৷৷ ২ ৷৷
ট্রেনটা একটু লেট ছিল৷ তার ওপর শনিবার বলে বিকাল থেকেই অফিস ফেরতা মানুষের ঢল৷ বাসেও প্রচণ্ড ভিড়৷ কয়েকটা বাস ছেড়ে দিতে হয়েছে চন্দনকে৷ বিদিশা বারের সামনে পৌঁছোতে প্রায় সাতটা বেজে গেল৷ আশেপাশের রেস্তোরাঁ, পানশালার হোর্ডিংগুলো নিয়নের আলোয় ঝলমল করছে৷ যেন তারা হাত নেড়ে ডাকছে পথচারীদের৷ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে অবিশ্রান্ত গাড়ির স্রোত আর হর্নের শব্দ৷ রাত নামছে কলকাতাতে৷ মোহমোয়ী রাত৷
কাচের দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল গেটম্যান রমানাথ৷ চন্দনকে দেখে তার মুখের হাসিই বলে দিল সে তাকে চিনতে পেরেছে৷ সেলাম ঠুকে দরজা খুলে দিল সে৷ চন্দন ভিতরে পা রাখল৷ এসির ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করল তার শরীর৷ কারুকাজ করা প্লাইউডের নীচু সিলিং থেকে মাথার ওপর ছোট ছোট আলো জ্বলছে৷ সব টেবিলই প্রায় ভর্তি৷ কয়েকজন মহিলাও আছে টু- সিটার টেবিলগুলোতে৷ ভ্রমরের গুঞ্জনের মতো শব্দ ভেসে আসছে ঘরের চারদিক থেকে৷ ওয়েটাররা ট্রেতে পানীয়, খাবারের গ্লাস নিয়ে সার্ভ করছে৷ বিদিশা বারের ম্যানেজার অপূর্ব ঘোষালকে দেখতে পেল চন্দন৷ তাঁর পরনে কালো প্যান্ট, সাদা বুশশার্ট, পিন দিয়ে আটকানো লাল টাই৷ সোনালি ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে চোখ চারপাশের টেবিলে ঘুরছে৷ চন্দনকে দেখতে পেয়ে স্মিত হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে৷ টেবিলগুলোর মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চন্দন কাউন্টারের কাছে অপূর্ব ঘোষালের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, ‘গুড ইভিনিং স্যার৷ আপনার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে আমি ভাবলাম আপনি আর এলেনই না৷’
চন্দন পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছে বলল, ‘ট্রেনটা লেট করল, বাসেও উঠতে একটু বেগ পেতে হল৷ তা আজকে এখানে তো বেশ ভিড় দেখছি!’
অপূর্ব ঘোষাল জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, শনিবার দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে৷ অনেকেই বাড়ি ফেরার আগে সারা সপ্তাহের ক্লান্তি দূর করতে বারে ঢোকেন৷’
একথা বলে একটু হেসে তিনি বললেন—‘অন্ধকার বিদিশার নিশা৷’
কথাটা শুনে চন্দন মৃদু বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এটা কোন কবিতার লাইন আপনি জানেন?’
চারদিকের টেবিলগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে ঠোঁটের কোলে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, জীবনানন্দ সেনের ‘বনলতা সেন’ কবিতা৷ তবে এ লাইনটা আমাকে প্রথম মজা করে বলেছিলেন এক কাস্টমার৷ স্কুলমাস্টার ছিলেন ভদ্রলোক৷ বছর দশেক আগে নিয়মিত আসতেন এখানে৷ আমি একটু-আধটু গল্প-উপন্যাস পড়ি বলে, কবিতার বইটাও একদিন আমাকে গিফট করেছিলেন৷’
চন্দন হেসে বলল ‘হ্যাঁ, ‘বিদিশার নিশা’ই বটে!’
অপূর্ব ঘোষাল বললেন, ‘স্যার, আপনার জন্য একটু চা বা কফি বলি? কী খাবেন?’
চন্দন জবাব দিল, ‘চা-ই ভালো৷ তবে এখন নয় একটু পরে হলে ভালো হয়৷’
তিনি বললেন, ‘তবে তাই হবে৷’
এ কথা বলে নিয়ে অপূর্ব ঘোষাল ক্যাশ কাউন্টারে বসা ক্যাশিয়ার ভদ্রলোককে বললেন, ‘শুভঙ্করবাবু, ফ্লোরটা একটু খেয়াল রাখবেন৷ সাত নম্বর টেবিলের বিলটা বানান৷ পাঁচ পেগ তো হয়ে গেল৷ অনেকক্ষণ ধরে ঢুলছে লোকটা৷ টেবিলটাও ফাঁকা করা দরকার৷’
এ কথা বলে তিনি চন্দনকে বললেন, ‘চলুন স্যার, আপনাকে এবার ওপর থেকে ঘুরিয়ে আনি৷’
অপূর্ব ঘোষাল তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করাতে একটা মৃদু অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল অপূর্বর৷ এ ডাকের মধ্যে একটা যেন কেমন দূরত্ব থাকে৷ চন্দন বলেই ফেলল কথটা—‘আপনি আমাকে ‘স্যার’ না বলে অন্য কিছু বলেও ডাকতে পারেন৷ এ শব্দটা শুনলে নিজেকে কেমন স্কুলমাস্টার বা কোনো অফিসের বাবু মনে হয়৷ আমি এর কোনোটাই নই৷
অপূর্ব হেসে বললেন, ‘আসলে তিরিশ বছর ধরে কাস্টমারদের স্যার স্যার বলে ডাকতে ডাকতে এই সম্ভাষণটাই মুখে চলে আসে৷ তবে কী বলে ডাকব বলুন তো?’
অপূর্ব ঘোষাল প্রায় কুড়ি বছর বয়সের বড় হবেন চন্দনের থেকে৷ চন্দন মৃদু ভেবে নিয়ে বলল, ‘চন্দনবাবু বলে ডাকতে পারেন, এমনকি নাম ধরে ডাকলেও আপত্তি নেই৷’
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিদিশা বারের ম্যানেজার বলে উঠলেন, ‘ছিঃ ছিঃ কী যে বলেন! আপনি একে লেখক মানুষ, তার ওপর আবার মালিকের পাঠানো লোক! আপনাকে কি নাম ধরে ডাকা যায়! বয়সে ছোট হলেও নয়৷ তবে আপনার ‘স্যার’ শব্দে আপত্তি থাকলে ওই ‘চন্দনবাবু’ বলে ডাকা যেতে পারে৷’
চন্দন হেসে বলল, ‘সেই ভালো৷ আর আমিও আপনাকে ‘অপূর্ববাবু’ বলেই ডাকব৷’
অপূর্ব এরপর চন্দনকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় একজন ওয়েটার তাঁদের সামনে এসে চাপা স্বরে বলল, ‘স্যার, চার নম্বর টেবিলটা একবার ঘুরে যান, অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা চলছে৷’
তার কথা শুনে কাছেই একটা টেবিলের দিকে এগোলেন অপূর্ব৷ বিরল কেশ বেঢপ চেহারার এক বৃদ্ধ বসে আছেন সেই টেবিলে৷ পরনে সাফারি সুট, হাতে দামি ঘড়ি৷ বছর পঁচিশের একটা মেয়েও বসে আছে তাঁর পাশে৷ লালচে ব্লিচ করা চুল৷ সাদা-কালো ডোরাকাটা টাইট টপ৷ তার পোশাকের নীচের অংশ অবশ্য দেখা যাচ্ছে না টেবিলের আড়ালে থাকায়৷ টেবিলের ওপর রাখা আছে একটা বিয়ারের বোতল, আধ-খাওয়া খাবারের প্লেট৷ বিয়ারের কাচের মগটা হাতে ধরে একটু এলিয়েই বসে আছেন সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক৷ অল্পবয়সি মেয়েটা গা ঘেঁসে বসে তাঁর৷ অপূর্ব ঘোষাল কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সেই টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোকের উদ্দেশে বললেন, ‘কেমন আছেন স্যার? শরীর ভালো আছে তো? আমাদের এখানে সার্ভিস ঠিক আছে তো?’
প্রশ্ন শুনে মৃদু চমকে উঠে সোজা হয়ে বসে ভদ্রলোক বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব ভালো৷ খুব ভালো সার্ভিস আপনাদের৷ সে জন্যই তো এখানে আসি৷’
বিদিশা বারের ম্যানেজার মৃদু হেসে তাঁর উদ্দেশে বললেন, ‘হ্যাঁ, ভালো থাকবেন, নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেবেন৷’—এ কথা বলে তিনি চন্দনের কাছে এসে বললেন, ‘চলুন ওপরে ওঠা যাক৷’
কার্পেট বিছানো সরু সিঁড়িটা দিয়ে উঠতে উঠতে চন্দন জানতে চাইল, ‘চার নম্বর টেবিলের ব্যাপারটা কী হল? ওয়েটার বলল বলে আপনি যে টেবিলে গিয়ে ভদ্রলোকের খোঁজ নিলেন?’
অপূর্ব বললেন, ‘ভালগার’৷
চন্দন বলল, ‘তার মানে?’
তিনি প্রথমে বললেন, ‘পঁচাত্তর বছর বয়স হবে লোকটার৷ অনেক পয়সা, কোনো একটা কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ছিল একসময়৷ ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকে৷ বুড়োটা মাঝে মাঝে এখানে আসে সঙ্গে নাতনির বয়সি মেয়েদের নিয়ে৷’—এ কথা বলে একটু থেমে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে করিডোর দিয়ে এগোতে এগোতে বললেন, ‘মেয়েটা সম্ভবত এসকর্ট সার্ভিস থেকে ভাড়া করা৷ হাঁটু পর্যন্ত স্কার্ট৷ বুড়োর বাঁ হাতটা খেলা করছিল টেবিলের আড়ালে মেয়েটার স্কার্টের নীচে৷ টেবিলের সামনের অংশ ঢাকা থাকায় সামনের দিক থেকে কিছু দেখা না গেলেও পাশের টেবিলের কাস্টমাররা আর-যাওয়া আসার পথে ওয়েটাররা দেখতে পাচ্ছিল সেটা৷ বুড়োটাকে তো আর বলা যায় না যে, আপনি এসব কী করছেন? কাজেই কায়দা করে তার শরীরের খোঁজখবর নেবার অছিলায় বুঝিয়ে দিলাম তিনি আমাদের নজরে পড়েছেন৷ এমন কত কিছু চোখে পড়ে আমাদের৷ কায়দা করে ট্যাকেল করতে হয় আমাদের যাতে বারের পরিবেশ খুব একটা খারাপ না হয়৷ আবার যে সব কাস্টমার ওসব ভালগারিটি করেন তাঁরাও অসন্তুষ্ট না হন৷’ অপূর্ব ঘোষালের কথা শুনে চন্দন বুঝতে পারল এ লাইনে দীর্ঘদিন থাকার ফলে নিজের কাজের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত পেশাদায়িত্ব অর্জন করেছেন অপূর্ব ঘোষাল৷
চন্দনকে নিয়ে তিনি উপস্থিত হলেন গতদিনের সেই কাচের দরজার সামনে৷ যেখানে অন্য দিক থেকে স্বর্গের সিঁড়ি এসে মিশেছে৷ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বেশ শক্তপোক্ত চেহারার মাঝবয়সি লোক৷ ঘাড় পর্যন্ত চেঁচে তোলা মাথার পিছনের চুল৷ পরনে টাইট জিন্স আর গেঞ্জি৷ পায়ে সস্তা দামের স্নিকার৷ তাকে দেখিয়ে অপূর্ব বললেন, ‘এই হল আমাদের অর্জুন৷ যার কথা আপনাকে বলেছি৷’
অর্জুন নামের লোকটা অপূর্ব ঘোষালকে বলল ‘হ্যাঁ স্যার, ওনার কথা রমানাথ বলেছে আমাকে৷’—এ কথা বলে সে চন্দনের উদ্দেশে বলল, ‘গুড ইভিনিং স্যার৷’
চন্দনও প্রত্যুত্তরে বলল, ‘গুড ইভিনিং৷’
অপূর্ব ঘোষাল চন্দনকে বললেন, ‘চলুন, আমরা এবার শনিবারের স্বর্গে প্রবেশ করব৷’
অর্জুন দরজা খুলে দিল৷ কাচের পর্দার আড়ালে প্রবেশ করল চন্দনরা৷ ভিতরে ঢুকেই মুহূর্তের জন্য যেন কানে তালা লেগে গেল চন্দনের! প্রচণ্ড জোরে গমগম শব্দে লাউড স্পিকার বক্স বাজছে৷ ডায়াসের ওপর কর্ডলেস মাইক্রোফোন হাতে বহুল প্রচলিত একটা গান গাইছে গতকালের সেই আশাবরী নামে সেই মহিলা৷ তিন-চারজন লোক উচ্চগ্রামে নানা ধরনের বাজনা বাজাচ্ছে গানের সঙ্গে৷ ডায়াসের কোণের দিকে আরও একজন অল্পবয়সি মেয়ে বসে আছে৷ শ্যামবর্ণা ছিপছিপে চেহারা, মুখমণ্ডলে একটু চড়া মেকাপ৷ গায়ে চুমকি বসানো কালো শাড়ি-ব্লাউজ৷ এখানকার ওয়েটারদের পরনে সাবেকি পাগড়ি কুর্তার বদলে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট৷ সব টেবিলই ভর্তি৷ তবে কাস্টমারদের মধ্যে বয়স্ক লোক তেমন একটা নেই৷ দু-চারজন মাঝবয়সি লোক ছাড়া এ সময় অধিকাংশই অল্পবয়সি যুবক৷ নিজেদের মধ্যে অনেকেই উচ্চস্বরে কথা বলছে, কিন্তু লাউড স্পিকারের তুমুল শব্দের সঙ্গে তাদের কথাবার্তা মিলেমিশে যাবার ফলে কারো কথাই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না৷ তবে তাদের হাবভাব উচ্ছলতা দেখে মনে হচ্ছে তারা তাদের সব চিন্তা যেন বাইরে ছেড়ে স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে এই তথাকথিত স্বর্গে এসে উপস্থিত হয়েছে কিছুটা সময় জীবনের উল্লাসে বেঁচে থাকার জন্য৷ নীচের ফ্লোরের তুলনায় ঘরের বাতাসে মদের গন্ধ অনেক বেশি কড়া৷ কাস্টমারদের টেবিলের বা তাদের হাতে ধরা গ্লাসগুলোর পানীয় গাঢ় রক্তবর্ণের, কালচে ধরনের৷ চারদিকে তাকিয়ে চন্দন বুঝতে পারল, স্কচ হুইস্কি বা নরম ভদকা, জিন পান করার মতো লোক এখানে বিশেষ নেই৷ এরা ওই কালচে বর্ণের রাম বা সস্তা দামের কড়া হুইস্কি খাওয়া লোক৷ গান গাইতে গাইতে রাতপরি আশাবরী কোনো টেবিলে বসা কারো দিকে তাকিয়ে হাসি ছুড়ে দিচ্ছে অথবা চোখের ইশারা৷ কেউ কেউ বিশ-পঞ্চাশ বা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিচ্ছে৷ একজন ওয়েটার টেবিল থেকে সেই নোট নিয়ে রাখছে ডায়াসে, মিউজিক সিস্টেমের ওপর রাখা একটা প্লাস্টিকের ঝুড়িতে৷
আশাবরীর একটা গান শেষ হতেই কয়েকজন চেঁচিয়ে নিজেদের পছন্দ মতো গানের অনুরোধ জানাল তাকে৷ আবারও গান ধরল আশাবরী৷ তার সঙ্গে আবারও শুরু হল বাজনার প্রচণ্ড শব্দ৷ যে গানটা আশাবরী এবার ধরেছে সেটা অতি পরিচিত হিন্দিগান—‘উও সাম কুছ আজিব থি৷’ আশাবরী কয়েক লাইন গাওয়ার পর চন্দন এটাও বুঝতে পারল গানটার সুরও ঠিক নেই৷ অপূর্ব চন্দনকে প্রশ্ন করলেন, ‘কেমন বুঝেছেন?’
চন্দন একটু ইতস্তত করে বলল, ‘এত শব্দের মধ্যে এই লোকগুলো বসে আছে কীভাবে তাই ভাবছি! তা ছাড়া যিনি গাইছেন তার গলাটা সুন্দর হলেও…৷’
চন্দনের না-বলা কথাটা ধরে নিয়ে অপূর্ব বললেন, ‘সুন্দর হলেও সুর-তাল ঠিক নেই বলতে চাচ্ছেন তো? আসলে এই টেবিলগুলোতে যাঁরা বসে আছেন, দু-পেগ গলাতে ঢালার পর তাঁদের সব গানই সুন্দর মনে হয়, এরাই তখন এঁদের কাছে লতা-আশা-সন্ধ্যা৷ এই তো মজা, এখানে গায়ক-গায়িকারা গলায় নতুন তোলা গান প্র্যাক্টিস করে নিতে পারে৷ গান আর বাজনাটাই এখানে আসল৷ গলাটা মোটামুটি থাকলেই চলে যায়, কথা বা সুরের ভুলচুক তেমন ধর্তব্যের মধ্যে নয়৷ তবে এ জায়গাটাকে যারা ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারে অনুশীলনের জায়গা হিসাবে, তাদের কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যতে একদিন কাঞ্চন কুমার হন৷’
এ কথা বলার পর চারপাশের টেবিলগুলো একবার দেখে নিয়ে অপূর্ব বললেন, ‘আচ্ছা, এই টেবিলগুলোতে যাঁরা বসে আছেন তাঁদের মধ্যে সব থেকে ভদ্র-শান্ত মানুষ বলে আপনার কাকে মনে হচ্ছে বলুন তো?’
প্রশ্নটা শুনে চারপাশে তাকাতে তাকাতে চন্দনের একটা টেবিলে চোখ আটকে গেল৷ নিশ্চুপ ভাবে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে মাঝবয়সি ভদ্রলোক৷ ছিপছিপে চেহারা, পরনে সাদা ফুলশার্ট, কালো প্যান্ট৷ পায়ে চামড়ার সাদা চপ্পল, চোখে চশমাও আছে৷ শান্ত, ভাবলেশহীন মুখ৷ চারপাশের হইহুল্লোড় যেন তাকে স্পর্শ করছে না৷ চন্দন চোখের ইশারাতে লোকটাকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে ডানদিকের একদম শেষ টেবিলে একা বসে থাকা চশমা পরা লোকটা কে?’
কথাটা শুনে মৃদু হাসি ফুটে উঠল অপূর্ব ঘোষালের ঠোঁটে, একটু চাপা স্বরে তিনি বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি ওকেই দেখাবেন৷ ওর নাম ‘তাজ’৷ বন্দর এলাকার বেতাজ বাদশা৷ স্মাগলিং থেকে তোলাবাজি সব কিছুই করে৷ ভালো পলিটিকাল কানেকশন আছে৷ অনেকদিন ধরে মাঝে মাঝেই এখানে আসে৷ চুপচাপ ঠিক দু-পেগ খেয়ে বেরিয়ে যায়৷ সম্ভবত এদিকে কোনো কাজে আসে ও৷’
কথাটা শুনে চন্দন একটু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘লোকটার চেহারা দেখে কিন্তু নিপাট ভদ্রলোকই মনে হচ্ছে!’
অপূর্ব হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ৷ আমরা সাদা চোখেও সব ঠিক দেখি না৷ আর পেটে মদ পড়লে তো কথাই নেই, তখন অনেক কিছুই ভুল দেখি আমরা—ঠিককে বেঠিক, বেঠিককে ঠিক৷ তাই এখানে যারা বসে আছে তাদের এখানকার অনেক কিছুই ঠিক মনে হয়৷ যেমন এই চড়া মিউজিক, কখনও বা একটু-আধটু বেসুরো গান৷ আসলে এখানে যারা আসে তারা ঠিক গান উপভোগ করতে আসে না; সময়টাকে, রাতটাকে উপভোগ করতে আসে৷’—এ কথা বলে চন্দনকে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে এগিয়ে গিয়ে টেবিলগুলোর মধ্যে ঘুরতে শুরু করলেন বিদিশা বারের ম্যানেজার অপূর্ব ঘোষাল৷ দু-একজন কাস্টমারের সাথে মৃদু বাক্যালাপও করলেন তিনি৷ সেই তাজ নামের লোকটার টেবিলের কাছে গিয়েও হাসিমুখে তার সঙ্গে কয়েকটা কথাও বললেন তিনি৷ রাতপরি আশাবরী নতুন একটা গান ধরল—‘এই রাত তোমার আমার, শুধু দুজনে…৷’ একটা উচ্ছ্বাসের ঢেউ খেলে গেল ঘরটার মধ্যে৷ চন্দন বুঝতে পারল রাত যত গভীর হচ্ছে, নেশা যত তীব্র হচ্ছে ততই এ ঘরটা স্বর্গ হয়ে উঠছে লোকগুলোর কাছে৷
মিনিট দশেক ফ্লোরটাতে ঘুরে বেড়াবার পর অপূর্ব ঘোষাল ফিরে এসে বললেন, ‘চলুন এবার নীচে যাব৷ বিশেষত এই শনিবারটা আমাকে অনেকবার ওপর-নীচ করতে হয়৷ কাস্টমারের চাপ বেশি হয়, অনেক ফ্লাইং কাস্টমারও আসে৷ সব দিক খেয়াল রাখতে হয়৷ অশান্তির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে তা ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করতে হয়৷’
করিডোর দিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে চন্দন বলে, ‘শুনেছি, এ ব্যবসায় থানা-পুলিশের ব্যাপারটাও নাকি সামলাতে হয়?’
বিদিশা বারের ম্যানেজার বললেন, ‘থানা, আবগারি দপ্তর, করপোরেশন এসবের কিছুটা ঝামেলা সামলাতে হয় বইকি৷ ছোটখাটো ব্যাপার হলে আমাকেই সে সব দেখতে হয়, আর বড় কিছু হলে মালিক দেখেন৷ পলিটিকাল লিডারদেরও অনেক সময় খুশি করতে হয়৷ ছোটোখাটো নিয়ম ভাঙা তো কমবেশি প্রায় সব ব্যবসাতেই হয়৷ এই যেমন বারে ধুমপান এখন নিষিদ্ধ৷ কিন্তু অনেক কাস্টমারই ধূমপান করছে দেখতে পাচ্ছেন৷ বড় বারগুলোতে ব্যাপারটা মেইনটেন করা হয় বা ধূমপায়ীদের জন্য আলাদা ঘর আছে৷ কিন্তু আমাদের মতো মাঝারি বা ছোট বারগুলোতে তা করা সম্ভব নয়, কাস্টমাররা তবে অন্য বারে চলে যাবে৷ আইন বাঁচাবার জন্য আমরা টেবিলে অ্যাশট্রে রাখি না৷ একটা প্লেটে জল দেই যারা ধূমপান করে তাদের টেবিলে, সেটাকেই অ্যাশট্রে হিসাবে ব্যবহার করে তারা৷ তবে আমাদের বারে তেমন কোনো বড়ো আইন ভাঙা হয় না বলে পুলিশ-প্রশাসনের চাপ কম৷ যে সব বার সে সব করে তাদের চাপ বেশি পুলিশের৷ বারের রোজগারও অবশ্য বেশি৷
‘সে সব করা, বড় আইন ভাঙা মানে?’
অপূর্ব ঘোষাল জবাব দিলেন, ‘কিছু বারে কাস্টমারদের গাঁজা-মাদক সরবরাহ করার ব্যবস্থা থাকে৷ মেয়ে সরবরাহ করার ব্যবস্থাও থাকে বারের আড়ালে৷ আমাদের এখানেও অনেক কাস্টমার অনেক সময় জানতে চায় সে সব ব্যবস্থা আছে কিনা৷’ তাঁর জবাব শুনে অপূর্ব বলল, ‘ধরা যাক, কোনো বার সব নিয়ম মেনে চলছে, তবুও কি তাদের পুলিশ-প্রশাসনকে, রাজনৈতিক নেতাদের খুশি রাখতে হয়?’
ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অপূর্ব ঘোষাল উত্তর দিলেন, ‘নিয়ম না ভাঙলেও পুলিশ-প্রশাসন, পলিটিকাল পার্টিকে কিছুটা খুশি তো রাখতেই হয়, প্রতি বছর লাইসেন্স রিনিউয়ের ব্যাপার থাকে৷ খুশি না রাখলে সে সবের জন্য সমস্যা হতে পারে৷ সব থেকে বড় কথা এ ব্যবসায় নানা ধরনের খদ্দের আসা-যাওয়া করে৷ আপাতদৃষ্টিতে পরিবেশ ঠান্ডা মনে হলেও যে কোনো মুহূর্তে বড় কোনো দুর্ঘটনা, গণ্ডগোল হতে পারে৷ মদের ঘোরে কে কী করে বসতে পারে বলা যায় না৷ তখন পুলিশ-প্রশাসনের দরকার৷ তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবেও আগে থেকেই তাদের খুশি রাখতে হয়৷’
চন্দনরা নীচে নেমে এল৷ ভিড় আরও বেড়েছে৷ কাচের দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও বেশ কয়েকজন অপেক্ষা করছে ভিতরে ঢোকার জন্য৷ বিকাশ নামের একজন ওয়েটারকে ডেকে অপূর্ব ঘোষাল চন্দনের জন্য চা আনতে বললেন৷ তারপর তিনি চন্দনকে বললেন, ‘আবার কবে আসছেন?’
চন্দন বলল, ‘দু-তিন দিনের মধ্যেই৷ ফোন নাম্বারটা দিন আপনার৷ ফোন করেই আসব৷’
অপূর্ব ঘোষাল আর চন্দন দুজনেই তাদের মোবাইলে অন্যের ফোন নম্বর সেভ করে নেবার পর অপূর্ব ঘোষাল বললেন, ‘আমাকে মাফ করবেন, এবার টেবিলগুলো একটু ঘুরে দেখি, একটু পর আবার ওপরেও যেতে হবে৷ শনিবার তো, বুঝতেই পারছেন আমাকেই সব সামলাতে হয়৷’
চন্দন বলল, ‘আপনি আপনার কাজ করুন৷ আমাকে যে সময় দিলেন তার জন্য কৃতজ্ঞ৷’
চন্দনের কথা শুনে স্মিত হেসে এরপর টেবিলগুলো ঘুরতে শুরু করলেন অপূর্ব ঘোষাল৷ কাস্টমারদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তিনি নানারকম নির্দেশও দিতে লাগলেন কর্মীদের৷ কোন টেবিলে টিস্যু পেপার শেষ হয়ে গেছে, কোন টেবিলে একটা বাড়তি প্লেট দিলে ভালো হয় সবেতেই তাঁর প্রখর দৃষ্টি৷ কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দনের হাতে মিনিট দশেকের মধ্যে চায়ের কাপ-ডিশ এসে গেল৷ সঙ্গে একটা ফিশফ্রাই৷ তা দেখে চন্দনের বেশ লজ্জাবোধই হল৷ নিশ্চই অপূর্ববাবু আগেই বলে ছিলেন ব্যাপারটা৷ মিনিট দশেকের মধ্যেই চা আর ফিশফ্রাই শেষ করে, অপূর্ব ঘোষালকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল চন্দন৷
রাস্তায় গাড়ির ভিড় মৃদু কমেছে৷ তবে ফুটপাতে বেশ ভিড় আছে৷ পানশালাগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে জটলা করছে, সিগারেট ফুঁকছে অনেকে৷ তাদের মধ্যে দু-চারজন অল্পবয়সি মেয়েও আছে৷ চারপাশের বিলবোর্ড আর হোর্ডিং-এর আলোগুলো ঝলমল করছে৷ ঘড়ি দেখল চন্দন৷ আটটা বেজে পাঁচ৷ বাসের অপেক্ষাতে না থেকে একটা ট্যাক্সি নিলে হয়তো সাড়ে আটটার ট্রেনটা সে ধরতে পারবে৷ বারের সামনেই একটা ট্যাক্সি প্যাসেঞ্জার ড্রপ করছিল৷ চন্দন ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে গিয়ে সে শিয়ালদা যাবে নাকি জিজ্ঞেস করতেই লোকটা রাজি হয়ে গেল৷ চন্দন দরজা খুলে উঠতে যাচ্ছে ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আপনি কোন দিকে যাবেন?’
চন্দন ফিরে তাকিয়ে দেখল তার পিছনে দাড়িয়ে রাতপরি আশাবরী৷ সম্ভবত তার পিছন পিছনই বার থেকে বেরিয়েছে সে৷ কাঁধে একটা লেদারের ভ্যানিটি ব্যাগ৷
চন্দন জবাব দিল, ‘শিয়ালদা যাব৷’
আশাবরী বলল, ‘আমিও আপনার পিছনেই বিদিশা থেকে বেরোলাম৷ ওপরের ফ্লোরে গান করছিলাম৷ আপনি যখন শিয়ালদার দিকে যাচ্ছেন তখন আমাকে যদি বৌবাজারে কাইন্ডলি ড্রপ করেন তবে আমার খুব উপকার হয়৷’
কথাটা শুনে চন্দন মৃদু ইতস্তত করে বলল, ‘ঠিক আছে আসুন৷’
ট্যাক্সির একপাশের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল চন্দন৷ অন্যদিকের দরজা দিয়ে গাড়ির ভিতরে ঢুকে চন্দনের পাশেই বসল আশাবরী৷ চন্দন ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল বি.বি. গাঙ্গুলি স্ট্রিট, অর্থাৎ বৌবাজার হয়ে শিয়ালদাতে যাবার জন্য৷ একটা বাঁক নিয়ে গাড়ি সেদিকে এগোল৷ রাস্তার দু-পাশে আলো ঝলমলে সব দোকান৷ ফুটপাথে ব্যস্ত পথচারীরা৷ ট্যাক্সিটার সামনে-পিছনে বাস, ট্যাক্সির হর্নের শব্দ৷
জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল চন্দন৷ আশাবরীর সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে কি না সে বুঝতে পারছিল না৷ ট্যাক্সি কিছুটা এগোবার পর আশাবরী তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি বিদিশাতে কত দিন ধরে আসেন? আজই প্রথম এলেন?’
আশাবরীর কথা শুনে চন্দন বুঝতে পারল গতকাল সিঁড়িতে ওঠার সময়, আর আজ দোতলার ফ্লোরে অপূর্ব ঘোষালের সঙ্গে চন্দন থাকলেও আশাবরী ভালো করে নোটিশ করেনি তাকে৷ চন্দন জবাব দিল, ‘আজ আর কাল, দু-দিন এলাম৷’
আশাবরী বলল, ‘নীচেই ছিলেন বোধ হয়৷ আমি ওপরে গান করছিলাম৷’
চন্দন বলল, ‘ওপরেও গেছিলাম একবার৷ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ তখন আপনি গান করছিলেন৷’
তার জবাব শুনে আশাবরী বলল, ‘আমি ঠিক খেয়াল করিনি৷ আমার গান শুনলেন? কেমন লাগল গান?’
চন্দন ভদ্রতার খাতিরে জবাব দিল, ‘শুনলাম, ভালো লাগল৷’
আশাবরী বলল, ‘তবে, আজ আমার গলাটা ঠিক নেই, একটু ঠান্ডা লেগেছে৷ তবে কাজে তো আসতেই হবে৷ নইলে পয়সা কে দেবে৷’
কথাটা শুনে চন্দন বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, কিছু মনে করবেন না৷ আপনারা মাসিক বেতনে গান করেন, নাকি দৈনিক পারিশ্রমিক পান?’
আশাবরী বলল, ‘মাসিক বেতনের চুক্তি একটা আছে ঠিকই, তবে তার পরিমাণ শুনলে আপনি হাসবেন৷ আয়ের রাস্তা বলতে গান করার সময় কাস্টমারদের দেওয়া টাকাটা৷ কাস্টমাররা সিঙ্গারকে টাকা দিলেও আমি তার মধ্যে মাত্র থার্টি পারসেন্ট পাই এখানে৷ বাকি সেভেন্টি পারসেন্ট ব্যান্ডমাস্টারের লোকজনদের মধ্যে ভাগ হয়৷ বারের মালিকরা আমাদের পেটের ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করে না৷ গান গাইতে দিচ্ছে এটাই যেন বড় ব্যাপার৷ তারপর যে যার মতো করে খুঁটে খাও৷ এমনই ভাবনা মালিকদের৷’ শেষ কথাটা বেশ অসন্তাোষের সঙ্গে বলল আশাবরী৷
চন্দন জানতে চাইল, ‘অনুষ্ঠান-ফাংশনে গান গান না?’
আশাবরী হতাশভাবে বলল, ‘বছর দশেক আগে যখন প্রথম গান গাইতে আসি তখন ফাংশনের ডাক আসত৷ বিশেষত একটু গ্রাম বা মফসসলের দিক থেকে৷ হোল নাইট বিচিত্রা অনুষ্ঠান৷ তখন ভালো রোজগারও হত আমাদের৷ তারপর সে সব অনুষ্ঠান সব জায়গাতেই কমতে শুরু করল৷ তার ওপর আবার সরকার নাকি কোর্ট আইন আনল—রাত দশটার পর মাইক বাজানো যাবে না শব্দদূষণের জন্য৷ কাজেই হোল নাইট বিচিত্রা অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেল৷ সরকার-কোর্ট তো আইন করেই খালাস৷ কেউ জানল না, কত মানুষ, কত সংসারের পেটে লাথি পড়ল এই আইনের ফলে৷ এখন এই বারগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা৷’
চন্দন জানতে চাইল, ‘এখন কি বাড়ি ফিরবেন?’
ভ্যানিটি ব্যাগটা খুলে একটা ছোট আয়না আর রুমাল বার করে আশাবরী বলল, ‘কোথায় আর বাড়ি ফেরা! বাড়ি ফিরতে আজ রাত বারোটা৷ শনি আর মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বিদিশাতে গান গেয়ে আমি বৌবাজারে ‘রিল্যাক্স’ নামের একটা বারে সাড়ে আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত গান গাই৷ এখন সেখানেই যাচ্ছি৷ দুপুরের দিকটাতে পার্কস্ট্রিটের আরও একটা বারে সপ্তাহে দু-দিন গাইতে যেতাম৷ কিন্তু লাইসেন্স নিয়ে মালিকের সঙ্গে করপোরেশনের কি একটা ঝামেলা হওয়াতে সে বার এখন বন্ধ আছে৷ আমরা যে সব ছেলেমেয়েরা বারে গান গাই তারা এমনই নানা বারে ঘুরে ঘুরে কাজ করি৷ কয়েকটা বড় বার শুধু আছে যেখানে মালিকরা সিঙ্গারদের ভালো টাকা দেয়৷ তারা শুধু সেখানেই গায়৷ বাকিদের সবার অবস্থা আমারই মতো৷ এ- বারে ও-বারে খেপ খাটতে যেতে হয়৷’
ফুটপাতের গা ঘেঁষেই ট্যাক্সিটা চলছে৷ দোকানের উজ্জ্বল আলোগুলো গাড়ির মধ্যে প্রবেশ করছে৷ আশাবরী এরপর সেই আলোতেই আয়নাটা মুখের সামনে ধরে প্রথমে রুমাল দিয়ে ভালো করে মুখ মুছল৷ তারপর চলন্ত গাড়িতে বসেই অভ্যস্ত হাতে আইলাইনার আর লিপস্টিক লাগিয়ে নিল তার ‘রিল্যাক্স বারে’ যাবার জন্য৷
মিনিট দশেকের মধ্যেই বৌবাজারের আলো ঝলমল মোড় এসে গেল, ট্যাক্সি থামাতে বলল আশাবরী, ট্যাক্সি থামল৷ নেমে যাবার আগে আশাবরী কাছেই একটা গলি দেখিয়ে বলল, ‘ওই গলিতেই রিল্যাক্স বার৷ পরিবেশ ভালো আর ড্রিংসের দামও বেশি নেয় না৷ শনি, মঙ্গলবার তো আমি এই সময় থেকে থাকি৷ চলে আসতে পারেন এ দুটো দিন৷ আর বিদিশা বারে রবিবার ছাড়া অন্য সব দিন সন্ধ্যা ছটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তো আমি আছিই৷ গেলে দেখা হবে৷ অনেক উপকার হল আপনি এখানে পৌঁছে দেওয়াতে৷ অনেক ধন্যবাদ আপনাকে৷’—কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে গলির ভিতর হারিয়ে গেল রাতপরি আশাবরী৷ ঠিক এইসময় প্রকাশক সুবীরদার ফোনটা এল—‘প্রাণগোপালবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে৷ পরশু এগারোটাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট৷ সাড়ে দশটার মধ্যেই কলেজ স্ট্রিটে আমার কাউন্টারে চলে আসবেন৷’