খুঁজিতেছ পথের নিশানা
আমি যে জাপানি কৃষ্ণ। সে কি তব রয়েছে অজানা?
নিপ্পনের কংস তুমি, কিপ্পনের বংশ তুমি, কিবা দিবে মোরে প্রতিদান
ধুইয়া খাইব আমি তোমার বিজ্ঞান?
এই বলে কাজেকামে চোখ কটমট করে প্রফেসর ইঁচামুড়ার দিকে চেয়ে রইল।
হায় হায় করে উঠলেন প্রফেসর ইঁচামুড়া—এ কী রে কাজেকামে! এসব তুই কী বলছিস? তুই আমার নিজের হাতে বানানো রোবট। তোকে আবার প্রতিদান কী দেব।
পঞ্চাশ কিলো ওজনের একখানা ঘুষি বাগিয়ে কাজেকামে এগিয়ে এল প্রফেসরের দিকে। মুখে অনর্গল ডায়লগ—
তুই এক নরকের কীট
কেমনে বুঝিবি এক রোবটের সমস্ত সার্কিট?
কেমনে বুঝিবি মোর শরীরের কোটি কোটি মাইক্রোচিপস জুড়ে
কত গিগাবাইটের মেমারি গিয়াছে আজ পুড়ে।
সেই ঘুষি থেকে নিজেকে বাঁচাতে ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে পরিত্রাহি চেঁচাতে লাগলেন প্রফেসর ইঁচামুড়া,—আরে কাজেকামে, তোর সব গণ্ডগোল আমি জাপানে গিয়ে ঠিক করে দেব। আপাতত তুই একটু শান্ত হয়ে বোস বাবা। এরকম ভায়োলেন্ট হয়ে যাচ্ছিস কেন বল তো?
প্রফেসরের আবেদনে কর্ণপাত না করে, কাজেকামে খাটের তলায় ছেড়ে রাখা জুতোটা পায়ে গলাতে গলাতে বলল,—
নাহি চাই তোমার সাপোর্ট
টেকনো-মর্কট।
জেনে রেখো, তুমি মোর সব ভরসা না।
চলিলাম সেথা আমি, যেথায় রয়েছে প্রভু গদাধর সানা।
গটগট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল কাজেকামে। জোর করে তাকে আটকে রাখার ক্ষমতা প্রফেসরের ছিল না। তিনি খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলেন। মুখে হা-হুতাশ,—ওরে হতভাগা দধিবামন! এ কী সর্বনাশ তুই আমার করলি রেএএএ! আমার এমন দামি রোবটটাকে পাগল করে দিলিইইই? তার মাথায় যে এখন যাত্রা ছাড়া কিছুই ঢুকছে না রেএএএ। তোকে আমি ছাড়ব না, দধিবামন! না, না, কিছুতেই না।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে পরিস্থিতিটা ভালো করে বিচার করতে বসলেন প্রফেসর ইঁচামুড়া। একটা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই মুহূর্তে একজনই তাকে সাহায্য করতে পারে। দেখতে হবে চেষ্টা করে সে রাজি হয় কি না। মনে তো হয় হয়ে যাবে। তবে এখনই নয়। আর কয়েকটা দিন কাটুক।
ঠিক চার দিন পরে, প্রফেসর ইঁচামুড়া একটা ট্যাক্সি থেকে আবার নামলেন দুশো বারোর দুই, মানে নীল্টুদের বাড়ির সামনে।
ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে প্রফেসর একবার আড়চোখে চাইলেন উলটোদিকে মানে গদাধর অপেরার অফিসঘরের দিকে। যা ভেবেছেন, তাই। হতভাগা কাজেকামে মহা উৎসাহে বাঁশি বাজাচ্ছে। ওকে এখন ডাকলে মারতে আসবে। থাকগে। ওর ব্যবস্থা পরে করা যাবে ভাবলেন প্রফেসর। তিনি একতলার ল্যাবরেটরি ঘরটাকে এড়িয়ে, পেছনদিকে নীল্টুর পড়ার ঘরে গিয়ে উঁকি মারলেন। ফিসফিস করে বললেন,—খোকা, তোমার বাবাকে একবার এ ঘরে ডেকে আনতে পারবে? বলবে, প্রাইভেট কথা আছে।
‘প্রাইভেট’ কথাটা উচ্চারণ করেই ভুল করলেন প্রফেসর ইঁচামুড়া। নীল্টু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বাবা আর জাপানি সাহেবের কথাবার্তা পুরোটাই শুনল, এবং শুনে শিউরে উঠল। পা টিপে টিপে ঘরের দরজাটা পেরিয়ে সে এক দৌড়ে পৌঁছে গেল ল্যাবরেটরিতে। সেখানে তখন দধিবামন মন দিয়ে একটা পুরোনো প্যাকিংবাক্সের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখছিল। নীল্টুকে দেখেই তার চোখমুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল,—শিগগির এসে দেখে যাও, এ বেলা কী আবিষ্কার করলাম। দেখেছ, দূরের ছবি কাছে আনার যন্ত্র?
হতাশ নীল্টু দেখল, দধিদাদা একটা টেলিভিশন বানিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তার মায়ের ছবি। মা রান্নাঘরে রান্না করছে।
অহঙ্কারী স্বরে দধিবামন বলল,—এ তো দেখছ সাদাকালো ছবি। কালকের মধ্যে ছবিগুলোকে রঙিন করে ফেলব।
—দধিদাদা!
নীল্টুর ডাকের মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যাতে দধিবামন চমকে তার মুখের দিকে তাকাল।
—দধিদাদা! তোমার খুব বিপদ। এখন এসব ছেলেখেলায় সময় নষ্ট করার সময় নেই।
—ছেলেখেলা! বোঝাই গেল দধিবামন বেশ আহত হল।
—ছেলেখেলা ছাড়া কী? কালারড টেলিভিশন অনেকদিন আগেই আবিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু তোমাকে যে ওই জাপানি সাহেব বাবার কাছ থেকে কিনে নিতে চাইছে, তা কি তুমি জানো?
—আমাকে? আমি কি ছাগল না জোড়ামণ্ডা, যে আমাকে কিনতে চাইবে?
—তুমি ভীষণ দামি মানুষ দধিদাদা। তোমার মাথার মধ্যে ভবিষ্যতের সমস্ত আবিষ্কার লোড করে দিয়ে গেছে গ্রহান্তরের প্রাণীরা। ওই জাপানি সাহেব তোমার সেই সব আবিষ্কার নিজের নামে চালাবে বলে তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে। তুমি পালাও।
নীল্টুর এই কথায় দধিবামনের মাথাটা ঝনঝন করে উঠল। অনেকগুলো না বোঝা ব্যাপার হঠাৎই তার কাছে জলের মতন পরিষ্কার হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল, পোড়াবেগুন গ্রামের আকাশে সেই বিশাল চাকার মতন অদ্ভুত জিনিসটার এসে দাঁড়ানোর কথা, তার সঙ্গে অনায়াসে সে মিলিয়ে নিতে পারল তার মাথার মধ্যেকার এই অন্তহীন উদ্ভাবনী শক্তিকে। এবং নিজের বিপদটা সে নিজেও বুঝতে পারল। শুধু ওই ইঁচামুড়া কেন, এখন যে তার ক্ষমতার কথা জানবে, সেই তাকে ক্রীতদাস করে রাখতে চাইবে। একবার কপালজোরে রোবটের হাত থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু বারবার কি বাঁচবে? বিশেষত তার আশ্রয়দাতাই যেখানে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
ঠিক সেই সময়েই বাড়ির পেছনদিক থেকে প্রবল চেঁচামেচির শব্দ শোনা গেল। কান পেতে ওরা যা শুনল, তাতে দুজনেরই মন খুশিতে ভরে গেল। বিজুবাবু গলার জোরে প্রত্যাখ্যান করছেন ইঁচামুড়ার কুপ্রস্তাব। তিনি বলছেন, একটু পাগলাটে হলেও দধি আমার ছেলের মতন। ও আর আমি একসঙ্গে গবেষণা করি। ও আসার পরে আমার একাকিত্ব ঘুচেছে। ওকে কেন আমি আপনার হাতে তুলে দেব? বরং বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করলে আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দেব। টাকার লোভ আমাকে দেখাবেন না!
নীল্টু আর দধিবামন রাস্তার দিকের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল, জাপানি সাহেব মাথা নীচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
যেটা কেউ দেখতে পেল না সেটা হল, রিনির সঙ্গে ইঁচামুড়ার দেখা হওয়ার ঘটনাটা। পাড়ার পার্ক থেকে খেলাধুলো করে রিনি বাড়ি ঢুকতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই অনেকটা কাজলকুমারের মতন দেখতে একটা লোক তাকে জিগ্যেস করল,—খুকি বুঝি এই বাড়িতেই থাকো?
রিনি বলল,—হ্যাঁ।
—তোমার বাবার নাম কী?
রিনি বলল,—শ্রী বিজন রায়।
লোকটা তক্ষুনি রিনির দিকে একটা সুন্দর গোলাপ ফুল বাড়িয়ে ধরে বলল,—তাহলে এটা আমি তোমাকে দিলাম। শুঁকে দ্যাখো, কী সুন্দর গন্ধ।
তারপর রিনির আর কিছু মনে নেই।
সাত
সেদিন রাতে রিনি বাড়ি ফিরল না।
তারপরের দিনেও না।
বিজনবাবুর বাড়িতে তো কান্নাকাটি পড়ে গেল। পুলিশ এল। কিন্তু, না সেই জাপানি সাহেবের কোনও খোঁজ পাওয়া গেল, না রিনির।
তারপরের দিন বিজনবাবুর মোবাইলে একটা কল এল।—যদি মেয়েকে ফেরত পেতে চাও তাহলে দধিবামনকে নিয়ে স্ট্রান্ড রোডের বজরঙ্গবলির মন্দিরের পেছনে, গঙ্গার ধারে রাত ন’টার সময়ে হাজির হয়ে যেও। পুলিশকে খবর দিলে মেয়েকে জ্যান্ত ফিরে পাবে না।
বলাই বাহুল্য, ফোনের কণ্ঠস্বর প্রফেসর কইশিঙি ইঁচামুড়ার।
রিনিকে হারিয়ে দুশো বারোর দুই চিতপুর রোডে শ্মশানের স্তব্ধতা নেমে এল।
সন্ধেবেলা, দোতলার বসার ঘরে ওরা চারটি প্রাণী মাথা নীচু করে বসেছিল। রিনির মা কেঁদে কেঁদে আর কাঁদবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন। শুধু মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠছিলেন। নীল্টুর অবস্থাও একইরকম। সবচেয়ে আশ্চর্য পরিবর্তন দ্যাখা যাচ্ছে দধিবামনের মধ্যে। এমনিতে, নিজের গবেষণার বাইরে সারা জগৎ সংসারের সঙ্গে সে কোনও সম্পর্ক রাখে না। কিন্তু রিনিকে প্রফেসর ইঁচামুড়া অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে সে একবারের জন্যেও তার আশ্রয়দাতা পরিবারের মানুষগুলোকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। সে-ও দোতলার ওই ঘরটার এক কোনায় হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসেছিল।
কিছু কথা বলতে হয় বলেই যেন বিজনবাবু বললেন,—কী ব্যাপার বলো তো দধি? তোমার মাথায় কি আর নতুন কোনও আবিষ্কারের চিন্তা আসছে না! তুমি এখানে বসে আছ যে?
—হ্যাঁ, আসছে তো। শিশুর মতন সরলভাবে জবাব দিল দধি।—কিন্তু আমি আর কিছুই বানাব না। সমস্ত আমার মাথার মধ্যে রেখে দেব।
প্রফেসর ইঁচামুড়ার সঙ্গে মোলাকাতের কল্যাণে বিজনবাবুও এখন দধিবামনের মস্তিষ্কের ঝড়ের বেগে পরিণতির ব্যাপারটা জানেন। তবে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না বোধহয়। তাই জিগ্যেস করলেন,—তাই না কি? তা আজ বিকেলে মাথায় কী এল শুনি।
—ক্যানসারের ওষুধ। একইরকম সরল সুরে বলল দধিবামন।—সে ওষুধ আমি এখন ইচ্ছে করলেই বানাতে পারি। কিন্তু বানাব না।
—কেন? বানাবে না কেন?
—আমি তো বানিয়ে দিতেই পারি। ক্যানসারের ওষুধ বানিয়ে দিতে পারি, জরাকে জয় করবার মন্ত্র শিখিয়ে দিতে পারি, নক্ষত্রলোকে পাড়ি জমানোর উপযোগী আলোর চেয়েও দ্রুতগতির মহাকাশযানের হদিশ দিতে পারি। কিন্তু মানুষ কি তার নিজের সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা সেইসব জিনিস নিতে পারবে? তাকে তো নেওয়ার যোগ্য হতে হবে।
রিনিকে হারানোর দুঃখকেও যেন এক মুহূর্তের জন্যে ভুলে গেল ঘরের মধ্যে বসে থাকা বাকি তিনটে মানুষ। নীল্টু, বিজনবাবু আর নীল্টুর মা অবাক হয়ে চেয়ে রইল দধিবামনের দিকে। হঠাৎই তারা খেয়াল করল, দধিবামনকে আর মান্ধাতার আমলের একটা পেছিয়ে পড়া মানুষ মনে হচ্ছে না। এই দুদিনে সে যে কখন, কীভাবে এমন বদলে গেল তা তো তারা খেয়ালই করেনি। এখন তার চোখ দুটোয় এমন এক শান্ত বুদ্ধির আভা জ্বলজ্বল করছে, যে আভা পৃথিবীর মানুষের কাছে এখনও অচেনা। বিজনবাবুর হঠাৎই মনে পড়ল, তাই তো! হিসেব মতন তো দধিবামন এখন দু-হাজার একশো খ্রিস্টাব্দের মানুষের মেধাকে ছুঁয়ে ফেলেছে।
সেই জন্যেই কি সে আরও ভালো করে বুঝতে পারছে তার আশেপাশের মানুষজনের সীমাবদ্ধতা?
সেই জন্যেই কি সে মানুষের যোগ্যতার প্রশ্ন তুলছে?
হঠাৎই উঠে দাঁড়াল দধিবামন। দৃঢ় স্বরে বলল,—কাল আমি আপনার সঙ্গে রিনিকে ফিরিয়ে আনতে যাব।
—না, না। তোমাকে যেতে হবে না। বিপদ যদি কিছু হয়, তা আমাদেরই হোক। তুমি পরের ছেলে, শুধুমুধু কেন…
রিনির মায়ের এই কথা শুনে দধিবামন আহত দৃষ্টিতে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,—আমাকে যদি আপনারা ওই বদমাশ লোকটার হাতে তুলে দিতেন, তাহলে রিনির আজ এতবড় বিপদ হত না। কেন দেননি? আমাকে পরের ছেলে ভাবেন বলে কি? শুনুন, আগামীকাল আমার জ্ঞান এখনকার বিজ্ঞানকে দেড়শো বছর পেছনে ফেলে দেবে। আর সেই জ্ঞান আমি লুকিয়ে রাখব না। কাজে লাগাব। হ্যাঁ, কাজে লাগাব একবারই মাত্র—রিনিকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে। এই বলে দধিবামন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
আট
পরেরদিন, মানে যেদিন রাত্রে প্রফেসর ইঁচামুড়া রিনিকে ফেরত দেবেন বলেছেন, সেদিন দুপুরের দিকে গদাধর অপেরার অফিসঘরে অধিকারী গদাধর সানা ঘোষণা করলেন, এখন লাঞ্চ-ব্রেক।
সেই সকাল থেকে পুরোদমে রিহার্সাল চলছিল। সবারই বেশ খিদে পেয়ে গেছে। একজন বাদে। সে হল কাজেকামে মোটামুটি। তাকে কোনওদিন গদাধর একটা লেড়ো বিস্কুট অবধি খাওয়াতে পারেনি। এক ভাঁড় চা ও না। পাঁচুগোপাল ফিসফিস করে গদাধরকে বলেছে,—জাপানিরা কাঁচা মাছটাছ খেতে অভ্যস্ত গদা-দা। বিস্কুট মুখে রুচবে কেন বল তো?
তা না রুচুক। তাতে গদাধর সানার বিন্দুমাত্র অসুবিধে নেই। এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে একজন শিল্পীর খাওয়ার খরচটা যে বেঁচে যাচ্ছে, এতেই সে ভারি খুশি। অতএব, কাজেকামেকে একলা অফিসঘরে বসিয়ে রেখে দলের বাকি সকলে হ্যারিসন রোডের সস্তা হোটেলের দিকে হাঁটা লাগাল।
সবাই বেরিয়ে যেতেই কাজেকামে চেয়ার ছেড়ে উঠে দেওয়ালে লাগানো বড় আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ ভালো করে নিরীক্ষণ করে দেখল নিজের মুখটা। তারপর পার্ট বলতে শুরু করল।
কাজেকামের যাবতীয় যান্ত্রিক প্রতিভা এখন যাত্রায় নিবেদিত। সেই জন্যে একদিকে যেমন গদাধর অপেরার সমস্ত পালার সমস্ত ডায়াগল তার কণ্ঠস্থ, অন্যদিকে তেমনি তার নিজের মাথাতেও নানা রকমের চমৎকার সিচুয়েশন গিজগিজ করছে। তার দুয়েকটা সে গদাধর সানাকে বলেওছিল, বালক কৃষ্ণ পালায় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু গদাধর বড় ডিরেক্টরের মতন তাকে ধমকে দিয়েছে। বলেছে,—জুনিয়র আর্টিস্ট, জুনিয়র আর্টিস্টের মতন থাকবে। পঞ্চাশ বছর বয়েস না হলে পালা লেখা যায় না। কাজটা অত সহজ নয়।
কাজটা যে কঠিন কীসে তাও তো কাজেকামের মাথায় ঢোকে না। ফাঁকা ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাজেকামে তার স্বরচিত কৃষ্ণ-ক্লাইভ কথোপকথন আবৃত্তি করতে লাগল :
লর্ড ক্লাইভ : কে টুমি বালক, এই ভয়ঙ্কর যুঢঢের মাঝরে
ইয়েলো পোশাক পরি বাজাতেছ বাঁশের পাইপ?
একটি গোলার টুকরো লাগে যদি বুকের পাঁজরে
গ্রিন ম্যাঙ্গো ঝরে যাবে, পারিবে না হইতে রাইপ।
অটএব টরা করি পালাও হিঁয়াসে।
বালক কৃষ্ণ : শোনো মুর্খ রবার্ট ক্লাইভ!
গতকাল শ্রী রাধিকা, আমারে ফিঁয়াসে,
পলাশীর মাঠে তার সাধের নুপুরখানি গিয়াছেন ফেলে।
হারানো নুপুরখানি এখনি না পেলে
শ্রীরাধা আমার সাথে করিবেন জন্মশোধ আড়ি।
এদিকেতে তুমি আর নবাব সিরাজ
কি যে হট্টগোল হেথা বাঁধায়েছ আজ
সোনার নুপুরখানি চাপা দিয়ে দাঁড়ায়েছে কামানের সারি।
আবৃত্তি করতে করতে কাজেকামের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। তার হাতের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল। তার মনে হল, এমন অপূর্ব পালা যদি পৃথিবীর লোককে শোনানোই না গেল, তাহলে কীসের রোবট-জন্ম?
কিছুক্ষণ কী যেন ভাবনা-চিন্তা করে, হঠাৎই কাজেকামে ওই ঘরের তক্তাপোশের নীচ থেকে বিশাল টিনের বাক্সটা টেনে বার করল। ওটাই গদাধর অপেরার মেক-আপ-বক্স। ওর মধ্যেই দুর্বাসার দাড়ি, রাবণের মাথা, বাসুকির ফণা, রামচন্দ্রের ধনুক, ভিক্টোরিয়ার মুকুট, কৃষ্ণের মোহনবাঁশি, পীতধড়া, শিখীপুচ্ছ, ক্লাইভের সোনালি চুল,—সমস্ত রয়েছে। কাজেকামে ওই বিশাল বাক্সটা কড়ে আঙুলে ঝুলিয়ে, দুপুরের চিৎপুর রোড ধরে হাঁটা লাগাল গঙ্গার দিকে। মনে সাধ, ওই গঙ্গার কোনও একটা নিরিবিলি ঘাটে বসেই পুরো যাত্রাপালাটা আজ লিখে ফেলবে। তারপর নিজের একটা দল খুলবে। তার জন্যে যে পয়সা লাগবে সেটা আপাতত রাস্তায় ঘাটে কৃষ্ণের রোলে অ্যাকটিং দেখিয়ে তুলে ফেলবে বলেই ঠিক করল কাজেকামে।
গদাধর অ্যান্ড কোম্পানি যতক্ষণে খেয়েদেয়ে আবার সেই ঘরে ফিরল, ততক্ষণে কাজলকুমার ভাগলবা।
কাজলকুমার নেই!
নেই তক্তাপোশের নীচে রাখা মেক-আপের বাক্সটাও!
আরো কিছু গেছে কী না, তা বুঝতে সময় লাগবে।
গদাধর কপাল চাপড়ে ভাবল, ভাত ডালের খরচা বাবদ কাজলকুমার গত ক’দিন তার যেটুকু পয়সা বাঁচিয়েছিল, তার দ্বিগুণ আজ উসুল করে নিয়ে চলে গেল।
কিন্তু কেন? সেই কথাটাই কিছুতেই বুঝতে পারছিল না গদাধর। ও কি নিজের যাত্রাদল খুলতে চায়?
কুস্তিগীর মাধব সেদিনের যন্ত্রণাটা ভুলতে পারেনি। তাই সে মহা ঘটা করে কপালে জোড়হাত ঠুকে বলল, আহা, এটাও বুঝতে পারছ না গদা-দা? যার জিনিস, তিনিই নিয়ে গেলেন। আমাদের কাজেকামে কী আর সাধারণ মানুষ ছিলেন? ততক্ষণে হয়তো পীতধড়া, মোহনচূড়া সমেত বৃন্দাবনেই পৌঁছে গেছেন।
গদাধর জ্বলন্ত চোখে মাধবের দিকে চাইল।
দধিবামন একবার ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকাল। আরেকবার হাতের খবরের কাগজটার দিকে। ক্যালেন্ডার দেখাচ্ছে দু-হাজার এগারো সাল। আজকের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় অন্তর্ঘাত, বোমা বিস্ফোরণ আর খুনের খবর। ভেতরের পাতাগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও এরকম নানা হিংস্রতার গল্প, যার মধ্যে ছোট্ট করে ছাপা হয়েছে রিনির অপহরণের খবরটাও।
দুদিন আগেও দধিবামন ছিল এই শতাব্দীর সমবয়সি। তখন টেলিভিশন আর কাগজের এই খবরগুলোকে তার অস্বাভাবিক লাগত না। চারপাশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন সেও কাগজ পড়া শেষ করেই দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তে পারত। কিন্তু আজ দধিবামন ক্যালেন্ডারের ওই দশককে তো বটেই, ওই শতাব্দীকেও অনেক পেছনে ফেলে এসেছে। সে এখন মনে মনে যে পৃথিবীর নাগরিক, সেই পৃথিবীতে হিংসা নেই। ফলে খুনোখুনি, রাহাজানি, সন্ত্রাসবাদ কিছুই নেই।
সেই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষের মন দিঘির অথই জলের মতন টলটলে পরিষ্কার, আর সেই পরিষ্কার মনে প্রতিফলিত হয় মহাবিশ্বের সমস্ত শক্তি। কোনও যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। মানুষ তার মনেই সংহত করতে পারে সৌরশক্তি থেকে চৌম্বকশক্তি,—সমস্ত কিছু। তারপর সেই সংহত শক্তি দিয়ে প্রতিদিনের কাজ চালিয়ে নেয়।
সেই পৃথিবীতে মানুষ নিজের চাহিদাকে কমিয়ে এনেছে অনেক। তার প্রতিটা কাজ এখন প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে মেলানো। যেভাবে বরফ গললে মাটির বুক থেকে মাথা তোলে ছোট্ট গাছের চারা, বাসা বানাতে শুরু করে পাখিরা, সমুদ্র থেকে পাহাড়ি নদীতে ডিম পাড়বে বলে ফিরে আসে স্যামন মাছের ঝাঁক, ঠিক সেইভাবেই মানুষ এখন প্রকৃতিকে দেখে তার ঘর বানায়, তার পোশাক বোনে, তার খাবার খুঁজে নেয়। প্রকৃতির কোলে শিশুর মতন বাঁচার যে শিক্ষা মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল, সেই শিক্ষাই সে যেন অনেকদিন বাদে আবার ফিরে পেয়েছে।
দধিবামন অসহায়ের মতন তার চারিপাশে তাকায়। তার চোখে পড়ে রিনির মায়ের কান্নাভেজা চোখ। তার মনে পড়ে ইঁচামুড়ার লোভ চকচক চোখ। বাইরের এই পৃথিবীকে মাথার ভেতরের দুশো বছর এগিয়ে থাকা শান্ত সুন্দর পৃথিবীর সঙ্গে কিছুতেই মেলাতে পারে না দধিবামন।
দধিবামনের চোখের সামনে দু-হাজার এগারোর হিংস্র পৃথিবী। তার মাথার দু-হাজার দুশোর শান্ত সাধক পৃথিবী। এই দুই পৃথিবী ছাড়াও আরও এক পৃথিবী রয়েছে। সেই তৃতীয় পৃথিবী রয়েছে দধিবামনের বুকের ভেতরে। সেই পৃথিবী পাঁচশো বছর আগের গ্রামবাংলার জগত। সেও এক শান্ত, সুন্দর, খুব কম চাওয়া আর আরো কম পাওয়া দিয়ে তৈরি পৃথিবী। এর মধ্যে কোন পৃথিবীতে তুমি থাকতে চাও দধিবামন? দধি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।
প্রশ্ন করে, কিন্তু কোনও উত্তর খুঁজে পায় না। আজকের পৃথিবীতে কী নীল্টু, বিজুবাবু, রিনি আর তার মায়ের মতন ভালোবাসায় ভরা মানুষ নেই?
আগামীর পৃথিবীও কি একই জায়গায় স্থির হয়ে থাকবে? শেষ অবধি কতদূরে যাবে দধিবামন?
অতীতের পৃথিবীতে ফিরে গেলে কী হবে তার এই বিপুল জ্ঞানের? আক্ষেপ হবে না তো তখন, ওই আদিমতায় ফিরে যাওয়ার জন্যে?
নীল্টুদের শুনশান একতলার ঘরে বসে দধিবামন এক অসহায় শিশুর মতন দু-হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
নয়
স্ট্র্যান্ড রোডের বজরঙ্গবলির মন্দিরের পেছনের গঙ্গার ঘাটে প্রতিদিনই সন্ধেবেলায় গাঁজার আসর বসে। সদাব্যস্ত স্ট্র্যান্ড রোডের জনসমুদ্র থেকে একসারি ব্রিটিশ আমলের গুদামবাড়ি ওই জায়গাটাকে আড়াল করে রেখেছে। নদীর পাড় থেকে গঙ্গার ওপরে অনেকখানি এগিয়ে গেছে পুরোনো আমলের বিশাল জেটি। আগে বড় বড় মালবোঝাই স্টিমার এসে ওই জেটিতে মাল খালাস করত। এখন বহু বছরের অব্যবহারে কাঠের তক্তা জায়গায় জায়গায় ভেঙে পড়েছে। তার দুপাশে নদীর পলির ওপর বড় বড় ঘাস গজিয়েছে। সেখানে দু-চারটে জোনাকি জ্বলছে। ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসছে মন্দির থেকে ফেলে দেওয়া বাসি ফুলের মালা। উল্টোদিকের হাওড়ার কারখানার আলোগুলো গঙ্গার ঢেউয়ের ওপর দিয়ে যেন এ-পাড় অবধি এগিয়ে এসেছে।
জেটির এক কোণে বসে গুদামবাড়ির চারটে হিন্দুস্থানি দারোয়ান প্রতিদিনের মতোই গাঁজায় দম দিচ্ছিল। হাত থেকে হাতে ঘুরছিল কলকে। হঠাৎই আলোয় গড়া আরামকেদারার মতন একটা জিনিস, আকাশ থেকে নেমে, তাদের থেকে অল্প দূরে মাটির ওপর স্থির হয়ে দাঁড়াল।
নেশায় চুর রামাবতার তার পাশের লোক জনকভাইয়ের হাতে গাঁজার কলকেটা চালান করে দিয়ে, হিন্দিতে যা বলল, তার অর্থ হচ্ছে—দিনকাল কী পড়েছে রে জনকভাই। এরোপ্লেন থেকে অবধি সিট খুলে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে!
জনকভাই একবার আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল,—শুধু তো সিট নয়। তার সঙ্গে একঠো পাসিনজার ভি গির গয়া।
এরোপ্লেনের কোয়ালিটি নিয়ে তাদের গবেষণা আর বেশি এগোবার আগেই, সেই আরামকেদারার প্যাসেঞ্জারটি উঠে এসে জনকভাইয়ের হাতে ধরা কলকেটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,—এক রাউন্ড দেবেন স্যার? গতকাল থেকে নেশা না করে রয়েছি। পেট ভুটভাট করছে।
এমনিতে কোনও অসুবিধে ছিল না। গাঁজার আসরে পরকে মুহূর্তের মধ্যে আপন করে নেওয়ার চল তো আছেই। কিন্তু চার হিন্দুস্থানি সভয়ে দেখল, সেই কলকে-প্রত্যাশীর হাতের রং সবুজ, আর সেই হাতের ডগায় অক্টোপাসের বাহুর মতন কিলবিলে আটটা আঙুল। এর চেয়ে বেশি কিছু দ্যাখার মতন কলজের জোর তাদের ছিল না। কলকেটা সেই এরোপ্লেন থেকে খসে পড়া ভূতটার দিকে ছুড়ে দিয়ে তারা পাঁইপাঁই করে দৌড়োল। পরেরদিন তাদের মধ্যে দুজনকে পাওয়া গিয়েছিল বহরমপুরে, আর দুজনকে সজনেখালিতে।
ঘাড় ফিরিয়ে ভুতটা কী করছে দ্যাখার সাহস তাদের ছিল না। তবে যদি থাকত, তা হলে দেখতে পেত টার্নিকেট গ্রহের ডেল্টা মহানন্দে তার মাছের মতন মুখে কলকে ঠেকিয়ে ব্যোম টান দিচ্ছে।
দশ
বিজুবাবু, নীল্টু আর দধিবামন চিতপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতেই চলে এল স্ট্র্যান্ড রোডের পেছনের সেই ভাঙা জেটির ওপরে। তখন ঘড়িতে বাজে ঠিক এগারোটা। জায়গাটা এমনিতেই নির্জন; এত রাতে কোনও জনমানুষই চোখে পড়ল না।
নীল্টুকে কিছুতেই বাড়িতে রেখে আসা গেল না। সে বোনকে না দেখে আর থাকতে পারছে না। তার বায়নায় বিজুবাবু খুব একটা আপত্তি করেননি। কারণ, দধিবামন তো সঙ্গে থাকছেই। তার ক্ষমতার ওপর এখন সবারই খুব আস্থা।
প্রফেসর ইঁচামুড়া ফোনে সময় দিয়েছিলেন রাত সাড়ে এগারোটায়। ঠিক সাড়ে এগারোটাতেই একটা ট্যাক্সি এসে স্ট্র্যান্ড রোডে দাঁড়ানোর শব্দ পাওয়া গেল। একটুবাদেই ভাঙা জেটির অন্যপ্রান্তে এসে দাঁড়ালেন প্রফেসর ইঁচামুড়া। তার হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরা আছে রিনির হাত। অস্ত্রশস্ত্রও আছে নিশ্চয়, তবে এই অন্ধকারে দ্যাখা যাচ্ছে না।
—ঠিক আছে, এবার পালটাপালটি করে নেওয়া যাক। চেঁচিয়ে বললেন প্রফেসর ইঁচামুড়া। দধিবামন এদিকে চলে এসো, আর রিনি চলে যাও ওদিকে।
নীল্টুর গলার কাছে একটা পুঁটলি ঠেলে উঠছিল। চোখদুটোও জ্বালা করছিল। সে একবার দধিদাদার হাতটা টেনে ধরল। কিন্তু ওদিকে যে এই আবছায়াতেও দ্যাখা যাচ্ছে বোনের বড় বড় চোখ দুটোয় জল টলটল করছে। দধিবামন হাতটা নীল্টুর মুঠি থেকে টেনে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
দধিবামনের পা রিনির থেকে অনেক লম্বা, তাই সে আগে জেটি পেরিয়ে পৌঁছিয়ে গেল ইঁচামুড়ার কাছে। রিনিও প্রায় পৌঁছিয়ে গেছে তার বাবা আর দাদামণির কাছাকাছি। পথের বাকি অংশটুকু সে দৌড়ে পেরোতে গেল…
আর ঠিক তক্ষুনি পেছন থেকে কে যেন এক হ্যাঁচকা টানে তাকে আবার নিয়ে গিয়ে ফেলল ইঁচামুড়ার খপ্পরে। না, অন্য কেউ নয়। ইঁচামুড়াই রিনির কোমরে বেঁধে রাখা সরু সিল্কের দড়িটা ধরে টান মেরে তাকে আবার নিয়ে এসেছে নিজের কবজায়। একই সঙ্গে তার হাতে চলে এসেছে একটা রিভলভার।
একটা খিলখিল হাসি শোনা গেল। হাসি থামিয়ে ইঁচামুড়া তার মার্কামারা খ্যানখেনে গলায় বলল,—সরি বিজুবাবু সরি। আপনার মেয়েকে এখনই ফেরত দিতে পারছি না। দধিবামন যাতে আমাকে তার আগামী গবেষণার ফলাফলগুলো লক্ষ্মীছেলের মতন জানিয়ে দেয়, তার একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে। রিনিই হল সেই ব্যবস্থা। দধিবামন নিশ্চয় চাইবে না, তার গোঁয়ার্তুমির জন্যে রিনি বিপদে পড়ুক। চলো রিনি চলো দধিবামন! রাত অনেক হয়েছে। হোটেলে ফেরা যাক। কাল সকালেই আবার জাপানের ফ্লাইট।
রিনির একটা হাত শক্ত মুঠোয় ধরে, আর দধিবামনের মাথার পেছনে রিভলভারের নলটা ঠেকিয়ে হাঁটা লাগালেন ইঁচামুড়া।
বদমাশের চূড়ামণি নির্লজ্জ অসুর
আবার এসেছ ফিরে জ্বালাতে দধিরে?—
অন্ধকার স্ট্র্যান্ড রোডের থেকে এগিয়ে এল উদাত্ত আবৃত্তির শব্দ।
আবৃত্তিকারকেও একটু বাদেই দেখা গেল। পরণে হলুদ ধুতি, মাথায় রাংতার মুকুট, রঙিন শোলার মালা, কিন্তু হাতে প্লাস্টিকের রাইফেল—কাজেকামে গদাধর অপেরার মেকআপ বাক্সের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করেছে। সে সোজা এসে ইঁচামুড়ার পথ আটকে দাঁড়িয়ে গেল।
—সরে যা বলছি কাজেকামে। রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন ইঁচামুড়া।
প্লাস্টিকের রাইফেলটা ইঁচামুড়ার দিকে তাক করে কাজেকামে আবার শুরু করল তার ডায়ালগ—
এখনই উহারে তুমি না ছাড়ো যদি রে
ঝাঝরা করে দিব এবে সমস্ত শরীর
—কী মুশকিল! আমার রোবট আমারই এগেনস্টে চলে যাচ্ছে! এই কাজেকামে, জ্বালাস না, যেতে দে। আর তুই-ই বা ইন্ডিয়ায় বসে থেকে কী করবি? আমার সঙ্গে ফিরে চল। এই বলে ইঁচামুড়া কাজেকামেকে ঠেলে সরিয়ে এগোতে গেলেন।
সেই মুহূর্তে মঞ্চে আরেকজনের আবির্ভাব হল। সে অবশ্য রাস্তার দিক থেকে এল না। উঠে এল নদীর জল থেকে। সারা গায়ের টিয়াসবুজ পালক থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে। মাছের মতন মুখটায় একটু ভ্যাবাচাকা খাওয়া হাসি। অক্টোপাসের মতন আঙুল দিয়ে গা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,—ইশ, পা পিছলে একেবারে ঝপাং করে জলের মধ্যে…। ভাগ্যিস অ্যাম্ফিবিয়ান স্যুটটা পরা ছিল। না হলে ডুবে মরতাম।
কথা বলতে বলতেই টার্নিকেটের ডেল্টা সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ দধিবামনের মুখের দিকে চোখ পড়তেই সে ভারি খুশি হয়,—আরেঃ! মিস্টারকে যে চেনা চেনা লাগছে। কেমন আছেন স্যার?—বলে দু-হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল।
প্রফেসর ইঁচামুড়া প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে পড়লেন। তার সামনে এখন কৃষ্ণরূপী কাজেকামে আর ভিনগ্রহের উদ্ভট জীব। তাদের কাছ থেকে দধিবামন আর রিনিকে আড়াল করতে করতে তিনি চেঁচাতে লাগলেন,—আরে, আরে, এসব কী হচ্ছে? এসব কী হচ্ছে? আর এক পা এগোলে কিন্তু আমি গুলি চালাব বলে দিচ্ছি।
টার্নিকেটের ডেল্টা প্রফেসর ইঁচামুড়ার গলা শুনে এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর একগাল হেসে বলল,—অ্যাই দ্যাখো। এ-ও যে চেনা লোক। গলা শুনেই চিনেছি। প্রফেসর ইঁচামুড়া না? আপনার সঙ্গেই তো সেই ইয়ে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কথাবার্তা হল। তা সেই জিনিসটা খুঁজে পেলেন না কি?
দধিবামনের দিক থেকে ডেল্টা এগিয়ে গেল ইঁচামুড়ার দিকে।
—খবরদার খবরদার। আর এক পা এগোলেই আমি বাধ্য হব গুলি চালাতে।
ইঁচামুড়ার এই নাটকীয় আচরণে কাজেকামে ভারি উৎসাহ পেয়ে গেল। সে রাইফেল বাগিয়ে,—কী করিবি গুপ্তচর, কী করিবি মোরে বলে হুঙ্কার দিয়ে ইঁচামুড়ার দিকে এগোনো মাত্র…
দুড়ুম! গুলিটা লাগল কাজেকামের কানের গোড়ায়। তার মাথার ভেতর থেকে কিছুক্ষণ সুঁইইই কড়াক ঘচাং খট ধরনের নানারকম যান্ত্রিক আওয়াজ বেরোল। পরমুহূর্তে কাজেকামে ভারি অবাক হয়ে বলল,—এ কী স্যার? আপনি আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে যাচ্ছেন? দিন, দিন, ওদের একটাকে আমার হাতে দিন।
অর্থাৎ কাজেকামে আবার সেই পুরোনো দিনের বিশ্বস্ত কাজেকামে। তার মাথার থেকে এক গুলিতে যাত্রার ভূত নেমে গেছে।
প্রফেসর ইঁচামুড়া ভারি খুশি হয়ে বললেন,—আঃ, বাঁচালি কাজেকামে। একা একা এত কাজ কি পারা যায়? নে, মেয়েটাকে ধর!
কাজেকামের লোহার হাত রিনির ছোট্ট হাতটাকে চেপে ধরা মাত্র রিনি ব্যথায় কেঁদে উঠল। নীল্টু চিৎকার করে বলল, কী হল দধিদাদা? তুমি না বলেছিলে তোমার শেষ আবিষ্কারটা দিয়ে তুমি রিনিকে বাঁচাবে?
—ঠিক বলেছে নীল্টু। সেইটাই করতে যাচ্ছি এবার। দধিবামনের চোখ থেকে একটা শান্ত নীল আলো বেরিয়ে এসে ইঁচামুড়াকে ছুঁয়ে আবার মিলিয়ে গেল।
নীল্টু দেখল, ইঁচামুড়া একটুও নড়তে পারছে না। সে রিভলভার সমেত হাতটা তুলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
কিন্তু বাকি দুজন একইরকম আছে। তাদের একজনের মন বলে কিছু নেই। ফলে তার মনের ওপর দধিবামনের দূর নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে না। সে হল কাজেকামে মোটামুটি।
আর দ্বিতীয় জনের মনের ঠিকানা নিশ্চয় পৃথিবীর মানুষ দধিবামন পেয়ে ওঠেনি। সে হল ভিনগ্রহের ডেল্টা।
সব থেকে সমস্যা কাজেকামেকে নিয়েই। সে বুদ্ধিমান রোবট। পরিস্থিতি বুঝে, একহাতে রিনি, আর এক হাতে চলৎশক্তিহীন প্রফেসরকে প্রায় বগলদাবা করে নিয়ে সে হাঁটা লাগিয়েছে ট্যাক্সির দিকে।
সেদিকে এক মুহূর্ত চিন্তিত মুখে তাকিয়ে থেকে দধিবামন বলল,—নাঃ। কাজেকামের ব্যবস্থাটা একটু অন্যভাবে করতে হবে।
সে হঠাৎই ফতুয়ার পকেট থেকে একটা কী যেন বার করে টার্নিকেটের ডেল্টার মুখের সামনে ধরে বলল, এটা চিনতে পারছ?
—আরে…এ যে আমার কলকে। এর জন্যেই তো আমার এখানে আসা। ডেল্টা হাত বাড়িয়ে দৌড়ে এল।
—উঁহু। চট করে হাতটা সরিয়ে নিল দধিবামন।—সেই মাটির নীচের বাক্স থেকে বেরোনোর সময় থেকে যে জিনিস পকেটে নিয়ে ঘুরছি, তা কি অত সহজে দিয়ে দেওয়া যায়? একটা শর্ত আছে।
—বলো, বলো। মহা আগ্রহে ঝুঁকে পড়ল ডেল্টা।
—ওই বস্তুটিকে সঙ্গে করে তোমাদের গ্রহে নিয়ে যেতে হবে। ইশারায় কাজেকামের দিকে দ্যাখাল দধিবামন।
—এঃ! ওই মান্ধাতার আমলের রোবটটাকে! আচ্ছা বেশ। তাই নিয়ে যাব। নিয়ে গিয়ে আমাদের সায়েন্স মিউজিয়মে রেখে দেব। এবার দাও।
গাঁজার কলকেটা পকেটস্থ করে ডেল্টা অনায়াসে সেই পাঁচশো কেজির রোবটকে কোলে তুলে নিয়ে তার আরামকেদারার মতো দেখতে মহাকাশযানে গিয়ে বসল। একটা সামান্য দেশলাই জ্বালানোর মতন আলোর ঝিলিক। তারপরেই দেখা গেল কাজেকামে এবং ডেল্টা হাওয়া।
—আমিও এবার ফিরব। সঙ্গে করে নিয়ে যাব এই মহাপুরুষকে। প্রফেসর ইঁচামুড়ার দিকে আঙুল দ্যাখাল দধিবামন।
—কোথায় যাবে? প্রশ্ন করলেন বিজুবাবু।
—কেন যাবে? নীল্টুর গলায় আকুলতা।
—যাব পোড়াবেগুন গ্রামে। আজকের পোড়াবেগুন নয়। পাঁচশো বছরেরও আগের পোড়াবেগুন। সেখানে তখনও টার্নিকেট গ্রহ থেকে কোনও ফ্লাইং-সসার নামেনি। সেখানকার কালীবাড়ির পুরোহিতের ছেলে দধিবামন তখনও অ্যালকেমির ভক্ত। তার ধ্যান জ্ঞান, কেমন করে পরশপাথর আবিষ্কার করা যায়। সেই গবেষণাগুলো শেষ করতেই ফিরে যাব। ভাবছ, কেমন করে ফিরব?
আজ সকালে আমি পেয়ে গেছি সময়ভ্রমণের চাবিকাঠি। দুশো বছর বাদে তোমরাও পাবে। তোমরাও পারবে, ইচ্ছেমতন অতীতে বা ভবিষ্যতে ঘুরে বেড়াতে। তোমাদের সেই দিনের জন্যে শুভেচ্ছা রইল। কিন্তু আমি এই ক্ষমতা একবারই ব্যবহার করব। আমার নিজের সময়ে ফিরে যাওয়ার জন্যে। যেই সেখানে ফিরে যাব, অমনি আমি সব ভুলে যাব।
এই ক’দিনে যা হল, তা কিছুই মনে থাকবে না আমার। ভুলে যাব যে এই আমিই একদিন বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎশক্তি, বৈদ্যুতিনশক্তি পেরিয়ে মনের শক্তির হদিশ পর্যন্ত পেয়েছিলাম। আবার আমি গরুর গাড়ি চেপে ঘুরে বেড়াব, কলাগাছের ছাই দিয়ে কাপড় কাচব, চকমকি দিয়ে আগুন জ্বালাব। এক জন্মে একশো জন্মের জ্ঞানের বোঝা বয়ে বেড়ানো যে কী কষ্টের তা এই ক’দিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
—আমাদেরও ভুলে যাবে তুমি? এগিয়ে এসে দধিবামনের হাঁটুদুটো জড়িয়ে ধরল রিনি।
কোনও উত্তর দিতে পারল না দধিবামন। শুধু রিনির চুলে ভরা মাথাটায় একবার আদর করে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর বিজুবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল,—একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর কাছে অনেক ঋণ রয়ে গেল। তার একটু শোধ দিয়ে যাই। এই নোংরা লোকটাকে এই পৃথিবী থেকে পাঁচশো বছর আগের পোড়াবেগুন গ্রামে নিয়ে চলে যাই। আশাকরি তখন এ আর অতটা বদমাইশি করতে পারবে না। চলো ইঁচামুড়া। যাওয়া যাক। স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইঁচামুড়ার হাতটা নিজের হাতে ধরে দধিবামন একটা তুড়ি দিল।
বিজুবাবু, নীল্টু আর রিনি দেখল—তারা তিনজনে ভাঙা জেটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোনও পুরোনো বাড়ির পেটা ঘড়িতে ঢংঢং করে বারোটা বাজল। বিজুবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, চলো বাড়ি ফিরি। তোমাদের মা ভীষণ চিন্তা করবে।
উপসংহার
পাঁচশো বছর আগে পোড়াবেগুন গ্রামের পুরোহিতমশাইয়ের বাড়ির বাগানে এক জাপানি মালি কাজ করত। ব্যাটার স্বভাব ছিল ভারী খারাপ। সুযোগ পেলেই ফলপাকুড় চুরি করে হাটে বেচে দিয়ে আসত। অত বছর আগে বাংলাদেশে জাপানি কোথা থেকে এল, সে সাঁতার কেটে এসেছিল, না কি জাহাজ ধরে—অত কথা আমাকে জিগ্যেস কোরো না। বলতে পারব না।