৷৷ ৩ ৷৷
একদিন বাদে সাড়ে দশটার মধ্যেই কলেজ স্ট্রিটে পৌঁছোল চন্দন৷ সে ভেবে রেখেছে ওই প্রাণগোপাল লাহার বাড়িতে কাজটা মিটিয়ে সে বিদিশাতে যাবে৷ আর এও সে ঠিক করে রেখেছে আজ কোনো একটা টেবিলে বসবে সে৷ হ্যাঁ, একটা বিয়ারের বোতল অথবা দু-পেগ হুইস্কি নিয়েই বসবে৷ যাতে আশেপাশের টেবিলগুলো ভালো করে সময় নিয়ে খেয়াল করা যায়৷ তা ছাড়া এক কাপ চা হলেও তো বিনা পয়সাতে তারা খাওয়ায় চন্দনকে৷ গতদিন আবার ফিশফ্রাইও খাওয়াল৷ তাই আজ সে নিজে খাবে৷ সকালবেলা শীর্ষেন্দু ফোন করে জানতে চেয়েছিল যে বিদিশাতে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না৷ শীর্ষেন্দুর ক্লায়েন্ট বিদিশার মালিকও নাকি আবার তাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন একই কথা৷ আর তার সঙ্গে একটা অনুরোধও করেছেন৷ প্রত্যেক পানশালার মতো তাঁর পানশালাতেও একটু-আধটু নিয়মভাঙার কাজ চলে৷ চন্দন যেন তা কোথাও লিখে না বসে৷ চন্দন কথাটা শুনে শীর্ষেন্দুকে বলেছে যে এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন৷
কলেজ স্ট্রিট বইপাড়াতে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়েছে৷ হকাররা, গুমটির ছোট ব্যবসায়ীরা হাঁক দিচ্ছে, ‘কী বই লাগবে দাদা, কী বই?’ কয়েক জায়গাতে চন্দনের বইও আছে৷ এ ব্যাপারটাতে বেশ মজা লাগে চন্দনের৷ কেউ হয়তো তারই বই বিক্রি করছে অথচ তাকে সে চেনে না৷ না চেনাটাই স্বাভাবিক৷ সে বা লেখকরা তো ফিল্মস্টার বা টিভি স্টার নয়৷ আর এটা হয়তো এক অর্থে লেখকদের সৌভাগ্যও বটে৷ রাস্তায়, বাজারে জনতার ভিড়ে মিশে থাকতে পারে৷ চারপাশে ঘটে যাওয়া জীবনপ্রবাহকে নজরবন্দি করতে পারে৷ আহরণ করতে পারে মানুষের সুখ-দুঃখ-বেদনার ছোটো-বড়ো মুহূর্তগুলো৷ ভবিষ্যতে যা ফুটে ওঠে ছাপাখানার কালিতে বা কম্পিউটার স্ক্রিনে৷ ছড়িয়ে যায় দূর থেকে দূরে৷
নিজের কাউন্টারের বাইরেই চন্দনের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন সুবীরদা৷ মাথার চুল সব সাদা৷ পরনে ধুতি-শার্ট৷ মাঝারি প্রকাশক হলেও বহুদিন আছেন কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়াতে৷ অনেকের সঙ্গেই তাঁর পরিচয়৷ তিনি চন্দনকে দেখে একগাল হেসে বললেন, ‘আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম৷ চলুন তবে৷ কাছেই আমহার্স্টস্ট্রিটে বাড়ি৷ হেঁটে মিনিট পনেরো সময় লাগবে৷ আপনি চাইলে ট্যাক্সিও নেওয়া যেতে পারে৷’
চন্দন বলল, ‘না, তার দরকার নেই৷ হেঁটেই চলুন৷’
হাঁটতে শুরু করল তারা৷ চন্দন জানতে চাইল, ‘ভদ্রলোক বিরক্ত হবেন না তো?’
সুবীরদা বললেন, ‘কী যে বলেন মশাই! আপনার কথা বলতে বেশ খুশিই হলেন৷ আমার পুরোনো খদ্দের৷ আপনি আমার সঙ্গে গেলেই বুঝতে পারবেন৷
চন্দন বলল, ‘ভদ্রলোক কী করেন?’
সুবীরদা বললেন, ‘চাকরি-বাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে যা বোঝায় তা কিছুই না৷ শুনেছি ওনার পূর্বপুরুষদের একসময় নাকি বড় ব্যবসা ছিল৷ বনেদি বড়লোক মশাই৷ সাত পুরুষের বাস এই কলকাতাতে৷ সাত-আটটা বাড়ি আছে এই কলেজ স্ট্রিট, আমহার্স্ট স্ট্রিট অঞ্চলে৷ সেই বাড়িগুলোর ভাড়ার টাকাতেই ওনার চলে যায়৷ নেশা বলতে মদ্যপান আর বই পড়া৷ আপনি যে ব্যাপার নিয়ে কাজ করছেন সে ব্যাপারে ওঁকে এনসাইক্লোপিডিয়াও বলা যেতে পারে৷ আমাকে একদিন এ সব নিয়ে গল্প শুনিয়েছিলেন৷ তাই আপনি যেদিন পানশালা নিয়ে লিখবেন বললেন সেদিন ওনার কথাই মনে পড়ে গেল৷’
চন্দনরা কথা বলতে বলতে মিনিট পনেরোর মধ্যেই নির্দিষ্ট জায়গাতে পৌঁছে গেল৷ বড় রাস্তা থেকে কিছুটা ভিতরে পুরোনো কলকাতার গলি৷ একটা পুরোনো দিনের তিনতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন সুবীরদা৷ পাখি-তোলা বিরাট বিরাট দরজা-জানলা, আর কারুকাজ করা ঢালাই লোহার রেলিং সমৃদ্ধ দোতলা, তিনতলার বারান্দা৷ বাড়ির সদর দরজার দু-পাশে শান বাঁধানো রক আছে পুরোনো কলকাতার যা বৈশিষ্ট্য৷ লালচে রংয়ের বাড়ি৷ বাইরের দেওয়ালের গায়ে অনেক জায়গাতে পলেস্তারা খসে গেলেও, দরজা-জানলার রংয়ের প্রলেপ বহু দিন না পড়লেও বাড়িটা যিনি বানিয়েছিলেন তিনি বেশ পয়সাঅলা মানুষ ছিলেন৷ সদর দরজার গায়ে একটা হলদে হয়ে যাওয়া শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা ‘লাহা হৌস৷’ না ‘হাউস’ নয় ‘হৌস৷’ এটাই প্রাণগোপাল দত্তর বাড়ি৷
এগারোটা বাজতে এখনও মিনিট দশেক দেরি৷ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনে নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকল তারা৷ একটা বাঁধানো উঠোন আর তাকে ঘিরে থামঅলা বারান্দা৷ সদর দরজার ঠিক সোজাসুজি বারান্দাতে একটা পুজোমণ্ডপ আছে৷ আর একপাশের বারান্দায় রাখা একটা পুরোনো দিনের পালকি যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে পুরোনো কলকাতাকে৷ বারান্দার এক কোণে একটা পুরোনো আমলের কাঠের সিঁড়ি আছে৷ তা বেয়ে পরিচিত পায়ে চন্দনকে নিয়ে দোতলায় উঠে এলেন সুবীরদা৷ দোতলাতে সামনেই একটা ঘরের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল একজন লোক৷ সুবীরদাকে বলল, ‘আপনার পড়ার ঘরে বসুন, বাবুকে আমি ডেকে দিচ্ছি৷
সুবীরদার সঙ্গে ঘরটাতে পা রাখল চন্দন৷ ঠান্ডা শ্বেতপাথরের মেঝে৷ সারা ঘরের দেওয়াল জুড়ে বইয়ের আলমারি৷ এখনকার মতো সস্তা প্লাইউডের বইয়ের আলমারি নয়৷ কাচ ঢাকা কালো বার্নিশ করা পুরোনো দিনের আলমারি৷ একটা দেওয়ালের মাথায় বিরাট বড়ো শিংঅলা একটা হরিণের মাথা টাঙানো৷ চারপাশেই ছড়িয়ে আছে একটা আভিজাত্য৷ ঘরের ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরের টপঅলা একটা টেবিল আর তাকে ঘিরে বেশ কয়েকটা চেয়ার৷ সেগুলোও পুরোনো দিনের৷ কাঠের টেবিল, চেয়ারের পায়াতে সিংহের মাথা বসানো৷ ব্রিটিশ আমলে এ ধরনের পায়ার ব্যবহার ছিল৷ দুটো চেয়ারে বসল চন্দন আর সুবীরদা৷
মিনিট তিনেকের মধ্যেই ঘরে ঢুকলেন প্রাণগোপাল লাহা৷ ফর্সা লম্বা-চওড়া, মাথার চুল সাদা৷ পরনে একটা ফতুয়া আর লুঙ্গির মতো জড়ানো সরু পাড়ের সাদা ধুতি৷ গলাতে একটা ভারী সোনার চেন৷ সব মিলিয়ে চেহারাতে একটা ভারিক্কি ভাব আর আভিজাত্য আছে৷ তাঁকে দেখে চন্দনরা উঠে দাঁড়াল৷ চন্দনের সঙ্গে প্রবীরদা ভদ্রলোকের পরিচয় করিয়ে দেবার পর তিনি বললেন, ‘আপনার বই আমি রেশ কয়েকটা পড়েছি৷ গত বছর দুর্গাপুজোতে ওই যে একটা সিনেমার কাগজে স্টুডিওপাড়া নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন সেটাও পড়েছি৷ বেশ লেখার হাত আপনার৷ তবে আমি আপনাকে বয়স্ক মানুষ ভেবেছিলাম৷ অল্প বয়সেই নাম করে ফেলেছেন দেখছি!’
চন্দনদের মুখোমুখি একটা চেয়ারে এসে বসলেন প্রাণগোপাল৷ তারপর চন্দনের উদ্দেশে বললেন, ‘বলুন, আমি আপনার কী সাহায্য করতে পারি?’
চন্দন জবাব দিল, ‘আমি পানশালা নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছি৷ সুবীরদা বললেন, আপনি এ ব্যাপারে অনেক ইতিহাস জানেন৷ কলকাতার পানশালার ইতিহাস আর মদ্যপানের ইতিহাস৷ সে ব্যাপারেই জানতে এসেছি৷’
চন্দনের জবাব শুনে প্রাণগোপাল প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি মদ্যপান করেন? পানশালাতে গেছেন কখনও?’
চন্দন উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, করি কখনো-সখনো৷ কলকাতা ও মফসসলের বেশ কয়েকটা পানশালাতেও গেছি৷ আর দু-দিন ধরে মধ্য কলকাতার বিদিশা নামের একটা মাঝারি পানশালাতে যাওয়া-আসা শুরু করেছি ব্যাপারটা বোঝার জন্য৷’
প্রাণগোপাল বললেন, ‘বাঃ, আসলে যে বিষয় নিয়ে আপনি লিখবেন সে ব্যাপার সম্বন্ধে ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা থাকলে লেখা ভালো হয়৷ বিদিশা নামের বারটা যদি পুরোনো হয় তবে হয়তো কোনো সময় গেছি৷ তবে বছর দশেক হল কোনো বারে আর যেতে ভালো লাগে না৷ সাহেবদের থেকে আমরা বিলাতি মদ খাওয়া শিখলাম ঠিকই, কিন্তু তাদের এটিকেটটা শিখলাম না৷ অধিকাংশ পানশালাতেই শুধু হইহট্টগোল৷ তা ছাড়া অর্ধেক পানশালার কর্মীরা জানেই না, কোন মদ, কীভাবে কোন পাত্রে পরিবেশন করতে হয়৷ আর খদ্দেররাও জানে না কোন মদ কখন, কীভাবে কোন খাবারের সঙ্গে পান করতে হয়৷ আমি এখন সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে বসেই হুইস্কি খাই৷’
কথার মধ্যেই ঘরে ঢুকল একজন পরিচারক৷ বেশ বড় কাঁসার দুটো গ্লাস ভর্তি লস্যি সে নামিয়ে রেখে গেল টেবিলে৷
প্রাণগোপাল চন্দনদের উদ্দেশে বললেন, ‘নিন চুমুক দিন৷ এটা নিছকই লস্যি৷ তবে এটা যদি ‘বিশ্বনাথ লাহা’র যুগ হত তবে এ সময় ভাঙের শরবত পরিবেশন করা হত৷ সেই রামও আর নেই, সেই অযোধ্যাও নেই৷’
চন্দন চুমুক দিল গ্লাসে৷ পেস্তা দেওয়া, বরফের কুচি দেওয়া বাড়িতে বানানো ঠান্ডা লস্যি৷ প্রাণগোপাল এরপর চন্দনকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি বিশ্বনাথ লাহার নাম শুনেছেন? পুরোনো কলকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ লাহা?’
চন্দন মনে করতে পারল না নামটা৷ সে জবাব দিল, ‘ওনার নাম সম্ভবত জানা নেই৷’
প্রাণগোপাল নিজের ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর্দা প্রিন্স দ্বারকানাথের সদ্যপ্রীতির কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন? বেলঘোরের সেই বিখ্যাত বাগানবাড়ির কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন, যেখানে দ্বারকানাথ তাঁর সঙ্গী, ইয়ারদের নিয়ে মজলিশ বসাতেন?’
চন্দন বলল, ‘হ্যাঁ, দ্বারকানাথের মদ্যপ্রীতি, আর সেই বিখ্যাত বাগানবাড়ির কথা শুনেছি৷’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠাকুরবাড়িতে অনেকেরই মদ্যপানের নেশা ছিল৷ দ্বারকানাথের ওই বাগানবাড়িতে মদ্য সরবরাহ করতেন আমার পূর্বপুরুষ বিশ্বনাথ লাহা৷ অনেক সময় দ্বারকানাথের মদ্যপানের সঙ্গীও হতেন৷ কাজেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন মদ্যপান আমার রক্তে সাত পুরুষ ধরে মিশে আছে৷’
এরপর তিনি একটু হেসে বললেন, ‘সে এক যুগ ছিল বটে৷ বাঙালির বাবুয়ানার, বাঙালির মদ্যবিলাশের যুগ৷ দ্বারকানাথও ছিলেন তার অন্যতম পথিকৃৎ৷ ঠাকুর পরিবারের মদ্যপ্রেম নিয়ে রূপচাদ পক্ষী তো গানই বেঁধে ফেলেছিলেন—
‘কী মজা আছেরে লাল জলে জানে ঠাকুর কোম্পানি,
মদের গুণাগুণ আমরা কী জানি৷’
ঠাকুরবাড়ি নিয়ে একটা চুটকিও সে সময় লোকের মুখে ঘুরত—দুধ আর মদে স্নান করে বলে ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের গায়ের রং এত ফর্সা! দ্বারকানাথ মদ্যপ্রেমে মজেছিলেন সম্ভবত তাঁর এক আইডল রাজা রামমোহনকে দেখে৷ রামমোহন নিয়মিত মদ্যপান করতেন৷ তাঁর পড়ার টেবিলে বইপত্তরের সঙ্গে মদের বোতল দেখে রাজার মা নাকি আক্ষেপ করে বলেছিলেন—‘ম্লেচ্ছদের সঙ্গে মিশে ছেলে আমার মদ্যপানও ধরল!’
তবে রামমোহন নিয়মিত হলেও পরিমিত মদ্যপান করতেন৷ ঠিক তিন পেগ স্কচ হুইস্কি৷ রাজা তাঁর বেশ কিছু লেখাতে কার্যত মদ্যপানকে সমর্থনও করেছেন৷ আসলে সে সময়টা ছিল একাধারে বাঙালির জেগে ওঠার যুগ, আর তার সঙ্গে মদ্যপানেরও যুগ৷ হিন্দু কলেজের ছাত্ররা তো অনেকেই মনে করতেন, মদ্যপান করা মানে সংস্কারমুক্ত হবার একটা ধাপ৷ গোলদিঘির পাড়ে মদের আড্ডা বসাত, হিন্দু কলেজের কৃর্তী ছাত্ররা৷ হুইস্কি, রম আর ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর লেখায় যাকে ‘বীর’ বলে উল্লেখ করেছেন সেই ‘বিয়ার’ খাওয়া চলত সেখানে৷ অনেক শিক্ষিত বনেদি পরিবারের খুব একটা আপত্তিও ছিল না ছাত্রাবস্থায় মদ্যপান নিয়ে৷ শিবনাথ শাস্ত্রী মশাইয়ের রচনাতে আছে একদিন রাজনারায়ণ বসু নাকি একবার মদ খেয়ে গোলদিঘির পাড়ে পড়ে আছেন৷ তাঁর পিতৃদেব নন্দকিশোর বসু ব্যাপারটা জানতে পেরে ছেলেকে ডেকে আলমারি থেকে নিজের হাতে মদের বোতল বার করে পেগ সাজিয়ে বলেন, ‘এবার থেকে মদ্যপান করলে আমার সাথেই করবে৷ দিঘির পাড়ে গড়াগড়ি খাবে না৷’ একটানা অনেকগুলো কথা বলে থামলেন প্রাণগোপাল৷
চন্দন তাঁর বলা কথাগুলো শুনে বুঝতে পারল সুবীরদা তাকে ভুল জায়গাতে আনেননি৷ সুবীরদাও মৃদু হাসছেন চন্দনের দিকে তাকিয়ে৷
প্রাণগোপাল লাহা এরপর চন্দনকে বললেন, ‘আমি হয়তো অপ্রাসঙ্গিক অনেক কথা বলে ফেললাম৷ আসলে বৈঠকি আড্ডার ব্যাপারটাও আমার পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া৷ কথা বলতে শুরু করলে থামি না৷ আপনার জিজ্ঞাস্যটা যেন ঠিক কী ছিল?’
চন্দন বলে উঠল, ‘না, না, অপ্রাসঙ্গিক কথা একদমই নয়৷ আপনার কথাগুলো আমার কাজে লাগবে৷ বেশ কিছু অজানা তথ্য জানলাম৷ আমি পানশালার ইতিহাস সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি৷’
প্রশ্নটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন প্রাণগোপাল৷ যেন তিনি মনে মনে সাজিয়ে নিলেন চন্দনকে তিনি কী বলবেন৷ চন্দনও তার খাতাটা বার করল, নোট নেবার জন্য৷
প্রাণগোপাল লাহা চন্দনের প্রশ্নর জবাবে কথা শুরু করলেন, ‘দেখুন এই পানশালার ব্যাপারটা শুধু কলকাতাতে নয়, এ বাংলায় অনেক প্রাচীন৷ অন্তত ছয়, সাতশো বছর তো হবেই৷ এই বাংলাতে গুড় দিয়ে একধরনের মদ প্রস্তুত করা হত যার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে৷ যাকে অনেকে বলেছেন ‘গৌড়ীয় মদ’৷ কেউ কেউ তো আবার এমনও সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, গুড়জাত ওই মদের কারণেই এই স্থানের, রাজ্যের নাম হয়ে যায় গৌড়৷ গুড় ছাড়া মধু মেশানো মদও প্রস্তুত হত প্রাচীন বাংলাতে৷ তার নাম গৌড়ীয় মাধ্বী৷ এ ছাড়া ভাত, গম ইত্যাদি দিয়ে মদও প্রস্তুত হত৷ আর মদ্যপ্রেমী মানুষদের জন্য সেখানে গড়ে উঠেছিল শুঁড়িখানা বা প্রাচীন পানশালা৷ ও সব বাড়ির দেওয়ালের গায়ে বিশেষ চিহ্ন আঁকা থাকত৷ যা দেখে মদ্যসন্ধানীরা বুঝত ওই বাড়িগুলো হল শুঁড়িখানা৷ জালাতে মদ রাখা থাকত সেখানে৷ তালপাতার চাটাইতে বসে বেলের খোল পাত্র হিসাবে ব্যবহার করে মদ্যপান করা হত৷ পরবর্তীকালে ইউরোপীয় বণিকরা এদেশে বিলাতি মদ্য নিয়ে আসার আগে, বাংলার নবাব, রাজা, জমিদার, নায়েব, মদসুদ্দি, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মদ্যপান বা তরল নেশাদ্রব্য পানের অভ্যাস ছিল৷ সেগুলো মূলত হল জারিত ফলের রস, তাড়ি, মহুয়া, ধেনো মদ আর আরক৷ নানা ধরনের গাছগাছালির ছাল, শিকড়ের সঙ্গে আরও বেশ কিছু জিনিস মিশিয়ে আরক প্রস্তুত করা হত৷ এবার বলি ইংরেজদের কলকাতাতে আগমনের পরের কথা৷ তারা সঙ্গে করে বিদেশি মদ নিয়ে হাজির হলেও ইংরেজ-পর্তুগিজরা এখানে আসার পর দেশীয় মদের প্রতি প্রবল আকৃষ্ট হয়ে পড়ে৷ বিশেষত ওই ধেনো মদ আর আরকের ওপরে৷ দামেও সস্তা আর কড়া নেশাও হয়৷ আরকের সঙ্গে বিদেশি মদ মিশিয়ে ককটেলের মতো একধরনের মদ তৈরি করতে শুরু করে সাদা চামড়ার লোকগুলো৷ সেই মদের নাম ‘পাঞ্চ’৷ বর্তমানে মধ্য কলকাতা বলতে যা আমরা বুঝি সে জায়গাতে বেশ কয়েকটা পাঞ্চ হাউস গড়ে তোলে তারা৷ তা ছাড়া অনেক জায়গাতে নিজস্ব পানশালা বা ট্যাভার্নও গড়ে তোলে তারা৷ যে দু-তিনটের নাম মনে পড়ছে তা হল লন্ডন হার্মনিক, মুরস্যাটাভার্ন এসব৷ চিনা নাবিকরাও কিছু পানশালার পত্তন করে কলকাতাতে তাদের বাসস্থানের আশেপাশে৷ তবে আধুনিক ‘বার কাম রেস্টুরেন্ট’ বলতে আমরা যা বুঝি তার জন্ম হয়েছিল যতটুকু পড়েছি তা হল আঠেরোশো সত্তর সালে৷ উইলিয়াম পার্কস বলে এক ইংরেজ বর্তমান ধর্মতলার কাছাকাছি ‘লন্ডন হোটেল’ নামে একটা বার কাম রেস্টুরেন্ট বানিয়েছিলেন৷ তবে সেই বার চালু হত সন্ধ্যা ছটা থেকে৷ এক মোহরের বিনিময়ে সেখানে পানাহারের সুযোগ মিলত৷ এক মোহরের বিনিময়ে সে সময় দুটো দুধেলা গাই পাওয়া যেত৷ বুঝতেই পারছেন, ওই লন্ডন হোটেলকে কলকাতার প্রথম ‘লাক্সারি বার’ও বলা যেতে পারে৷ তবে ওই সব ট্রাভার্ন বা হোটেলগুলো সাধারণত ছিল ইউরোপীয় অথবা পয়সাঅলা, সম্ভ্রান্ত ভারতীয়দের জন্য৷ আর সাধারণ মধ্যবিত্ত মদ্যপ্রেমীদের জন্য ছিল অসংখ্য চোলাই-ধেনো মদ আর তাড়ির ঠেক৷’
দীর্ঘক্ষণ কথা বলে থামলেন প্রাণগোপাল লাহা৷ তাঁর কথা শুনতে শুনতে দ্রুত হাতে নোট নিছিল চন্দন৷ প্রাণগোপাল চন্দনের নোটবুকের দিকে তাকিয়ে এরপর বললেন, ‘দাঁড়ান, মনে পড়েছে! আমিও একবার এ ব্যাপারে কয়েকটা বইয়ের থেকে একটা খাতায় নোট লিখে রেখেছিলাম৷ সেটা দেখে বললে আপনার সুবিধা হবে৷’
প্রাণগোপাল চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে একটা আলমারি খুলে একটা বাঁধানো খাতা বার করে এনে বসলেন৷ খাতার বেশ কিছু পাতা ওলটাবার পর তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এই যে পেয়েছি৷ তথ্যটা আপনার কাজে লাগতে পারে৷ আঠেরোশো সত্তর সালে কলকাতা শহরে মোট এগারোটা পাঞ্চ হাউস ছিল, আর ছিল অসংখ্য শুঁড়িখানা৷ যেখানে বসে খাবার সুবিধা ছিল৷ অর্থাৎ এক অর্থে এরাও ছিল কলকাতার বারের আদি পুরুষ৷ আঠেরোশো ছিয়াত্তরের এক নথি থেকে জানা যায় সে সময় কলকাতা শহরে খুচরো মদের দোকান ছিল তিয়াত্তরটি, শুঁড়িখানা ছিল পাঁচটি, আর বসে খাওয়া মদের দোকান ছিল চবিবশটি৷ এগুলো ছিল সরকার স্বীকৃত৷ তা ছাড়া ছিল অসংখ্য বেআইনি দোকান৷’
তথ্যটা টুকে নিল চন্দন৷ প্রাণগোপাল লাহা খাতাটা বন্ধ করে বললেন, আসলে ওই আঠেরোশো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্ত, কেরানি বাঙালিরাও সুরাপ্রেমে আকৃষ্ট হয়৷ ধর্মতলা, পার্কস্ট্রিট, লালবাজার অঞ্চলে গড়ে উঠতে থাকে মধ্যবিত্তদের জন্য ছোটো ছোটো বার৷ এছাড়া শহরের নানা অঞ্চলে তৈরি হয় নানা অবৈধ পানশালা৷ বৌবাজার অঞ্চলের ফ্ল্যাগ স্ট্রিট শুঁড়িখানার জন্য কুখ্যাত ছিল৷ এছাড়াও ছিল মধ্যবিত্ত ও গরিবদের জন্য ছাতাওলা গলি, চুনা গলির মতো জায়গা৷
প্রাণগোপাল লাহা এরপর পুরোনো কলকাতার পানশালা ও সেসময় কলকাতা ও তার আশেপাশের নানা মদ্যপ্রেমীদের গল্প শোনালেন৷ প্রাণকৃষ্ণ মিত্র, রামহরি ঠাকুর, বারাণসী ঘোষ সহ বিখ্যাত মদ্যপ্রেমীদের নাম৷ প্রাণগোপালের কথায় উঠে আসতে লাগল সে সময়ের মদ্যপ্রেমিকদের নানা মজাদার তথ্য৷ কেমন করে মদ খাইয়ে ইংরেজ সাহেবদের থেকে জমিদাররা রায়বাহাদুর, রায়সাহেব খেতাব অর্জন করতেন, অথবা সারারাত ধরে মদ্যপান করে বাবুরা মুটের মাথায় ঝাঁকায় চেপে বাড়ি ফিরত সে সব গল্প৷ আর তার সঙ্গে মদ্যপ্রেমী মানুষদের করুণ কাহিনিও৷ যেমন একসময় প্রাণগোপাল বললেন, ‘অনেক মদ্যপ্রেমী যেমন সুরাপ্রীতির কারণে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন তেমনই তাঁদের মধ্যে শিক্ষা, রুচি আর পুরুষকারও ছিল৷ আজকের যুগের মানুষদের মতো তাদের মধ্যে ছ্যাঁচড়ামি ছিল না৷ এই যেমন হাওড়ার পাতিহালের জমিদার বরদাপ্রসাদ মজুমদারের কথাই বলি৷ সুরাপ্রেমী পাতিহালের জমিদার একদিন রাতে তাঁর পাত্র-মিত্র-মোসাহেবদের নিয়ে মজলিশে বসেছিলেন৷ কিছু নিমন্ত্রিত অতিথিও ছিলেন সেই মজলিশে৷ রাত বাড়ছে৷ তার সঙ্গে বেড়ে চলছে নাচ-গান আর মদ্যপানও৷ হঠাৎ মাঝরাতে শেষ হয়ে গেল মদের ভাণ্ডার৷ তখনও কিছু অতিথি মদ্যপানে পরিতৃপ্ত হয়নি৷ জমিদার বাড়িতে এসে মদ চেয়ে ফিরে যাবে অতিথিরা? তবে কি জমিদারের আর কোনো সম্মান থাকবে? নেশার ঘোরে জমিদার বরদাপ্রসাদ তাঁর ইয়ারদোস্ত, মোসাহেবদের ডেকে বললেন, ‘সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, যে আমাকে এই মাঝরাতে কয়েক বোতল মদ জোগাড় করে এনে দিতে পারবে তাকে আমি সকালে আমার জমিদারি লিখে দেব৷’
কথাটা শুনে তাঁর এক মোসাহেব তখনই কয়েক বোতল মদ জোগাড় করে এনে দিল৷ শুরু হল অতিথিদের আবার মদ্যপান৷ রাত শেষ হল একসময়৷ মদ্যাসক্ত অতিথিরা কেউ মুটের মাথায় ঝাঁকায় চেপে, কেউ বা পালকিতে অথবা পদব্রজে চলতে চলতে বাড়ির পথ ধরলেন৷ মদের ঘোর কেটে যাবার পর একটু বেলার দিকে স্নান সেরে, নতুন পিরান গায়ে আতর মেখে রোজকার মতো বারমহলে এসে বসলেন বরদাপ্রসাদ৷ যথারীতি তাঁর মোসাহেবের দলও তাঁর বৈঠকখানায় হাজির হল৷ সেই মোসাহেব যে গতরাতে মদ জোগাড় করে দিয়েছিল সে একটু মজার ছলেই জমিদারকে বলল, ‘আপনি সবাইকে সাক্ষী রেখে গতরাতে বলেছিলেন যে অতিথিদের জন্য মদ এনে দিতে পারবে তাকে আপনি আজ জমিদারি লিখে দেবেন৷ তবে জমিদারি লিখে দিন আমাকে?’
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন বরদাপ্রসাদ৷ কথা দিয়ে কথা না রাখার মতো বড়ো ধাপ্পা আর কিছু হয় না৷ সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি উকিল ডাকলেন৷ তারপর সেদিনই দলিল করে জমিদারি সেই মোসাহেবের নামে লিখে দিলেন৷ একেই বলে ‘ম্যান অব ওয়ার্ড৷’ হিন্দিতে বলে ‘মর্দ কি বাত, হাঁথি কা দাঁত৷’
এ পর্যন্ত শুনে চন্দন বিস্মিত ভাবে বলে উঠল, ‘সামান্য কটা মদের বোতলের বিনিময়ে, নেশার ঘোরে বলা কথার জন্য জমিদারি লিখে দিলেন তিনি!’
প্রাণগোপাল বললেন, ‘শুধু তাই নয়৷ বরদাপ্রসাদের জীবনের পরবর্তী কাহিনিটাও আপনাদের দুজনেরই জানা প্রয়োজন যেহেতু আপনারা বই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত৷ স্ত্রী-পুত্রকে পাতিহালে ফেলে রেখে ভাগ্যান্বেষণে পায়ে হেঁটে পাতিহাল থেকে কলকাতায় এসে উপস্থিত হলেন তিনি৷ কিন্তু কী কাজ করবেন তিনি? বরদাপ্রসাদ জমিদারের ছেলে জমিদার৷ ভোগ-বিলাস ছাড়া একমাত্র বই পড়তে পারেন তিনি৷ বইয়ের নেশা ছিল তাঁর৷ ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন হাজির হলেন বাগবাজারে গঙ্গার পাড়ে বটতলাতে৷ গরিব ফেরিওয়ালারা সেখান থেকে বাকিতে নানা জিনিস নিয়ে যায় যার মধ্যে বইও আছে৷ চটুল গল্প উপন্যাস পাঁচালি, মেয়েদের ব্রতকথা এ ধরনের বই৷ বটতলার বই৷ পাড়ায় পাড়ায় ঝাঁকা মাথায় বা কাঁধে করে ফিরিওয়ালারা পাড়ায় পাড়ায় তাদের জিনিস বিক্রি করে দিনের শেষে বা পরদিন পয়সা মিটিয়ে যায় মালিকের৷ বরদাপ্রসাদও সেই কাজ শুরু করলেন৷ জমিদারের ছেলে ভূতপূর্ব জমিদার, কপর্দকহীন বরদাপ্রসাদ বটতলা থেকে ধারে বই কিনে কাঁধে করে পাড়ায় পাড়ায় ফিরি করতে লাগলেন৷ ভাবতে পারছেন ব্যাপারটা! সময় এগিয়ে চলল, বছর ঘুরে চলল৷ কিছুটা পয়সা রোজগার হল বরদাপ্রসাদের৷ ঝামাপুকুরে সে পয়সাতে তিনি মাথা গোঁজার আস্তানা করলেন৷ আরও বেশ কিছু বছর অতিক্রান্ত হলে তিনি ধীরে ধীরে ওই বই ব্যবসা মুনাফা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন, বি. পি. এম টাইপো ফাউন্ডারি ছাপাখানা৷ গ্রাম থেকে কলকাতা শহরে চলে এসে বরদা-প্রসাদের পুত্র আশুতোষও ততদিনে ব্যবসার হাল ধরেছেন৷ বরদাপ্রসাদের উপাধি ছিল ‘মজুমদার’ আর পদবি ছিল ‘দেব’৷ আশুতোষ প্রতিষ্ঠা করলেন প্রকাশনা সংস্থা ‘দেব লাইব্রেরি’৷ এদিকে বিদ্যাসাগরের ‘সংস্কৃত প্রেস’ তখন দেনার দায়ে বিক্রি হতে চলেছে, বন্ধ হতে চলেছে বর্ণপরিচয় ছাপার কাজ৷ আশুতোষ পাওনাদারের দেনা মিটিয়ে সেই স্বত্ত্ব কিনে নিলেন৷ বরদাপ্রসাদের প্রেসের এতদিনে বেশ নামডাক হয়েছে৷ বরদাপ্রসাদের প্রেসে আবার শুরু হল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় ছাপার কাজ৷ এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি বরদা-প্রসাদের উত্তরাধিকারীদের৷ পাঁচ পুরুষ ধরে চলছে দেব লাইব্রেরি৷ চলছে দেব সাহিত্য কুটীর প্রকাশনা৷ বুঝতে পারছেন একেই বলে পুরুষকার৷ মদ্যপ্রেমী, কপর্দকহীন জমিদারি খোয়ানো বরদাপ্রসাদ তাঁর নিজের পুরুষকার, পরিশ্রম আর সততার বলে নিজেকে এমন জায়গাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন যে স্বয়ং বিদ্যাসাগরের মতো মানুষও তাঁর প্রেসে বর্ণপরিচয় তুলে দিয়েছিলেন৷’
এ কাহিনি চন্দনের কাছে একদমই নতুন৷ এমনকী সুবীরদাও বললেন, ‘দেব লাইব্রেরীর সাথে আমারও কারবার আছে, কিন্তু এ কাহিনী আমার জানা ছিলো না৷
প্রাণগোপালের সঙ্গে চন্দনদের কথা যখন শেষ হল ততক্ষণে ঘণ্টা দুই সময় কেটে গেছে৷ তাঁর কথা শুনে চন্দন বেশ পরিতৃপ্ত৷ সাধ্য মতো নোটও নিয়েছে সে৷ তারা চেয়ার থেকে উঠে ঘর থেকে বেরোবার পর তাদের সিড়ির মুখ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে প্রাণগোপাল লাহা বললেন, ‘দরকার হলে আবারও আসবেন৷ কথা বলতে আমার ভালোই লাগে৷ আর যদি সন্ধ্যাবেলা আসতে পারেন তবে স্কচ খাওয়াতে পারি৷ এদেশের নয়, খাঁটি স্কটল্যান্ডের থেকে আনা৷’
প্রাণগোপাল লাহার বাড়ি থেকে আবার কলেজ স্ট্রিটে যাবার পথ ধরল চন্দনরা৷ হাঁটতে হাঁটতে চন্দন বলল, ‘সত্যি লোকটা অসাধারণ৷ যতটুকু জানতে চেয়েছিলাম তার থেকে অনেক বেশি জানলাম ওঁর থেকে৷ এখানে নিয়ে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ৷’
সুবীরদা হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, এসব লোক মদ্যপ্রেমী হলেও পুরোনো কলকাতার ব্যাপারে জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া৷ আপনি গুগল সার্চ করলে যে তথ্য জানবেন তার থেকে এদের কাছে বেশি তথ্য পাবেন৷ তবে আপনার উপন্যাসটা যে শারদীয়া সংখ্যাতে প্রকাশ হোক না কেন, বই করার জন্য কিন্তু আমাকেই দেবেন৷ বড় প্রকাশক যেন ছিনিয়ে না নেয়৷’
চন্দন হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আপনাকেই দেব৷’
কথা বলতে বলতে কলেজ স্ট্রিট পৌঁছে গেল তারা৷ পিক আওয়ার্স৷ ক্রেতাদের ভিড়, ঠেলাওলা, দোকানিদের চিৎকার, হাঁকডাকে চারপাশ সরগরম৷ সুবীরদাকে দোকানে ফিরতে হবে, আর চন্দনকে যেতে হবে বিদিশাতে৷ কলেজ স্ট্রিট চৌরাস্তার মোড়ে সুবীরদার থেকে বিদায় নিয়ে চন্দন একটা বাসে চেপে বসল বিদিশাতে যাবার জন্য৷