এক
আজ আবুহাটির মনসাপুজোর মেলার প্রথম দিন। মাসটা আষাঢ়, আকাশ মেঘে ঢাকা, অন্ধকার নেমে এসেছে তাড়াতাড়ি। তাই বিকেল না ফুরোতেই মেলার কয়েকশো দোকানের আলো প্রায় একসঙ্গে জ্বলে উঠল। গ্যাসের আলো, হ্যাজাকের আলো, কুপির আলো, মোমবাতির আলো। না, বিদ্যুতের আলো নেই কারণ আবুহাটি কিংবা তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছোয়নি।
একটু ভুল বলা হল। মেলার উত্তর প্রান্তে দা গ্রেট নাইরোবি সার্কাসের বিশাল তাঁবুতে বৈদ্যুতিক আলোর মালা ঝুলছে, তবে সে বিদ্যুৎ আসছে জেনারেটর থেকে।
আবুহাটি গ্রামের এই আলোর উৎসবের ঠিক মাথার কাছে আকাশছোঁয়া এক অন্ধকার পাঁচিলের মতন দাঁড়িয়ে আছে দলমা পাহাড়ের সারি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের পাহাড়চূড়াটার নাম মনসা পাহাড়।
মনসা পাহাড়ের নামটা ভারি সার্থক। দেবী মনসার বাহনদের প্রিয় বাসস্থান এই পাহাড়। ওখানকার প্রতিটা পাথরের খাঁজে কেউটে, প্রতিটা ঘাসজমির নীচে গোখরো আর গাছের ডালে ময়ালসাপের বাস। সেই বাহনেরা যাতে দয়া করে নীচের গ্রামগুলোর দিকে দৃষ্টি না দেন সেই জন্যেই সুদূর অতীতে কোনও এক সময় এখানে মনসাপুজো আর মেলার সূচনা হয়েছিল।
তবে, পুজোআচ্চায় কি আর তাঁদের পুরোপুরি আটকানো যায়? মাঝেমধ্যেই তাঁরা কোনও না-কোনও গ্রামের কাউকে না-কাউকে ছুবলে দিয়ে থাকেন। তখন গ্রামের মানুষের ভরসা ওঝা জব্বর আলি।
ভরসাটা যে কোত্থেকে আসে বলা মুশকিল। কারণ, জব্বর আলি আজ পর্যন্ত একজনও সাপেকাটা মানুষকে বাঁচিয়েছে বলে খবর নেই। তবে কি না, জব্বরের ভারি চালাকচতুর চেহারা, খাড়া নাক, বড় বড় চোখ। গায়ের রং সাহেবদের মতন ফরসা। তার পরনে রঙিন আলখাল্লা, ঘাড় অবধি লুটিয়ে পড়া বাবরি চুল, গলায় রঙিন পাথরের ছ’খানা মালা, ডান হাতে অবিকল সাপের মতন প্যাঁচানো এক মাধবীলতার লাঠি, আর বাঁ-কাঁধে নকশিকাঁথার কাজ করা বিরাট ঝোলা। এই সব দেখে হয়তো লোকে ভাবে একেবারে বিনা চিকিৎসায় মরার থেকে জব্বর আলির কাছে একবার দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া ভালো।
জব্বর আলি নিজেও বুঝতে পারে, তার ওপরে লোকের ভক্তি-শ্রদ্ধাটা দিন দিন কমে আসছে। নেহাত আবুহাটির তিরিশ মাইলের মধ্যে হাসপাতাল নেই, তাই লোকে এখনও তার কাছে আসে। কিন্তু যারা আসে তাদের চোখেমুখেও কেমন যেন একটা হেলাফেলার ভাব লেগে থাকে।
জব্বর আলি ভাবে, তার পঁচিশ বছর বয়স হয়ে গেল। আলখাল্লা আর প্যাঁচানো লাঠি দিয়ে আর কত দিন লোক ঠকাবে? এবার সত্যিকারের জম্পেশ একটা ওষুধ-টষুধ দরকার। সাপের বিষের মোক্ষম একটা টোটকা।
দরকার একটা বিষপাথর।
হ্যাঁ, বিষপাথর।
জব্বর আলি তার ঠাকুরদার কাছে ছোটবেলায় বিষপাথরের গল্প শুনেছিল। ঠাকুরদাও ছিলেন ওঝা। তিনি আবার বিষপাথরের কাহিনি শুনেছিলেন তাঁর গুরুর কাছ থেকে। সে নাকি এক অদ্ভুত পাথর। যেখানে সাপে কামড়েছে সেখানে পাথরটাকে চেপে বসিয়ে দিলে পাথরটা শরীর থেকে বিষ চুষে নিতে থাকে। সমস্ত বিষ চুষে নিয়ে সাদা পাথরটা নীল হয়ে যায়, আর বিষমুক্ত হয়ে সাপে কাটা লোকটা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে। তখন এক বাটি দুধের মধ্যে পাথরটাকে চুবিয়ে রাখতে হয়। সমস্ত বিষ চলে যায় দুধের মধ্যে, দুধের রং হয়ে যায় নীল, বিষপাথর আবার তার আসল সাদা রং ফিরে পায়।
ঠাকুরদা এ-ও বলেছিলেন, ওই মনসা পাহাড়ের মধ্যেই কোথাও বিষপাথরের এক-দুটো টুকরো লুকিয়ে আছে।
জব্বর জিগ্যেস করেছিল, ‘অত বড় পাহাড়, অত রাশি রাশি পাথর। তার মধ্যে থেকে একটুকরো বিষপাথর খুঁজে পাব কেমন করে? এ তো খড়ের গাদার মধ্যে থেকে সূঁচ খুঁজে বার করার চেয়েও কঠিন।’
ঠাকুরদা সে প্রশ্নের স্পষ্ট কোনও জবাব দিতে পারেননি। বলেছিলেন, ‘সেটাই যদি জানব, তাহলে আর সে পাথর নিয়ে আসব না কেন বল? তবে গুরুর কাছে এটুকু শুনেছি, বিষপাথরের খোঁজ পাওয়া যায় বিষাক্ত সাপের কাছ থেকেই।’
ঠাকুরদার গুরুর সেই হেঁয়ালির মানে বুঝতে না পেরে জব্বর আলিও কোনওদিন ওই পাথরের খোঁজে বেরোনোর চেষ্টা করেনি। তবে আজ সকালেই এমন একটা কাণ্ড ঘটে গেল যে, জব্বর আলির মনে হল, এর চেয়ে মনসা পাহাড়ের সাপের মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকাও অনেক ভালো। গ্রামের তপন মণ্ডলের ছেলেটাকে সাপে কেটেছিল। সবাই তার কাছেই নিয়ে এসেছিল ছেলেটাকে। কিন্তু যাবতীয় শেকড়-বাকড়, মন্ত্র-তন্ত্র প্রয়োগ করার পরেও ছেলেটা বাঁচল না। তপন মণ্ডল জব্বর আলির ছোটবেলার বন্ধু। ছেলেকে হারানোর পর তপনের আকুল কান্নাটা জব্বর কিছুতেই ভুলতে পারছিল না।
বেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে নিজের বাড়ির দাওয়ায় বসে থাকার পর, দুপুর নাগাদ জব্বর আলি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কাঁধের ঝোলায় জলের বোতল আর রুটি-তরকারি ভরে পা বাড়াল মনসা পাহাড়ের রাস্তায়। জব্বরের বউ একবার জিগ্যেস করেছিল, কোথায় যাচ্ছ? জব্বর তাকে মিথ্যে করে অনেক দূরের একটা গ্রামের নাম বলেছিল। বলেছিল, সেই গ্রামের এক সাপে কাটা রোগীকে দেখতে যাওয়ার ডাক এসেছে। ফিরতে দু-এক দিন দেরিও হতে পারে।
মিথ্যে কথাটা জব্বরকে এই জন্যেই বলতে হল যে, মনসা পাহাড়ে যাচ্ছে শুনলে তার বউ কেঁদে-কেটে বাড়ি মাথায় তুলত। অন্য সকলের মতন সে-ও ওই পাহাড়কে সাক্ষাৎ যমের বাড়ি বলেই জানে। জানে, ওই পাহাড়ে একবার কেউ গেলে আর ফেরে না।
সেই দুপুর থেকে পাহাড়ে চড়তে শুরু করে বিকেলবেলায় জব্বর আলি মনসা পাহাড়ের প্রায় চুড়োর কাছ বরাবর পৌঁছল। এতক্ষণ অবধি পুরো পথটাই ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। এই প্রথম জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা পরিষ্কার জায়গা পেয়ে সে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে বসল।
একটা বড় পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে সামনে তাকাতেই জব্বর মুগ্ধ হয়ে গেল। সে দেখতে পেল—অনেক নীচে, পাহাড় শেষ হয়ে যেখানে সমতলভূমি শুরু হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে আবুহাটির মেলা। এত ওপর থেকে আলাদা করে দোকানপাট, মানুষজন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে শুধু আলো। অন্ধকার মাঠের ওপর পড়ে থাকা এলোমেলো এক আলোর ওড়নার মতন ঝলমল করছে মনসা পুজোর মেলা।
অবশ্য বেশিক্ষণ সেই সুন্দর দৃশ্য দেখবার সুযোগ পেল না জব্বর আলি। পেছন থেকে একটা তীব্র হিসহিস শব্দে চমকে উঠে সে ঘুরে তাকাল।
সাক্ষাৎ যমের বাহন। কালকেউটে। জব্বর যেখানটায় বসেছিল সেখান থেকে বড়জোর দশ হাত দূরে একটা ঘাসজমির ওপর সাপটা ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অল্প অল্প দুলছে। তবে তার লক্ষ জব্বর আলি নয়, এগিয়ে আসা একটি বেজি।
বেজিটার আকৃতিও বেশ বড়সড়। তারও রোখ সাংঘাতিক। মুহূর্তের মধ্যে বেধে গেল বেজি আর সাপের লড়াই। মন্ত্রমুগ্ধের মতন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল জব্বর।
দুটি প্রাণীই সমান ক্ষিপ্র, তাই লড়াইটাও হচ্ছিল সমানে সমানে। কেউটেটা চাইছিল কোনওভাবে বেজিটার গায়ে ছোবল বসাতে, আর বেজি চাইছিল পেছন থেকে সাপটার ঘাড়ে দাঁত বসাতে। দুজনে দুজনকে ঘিরে পাক খাচ্ছিল। এগোচ্ছিল, পেছোচ্ছিল। কিন্তু কেউটে সুবিধে করে উঠতে পারছিল না।
হঠাৎই বেজিটার পেছনের একটা পা একটু হড়কে গেল। একমুহূর্ত সময় লাগল তার নিজেকে সামলাতে, কিন্তু সেই এক মুহূর্তের মধ্যেই সাপের ছোবল নেমে এল বেজিটার মাথায়। বেজিটাও আর দেরি না করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাপটার ওপরে। মুহূর্তের মধ্যে ধারালো দাঁত দিয়ে তার মাথাটা ছিড়ে নিল।
লড়াই শেষ। জব্বর আলি দেখল বেজিটা টলতে টলতে ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে পাহাড়ের গায়ে একটা পাথরের ঢিপির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, সাপের বিষের প্রতিক্রিয়া ওর শরীরে আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। জব্বর আলির কী মনে হল, সে বেজিটাকে অনুসরণ করতে শুরু করল।
পাথরের ঢিপিটার কাছে পৌঁছিয়ে বেজিটা দুটো বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে ভেতরে কোন গর্তের মধ্যে নেমে গেল কে জানে। জব্বর আলি বাইরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
মিনিট পাঁচেক বাদেই, সেই একই পাথরের ফাঁক দিয়ে বেজিটা বেরিয়ে এল—আগের মতনই চনমনে, ফুর্তিবাজ। বিষের কোনও লক্ষণই তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। লাফাতে লাফাতে বেজিটা ঘাসজমি পেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে গেল, আর জব্বর আলির মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটা শব্দ—বিষপাথর।
সে নিশ্চিত, ওই পাথরের খাঁজে কোথাও বিষপাথর রয়েছে। তার সঙ্গে মাথা ঘষে, বিষ নামিয়ে ফিরল ওই বেজিটা। এ ছাড়া আর কীভাবে ও মাথায় কেউটের কামড় খেয়েও সেরে উঠতে পারে? এই জন্যেই বোধহয় দাদুর গুরুজি বলেছিলেন, বিষধরের কাছ থেকেই বিষপাথরের সন্ধান পাওয়া যাবে।
বিষপাথরের সন্ধান পেয়ে গেছে জব্বর আলি। এবার শুধু সেটাকে হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।
দু-হাত দিয়ে প্রাণপণে ছোট-বড় পাথরের টুকরোগুলোকে তুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল জব্বর আলি। একটু বাদেই পাথরের আড়াল সরে গিয়ে একটা গুহার মুখ দেখা গেল। জব্বরের ঝোলার ভেতরে টর্চ ছিল। টর্চটাকে জ্বালিয়ে সে গুহার ভেতরে ঢুকল।
ভেতরটা স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার। প্রথমে মাথা নীচু করে সুড়ঙ্গের মতন সরু গুহাপথের মধ্যে দিয়ে সে হাঁটছিল, কিন্তু একটু পরেই সেই সুড়ঙ্গ গিয়ে মিশল একটা বিশাল গুহাঘরের মধ্যে।
অনেক কিছুই দেখার ছিল সেই গুহাঘরে—দেওয়ালে অনেক ছবি, মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা অনেক অস্ত্রশস্ত্র। জব্বরের টর্চের সরু আলোর ফলা কখনও এখানে এক টুকরো, কখনও ওখানে এক টুকরো দৃশ্যকে ফুটিয়ে তুলছিল। টর্চটাকে সরিয়ে নিলেই সেই সব দৃশ্য আবার হারিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকারে। জব্বরের সেসব দিকে মন ছিল না। গুহার দেওয়ালে অমন ছবি, অত অস্ত্রশস্ত্র পড়ে থাকার মানেও সে বুঝছিল না। তার মাথার মধ্যে তখন একটাই চিন্তা—এই বিশাল ঘরের মধ্যে কোথায় বিষপাথর? কেমন করে সে খুঁজে পাবে সেই সাতরাজার ধন এক মানিককে?
হঠাৎই জব্বরের টর্চের আলো গুহার পাথরের মেঝের মাঝখানে একটা ঢিপির মতন উঁচু জায়গার ওপর গিয়ে পড়ল। ওটা কী?
জব্বর আস্তে আস্তে সেইদিকে এগিয়ে গেল, আর তখনই তার নজরে এল ধুলোর ওপরে ছোট ছোট পায়ের ছাপ—বেজির পায়ের ছাপ। আনন্দে জব্বর আলির বুকের ভেতরটা উলসে উঠল। কোনও সন্দেহ নেই, বেজিটা ওই ঢিপিটার কাছে গিয়েই বিষপাথরের ছোঁয়া পেয়েছিল।
ঢিপিটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল জব্বর। দেখল পাথর সাজিয়ে তৈরি নিরেট জিনিসটার গায়ে এক জায়গায় একটা গর্ত হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে দিয়ে একটা বেজির পক্ষে ভেতরে ঢোকা সম্ভব, কিন্তু মানুষের পক্ষে নয়। কিন্তু সাফল্যের এত কাছে এসে ফিরেও তো যাওয়া যায় না।
জব্বর আবার ভালো করে ঢিপিটাকে পরীক্ষা করে দেখল। না, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। পুরোনো ইটের মতন পাথরের জোড়গুলো আলগা হয়ে এসেছে। টর্চটাকে পাশে নামিয়ে রেখে জব্বর জোড়ের মধ্যে আঙুল গলিয়ে চাড় দিতেই একটা চৌকোনা পাথর খুলে বেরিয়ে এল। আর দেরি না করে জব্বর পাথরের পর পাথর খুলে মেঝেয় নামিয়ে রাখতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপরের পাথরের ঢাকনাটা সরে গেল। দেখা গেল ভেতরে একটা মৃতদেহ শোওয়ানো রয়েছে।
জব্বরের গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মৃতদেহ! তার মানে ঢিপিটা আসলে একটা কবর? সে না-হয় হল, কিন্তু এত পুরোনো কবরের মধ্যে যে মৃতদেহ শুয়ে আছে তা এমন অবিকৃত থাকে কেমন করে!
বিশাল চেহারা ছিল মৃত লোকটার। গায়ের রং কুচকুচে কালো। মুখ ভর্তি দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। গায়ে পোশাক-আশাক তেমন নেই, শুধু কোমরে একটা কীসের যেন চামড়া জড়ানো। আর সারা শরীরে অজস্র পাথরের মালা আর ধাতুর গয়না।
জব্বরের চোখ আটকে গেল মৃত লোকটার গলায় ঝোলানো মালাটার দিকে। নানান রঙের পাথরে গাঁথা মালাটার ঠিক মাঝখানে একটা বড় সাদা হাঁসের ডিমের মতন পাথর ঝুলছে।
ওটাই কি বিষপাথর?
জব্বর আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে মালাটা ধরে টান মারল।
তখনই মৃত লোকটা একটা বড় হাই তুলে উঠে বসল। তারপর দু-হাত দিয়ে চোখ কচলে জব্বরের দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল।
জব্বর ততক্ষণে সম্মোহিতের মতন উঠে দাঁড়িয়েছে। কোথায় তার ঝুলি, কোথায় টর্চ সেসব কিছুই তার খেয়াল নেই।
লোকটাও এবার উঠে দাঁড়াল। জব্বরের মাথা ছাড়িয়ে আরও এক হাত উঁচুতে তার মাথা। নিজের গলার মালাটার দিকে ইঙ্গিত করে লোকটা জব্বরকে প্রশ্ন করল, ‘এই পাথরটা তোমার লাগবে?’
বলা বাহুল্য, কবর থেকে জেগে ওঠা সেই ভূতটা জব্বর আলির কাছ থেকে তার প্রশ্নের উত্তর পেল না। কারণ, ততক্ষণে জব্বর মনসা-পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঘণ্টায় বাহাত্তর কিলোমিটার গতিবেগে নীচে নামতে শুরু করেছে।
দুই
ফাঁকা মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাদুকর সন্তোষ পাল এমন জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যে, তার ধাক্কায় টেবিলের ওপর রাখা ম্যাজিক-তাসের বান্ডিল থেকে অর্ধেক তাস ফড়ফড় করে উড়ে গেল। মঞ্চের মেঝের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে সন্তোষের শাগরেদ পন্টা একটা বাটিতে ফাটা টমেটো আর ডিমের কুসুম সংগ্রহ করছিল। সে তাসগুলোকে তাড়াতাড়ি তুলে আবার প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল।
পন্টার কাজে খুশি হওয়া দূরে থাক, সন্তোষ হঠাৎ তার ওপর মহা খাপ্পা হয়ে উঠল। দাঁত খিঁচিয়ে বলল, ‘তোকে হাজার বার বারণ করেছি না ওই সব ডিম আর টমেটোগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যেতে, তবু তুই আমার কথা শুনবি না? লজ্জা করে না তোর? লোকে তোর প্রভুকে ডিম ছুড়ে মারে, আর তুই সেই ডিমের মামলেট বানিয়ে খাস?’
পন্টা সন্তোষের চোখরাঙানিকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে, সন্তোষেরই আলখাল্লার কাঁধের ওপর লেপটে থাকা কিছুটা ডিমের কুসুম চামচ দিয়ে বাটির মধ্যে নামিয়ে এনে বলল, ‘আহা, পেঁয়াজকুচি আর মামলেট ভাজার তেলটা তো তোমার দর্শকেরা ছুড়ে দেয় না। সেগুলো তো নিজেদেরই দিতে হয়। তবে আবার অপমান কীসের? তাছাড়া, একদিনও তো আমার মামলেটে ভাগ বসাতে ছাড়ো না। তাহলে?’
পন্টার কথায় সন্তোষ একটা ঢোক গিলে চুপ করে গেল। সত্যি কথা বলতে কী, যদি ওই মামলেটটুকু না থাকে, তাহলে আজ রাতেও তাকে আর পন্টাকে স্রেফ ঢ্যাঁড়শভাজা দিয়ে শুকনো রুটি চিবোতে হবে।
তবু অপমানের কথা ভোলা যায় না। ব্যর্থতার কথাও ভোলা যায় না।
কেন যে এমন হয়? কেন যে দশটা ম্যাজিক দেখাতে গেলে একটাতে গণ্ডগোল হয়েই যায়, তা কিছুতেই বুঝতে পারে না সন্তোষ পাল। এই জন্যেই তার আর বড় ম্যাজিশিয়ান হওয়া হল না, সারা জীবন মেলার ম্যাজিকওয়ালা হয়েই থাকতে হল।
আজকে, একটু আগেই যে অবিশ্বাস্য কাণ্ডটা হল, সেটাই ধরা যাক। সতেরো বছর বয়স থেকে এই চোখ বেঁধে বোর্ডে অঙ্ক কষার খেলাটা সে দেখিয়ে আসছে। কায়দাটা জানা থাকলে একেবারেই সহজ ম্যাজিক। তবু কী করে যে আজ পরপর চারবার ত্রিশ দুগুণে আটচল্লিশ লিখল কে জানে।
রোজই এইরকম হচ্ছে। গতকাল টুপির ভেতর থেকে পায়রা বার করতে গিয়ে দেখে আলখাল্লার হাতার নীচে পায়রা লুকিয়ে রাখতে ভুলে গেছে।
গত পরশু ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার জল শেষ হয়ে গেল।
আর তেমনি অসহিষ্ণু�এই সব মেলার দর্শকেরা। তাঁবুর ভেতর মেঝেয় বসে ম্যাজিক দেখবে। টিকিটের দাম এক টাকা থেকে বাড়িয়ে দেড় টাকা করতে গেলেই চেঁচিয়ে-মেঁচিয়ে হুলুস্থুলু বাঁধাবে। কিন্তু খেলায় একটু ভুল হলেই পটাং পটাং করে চার টাকা দামের ডিম ছুঁড়ে মারতে একটুও বাঁধে না। তখন ওদের পয়সার মায়া কোথায় মুখ লুকোয় কে জানে?
আবুহাটির মনসাপুজোর মেলার আজ সবে তৃতীয় দিন। গত তিন দিনেই যা বদনাম কুড়োল সন্তোষ, তাতে আগামী সাত দিন শো চালাতে পারবে কি না সন্দেহ। আবার না চালিয়েই বা করে কী? এর পরের মেলা হল গিয়ে জয়চণ্ডীর মেলা, সে আরও ন’দিন পরে। মাঝের সময়টা তাহলে সে তাঁবু নিয়ে ঘুরবে কোথায়?
খুব চিন্তা নিয়েই খাওয়া-দাওয়া সারল সন্তোষ। চিন্তা নিয়েই মেলার পেছনের দিঘিটায় মুখ ধুতে গেল। একটু আগেই বেশ জোরে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন মেঘহীন আকাশটা তারায় তারায় পিন-কুশন হয়ে রয়েছে। দিঘির ওপাড় থেকেই পাহাড় উঠেছে। বেশ লাগছিল সন্তোষের সেই পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকতে। হঠাৎই সে দেখল, ঠিক তার উল্টোদিকে দিঘির জলে শুঁড় ডুবিয়ে একটা হাতি জল খাচ্ছে।
মাঝখানে প্রায় আধ কিলোমিটার চওড়া জলের ব্যবধান, তবু সন্তোষের বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। তার কারণ, এত দূর থেকেও সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল—এতদিন অবধি সে সিনেমায়, ছবিতে, চিড়িয়াখানায় কিংবা সার্কাসে যত হাতি দেখেছে, এ হাতি তাদের সবার চেয়ে আলাদা। এর আকৃতি সাধারণ হাতির দুগুণ, এর দাঁতদুটো প্রায় মাটি অবধি নেমে এসে তারপর আবার পাক খেয়ে ওপরে উঠেছে এবং সবচেয়ে বড় কথা এই হাতির শরীরটা বিরাট লম্বা লম্বা লোমে ঢাকা।
সন্তোষ একবার নিজের হাতে ধরা নিমদাঁতনটাকে ভ্যানিশ করে আবার ফিরিয়ে আনল। তারপর কাঁধের গামছাটাকে ঝেড়েঝুড়ে পাঁচটা পাঁচ-টাকার কয়েন বার করল। নাঃ, ম্যাজিকগুলো তো ঠিকঠাকই দেখাতে পারছে। তার মানে সে স্বপ্ন দেখছে না। তাহলে এই অদ্ভুত জন্তুটাও তো সত্যিকারেই ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
চুপিচুপি পা টিপে-টিপে বেশ কিছুটা পেছিয়ে এসে হঠাৎই উল্টোবাগে ঘুরে চোঁ-চাঁ দৌড় লাগাল সন্তোষ। থামল একেবারে তাঁবুর ভেতরে শরীরটাকে থ্রো করে দিয়ে।
কিছুক্ষণ একটা মোড়ার ওপর বসে দমটম নিয়ে, বুক ধড়ফড়ানিটা একটু কমলে পরে, চারিদিকে তাকিয়ে সন্তোষের মনে হল জায়গাটা কেমন যেন অচেনা অচেনা ঠেকছে। সে নিশ্চিত, এই চৌকিটা তার নয়। তার চৌকিতে কোনওদিনও এরকম বিচ্ছিরি নোংরা আর দুর্গন্ধে ভরা চাদর পাতা ছিল না।
ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে সন্তোষ ভালো করে চারিপাশে চেয়ে দেখল।
এত রাতে মেলার কোনও তাঁবুতেই আলো জ্বলে না। এই তাঁবুটাও প্রায় পুরোপুরিই অন্ধকারে ঢাকা। সেই আবছা আলোয় সন্তোষ দেখল, চৌকির পায়ার সঙ্গে একটা ভালুক চেন দিয়ে বাঁধা অবস্থায় শুয়ে শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে। তা ছাড়াও ঘরটার চারপাশে নানান সাইজের খাঁচা ডাঁই করে রাখা আছে, আর সেগুলোর মধ্যে থেকে ক্রমাগত ফ্যাঁশফ্যাঁশ, গরগর, চিড়িকপিড়িক আওয়াজ ভেসে আসছে। সন্তোষের কোনও সন্দেহ রইল না যে, সে ভুল করে অন্য কোনও খেলার তাঁবুতে ঢুকে পড়েছে।
সে সবে মাত্র বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে পা টিপে টিপে ছেঁড়া পর্দার দিকে এগিয়েছে, তখনই চৌকির ওপর থেকে কাঁথার ঢাকনা সরিয়ে একজন বয়স্ক মানুষ উঠে বসল এবং খুব বিনীত গলায় বলল, ‘আরে! ম্যাজিশিয়ান সাহেব না? চলে যাচ্ছেন কেন? এসেছেনই যখন, একটু বসে যান।’
সন্তোষ ভালুকটার কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে চৌকির এক কোনায় বসল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘এটা কোথায় ঢুকে পড়েছি বলুন তো।’
‘হেঃ, হেঃ, হেঃ। সেটা এখনও বুঝতে পারেননি? আপনার তাঁবুর পাশের তাঁবুটি কাদের?’
‘আজ্ঞে, দা গ্রেট নাইরোবি সার্কাসের।’
‘ঠিক। এ হল গ্রেট নাইরোবির খিড়কির দিকটা। যত খেলোয়াড়দের তাঁবু এইখানটাতেই।’
‘আর আপনি?’ কৌতূহল চাপতে না পেরে জিগ্যেস করে বসল সন্তোষ।
‘অধমের নাম বেণুগোপাল। অবশ্য সার্কাসের ছেলে থেকে বুড়ো সকলে বেণুপাগল বলেই ডাকে আমাকে। তা, ওতে আমি কিছু মাইন্ড করি না। সত্যি কথা বলতে কী, আমি যে একটু পাগলাটে আছি, সেটা নিজেও মাঝে মাঝে বুঝতে পারি।’
‘আপনি কি সার্কাসে খেলা দেখান?’
‘দেখাতাম। এখন রিটায়ার্ড। কেন জানেন?’
সন্তোষ মনে মনে ভাবল লোকটা যে খ্যাপাটে, এটা তারই একটা উদাহরণ। রিটায়ার কখন করে মানুষে? মুখে বলল, ‘বয়েস হয়েছে, তাই?’
‘নো নো নো নো নো।’ দুদিকে ঘাড় ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বেণুগোপালের রোগা গলার ওপর থেকে সাদা চুলে ভরা মাথাটা প্রায় খুলেই আসে আর কি। ‘রং রং রং। অ্যাবসল্যুটলি রং।’
‘তবে?’ একটু বিরক্ত হয়েই জিগ্যেস করল সন্তোষ।
‘হল কী জানেন? আমি যে খেলাটা দেখাতাম সেই আইটেমটাই দেখানো বন্ধ হয়ে গেল। আইন করে বন্ধ করে দিল গভর্মেন্ট। আমি, রিংমাস্টার বেণুগোপাল, দেখাতাম বাঘ-সিংহের খেলা।
‘কিন্তু সার্কাসে বাঘ-সিংহ রাখা বারণ হয়ে গেল, আমিও বেকার হয়ে গেলাম। তবে একটানা ছাব্বিশ বছর এই সার্কাসে কাজ করছি তো, এখনকার মালিককে এক কালে কোলে নিয়ে ঘুরেছি। তাই আমাকে তাড়িয়ে দিল না। আর আমারও এমন অভ্যেস হয়েছে, সার্কাসের ধুলো ধুলো, বুনো বুনো গন্ধটা নাকে না ঢুকলে ঘুম আসে না।
‘তা ছাড়া যাবই বা কোথায়? সংসার করিনি। না আছে বাপ-মা, না বউ-বাচ্চা। তাই এখানেই রয়ে গেলাম। এখন দুটো কাকাতুয়া, ক’টা বাঁদর আর ওই ভালুক বিবিকে নিয়ে একটা খেলা দেখাই। কিন্তু তাতে মন ভরে না, বুঝলেন। এক কালে দশটা বাঘ আর দশটা সিংহ আমার হাতের ইশারায় উঠত বসত। মানুষের চেয়েও বাঘ-সিংহের ভাষাটা ভালো বুঝতাম আমি। ওদের মনটা পড়তে পারতাম। সেই জন্যেই এত বছর খেলা দেখানোর পরেও ওরা আমার গায়ে আঁচড় অবধি কাটেনি কখনও। খুব ভালোবাসত আমাকে।’ কথা বলতে বলতে বেণুগোপালের চোখদুটো উদাস হয়ে গেল।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বেণুগোপাল বলল, ‘মাঝে-মাঝেই মনে হয় অন্তত একটা পোষা বাঘ যদি কাছাকাছি থাকত, মনের কথাগুলো তাকে বলতে পারতাম।’
সন্তোষ মনে মনে ভাবল, ‘কী ডেঞ্জারাস লোকরে বাবা! মনের কথা বলার জন্যে বাঘ খুঁজছে? একে লোকে যদি বেণুপাগল বলে তাহলে কি খুব একটা ভুল বলে?’
কল্পনা থেকে বাস্তব জগতে নেমে এসে বেণুগোপাল সন্তোষকে প্রশ্ন করল, ‘তা আপনি অমন উদভ্রান্তের মতন দৌড়ে এলেন কেন? ডাকাতে ধরেছিল না কি?’
বেণুগোপালের প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে বুঝতে পারছিল না সন্তোষ। সত্যি কথাটা বললে তাকে যদি পাগল ভাবে। তারপর সাতপাঁচ ভেবে বলেই ফেলল, ‘একটা ভয়ংকর হাতি দেখলাম, বুঝলেন?’
‘হাতি? তা দেখতেই পারেন। দলমার জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে এখানে হাতি নেমে আসে বই কি। তা অত ভয় পাওয়ার কী আছে। হাতি খুব ভদ্র জীব।’
‘না, না, সে সাধারণ হাতি নয়। আপনাদের সার্কাসের হাতির চেয়ে প্রায় দুগুণ বড়। দাঁতগুলো মাটি অবধি নেমে এসে আবার পাক খেয়ে উঠে গেছে মাথার ওপরে। আর সারা শরীর বড় বড় লোমে ঢাকা।’
বেণুগোপাল চৌকি থেকে নেমে এসে সন্তোষের মুখটা কাছ থেকে নিরীক্ষণ করল। দুবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে বুঝবার চেষ্টা করল, নেশাভাঙ করেছে কিনা। তারপর বলল, ‘আপনি যা ডেসক্রিপশন দিচ্ছেন তার মানে কী দাঁড়ায় জানেন?’
সন্তোষ নীরবে ঘাড় নাড়ল।
‘তার মানে দাঁড়ায় আপনি এই দু-হাজার তেরো সালে, আবুহাটির দিঘির পাড়ে একটি জ্যান্ত ম্যামথ দেখেছেন।’
‘ম্যা…ম্যা…।’
‘মথ। ম্যামথ। সেই প্রাগৈতিহাসিক জীব, যা কিনা তুষারযুগের সময় পালে পালে এই পৃথিবীর বুকে চরে বেড়াত, আর আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা তাকে শিকার করে খেত। তার বংশ নির্বংশ হয়ে গেছে অন্তত বারো হাজার বছর আগে। চলুন তো দেখি কোথায় আপনার ম্যামথ।’
দেয়াল থেকে চট করে একটা রাইফেল পেড়ে নিয়ে বেণুগোপাল তাঁবুর পর্দা সরিয়ে দিঘির দিকে হাঁটা লাগাল। তখন তাকে দেখে কে বলবে এই লোকটাই একটু আগে কাঁথা মুড়ি দিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়েছিল? একেবারে সটান লম্বা চেহারা, চোখদুটো যেন অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলছে। সন্তোষ তার সেই চেহারা দেখে একটু একটু বুঝতে পারছিল—দশ বছর আগে রিং-এর মধ্যে চাবুক হাতে এই মানুষটা কেমন করে কুড়িটা হিংস্র শ্বাপদকে শাসন করত।
মিনিট সাত-আট হাঁটার পরেই ওরা দুজন সেই জায়গাটায় পৌঁছে গেল, যেখানে দাঁড়িয়ে সন্তোষ কিছুক্ষণ আগে সেই অদ্ভুত জীবটাকে দেখেছিল। এখন কিন্তু জায়গাটা ফাঁকা। একটা শেয়ালের ল্যাজ অবধি কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
বেণুগোপাল কেমন যেন মুচকি হেসে সন্তোষের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী ম্যাজিশিয়ান সাহেব, অত বড় প্রাণীটাকে কোন ম্যাজিকে ভ্যানিশ করে দিলেন?’
সন্তোষ প্রতিবাদ করে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই উল্টোদিকের পাহাড়ের চড়াই পথে এক সার গাছ প্রবলভাবে দুলে উঠল। এত দূর থেকেও সেই দৃশ্য ওরা দুজনেই পরিষ্কার দেখতে পেল। বুঝতে অসুবিধে হল না—বিশাল কোনও একটা জীব ওই পথে পাহাড়ের ওপর উঠে যাচ্ছে। তার শরীরের ধাক্কায় শাল-সেগুনের গাছগুলো নুয়ে পড়েই আবার সোজা হয়ে যাচ্ছে।
ওরা দুজনেই সম্মোহিতের মতন সেইদিকে তাকিয়ে আছে, তখনই হুঙ্কারটা ভেসে এল। একটানা গুরগুর আওয়াজ। যেন মাটির অনেক নীচে একটা দানবিক মাদল বাজছে। মাদল নয়, এ যে কোনও জন্তুর ডাক তাতে সন্তোষ কিংবা বেণুগোপাল কারুরই কোনও সন্দেহ রইল না। এমন কোনও প্রাণী, যার ডাকের সঙ্গে আধুনিক মানুষের পরিচয় নেই।
সেই ডাকের উত্তরে ওদের পেছন দিক থেকে শাঁখের মতন একটা আওয়াজ ভেসে এল। এ আওয়াজটা অবশ্য ওদের খুব চেনা। নাইরোবি সার্কাসের পোষা হাতি গণেশ তার পূর্বপুরুষকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
তিন
সকালবেলার মেলার চেহারা দেখে কারুর পক্ষে বিশ্বাস করাই কঠিন যে, এই নিঝুম জায়গাটাই সূর্যাস্তের পর এমন জমজমাট হয়ে উঠতে পারে। আপাতত নাগরদোলা আর ঘোড়ারদোলাগুলো শেকল দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় ঘুমোচ্ছে। প্রায় সারা রাতের পরিশ্রমের পর বেশিরভাগ দোকানিও তখনও বিছানা ছাড়েনি। সব মিলিয়ে ভারি একটা আলসেমির ছবি।
মেলার উত্তরদিকের মাঠটায় অবশ্য কোনও দোকানপাট নেই। ওই বিশাল মাঠটায় প্রতি বছরই নানারকমের খেলার তাঁবুগুলোকে জায়গা দেওয়া হয়। এ বছরেও সন্তোষ পালের ‘জাদুনগর’ আর ‘দা গ্রেট নাইরোবি সার্কাস’-এর আশেপাশে ওরকম আরও বেশ কয়েকটা খেলার তাঁবু পড়েছে।
যেমন ‘মেক্সিকান মরণকূপ’। কাঠের গোল চক্করের মধ্যে কান-ফাটানো শব্দ করে তিন-চারটে মোটর সাইকেল বাঁই বাঁই করে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে দেওয়াল বেয়ে ওপরে উঠে আসে, এ ওকে পেরিয়ে চলে যায়। সত্যিই রোমহর্ষক খেলা। তবে মেক্সিকোর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। খেলোয়াড়দের সবারই বাড়ি মেদিনীপুরে।
‘মেক্সিকান মরণকূপ’-এর পাশে ছোটখাটো একটা তাঁবুর গায়ে লেখা আছে ‘আজব দুনিয়া’। ওর মধ্যে ইলেকট্রিক-মেয়ে, মাকড়শা-নারী, দু-মাথাওয়ালা মানুষ এই সব আছে। সবক’টা খেলার মধ্যে এদেরই টিকিটের দাম সবচেয়ে কম, তবু দর্শকেরা রোজই গালাগাল করতে করতে বেরিয়ে আসে। পিজবোর্ডের ঠ্যাং লাগিয়ে যদি কেউ মাকড়শা সাজে, কিংবা খড়ের নীচে শরীর ঢেকে দুটো লোক যদি মাথা বার করে বলে আমি দু-মাথাওয়ালা মানুষ, তবে দর্শকরা রাগবে না?
যাই হোক, সেই ‘আজব দুনিয়া’র ঠিক উলটোদিকে আরও একটা মাঝারি তাঁবু, যেটার গায়ে লেখা ‘নররাক্ষস’। শুধু লেখাই নয়, তাঁবুর বাইরের দিকটা জুড়ে নররাক্ষসের ভয়ংকর ভয়ংকর সব ছবিও আঁকা আছে। সে সব ছবির পাশে মা দুর্গার মহিষাসুরকেও মনে হবে নিতান্ত নিরীহ। নররাক্ষস সাজত যে লোকটা তার নাম কানাই মণ্ডল। তাকে দেখতে ছিল সত্যিই বেশ ভয়ংকর এবং নররাক্ষসের অভিনয়টাও সে বেশ ভালোই করত।
তাঁবুর ভেতরে বসে লোকজন হাঁ করে দেখত নররাক্ষসের দাপট। এদিকে চারজন, ওদিকে চারজন, মোট আটজন লোক রাক্ষসের কোমরে বাঁধা দড়ির দুটো দিক দিয়ে টেনে ধরেও তাকে সামলাতে পারত না। উল্টে রাক্ষসই তাদের সবাইকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে আসত মঞ্চের সামনে, ঝাঁপ মারতে চাইত দর্শকদের ঘাড়ের ওপর। এমন হাবভাব করত, যেন ওদের মধ্যেই দু-একটাকে তার খাওয়ার ইচ্ছা। এই সময় শো-র মালিক তাকে শান্ত করবার জন্য একটা জ্যান্ত মোরগ তার দিকে ছুঁড়ে দিতেন। সেই মোরগটাকে হাতে পেয়ে নররাক্ষসের আহ্লাদ আর ধরত না। পালক টালক ছিঁড়ে তক্ষুনি তাকে চিবিয়ে খেত, আর তার এই রাক্ষুসেপনা দেখে দর্শকদের মধ্যে হাততালির ঝড় বয়ে যেত।
তবে সত্যি কথা বলতে কী, কানাই কোনওদিন কাঁচা মুরগি খেত না। সে খাওয়ার অভিনয় করত, আর হাতের কায়দায় মুরগির পালক-টালক সব কালো আলখাল্লার ভেতরে চালান করে দিত। তা করুক, তবু কানাইয়ের কল্যাণে নররাক্ষসের তাঁবুর মালিক হারুবাবুর ব্যবসা ভালোই হচ্ছিল। ভগবানের বোধহয় সেটা সইল না।
হল কী, প্রথমদিনের শো-এর শেষে পুকুরঘাটে চান করতে গিয়ে কানাই আছাড় খেল আর তার ডান হাতটা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল। আবুহাটির ধারেকাছে ডাক্তার হাসপাতাল কিছুই নেই, তাই হারুবাবুকে বাধ্য হয়েই কানাইকে তিরিশ মাইল দূরের শহরের হাসপাতালে ভরতি করে দিয়ে আসতে হল। ব্যস, শো বন্ধ। লোকজন আসে যায়। তারা নররাক্ষসের তাঁবুর সামনে ভেতরে ঢুকবার আশায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তাঁবু আর খোলে না।
সন্তোষের শাগরেদ পন্টা ছেলেটা ভারি চালাক। সে নানান মেলায় নররাক্ষসের খেলা দেখে দেখে কানাইয়ের কায়দাকানুন সব মুখস্থ করে ফেলেছিল। তা সেই পন্টা দ্বিতীয়দিনেই হারুবাবুকে গিয়ে বলেছিল, ‘স্যার, আমাকে নররাক্ষসের রোলটা একবার দিয়ে দেখুন না। একেবারে ফাটিয়ে দেব।’
হারুবাবু বিষণ্ণ মুখে তার দিকে চেয়ে বলেছিলেন, ‘না রে বাবা। তোর ওই ফড়িং-এর মতন চেহারা। তোকে দেখলে লোকে ভয় পাবে কেন?’
হারুবাবুর কথাটা কিছু বেঠিক ছিল না। শুধু অভিনয় দিয়ে তো আর রাক্ষস সাজা যায় না, তার সঙ্গে মানানসই চেহারাছবিও চাই। সেইটা বুঝেই পন্টা হতাশ হয়ে ফিরে এসেছিল।
তার চেয়েও বেশি হতাশায় ভুগছিল হারুবাবু। পর পর চারদিন শো বন্ধ। কে জানে, একটা উপযুক্ত লোকের অভাবে আরও কতদিন এইভাবে ব্যবসা মার খাবে।
কিন্তু পঞ্চমদিন দুপুরবেলায় হঠাৎ হারুবাবুর দিকে ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। ভগবানও বলা চলে, আবার ভূত বললেও ভুল হয় না। হল কী, হাতে কাজকর্ম নেই বলে হারুবাবু নিজের তাঁবুর ঝাঁপ বন্ধ করে মেলার দোকানের সারির মধ্যে পায়চারি করছিলেন। এই দুপুরের সময়টা দোকানপাট খোলা থাকলেও মেলায় তেমন লোকজন আসে না। আজকেও দূরের গ্রাম থেকে আসা কয়েকজন লোক শুধু এদিক-ওদিক ঘুরছিল। তাছাড়া বিশেষ কেউ ছিল না।
এই সব মেলার দোকানিরা তাদের দোকান নিয়ে সারা বছর এ-মেলা থেকে ও-মেলায় ঘুরে বেড়ায়। সারা বাংলায় কোথায় কখন কোন মেলা বসে তা তাদের মুখস্থ। রাণীগঞ্জের পিরবাবার মেলা শেষ হল তো চলো পুরুলিয়ায় বাঁধনা মেলায়। তার পরেই বাঁকুড়ায় ধর্মঠাকুরের মেলা। এই ভাবেই সারা বছর কাটিয়ে দেয় তারা।
হারুবাবু কিংবা সন্তোষ পালরাও তাঁদের খেলার তাঁবু নিয়ে যেহেতু ওদেরই সঙ্গে এক মেলা থেকে আরেক মেলায় ঘুরে বেড়ান তাই দু-দলের মধ্যে দিব্যি জানাশোনা হয়ে গেছে।
এরকমই এক দোকানি মোহন পাণ্ডে, যাকে মেলার সবাই পাণ্ডেজি বলে ডাকে। মোহন পাণ্ডে বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার লোক, হারুবাবুর সঙ্গে তার অনেকদিনের আলাপ। মোটাসোটা গোলগাল চেহারা। মানুষটাও খুব হাসিখুশি। পশ্চিমবঙ্গের যে-কোনও মেলায় একটু খোঁজ করলেই পাণ্ডেজির পাথরের জিনিসপত্রের দোকান দেখতে পাওয়া যাবে। দোকানের নাম ‘দ্বারভাঙ্গা স্টোর’।
কী নেই সেই দোকানে? শিল-নোড়া, খল-নুড়ি, পাথরের থালা-গেলাস-বাটি, পাথরের পিলসুজ থেকে শুরু করে ছোটখাটো ঠাকুর দেবতার মূর্তি অবধি। পাণ্ডেজি আর তার ছেলে মাধব দুজনে মিলে ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথর কেটে ওই সব জিনিস তৈরি করে। গ্রামের দিকে পুজো আচ্চার কাজে পাথরের বাসন-কোসনের এখনও চাহিদা আছে। তাই দ্বারভাঙ্গা স্টোরে বিক্রিবাটা মন্দ হয় না।
ঘুরতে ঘুরতে পাণ্ডেজির পাথরের দোকানের সামনে পৌঁছে হারুবাবু নিজেই যেন পাথর হয়ে গেলেন। বিস্ময়ে তাঁর চোয়ালদুটো আপনা থেকেই ঝুলে পড়ল। এ কাকে দেখছেন তিনি? পাণ্ডেজির দোকানের ভেতরে ও কে বসে আছে? এ তো আস্ত নররাক্ষস।
সত্যি, মানুষের মধ্যে যে এরকম চেহারা দেখা যায়, তা তিনি জানতেন না। এর পাশে কানাই তো শিশিরভেজা গোলাপফুল। লোকটা যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া। সারা মুখ কর্কশ চুলদাড়িতে ঢাকা। তেমনি তার সাজপোশাক। নানারকম পাথরের মালা দিয়ে লোকটার দুই হাত আর বুক ঢাকা। কোমরে একটা বাঘছালের মতন কিছু প্যাঁচানো রয়েছে। লোকটা পাণ্ডেজির দোকানের মেঝেয় বসে, মাথা নীচু করে, একমনে ছেনি দিয়ে একটা পাথর কাটছে।
হারুবাবু দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে লোকটার কাজ দেখতে লাগলেন। একটু বাদে পাণ্ডেজির সঙ্গে চোখাচোখি হতে হারুবাবু পাণ্ডেজিকে ইশারায় বাইরে ডাকলেন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘একে কোথায় খুঁজে পেলে পাণ্ডে?’
পাণ্ডেজি ফিসফিস করে বলল, ‘আমি খুঁজে পাইনি। ঘণ্টাখানেক আগে নিজেই আমার দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।’
‘তারপর?’
‘তারপর জিগ্যেস করল, পাথরের বল্লম বা কুঠার পাওয়া যাবে কিনা। তা, আমি বললাম, চল্লিশ বছর দোকানদারি করেছি। বল্লম বা কুঠার যে আবার পাথরের তৈরি হয়, তা তো কখনও শুনিনি।’
‘তারপর?’
‘তখন লোকটা বলল, ও আমার দোকানে বসে যদি ওরকম কয়েকটা অস্ত্র বানিয়ে নেয় তাতে আমার আপত্তি আছে কি না। লোকটার চেহারা ভয়ংকর হলে কী হবে? কথাবার্তা খুব ভদ্র। তবু আমি একটু কিন্তু কিন্তু করছিলাম। এরকম নিয়ম নেই কি না। তখন লোকটা আমাকে এইটা দিল।’ পাণ্ডেজি একটা কাগজের মোড়ক খুলে দুটো জিনিস হারুবাবুর হাতে তুলে দিল।
হারুবাবু পাণ্ডেজিকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী এগুলো?’
‘বলল তো আসল বাঘের দাঁত। কিন্তু বাঘের দাঁত কি এত বড় হয়?’
হারুবাবু দাঁতদুটো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। একই আকৃতির বাঁকানো ভোজালির মতন বিশাল দুটো দাঁত। ভোজালির মতনই ধারালো। পাণ্ডেজির হাতে সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে হারুবাবু মন্তব্য করলেন, ‘বাঘের দাঁত না সিন্ধুঘোটকের, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। যাই হোক, মনে হচ্ছে দুষ্প্রাপ্য জিনিস। যত্ন করে রেখে দাও।’
তারপর দুজনেই আবার দোকানের মেঝেয় বসে থাকা লোকটার কাজ দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কাজ শেষ হয়ে গেল। এইটুকু সময়ের মধ্যেই একটা বাটনা-বাটা শিলকে কেটে কুটে, পালিশ করে অপূর্ব দুটো বল্লম আর একটা কুঠারের ফলা বানিয়ে ফেলেছে লোকটা। এবার সে জিনিসগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়াল। পাণ্ডেজিকে একটা নমস্কার করে দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটা লাগাল মনসা পাহাড়ের দিকে। তার মানে লোকটা ওইদিকেই কোনও গ্রামে থাকে।
হারুবাবু লোকটার পিছু নিলেন।
শহরের রাস্তায় এরকম পোশাক-আশাকে একটা লোক ঘুরে বেড়ালে নিশ্চয় ভিড় জমে যেত। তবে আবুহাটির মেলায় এই মুহূর্তে মানুষজন খুবই কম। তাদের মধ্যেও যারা ওই লোকটাকে দেখল, তারাও নিশ্চয় তাকে কোনও সাধুবাবা-টাবাই ভাবল। কাজেই লোকটা নির্বিঘ্নেই মেলার সীমানা পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় পৌঁছে গেল।
আর ঠিক তখনই হারুবাবু তাকে পেছন থেকে ডাক দিলেন, ‘ভাই একটু দাঁড়াবে? দুটো কথা ছিল।’
লোকটা সেই ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়াল। এখন হারুবাবু লোকটার মুখোমুখি। হারুবাবুর মাথা ছাড়িয়ে আরও দু-হাত ওপরে তার মাথা। লোকটার মুখটা মোটেই সুন্দর নয়। কপাল প্রায় নেই বললেই চলে, কুতকুতে চোখ, চ্যাপটা নাক। কীরকম যেন বাঁদর বাঁদর ভাব। তার ওপরে হারুবাবুর দিকে তাকিয়ে যখন হাসল, তখন হারুবাবু দেখলেন তার শ্বদন্ত দুটো অবিকল কুকুরের মতন ধারালো আর লম্বা। হারুবাবুর বুকটা দুরদুর করে উঠল। লোকটার পেছন পেছন এই জনমানবহীন জায়গায় চলে আসাটা কি একটু গোঁয়ার্তুমি হয়ে গেল না?
অবশ্য চেহারা দিয়ে সবসময় মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। পাণ্ডেজি তো বলেইছিল, লোকটা খুব ভদ্র। সেই সাহসেই হারুবাবু আবার বললেন, ‘তোমার তাড়া না থাকলে চলো না, ওইখানটায় একটু বসি।’
লোকটা আবার হাসল। বলল, ‘তাড়া আবার কীসের? এক সময় আমার অনেক কাজ ছিল। এখন আমার দলের লোকেরাও নেই, আমারও কাজ নেই।’
‘দল!’ শুকনো গলায় হারুবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘মানে ডাকাত দলের কথা বলছ না কি?’
‘আরে, ছ্যা-ছ্যা। ওসব ডাকাতি-টাকাতি শুরু হল তো মাত্র হাজার ছয়েক বছর আগে, যখন মানুষ নিজের সম্পত্তি বানাতে শুরু করল। আমাদের সময়ে সম্পত্তি-টম্পত্তি ছিল না। তাই চুরি-ডাকাতিও ছিল না। তবে হ্যাঁ, শিকারের জায়গা দখল নিয়ে নানান দলের মধ্যে বেদম মারপিট হত। আমি আমার শিকারের দলের কথাই বলছিলাম আর কি।’
লোকটা ডাকাত নয় জেনে একদিক দিয়ে যেমন হারুবাবু নিশ্চিন্ত হলেন, তেমনি আবার মাথায় ছিট আছে বুঝতে পেরে চিন্তিতও হয়ে পড়লেন। পাগল না হলে কি কেউ বলে ‘আমাদের সময়ে সম্পত্তি-টম্পত্তি ছিল না’? এরকম একটা আধপাগলা লোককে চাকরিতে নেওয়া কি ঠিক হবে? কিন্তু উপায়ই বা কী? আর তা ছাড়া যদি লোকটা ঠিকঠাক নররাক্ষসের পার্টটা উতরে দিতে পারে তাহলে এ যে কানাইয়ের কান কেটে নেবে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কাজেই একটা রিস্ক নিয়ে দেখাই যেতে পারে।
আশ্চর্যের ব্যাপার, লোকটাকে রাজি করাতে কোনও অসুবিধেই হল না। হারুবাবুর প্রস্তাবে সে এক পায়ে খাড়া।
কিন্তু এবার তো লোকটার সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নিতে হবে। নামধাম ইত্যাদি না জেনে কি কাউকে কাজে লাগানো যায়? অতএব হারুবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার নামটা কী ভাই?’
লোকটা থুতনি চুলকোতে চুলকোতে উত্তর দিল, ‘এই তো সমস্যায় ফেললেন। নাম ব্যাপারটাও আমার কাছে নতুন। আমাদের সময়ে নাম ধরে ডাকাডাকির চল ছিল না। ক’টাই বা মানুষ ছিলাম তখন পৃথিবীতে? হাত নেড়ে ডাকলেই লোকে চলে আসত।’
হারুবাবু ভারি রেগেমেগে বললেন, ‘দ্যাখো হে ছোকরা, তুমি বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট। ওরকম মাতব্বরের মতন ‘আমাদের সময়, আমাদের সময়’ বলে কথা বোলো না। নাম একটা তোমাকে বলতেই হবে। না হলে ডাকব কেমন করে?’
লোকটা ব্যাজার মুখে বলল, ‘এই তো আপনাদের নিয়ে মুশকিল—সত্যি কথা বললে বিশ্বাস করেন না। যাগগে, এতই যখন নামের প্রয়োজন তখন গুহা মানব বলে ডাকতে পারেন।’
হারুবাবু ফিক করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘তোমার মাথায় সত্যি করেই ছিট আছে হে। পদবিটা কি কেউ নামের আগে বলে? তোমার নাম মানব গুহ, তাই তো? বেশ নাম, চমৎকার নাম। আমি তোমাকে মানব বলেই ডাকব, কেমন? এই নাও, পঞ্চাশটা টাকা। এখন বাড়ি যাও। ঠিক সাড়ে ছ’টার সময় আমার তাঁবুতে চলে আসবে। তারপর মেক-আপ টেক-আপ নিয়ে…’
হারুবাবুর কথায় বাধা দিয়ে মানব গুহ বলল, ‘মেক-আপ আবার কেন লাগবে?’
হারুবাবু বললেন, বলেছ ঠিকই। তোমার যা চেহারা তাতে এমনিতে মেক-আপ দরকার পড়ত না। কিন্তু কী জানো? আলখাল্লাটা গায়ে না চড়ালে মুরগির মাংস-টাংস লুকোবে কোথায়?’
মানব ভারি অবাক গলায় বলল, ‘লুকোব কেন?’
হারুবাবু চটে গিয়ে বললেন, ‘তাহলে কি সত্যিকারে কাঁচা মাংসই খেয়ে ফেলবে?’
মানব বলল, ‘আমি তো কাঁচা মাংসই খাই। কখনও ইচ্ছে হলে একটু আগুনে ঝলসে নিই, এই আর কি।’
মানব গুহর এই কথা শুনে, আর সেই সঙ্গে তার হাতে ধরে থাকা পাথরের বল্লম আর কুঠারের দিকে তাকিয়ে, হারুবাবুর গা-টা শিরশির করে উঠল। মনে হল চারদিকটা বড্ড ফাঁকা। দু-একটা লোক থাকলে ভালো হত। আবার তিনি যখন মানবের দিকে ফিরে তাকালেন, ততক্ষণে সে হাওয়া। একটা লোক এত তাড়াতাড়ি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতে পারে কেমন করে, সেটা কিছুতেই হারুবাবুর মাথায় ঢুকছিল না।
মাথায় ঢুকছিল না আরও অনেক কিছুই। তবু আজকের শো-টা যে চালাতে পারবেন, সেই আনন্দেই আর ওসব চিন্তাকে আমল না দিয়ে, হারুবাবু একটা কীর্তনের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে তাঁবুতে ফিরলেন।
চার
সেদিনের নররাক্ষসের শো-টা একটু বেশিরকমেরই রাক্ষুসে হয়ে গেল। প্রথমত মানব গুহের ওইরকম চেহারা। তারপর গায়ের জোর। বাপরে, সে কী শক্তি তার গায়ে! কানাই মণ্ডলের মিছিমিছি দড়ি-টানাটানিতে যে লোকগুলো অভ্যস্ত ছিল, তারা মানব গুহর প্রথম ঝটকাতেই স্টেজের দুদিকে ছিটকে পড়ল।
তারপর মানব গুহ জ্যান্ত মুরগিটাকে পরম পরিতৃপ্তি সহকারে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল।
তাতেই শেষ নয়। শুরু থেকেই মানব তার বাঁ-হাতে একটা জ্যান্ত ময়াল সাপের মুণ্ডু চেপে ধরে রেখেছিল। মুরগি খাওয়া শেষ হলে সে কোত্থেকে যেন দুটো চকমকি পাথর বের করে স্টেজের ওপরেই আগুন জ্বালিয়ে সেই সাপটাকে রোস্ট করতে বসল।
এই অবধি দেখে দর্শকরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগল, যদিও মহিলা আর কমবয়সিদের মধ্যে অনেকেই ততক্ষণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। হাততালির মধ্যেই দু-একজন চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘ওহে মালিক, রাক্ষসটার ওইটুকু একটা মুরগিতে পেট ভরে? ওকে একটা পাঁঠা এনে দাও না।’
হারুবাবুও বিপদ বুঝে পর্দা ফেলে শো শেষ করে দিলেন। বাইরে ততক্ষণে এই নতুন নররাক্ষসের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। আগামীকালের অ্যাডভান্স বুকিং-এর জন্য হাজারখানেক লোকের লাইন পড়ে গিয়েছে টিকিট কাউন্টারের সামনে।
মানব গুহর ওসব দিকে খেয়াল নেই। সে তখনও মন দিয়ে ময়াল সাপের বার-বি-কিউ বানাচ্ছে। উইংস-এর ধার থেকে দৌড়ে এসে হারুবাবু তার সামনে হাত জোড় করে বসে পড়লেন। বললেন, ‘বাবা মানব, এবার ক্ষ্যামা দাও। তা না হলে মেলায় অগ্নিকাণ্ড হবে। আমাকেও পুলিশে ধরবে।’
মানব গুহ তাই শুনে হারুবাবুর পিঠে সান্ত্বনার চাপড় মেরে বলল, ‘আমি যতক্ষণ কাছে আছি, ততক্ষণ আগুনকে একদম ভয় পাবেন না। জানেন চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালানোর কৌশল কে আবিষ্কার করেছিল? আমার আপন পিসেমশাইয়ের দাদু। আমি থাকতে আপনার কোনও ভয় নেই।’
‘আর তুমি কী আবিষ্কার করেছ?’ গম্ভীর গলায় ওদের পেছন থেকে প্রশ্নটা ভেসে এল। হারুবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, রিটায়ার্ড রিং-মাস্টার বেণুগোপাল কখন যেন দর্শক আসন থেকে স্টেজের ওপরে উঠে এসেছেন। তার সঙ্গে ম্যাজিশিয়ান সন্তোষ পাল। ওদের দেখে হারুবাবু মনে অনেকটা বল পেলেন। কাঁদো কাঁদো স্বরে বেণুগোপালকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দেখুন তো ভাই, খাল কেটে কেমন কুমির আনলাম। এই লোকটা সত্যিকারেই রাক্ষস-টাক্ষস নয় তো?’
বেণুগোপাল বলল, ‘দাদা, আপনার এই নতুন লোকটার পারফরমেন্স পুরোটা আমি আর ম্যাজিশিয়ানসাহেব সামনের চেয়ারে বসে দেখলাম। আমি একটা জিনিস ভাবছি। জানি না সত্যি কি না। তবে যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের তিনজনেরই শো জমে যাবে। আপনি মিছিমিছি ভয় পাবেন না।’
তারপর বেণুগোপাল মানব গুহর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী হল? বললে না তো তুমি কী আবিষ্কার করেছ?’
সাপটাকে স্টেজের পেছনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দৈত্যের মতন শরীরটাকে নিয়ে লাফিয়ে উঠল মানব। বলল, ‘দেখবেন? সত্যি দেখতে চান আমার আবিষ্কার? তাহলে চলুন আমার সঙ্গে।’
‘শোনো শোনো মানব!’ পেছন থেকে হারুবাবু ডাক দিলেন। ‘এত রাতে আর কেন যাব? তার চেয়ে কোথায় যেতে হবে বলে দাও, আমরা কাল সকালেই ঠিক পৌঁছে যাব।’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মানব। তারপর একটু ভেবে বলল, ‘বেশ। কাল সকালে চলে আসুন মনসা পাহাড়ের মাথায়। আমি আপনাদের একটা আশ্চর্য জিনিস দেখাব।’
আর না দাঁড়িয়ে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সেই সুভদ্র রাক্ষস।
সন্তোষ পাল এতক্ষণ জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মানব গুহ চোখের আড়ালে চলে যাওয়া মাত্র সে হারুবাবুর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বাঁচালেন হারুদা। এই অন্ধকারের মধ্যে মনসা পাহাড়ের মাথায় চড়তে হলেই হয়েছিল আর কী।’
বেণুগোপাল বলল, ‘কিন্তু তাই বলে কালকে ওখানে যাওয়ার প্ল্যানটা যেন বাতিল করবেন না। আমার মন বলছে ম্যামথের রহস্যও মানব গুহর দাড়ির জঙ্গলেই লুকিয়ে আছে।’
‘ম্যামথের রহস্যটা কী ভাই?’ জিগ্যেস করলেন হারুবাবু।
আগের দিন রাত্রে দিঘির তীরে সন্তোষের ম্যামথ-দর্শনের ঘটনা তাকে খুলে বলল বেণুগোপাল। তাই শুনে হারুবাবুরও মনে পড়ে গেল মানব গুহর পাণ্ডেজিকে দেওয়া সেই ভোজালির মতন বড় দাঁতদুটোর কথা। তাছাড়া লোকটা শিলনোড়ার পাথর দিয়ে চমৎকার বল্লম আর কুঠার বানিয়েছিল, আর মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সে সব কথা আবার হারুবাবু বললেন বেণুগোপাল আর সন্তোষকে।
সব শুনেটুনে বেণুগোপাল বলল, ‘একটা ব্যাপার বুঝতে পারছেন? লোকটা সন্তোষভাইয়ের থেকেও বড় ম্যাজিশিয়ান আর আমার চেয়েও বড় রিং-মাস্টার। ও যে আরও কী কী পারে তা তো আমরা জানিই না। কিন্তু একটা কথা ঠিক। ওকে হারিয়ে যেতে দেওয়া চলবে না। আমার মন বলছে, ওর সঙ্গে লেগে থাকতে পারলে আমাদের সবারই লাভ। আজ যেরকম হারুদার তাঁবুর সুনাম সারা মেলায় ছড়িয়ে পড়ল, কাল তেমনটা আমাদের কপালেও হতে পারে। সেই জন্যেই বলছিলাম ও সাহায্য করলে আমাদের শো-ও জমে যাবে। ভালো কথা, হারুবাবু, লোকটার নামটা যেন কী বলছিলেন?’
হারুবাবু বললেন, ‘প্রথমটায় তো বলেছিল ওর কোনও নাম নেই। তারপর জোরাজোরি করতে বলল, মানব গুহ।’
‘মানব গুহ বলল?’
‘না, না। বলেছিল গুহ মানব। লোকটার একটু পাগলাটে কথাবার্তা, তাই না?’
‘পাগল আপনি হারুবাবু, তাই ওর কথা বুঝতে পারেননি। ও নিজের নামটা ঠিকই বলেছিল। গুহামানব। ”কেভ-ম্যান”।’
পাঁচ
যে গুহাটার মধ্যে মেলার প্রথমদিন রাত্রিবেলায় জব্বর আলি বিষপাথরের খোঁজে ঢুকেছিল, সেই গুহাটার মধ্যেই পরদিন সকালে ওরা তিনজন হাজির হল। ওরা মানে হারুবাবু, ম্যাজিশিয়ান সন্তোষ আর বেণুগোপাল।
যাওয়ার পথে, মনসা পাহাড়ের জঙ্গলে পা রাখার পর থেকেই, বেণুগোপালের চেহারা একদম পালটে গিয়েছিল। তার অন্য দুজন সঙ্গী পরিষ্কার বুঝতে পারছিল যে, বেণুগোপালের সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন অতিমাত্রায় সজাগ হয়ে রয়েছে। সারাক্ষণই সে যেন কীসের বা কাদের চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এক সময় বেণুগোপাল পেয়েও গেল যা সে খুঁজছিল। এক জায়গায় একটা চিতল হরিণের আধখাওয়া দেহ পড়েছিল। নিজের রাইফেলটা সন্তোষের হাতে ধরিয়ে বেণুগোপাল সেই অবশিষ্ট শরীরটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তারপর কেমন যেন হতভম্ভ ভাবে হারুবাবু আর সন্তোষের দিকে মুখ তুলে তাকাল। ওরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল বেণুগোপালের দিকে, জিগ্যেস করল, ‘কী হল?’
বেণুগোপাল কথা বলতে পারছিল না। ইঙ্গিতে হরিণটার মাথার দিকে দেখাল। ওরা দেখল যে জায়গাটার দিকে বেণুগোপাল ইঙ্গিত করছে, সেই জায়গাটায় প্রায় চার ইঞ্চি ব্যবধানে বিশাল দুটো গর্ত। যেন হরিণটার মাথার খুলির মধ্যে লোহার ড্রিল চালিয়ে দুটো গর্ত করা হয়েছে। বোঝাই যায়, প্রাণীটার মৃত্যুর কারণও এই আঘাত।
‘এ দুটো কীসের দাগ ভাই?’ প্রশ্ন করলেন হারুবাবু।
‘দাঁতের দাগ। কেমন দাঁত জানেন? যেরকম দাঁত মোহন পাণ্ডের হাতে তুলে দিয়েছিল আপনার মানব গুহ। আর…’
কথা থামিয়ে বেণুগোপাল চারিদিকে ভিজে মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা থাবার দাগগুলোকে ভালো করে দেখে কথাটা শেষ করল, ‘…আর দাঁতের মালিক যে প্রাণীটি, মানে এই হতভাগা হরিণটা যার শিকার, সেই প্রাণীর নাম জানেন? ”স্যাবার—টিথড টাইগার”। বাংলায় বলতে গেলে ভোজালি দেঁতো বাঘ। সেই বাঘের ওপরের চোয়ালের শ্বদন্ত-দুটো মুখের বাইরে প্রায় ছ’ইঞ্চি বেরিয়ে থাকত, অবিকল দুটো ছোরার মতন। তাই ওরকম নাম।’
সন্তোষ ভয়ে ভয়ে চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘এরকম বাঘ যে আছে তা তো জানতাম না।’
‘আছে নয়, ছিল। স্যাবার-টিথডরা পৃথিবীর বুক থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে অন্তত বারো হাজার বছর আগে।’
‘তাহলে আপনি যে বলছেন, হরিণটাকে স্যাবার-টিথড মেরেছে!’ অবাক হয়ে বলল সন্তোষ।
‘সে কথাটাও মিথ্যে নয়; যেমন মিথ্যে নয় আপনাদের দেখা ম্যামথ, যেমন মিথ্যে নয় গুহামানব। চলুন, ওই যে মানব গুহ আমাদের ডাকছে।’ রাইফেলটা সন্তোষের হাত থেকে ফেরত নিয়ে পাহাড়ের চড়াইয়ের দিকে তাকালেন বেণুগোপাল।
বাকি দুজনও মুখ তুলে দেখল, সত্যিই, চূড়ার কাছাকাছি একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে মানব গুহ দুহাত নেড়ে ওদের উঠে আসার ইশারা করছে।
আর মিনিটপনেরো চড়াই ভাঙার পরেই ওরা তিনজন মানব গুহর কাছে পৌঁছে গেল। আজকে তার সাজপোশাকের জৌলুস আরও বেড়েছে। পাথরের মালার পাশাপাশি সারা গায়ে নানা রঙের উল্কিও এঁকেছে সে। বোঝাই যাচ্ছে, ঘরে অতিথি আসবে বলে ভালোরকমের প্রস্তুতি নিয়েছে।
মানবের সঙ্গে সেই সুড়ঙ্গ পেরিয়ে বড় হলঘরের মতন গুহাটায় পৌঁছে গেল ওরা। আজ গুহাটার দেওয়ালে অন্তত চার-পাঁচ জায়গায় পশুচর্বির মশাল জ্বলছিল। তাই জব্বর আলির মতন টুকরো টুকরো ছবি দেখতে হল না ওদের, দেখল পুরোটাই।
আর সে কী ছবি! সারা দেওয়াল জুড়ে উজ্জ্বল রঙে আঁকা অজস্র বিচিত্র গুহাচিত্র। তার মধ্যে শিকারের ছবি আছে, যুদ্ধের ছবি আছে, আবার শ’য়ে শ’য়ে এমনি হাতের ছাপও রয়েছে। এসব মিলিয়ে পুরো দেওয়ালটাই যেন রঙিন এক শাড়ির মতন ঝলমল করছে।
বেণুগোপাল, হারুবাবু আর সন্তোষ মুগ্ধ হয়ে দেওয়ালের সীমানা বরাবর হেঁটে চলেছিল। যতক্ষণ না সমস্ত ছবি দেখা শেষ হল, ততক্ষণ ওরা কেউই কোনও কথা বলতে পারল না। ছবি দেখা শেষ হলে ওরা গুহার মেঝের একপাশে উঁচু একটা পাথরের চাতালে এসে বসল। ওদের তিনজনের মুখোমুখি বসল মানব।
বেণুগোপালই প্রথম ঘোর কাটিয়ে কথা বলে উঠলেন। তিনি মানবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কই, তুমি যে তোমার কোন আবিষ্কার দেখাবে বলেছিলে?’
কথা না বলে মানব উঠে দাঁড়াল। তারপর গুহাঘরের এক কোণা থেকে একটা গোল করে কাটা গাছের গুঁড়ি এনে ওদের সামনে নামিয়ে রাখল।
ওরা তিনজনেই সমস্বরে বলে উঠল, ‘এটা কী?’
মানব গুহ তার স্বভাবসিদ্ধ শান্তস্বরে বলল, ‘চাকা।’
শত চেষ্টাতেও হারুবাবু আর সন্তোষ হাসি সামলাতে পারল না। তাই দেখে মানব গুহর মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। সে বলল, ‘জানি, আপনাদের চারিদিকে এখন লক্ষ লক্ষ চাকা ঘুরছে। শিশুর হাতের খেলনা থেকে দানবিক টারবাইন অবধি সব জায়গাতেই চাকা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, যেদিন আমি প্রথম এই কাঠের টুকরোটাকে পাহাড়ের ঢাল দিয়ে গড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেদিন পৃথিবীতে আর কোনও চাকা ছিল না।
বেণুগোপাল উঠে দাঁড়িয়ে মানব গুহর হাতটা জড়িয়ে ধরে বললেন, অভিনন্দন। আরও বহু মানুষের মতন আমারও স্বপ্ন ছিল মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটার আবিষ্কারকের সঙ্গে আলাপ করব। আজকে সেই স্বপ্ন সার্থক হল।’
বেণুগোপালের দেখাদেখি হারুবাবু আর সন্তোষও উঠে দাঁড়িয়ে মানবের সঙ্গে হাত মেলাল।
মানব গুহর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, ‘চলুন, বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।’
‘না, আরেকটু বসুন। কয়েকটা কথা জানবার আছে।’ বেণুগোপাল বললেন।
‘বলুন।’ ওদের মুখোমুখি বসে বলল মানব গুহ।
‘আপনি মানব গুহ নন, আপনি গুহামানব।’
এই অল্পসময়ের মধ্যেই এমন একটা কিছু হয়ে গিয়েছিল যার জন্যে ওই অর্ধনগ্ন কুরূপ মানুষটাকে মেলার তিন খেলোয়াড়ের কেউই ‘তুমি’ করে কথা বলবার কথা ভাবতেও পারছিল না।
বেণুগোপাল একটু থেমে আবার বললেন, ‘আপনি তুষারযুগের শেষে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন। আবার ফিরে এলেন কেন? কেমন করে?’
গুহামানব উদাস চোখে গুহার দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলো দেখতে দেখতে বলল, ‘জানি না। সম্ভবত আপনারাই আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন। আপনাদের স্বপ্ন আমাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছে।’
‘আমাদের স্বপ্ন!’ হারুবাবুর গলায় অপার বিস্ময়।
‘হ্যাঁ। আপনাদের মধ্যে কেউ চেয়েছেন বিষপাথর, কেউ চেয়েছেন ম্যাজিক, কেউ চেয়েছেন বন্য পশুদের ওপর প্রভুত্ব আবার কেউ চেয়েছেন হিংস্র এক নররাক্ষস। ভেবে দেখুন তো, গুহামানব ছাড়া আর কার মধ্যে এই সমস্ত কিছু মিলেমিশে এক হয়ে যেতে পারে?’
ওরা কেউ কোনও কথা না বলে চুপ করে গুহামানবের কথা শুনতে লাগল।
‘সেই জন্যেই বোধহয় আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি ছিলাম তুষার যুগের গুণিন। তখন এই মনসা পাহাড়েই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বরফ ঝরে পড়ত। এই গুহার বাইরের পৃথিবীতে সাদা ছাড়া কোনও রং দেখা যেত না। নীচের ওই মাঠে বলগা হরিণদের খুরের শব্দও একসময়ে মিলিয়ে যেত। তখন শব্দও থাকত না কোনও। গুহা ছেড়ে বেরোতে পারত না একজনও আদিম মানুষ।
‘তখন মানুষের হাতে কোনও আমোদ-প্রামোদের উপকরণ ছিল না, বিজ্ঞান ছিল না, ধর্ম ছিল না। সাদা বরফে ঢাকা নিঃশব্দ একঘেয়েমিতে ডুবে থাকতে থাকতে তারা একসময় নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যেত, যদি না…’
‘যদি না?’ সমস্বরে জিগ্যেস করল ওরা তিনজন।
‘যদি না আমি থাকতাম। আমি—তুষার যুগের গুণিন। আমি সেই ভয়ংকর দিনগুলোতে আমার ভাই বন্ধুদের হাতে রং তুলি ধরিয়ে দিতাম। বলতাম ছবি আঁকো। ওরা গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকত। আমি হরিণের হাড় দিয়ে বাঁশি তৈরি করে ওদের হাতে তুলে দিতাম। বলতাম গান করো। আমি ওদের নিয়ে আগুন ঘিরে নাচতাম।’
‘আর এইভাবে সেই দীর্ঘ শীতের রাত কেটে যেত। আবার বসন্ত আসত। ফিরে আসত বল্গা হরিণের খুরের শব্দ। ফিরে আসত শিকারের দিন। মানুষ পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যেত।’
‘তাহলে ভেবে দেখুন তো হারুবাবু, ভেবে দেখুন তো সন্তোষবাবু, বেণুগোপালবাবু—আমি, গুহাবাসী এক গুণিন—আমিই আপনাদের সমস্ত খেলা আর শিল্পের জনক কি না?’
অনেকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। তারপর জাদুকর সন্তোষ পাল গুহামানবকে প্রশ্ন করল, ‘এখন আপনি কী করবেন?’
‘সেটা নির্ভর করছে আপনাদের ওপর। ম্যাজিশিয়ানমশাই, আপনি কী চান এরকম ম্যাজিক দেখাতে, যে ম্যাজিক দেখে কেউ আপনার দিকে ডিম আর টমেটো ছুঁড়ে মারবে না?’ গুণিনের হাতের ইঙ্গিতে মুহূর্তের মধ্যে সেই অন্ধকার গুহার মধ্যে কয়েক হাজার আলোয় গড়া রঙিন পাখি ওড়াউড়ি করতে লাগল। আবার হাতের ইঙ্গিতেই তারা মিলিয়ে গেল।
‘বেণুগোপালবাবু! আপনি কি চান সার্কাসের রিঙের মধ্যে ওইরকম কয়েকটা বাঘের সঙ্গে খেলা দেখাতে?’ গুহামানবের দৃষ্টি অনুসরণ করে ওরা তিনজন গুহার প্রবেশপথের দিকে তাকাল। সেখানে তখন তিনটে স্যাবার-টিথড টাইগার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাজ আছড়াচ্ছে। তাদের গলার মধ্যে থেকে আদুরে বেড়ালের মতন গরগর শব্দ বেরিয়ে আসছে। গুহামানবের হাতের ইশারায় তারা আবার বাইরে বেরিয়ে গেল।
‘সব শেষে আপনাকে জিগ্যেস করি হারুবাবু, আপনি কী চান, দিনের পর দিন আপনার দর্শকদের এই অর্ধনগ্ন কুশ্রী মানুষটাকে দেখাতে, যার স্বাভাবিক আহারই কাঁচা মাংস?’
আবারও কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। তারপর সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম কথা বলল রিংমাস্টার বেণুগোপাল। বেণুগোপাল বলল, ‘মিথ্যে বলব না, কিছুক্ষণ আগে অবধি আমরা ঠিক এই জিনিসগুলোই চেয়েছিলাম। কেউ চেয়েছিলাম আপনাকে কাজে লাগিয়ে নিজের শো-কে জমজমাট করে তুলতে। কেউ চেয়েছিলাম আশ্চর্য ম্যাজিক শিখতে। আবার কেউ চেয়েছিলাম অন্য কিছু নয়, প্রিয় পোষ্যদের ফিরে পেতে।’
বেণুগোপালের কথার জের টেনে জাদুকর সন্তোষ বলে উঠল, ‘কিন্তু এখন আমরা আর তা চাই না। এত হাজার বছর পরেও মেলা থেকে মেলায় আমরা ঠিক সেই কাজটাই তো করছি, যেটা বারো হাজার বছর আগে আপনি করতেন—মানুষকে পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানো, তার মনটাকে তাজা রাখা। বুঝতে পারছি, আপনার রক্ত আমাদের সবার মধ্যে রয়েছে। আপনার স্বপ্নও আমাদের সবার মধ্যে রয়েছে। সেই-ই যথেষ্ট।’
গুহামানবের বিচ্ছিরি মুখটা দারুণ একটা হাসিতে ভরে উঠল। সে উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘চলুন, তাহলে আপনাদের এগিয়ে দিই। তারপর আমিও ফিরে যাব আমার কালে, বারো হাজার বছর আগের হিমযুগে।’
পরমুহূর্তেই বেণুগোপাল, সন্তোষ আর হারুবাবু দেখলেন তারা মেলার মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু দূর থেকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে মোহন পাণ্ডে।
হারুবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল মোহন? কোনও বিপদ-আপদ ঘটল না কি?’
‘দাদা, সেই বাঘের দাঁতদুটো আমার ফতুয়ার পকেটে রেখেছিলাম। হঠাৎই আর দেখতে পাচ্ছি না। যেন বিলকুল হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কোথায় গেল বলুন তো!’
মোহন পাণ্ডের উদ্বেগ দেখে ওরা তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠল। হারুবাবু বললেন, ‘কোথায় গেল বললে তুমি বিশ্বাস করবে না মোহন। তা ছাড়া সে অনেক লম্বা গল্প।’
সন্ধে হয়ে গেছে। আবুহাটির মেলার সমস্ত আলো জ্বলে উঠেছে। হতভম্ভ মোহন পাণ্ডেকে পেছনে রেখে ওরা জোরে পা চালিয়ে যে যার তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেল।